ছাত্র নাগরিক অভ্যুত্থানের পথে দেশ-

by News Room

গোলজার আহমদ হেলাল

নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ছাত্র নাগরিক অভ্যুত্থানের পথে ধাবিত হচ্ছে বাংলাদেশ। কোটা সংস্কারের দাবীতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ছাত্র-বিক্ষোভ,গণ-বিক্ষোভ,গণ-অসন্তোষ পেরিয়ে পরিণত হয়েছে ছাত্র গণ-আন্দোলনে।শিক্ষার্থীদের দাবী গণদাবীতে পরিণত হয়েছে।দেশের সকল শ্রেণী, পেশা, জাতি, ধর্ম ও বর্ণের মানুষ শামিল হয়েছে তীব্র এই গণ-আন্দোলনে। প্রতিদিন মিছিল, মিটিং, সভা, সমাবেশ করছেন আন্দোলনকারীরা। সংঘাত-সংঘর্ষ চলছে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সৃষ্ট এই ছাত্র আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে।সরকার এই আন্দোলন দমন করতে বেছে নিয়েছে নৃশংস হত্যাকাণ্ড,নিপীড়ন,গণ গ্রেফতার।দেশের ছাত্র, জনতা ও শিশুদের উপর নির্বিচারে গুলি ও গণহত্যা চালিয়ে ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম অধ্যায় সৃষ্টি করেছে।নির্মম এই হত্যাযজ্ঞ পৃথিবীর বৃহৎ একটি ছাত্র গণহত্যা।

বাংলাদেশের চলমান ছাত্র আন্দোলন ও ছাত্র বিক্ষোভে নানাধরনের বৈচিত্র্যময় ও সৃজনশীল কর্মসূচি এনেছে শিক্ষার্থীরা।গ্রাফিতি ও দেয়াল লিখন এর মধ্যে একটি। দেশের অর্ধশত বছরের রাজনীতিকে ম্লান করে দিয়েছে ছাত্ররা।ক্ষমতাসীনদের মিনিটে মিনিটে মিথ্যা বয়ান ও যাবতীয় রাজনীতির ব্যর্থতার দরুণ পলিটিশিয়ানদের উপর থেকে বিশ্বাস উঠে গেছে ছাত্র-ছাত্রীদের। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বাংলা ব্লকেড কর্মসূচি, কমপ্লিট শাট ডাউন কর্মসূচি, March for Justice, Remember of our heroes,প্রার্থনা,গণমিছিল ইত্যাদি কর্মসূচি দেশের রাজনীতি ও আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কোটা সংস্কারের ইস্যুতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দাবীগুলো সাধারণ মানুষের দাবীতে পরিণত হয়েছে। ছাত্র আন্দোলন ছাত্র বিক্ষোভ থেকে গণবিক্ষোভ,গণ আন্দোলন ও গণ অভ্যুত্থানের দিকে যাত্রা করেছে। সরকার আন্দোলন থামাতে ও শিক্ষার্থীদের দাবী মানতে,ক্লাসে ফেরাতে নানা কালক্ষেপণ করে ও ব্যর্থ কৌশল অবলম্বন করে।ছাত্রদের নিরস্ত্র, অহিংস ,উত্তাল ,যৌক্তিক ও ন্যায্য আন্দোলন দমন করতে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। নিহত ও গুলিবিদ্ধ হয় শত শত ছাত্র, জনতা ও শিশু।ছাত্রদের আন্দোলনে স্বতস্ফূর্ত ভাবে যোগ দেয় প্রতিবাদী সাধারণ জনতা।দেশে এক পর্যায়ে কারফিউ জারি হয়, সামরিক ও আধা সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে সাধারণ ছাত্র জনতার মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়। সকল নিয়মনীতি
উপেক্ষা করে মৌলিক ও নাগরিক অধিকার ক্ষুন্ন করে অন্যায়ভাবে নিরীহ ছাত্রদের গ্রেফতার করা হচ্ছে গণহারে। অপ্রাপ্ত বয়স্ক শিশুদের রিমান্ডে নেয়া হচ্ছে। অভিভাবক, শিক্ষক ও সাংবাদিকদের উপর হামলা করছে সরকারী বাহিনী।ঘরের বারান্দায় মায়ের কোলে শিশু এই অবস্থায় মা গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করছে, জানালা দিয়ে গুলি ঢুকে নিজ ঘরেই মৃত্যুবরণ করছে শিশু, পিতার কোলে শিশু গুলিবিদ্ধ হয়েই নিজ বাড়ীর ছাদেই ইন্তেকাল করতে হচ্ছে, পিয়াজু কিনতে ঘরের বাহিরে যাওয়া মাত্র গুলিবিদ্ধ হয়ে শিশু মরছে। ছাত্র আন্দোলন দমাতে সামরিক যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করছে পুলিশ। মাথার উপর হেলিকপ্টার, রাজপথে সাজোয়া যান, গ্রেনেড, রাবার বুলেট ইত্যাদি ব্যবহার হচ্ছে নিজ দেশের ছাত্র ও জনগণের উপর। বিগত একশো বছরের ইতিহাসে এই দেশ ও উপমহাদেশের কোথায়ও এমন ঘটনা ঘটেনি। এত অল্প সময়ে এত হত্যা ও গণহত্যার মতো ঘটনা ঘটেনি। অরাজক পরিস্থিতির মধ্যে গোটা দেশের মানুষ।

ইউনিসেফ বলছে ৩২ জনের মতো শিশু হত্যা করা হয়েছে।ইউরোপীয় ইউনিয়নের দাবী ৩৭ জন শিশু হত্যকান্ডের শিকার। নিহত শিশু, শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনগণের এ পর্যন্ত ২৬৬ জনের তালিকা প্রকাশ করেছে একটি গণমাধ্যম। বেসরকারী একটি সংস্থা বলেছে তিনশোর অধিক ছাত্র জনতা নিহত হয়েছে। সরকার বলেছেন ১৪৭ জন। যা মোটেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ পত্রিকার পাতা খুললে দেখা যায় এখনো অনেক মানুষ নিখোঁজ। অসমর্থিত সুত্রগুলো বলেছে, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে প্রাণহানির সংখ্যা হাজারের উপরে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। দৈনিক প্রথম আলোর পরিসংখ্যান বলছে নিহতদের ৭০ শতাংশ কম বয়সী। যা ফিলিস্তিনের কাছাকাছি। সেখানে ইসরাঈলী হামলায় ৭৫ শতাংশ কম বয়সীরা শহীদ হচ্ছেন।ঢাকায় গণ গ্রেফতারের ৮৭ শতাংশের রাজনৈতিক কোন পরিচয় নেই।

দৈনিক প্রথম আলো ২৪ জুলাই তারিখে যা তথ্য পাওয়া যায়, শিশু সামির। বয়স ১১।ঘরের ভেতরেই ছিল। জানালার পাশে তার পড়ার টেবিল। বাহির থেকে কাঁদানো গ্যাস, গন্ধ ইত্যাদি প্রবেশ করছিল। সে জানালা বন্ধ করতেই তার চোখে গুলি আঘাত করল। বের হল মগজ দিয়ে। লুটিয়ে পড়লো মাটিতে। রক্তাক্ত নিথর দেহ। অসহায় পিতা পুলিশের কাছে “আমার কোন অভিযোগ নেই…. ” বলে লিখিত ফরমে সই করে জীবনের চেয়ে প্রিয় তার ছেলেটিকে দ্রুত কবরস্থ করলো। পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ দুনিয়ার সবচেয়ে ভারী। আহ কত হৃদয়বিদারক ঘটনা। গা শিউরে উঠে। আরেকটি ঘটনা নারায়ণগঞ্জ শহরে।বাড়ির ছাদে খেলার সময় মাথায় গুলিবিদ্ধ ছয় বছরের শিশু রিয়া গোপের লাশ বুকে নিয়ে বাবা দিপক কুমারের আহাজারিতে স্বজনদের শান্তনা দেওয়ার ভাষা নেই। মারা গেলো শিশুটি পিতার চোখের সামনেই।আহ,পিতা-মাতা বেঁচেও না থাকার সমান। স্বজন হারানোর ব্যথা কত কষ্ট, ব্যথিত বেদনরাই একমাত্র বুঝতে পারে।আবদুল আহাদ। বয়স ৪। গত শুক্রবার ১৯ জুলাই বিকেলে যাত্রাবাড়ীতে বাবা মা এর সাথে বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়। পর দিন শনিবার মারা যায়-ও কি করছে? কোন দল করতো?আহমেদ সানির বয়স সবেমাত্র সাতে পড়েছে। মিরপুর ১৪ জামেউল উলূম মাদরাসার শিক্ষার্থী সে।১৯ তারিখে বাসার সামনে সংঘর্ষ চলছিল, সে জানালা দিয়ে দেখছিল। পুলিশ গুলি করলে কাচ ভেদ করে এসে কপালে লাগে। তৎক্ষনাৎ মারা যায়।-ও মাদ্রাসায় পড়তো।পিয়াজো কিনতে ঘরের বাহিরে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করে সাভারে এক শিশু। যাত্রাবাড়ীতে মা শিশু কে কোলে নিয়ে পায়চারী করছেন নিজ ঘরের বারান্দায়। গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেলেন মা। এভাবে আন্দোলনকারীর সাথে নিরীহ শিশু, সাংবাদিক, দিনমজুর ও নিম্ন মধ্যম আয়ের মানুষও নিহত হয়েছেন। পুলিশের আক্রমণে আহত ও নিহত মানুষগুলোর উপর পৈশাচিকতার দায় এককভাবে সরকারকে নিতে হবে।

একটি ন্যায্য ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা প্রথমেই সহজ সমাধান করতে পারতেন।প্রধানমন্ত্রী চীন সফর থেকে এসে শিক্ষার্থীদের সাথে বসতে পারতেন। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে মীমাংসা করে ফেলতে পারতেন। এটি আইনসিদ্ধ। এডিআর, ডকট্রিন অফ নেসাসিটি ইত্যাদি মানুষের জন্য। সমঝোতা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। Compromise is the beauty of democracy. Politics is the art of compromise. রাষ্ট্র পরিচালনা করতে এ বিষয়গুলো ভাবতে হবে। Necessity knows no law প্রয়োজন আইন মানে না দেখিয়ে নিরীহ নিরস্ত্র মানুষের বুকে গুলি চালানো হয়, তথ্য প্রাপ্তির ন্যায্য সেবা ইন্টারনেট বন্ধ করে ব্যাহত করা হয় অথচ একটি ন্যায্য দাবীকে সামনে রেখে শিক্ষার্থীদের সাথে বসা গেল না।দেখানো হলো হাইকোর্ট। বাঙালকে হাইকোর্ট দেখানোর এই খেলা কে শুরু করলো? মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের প্রেস ব্রিফিংয়ে বললেন, আন্দোলনকারীর উপর গুলি চালানোর নির্দেশনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কখনোও দেওয়া হয় নাই। তাহলে গুলি হচ্ছে কেন? আমাদের গ্রামে প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজ পর গ্রামের অনেক দেওয়ানী ফৌজদারি মামলা সহ সামাজিক বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করে থাকেন মুরুব্বিরা।এদের বিচার বুদ্ধি বিবেকের কাছে দেশের প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেটগণও হার মানবেন। সরকারের ভাবা উচিত ছিল শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ থাকাও সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রীর নিকট সমাধান চাইছিলো। কোর্টের কাছে নয়। তাদের পরিষ্কার কথা ছিল, নির্বাহী বিভাগ কিংবা সংসদে আইন হোক।সরকার নিপীড়নকে বেছে নিয়ে ছাত্রলীগ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধালো।যা মোটেই কাম্য ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা লাঞ্ছিত হয়ে বলেছে, প্রধানমন্ত্রী আমাদেরকে দেখান হাইকোর্ট। আমরা দেখাই সংবিধান। সংবিধানে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর কোটার কথা বলা হয়েছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি, তৃতীয় লিঙ্গ, প্রতিবন্ধী এরা অনগ্রসর। স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরেও কি মুক্তিযোদ্ধারা অনগ্রসর? সংবিধানে চাকুরি ও সুযোগের সমতার কথা বলা হয়েছে।সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার এই তিন মূলনীতি অনুসারে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে তা উল্লেখ আছে। শিক্ষার্থীরা অধিকারের ব্যপারে আপোষহীন হল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এ আন্দোলন সবখানে ছড়িয়ে পড়ে। কবি নজরুলের গান আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর নারী শিক্ষার্থীদের অসম সাহস, শ্লোগান ও বক্তৃতা অল্প সময়ের মধ্যে এই আন্দোলনকে বেগবান ও গতিশীল করে তোলে। একজন মেয়ে শিক্ষার্থী বলেছে,বাবাকে বলে আসছি আমি মরে গেলে আমার লাশ নিবেন না। ছাত্ররা যখন বিজয় মিছিল দিবে তখন বিজয় উল্লাস করে আমার লাশ নিয়ে দাফন করবেন।ছাত্রলীগের হামলায় আহত ঐ নারী শিক্ষার্থী বলেছেন, ওরা আমাদেরকে যেভাবে মারছে, আমাদের ভাইদেরকে যেভাবে মেরেছে। আমরা দমে যাইনি। পুলিশ, বিজিবি, নিরাপত্তা বাহিনী ও বুলেট, বেয়নটের সামনে দাঁড়িয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে যেভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন তা অতুলনীয় ও দুর্বার। ফলে সারা দেশে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় জেগে উঠে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পদভারে, মিছিলে মিছিলে।

DW’র প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ-সংঘাতে নিহত প্রায় ৭৮ শতাংশ মানুষের শরীরে প্রাণঘাতী গুলির ক্ষতচিহ্ন ছিল। বেশির ভাগের গুলি লেগেছে মাথা, বুক, পিঠ ও পেটে। বিক্ষোভে যেমন গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে, তেমনি নিহত ব্যক্তিদের কেউ কেউ নিজের বাসার ভেতরে, বারান্দায় ও ছাদে থাকা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। প্রথম আলোর পর্যালোচনায় আসা ১৭৫ জন নিহতের মধ্যে ২২ জন শিশু ও কিশোর। ১৮ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে ১০৩ জন।’গাজা ফিলিস্তিন শিশুর হত্যাও এরকম হয়নি। বাংলাদেশের এই ছাত্র হত্যাকাণ্ড দুনিয়ার বৃহত্তর দ্বিতীয় ছাত্র গণহত্যা। কোটা সংস্কারের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনোভাব বুঝতে ব্যর্থ হওয়া সরকারপক্ষ আজকের এই রক্তপাতের জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দায়ী থাকবে। ইতিহাস আমাদের রাষ্ট্রের এই ব্যর্থতার দায় নেবে না। অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার জন্য সরকার কখনোই আন্দোলকারীদের কাঁধে দায় দিতে পারবে না। সরকার চাইলেই শুরুতেই শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়টি যৌক্তিকভাবে সুরাহা করতে পারত। তা করতে পারলে হয়তো আমাদের এত লাশের মিছিল দেখতে হতো না। সাধারণ শিক্ষার্থীদের হাত ঘুরে আন্দোলন পাড়া-মহল্লা পর্যন্ত চলে যেত না।এই আন্দোলন এখন আর কেবলই আন্দোলন নয়, দীর্ঘদিন ধরে চলা বৈষম্য ও অনাচারের বিরুদ্ধে বড় ধরনের প্রতিবাদ।এতে ‘সাধারণ মানুষ’ ক্রমেই জড়িয়ে পড়েছে।ছাত্ররা ডাক দিয়েছে অনির্দিষ্ট কালের জন্য সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন। ভয়াবহ শংকায় দেশ।

কোটা সংস্কারের দাবীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে মুক্তিযোদ্ধা – রাজাকার খেলার যবনিকাপাত ঘটেছে।স্বাধীন বাংলাদেশে রাজাকার কোন ভালো উপাধি নয়।এটি নিয়ে গর্বের কিছু নেই। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর দোসর হিসেবে সম্মুখে থেকে কাজ করেছে রাজাকার বাহিনী।পাকিস্তানী সামরিক জান্তা ‘রাজাকার অর্ডিন্যন্স’ এর মাধ্যমে তৎকালীন সময়ে সরকারীভাবে এবাহিনীতে জনবল রিক্রুট করেছে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, চেয়ারম্যান, মেম্বার ইত্যাদি পেশার লোক রাজাকারী করে পাকিস্তান সরকারের ভাতা গ্রহণ করেছিল মুক্তিযুদ্ধের সময়।ক্ষমতাসীনদের মধ্যেই ভুরি ভুরি রাজাকার আছেন। ২০২৪ সালে কোনো স্কুল কলেজ ভার্সিটি পড়ুয়া শিক্ষার্থী কিংবা ছেলেমেয়ে আবেগতাড়িত হয়ে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা বা রাজাকার বললে তাতে কিছু আসে যায় না এটি আমাদের বুঝতে হবে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো,কর্তৃত্বশীলদের পক্ষ থেকে ৫৩ বছর আগের ঘটনা কিভাবে আজকের তরুণদের ঘাড়ে চাপানো হয়!এটি অযৌক্তিক ও অপরিণামদর্শী। এ নির্লজ্জতা আর কতকাল চলবে?

বৈষম্যবিরোধী চলমান ছাত্র আন্দোলনের দাবী ছিল কোটা সংস্কার। কোটা নির্মুল নয়। শতকরা ৫৬ ভাগ কোটা (কোন কোন ক্ষেত্রে ৬২,৭০,৮২,৯৬ ভাগ) স্পষ্টত বৈষম্য।এই বৈষম্যের বিরুদ্ধেই তাদের আন্দোলন ছিল।কিন্তু সেখানে ট্যাগ লাগিয়ে দেয়া হয়েছিল খোদ সরকারের জায়গা থেকেই।যে কোন গণতান্ত্রিক ও ন্যায্য আন্দোলনে রাজাকার, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ইত্যাদি ট্যাগ লাগিয়ে দেয়া একশ্রেণীর মানুষের বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।যা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

দেশের বুদ্ধিজীবী, অধ্যাপক, আইনজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, সাংবাদিক, শিল্পী, অভিনেতা, অভিনেত্রী, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক অফিসার, শিক্ষার্থীদের অভিভাবক ও শিক্ষকরা এই চলমান ছাত্র আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।কথা বলছেন নিপীড়ন, গণহত্যা ও গণ গ্রেফতারের বিরুদ্ধে। নৃশংস বর্বর ছাত্র হত্যা নিয়ে তৈরী হয়েছে গান, কবিতা, নাটক, চলচ্চিত্র ইত্যাদি। আটক হচ্ছেন শিল্পীরা, আহত হচ্ছেন শিক্ষকরা।অভিহিত করেছেন জুলাইকে শোকের মাস হিসেবে। রক্তাক্ত জুলাই, জুলাই হত্যাকাণ্ড শিরোনামে প্রতিবেদন হচ্ছে দেশ-বিদেশের জার্নালগুলোতে। শিক্ষার্থীরা জুলাই মাসকে মুক্তি না পর্যন্ত সমাপ্তি করছেন না। তারা ৩২,৩৩ জুলাই হিসেবে তারিখ গণণা করছে। কোটা আন্দোলনে প্রথম শহীদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আবু সাঈদ এ প্রজন্মের আইকনে পরিণত হয়েছেন। অধিকারের জন্য বুক পেতে দিলেন বুলেটের সামনে। ইতিহাসে এধরনের নজির খুব কম। তার সাহস শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা।

ছাত্র-জনতার উপর নির্বিচারে গুলি ও গণহত্যা দেখে দলীয় দাসত্ব থেকে কেউ যদি নিজেকে বের করে না আনতে না পারে তাহলে মানুষের বিবেক ও মনুষ্যত্ব বোধ সম্পর্কে প্রশ্নই থেকে যায়।

You may also like

Leave a Comment