রুদ্র মিজান ::
একটি চাকরি খুব প্রয়োজন। বেশ অনেক দিন যাবত চেষ্টা করছেন ডলি। প্রায় এক বছর ধরে স্বামী দূরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত । সেই থেক বড্ড অসহায় হয়ে পড়েছেন তিনি। চাকরিটা তাঁর জন্য নয়। তাঁর পুত্র ওবায়েদের জন্য। ওবায়েদ অনার্স শেষ করছেন এ বছর। বিষয় গণিত। এ দেশে এটি ভালো বিষয় হিসেবেই পরিচিত। কিন্তু চাকরিটা হচ্ছে না। একমাত্র পুত্র ওবায়েদ আরও বিদ্যালয় পড়ুয়া দু’ কন্যা ও অসুস্থ স্বামীকে নিয়েই ডলির সংসার। স্বামীর চিকিৎসা, দু’মেয়ের লেখাপড়া সব-মিলিয়ে চোখে অন্ধকার দেখছেন তিনি। আরমান ডলিকে বলেছে- চিন্তা করবেন না। আমাদের ব্যাংকে ওবায়েদের চাকরিটা হয়ে যাবে।আরমান একটি ব্যাংকের পরিচালক। সে বললেই চাকরিটা হয়। তাই ডলি আরমানের কাছে এসেছেন। ডলির দূর সম্পর্কের আত্মীয় আরমান। বোনপো। সবসময় হাসি হাসি ভাব। এটি তার অফিসকক্ষ। চারদিকে কালো থাইগ্লাস। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। নিরব এ কক্ষের দরজা বন্ধ। পাশাপাশি সোফায় বসে কথা হচ্ছে তাদের। এ পরিবেশে খুব অস্বস্তি বোধ করছেন ডলি। কারণ আরমানের দৃষ্টি। তার দৃষ্টিটা খুব ভালো মনে হচ্ছে না। যদিও সম্পর্কটা খালা-বোনপো’র। দেখে বুঝার উপায় নেই ডলির বয়স প্রায় পঞ্চাশ। বয়সের ব্যবধানও প্রায় অর্ধেক। উত্তরাধিকারী সূত্রেই আরমান একটি ব্যাংকের পরিচালক। এই মুহূর্তে আরমানের দৃষ্টি ডলির ক্রীম রঙের শাড়িতে ঢাকা বুকের ওপর। চমকে ওঠেন ডলি। ডলি বলেন- ঠিক আছে আরমান তুমি চেষ্টা করো। আমার খুব উপকার হবে।
তাৎক্ষণিকভাবে ডলির কোমল হাতটা টেনে ধরে আরমান। সে বলে- সুযোগতো দিতে হবে।
কিছু না বুঝার ভাব করে হাত ছাড়াতে ছাড়াতেই ডলি বলেন- তোমার মা খুব ভালো ছিলেন। আমাকে নিজের আপন বোনের মতো দেখতেন।
মুহূর্তেই আরমানের মুখটা কালো হয়ে যায়। সে বলে- ঠিক আছে। দেখি কী করা যায়।একটা বিরক্তির ভাব। যেন ফরোয়ার্ড থেকে বল ছোড়া আক্রমণাত্মক কোনো খেলোয়ারের ব্যর্থ হওয়ার মতো। ডলি চলে যান। ওই রাতে আর ঘুম হয় নি তাঁর। কী করবেন তিনি। প্রতিদিন চাল, ডাল সহ সকল পণ্যের দাম লাগামহীনভাবে বাড়ছে। বেঁচে থাকতে হলে তা ক্রয় করতেই হয়। মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন তাঁর স্বামী। তাঁর চিকিৎসার কোনো ত্রুটি করা যাবে না। দু’মেয়ের লেখাপড়ার খরচ। বিষিয়ে উঠেছে ডলির জীবন। কোথায় যাবেন। কার কাছে যাবেন। আর কতদিন এভাবে চলবেন। গ্রামের বাড়ির সামান্য জমি বিক্রি করে আর ভাইদের আর্থিক সাহায্যে এতদিন সংসার চালিয়েছেন তিনি।
ডলি আজ এক আত্মীয়ের বাসায় গিয়েছিলেন। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। বললেন- আমাদের এখানে আপাতত নিয়োগ দেওয়া হবে না। প্রয়োজন হলে তিনি ডলিকে ডাকবেন।
ডলির পুত্র ওবায়েদও চেষ্টা করছে। হচ্ছে না। ওবায়েদ একটি কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষকতার চাকরি পেয়েছিলো। কিন্তু এটি ছাড়তে হলো। বেতন কম। প্রতিদিন প্রতিষ্ঠানে যাওয়া- আসার রিকশা ভাড়া আর এক কাপ চা খেলে মাস শেষে কিছুই থাকে না। আসলে বেতন বলা ঠিক না। এটি নাকি সম্মানী। প্রতিষ্ঠানের পরিচালকরা বলেন- এটি এক ধরনের সেবা। সমাজ ও দেশের সেবা।
ওবায়েদ ভাবে সেবাটা যদি বিনামূল্যে দেওয়া হতো। মধ্যবিত্ত পরিবারের বেশ উপকার হতো। কিন্তু লাগামহীন ভর্তি ফি আর মাসিক বেতনের কারণেতো মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা এখানে ভর্তি হওয়ার সুযোগই পান না। অথচ শিক্ষকরা শ্রম দেন। আঙুল চুষেন। মা ডলি ও অসুস্থ বাবার কষ্টে ওবায়েদের সহ্য হয় না। সে ভাবে ঠেলাগাড়িতে করে সবজি বিক্রি করা যায়। আইসক্রীম, ঝালমুড়ি..এসব।
চিকিৎসক ডলিকে জানিয়েছেন ভারতে-মাদ্রাজে চিকিৎসা করালে তাঁর স্বামীর কিছুটা উন্নতি হতে পারে। ডলি নিরবে শুনলেন। চিকিৎসকের চেম্বার থেকে বাসায় ফেরে দরজা বন্ধ করে একা-একা নিজের রুমে বসে থাকলেন দীর্ঘক্ষণ। নিরবে কাঁদলেন। নিজেকে পৃথিবীর সব’চে অসহায় মানুষ মনে হলো। স্বামী এবং সংসার বাঁচানোর জন্য তিনি এখন কী করবেন। আরমানের মুখ ভেসে ওঠে তাঁর চোখে। তিনি কী শেষ পর্যন্ত আরমানের কাছেই আত্মসমর্পন করবেন।
ডলির খুব মনে পড়ে, তিনি তখন অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্রী। বিষয় বাঙলা। তাদের শিক্ষক অরবিন্দু দাস বেশ রোমান্টিক ছিলেন। জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন, সুরঞ্জনা কখনো সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নীরা কবিতা আবৃত্তি করে তিনি ক্লাশ শুরু করতেন। সুযোগ পেলেই ডলির দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেন। এ নিয়ে সহপাঠীরা কত মজা করতো। ডলি ভীষণ লজ্জা পেতেন। অরবিন্দু স্যার একদিন ডলিকে ক্লাশে সবার সামনে বললেন, বনলতা সেন কবিতায়, দু দন্ডের শান্তির জন্য প্রেমিক ইচ্ছাপূরণের গতিশীল যাত্রীতে পরিণত হয়েছেন। সেই কামনাসৃষ্ট ইচ্ছা পূরণ কী সম্ভব বলে তুমি মনে করো?
ডলি থ হয়ে যায়। কী বলবেন তিনি। কী বলা যায়। ডলিতো বনলতা সেন নয়। তাঁর বাড়ি নাটোর নয়। তাঁকে নিয়ে কেউ কবিতা লেখে নি। তাহলে সরাসরি এরকম প্রশ্ন কেন?
স্যার আবার বলেন, প্রেমিক বনলতা সেনকে দেখতে চায়। কিন্তু সব প্রেমিক বনলতা সেনকে দেখতে পারে না। তাই কবি নিজেই বলেছেন ‘থাকে শুধু অন্ধকার মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন…।’সেই স্যার একদিন একদিন লেকচার শিট দেবেন বলে বাসায় ডাকেন ডলিকে। ডলি আর তাঁর বান্ধবী শেমি সেদিন স্যারের বাসায় গিয়েছিলো। স্যার কিছুক্ষণ গল্প করলেন। ডলির প্রশংসা করলেন। বললেন, তুমি ছাত্রী হিসেবে খুবই ভালো। এছাড়াও তোমার অনেক গুণ রয়েছে। তুমি গান, নৃত্য, মঞ্চ নাটক বা আবৃত্তি করতে পারো। খুব ভালো করবে। তোমার কণ্ঠ খুব সুন্দর। সুদর্শনা তুমি।
স্যার শ্রীকৃষ্ণকীর্তন সম্পর্কে বলেন, বালিকা বয়সে নপুংসক এক ঘোষের সঙে রাধার বিয়ে হয়। কিন্তু পরবর্তীতে এই রাধার সাথে কৃষ্ণের প্রণয়ের সম্পর্ক এক বিরল ইতিহাসের জন্ম দিয়েছে।
স্যারের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে পেরে একটু দূরত্ব সৃষ্টি করেন ডলি নিজেই। ওই স্যারের বাসায় আর শিটের জন্য পা দেন নি তিনি। সুন্দরী মেয়েদের পটানোর জন্য সবসময়ই এক শ্রেণির ছেলেরা ওৎপেতে থাকে। নানা ফন্দি-ফিকির করতে থাকে। একটু বড় হওয়ার পর থেকেই এরকম নানা ফন্দি মোকাবেলা করতে হয়েছে তাঁকে। একদিন ক্লাশমেট বন্ধু রাজু প্রস্তাব দিলো, তুই টিভি নাটকে কাজ করবি। আমার এক বড় ভাই নাটক নির্মাণ করেন। বেশ পরিচিতি আছে তার। বড় ভাইয়ার বিয়েতে তুকে আমার সাথে দেখে নিজ থেকেই তিনি বলেছেন। তুই চাইলে স্টার হয়ে যেতে পারবি।
প্রথমে আগ্রহ দেখান নি ডলি। অথচ দু-এক বছর পূর্বেও নাটকে অভিনয়ের তীব্র ইচ্ছে ছিলো তাঁর। তবু বন্ধুর অনুপ্রেরণায় একসময় নতুন করে আগ্রহ সৃষ্টি হয় ডলির। নাট্য নির্মাতার নাম মাহমুদ হাসান। রাজু একদিন সেখানে নিয়ে যায় ডলিকে। এভাবে বেশ কয়েক দিন যাতায়াতের পর মাহমুদের সাথে ঘনিষ্টতা সৃষ্টি হয় ডলির। একদিন ফোনে মাহমুদ জানান, তার বাসায় যেতে হবে। নাটকের চরিত্র নিয়ে জরুরি কথা আছে। ডলি উৎসাহে বাসায় ছুটে যান।
ডলির সাথে গল্প-আড্ডায় মেতে উঠে মাহমুদ । তখন সন্ধ্যা। মাহমুদের বাসায় ডলি ছাড়া কেউ নেই। নাট্য নির্মাতা মাহমুদ হাসান ডলির হাত টেনে তার একপাশে বসিয়ে বলেন- তোমাকে কিছু ছবি তুলতে হবে। এসব পোষাক দিয়ে হবে না। নাটকের চরিত্রের সাথে তোমাকে মিশে যেতে হবে। এটি একটি বিদেশি মেয়ের চরিত্রতো। তাই সেভাবে পোষাক পড়তে হবে। কাল বিকেলে সেভাবে তৈরি হয়ে এসো। বা এখানে এসে তৈরি হলেই চলবে।ডলি কোনো কথা বলেন না। শুধু মনে হচ্ছিলো একটা অশনি সংকেত তাঁর মনে নাড়া দিচ্ছে। ডলি চিন্তিত।
মাহমুদ হাসান বলেন- আন ইজি ফিল করলে চলবে না। নাটক-গান করতে হলে একটু খোলামেলা স্বভাবের হতেই হয়। মনে রেখো, পৃথিবীটা হচ্ছে গিভ এন্ড পে। তুমি শুধু আমাকে একটু দেখো.. আমি তোমাকে স্টার বানিয়ে দেব।
এভাবে কথা বলতে-বলতে ডলির হাত ধরেছিলো মাহমুদ । ডলি হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। মাহমুদ তাঁর কাঁধে হাত রাখতে চায়। ডলি বলেন- মাহমুদ ভাই, আপনি কী বুঝতে পারছেন এসব কী করছেন।
ডলিকে টেনে তার বুকের সাথে মিশিয়ে নেন মাহমুদ । ডলি বন্দি পাখির মতো ছটফট করেন। মাহমুদ বলে- শোন এ লাইনে প্রতিষ্ঠিত হতে চাইলে আমাকে না হয় অন্য কাউকে এভাবে আপন করে নিতেই হবে।
ডলির চোখ থেকে তখন জল গড়িয়ে পড়ছে। ডলি বলেন- আমি স্টার হতে চাই না। প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিন। নতুবা আমি চিৎকার করব। আমি জানতাম না যে আপনি একটা লুইচ্চা।
এভাবে অনেক সময় ধস্তাধস্তির পর ডলি মুক্তি পান মাহমুদের হাত থেকে।
সেই ডলি এখন এ কোন অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছেন। সংসারের টানটান অবস্থা, স্বামীর
অসুস্থতা। তিনি কী করবেন এখন। এসব ভাবছেন আর মেকাপ করছেন ডলি। তাঁর মেকাপ নষ্ট হচ্ছে চোখের জলে। টিস্যু দিয়ে তিনি জল মুছেন। এই সময়ে সৌন্দর্যটাই যেন তাঁর পুঁজি।
স্মৃতিগুলো মনে পড়ে ডলির। মাস্টার্স শেষে একটা চাকুরির সন্ধান করেছিলেন তিনি। তখনও তাঁর সৌন্দর্যটা বিপত্তি হয়ে দাঁড়ায়। যদিও এটি অনেকের কাছে আবার আর্শীবাদ। একটি উন্নয়ন সংস্থায় লিখিত পরীক্ষায় উর্ত্তীণ হয়েছিলেন ডলি। কিন্তু আটকে গেলেন মৌখিক পরীক্ষায়। ওই সংস্থার চেয়ারম্যান একাই পরীক্ষা নিচ্ছিলেন। ওই সময়ে তিনি ডলিকে বলেছিলেন- আপনি নিশ্চয়ই একজন প্রগতিশীল মানুষ। সামাজিক অন্ধ প্রথাগুলো ভেঙে উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে একটি নতুন সমাজ গড়তে হবে। আমাদের সেভাবেই চলতে হবে।
ডলি কোনো কথা বলেন না। মাথা নিচু করে কথাগুলো হজম করেন তিনি। ভদ্রতাসূচক মাঝে মাঝে স্মিত হাসি দেন। সংস্থার চেয়ারম্যান সাহেব বলে যান- যেমন অনেক সময় আমার সাথে আপনাকে বিভিন্ন জায়গায় যেতে হবে। একসাথে থাকতে হবে। একদম আপন পরিবেশের মতো করে। এজন্য আপনাকে আমি ভালো মাইনে দেব। আমি সন্তুষ্ট থাকলে শীঘ্রই প্রমোশনও হবে। আপনি যদি এ বিষয়ে কোনো আপত্তি না করেন আমি আপনাকে বিভিন্ন দেশে নিয়ে যাব। এখন সিদ্ধান্ত আপনি নেবেন।
তিনি একটু থেমে ডলির মুখের দিকে তাকালেন। বললেন- আপনাকে দেখেই আমার ভালো লেগেছে। আপনি কি এখনই এ বিষয়ে জানাবেন।
ডলি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ান। সাথে সাথে মুখটা কালো বর্ণ ধারণ করে চেয়ারম্যানের। ডলি বলেন- এরকম চাকরির জন্য লেখাপড়া করি নি। আমার মা-বাবা আপনার মা-বাবার মতো করে আমাকে নোংরামি শিক্ষা দেন নি। আমি সরি।
বলেই জুতার খট খট আওয়াজ তুলে সেদিন চাকরির গুষ্ঠি কিলিয়ে বাসায় ফিরেছিলেন ডলি। তারপর আর চাকরি খুঁজেন নি। একটি ফ্যাশন হাউজ করেছিলেন। বিয়ের পর পারিবারিক কাজের কারণে তা বন্ধ করে দেন তিনি।
সেই ডলি এখন ভীষণ অসহায়। চারদিকে অন্ধকার। আশাহত। এখন সংসার এবং স্বামীর জীবন রক্ষার সংগ্রামে তিনি অস্ত্রহীন যোদ্ধা যেন। ঠোঁটের লিপস্টিক আরও গাঢ় করে নেন ডলি। শরীরে পারফিউম দেন। আবেদনময়ী এক গন্ধ ছড়ায় তাঁর কোমল শরীর থেকে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। হালকা কমলা রঙের শাড়ি, অভিন্ন রঙের ব্লাউজ পড়েন ডলি। কল দেন আরমানের মোবাইলফোনে।
তারপর আমরা তাকে রিকশার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি রাস্তায়। উদ্দেশ্য আরমানের অফিসকক্ষ। ছেলের চাকরির জন্য এক অদ্ভুত ইন্টারভিউ! য়ার মুখোমুখি হতে তিনি এখন প্রস্তুত।
লেখক : কবি, গল্পকার ও সংবাদকর্মী।
