সেলিম মোঃ আলী আসগর
শুধু কারবালার বিয়োগান্তক ঘটনাই নয় ১০ মহররম তথা আশুরা মুসা আঃ এর কওমকে ফিরাউনের কবল থেকে মুক্তি, নমরুদের আগুন থেকে ইব্রাহিম আঃ এর মুক্তি, আদম আঃ কে জান্নাত থেকে পৃথিবীতে প্রেরণ, নুহ আঃ আমলে প্লাবন শুরু ও সমাপ্তী, আকাশ- জমিনের সৃষ্টি সহ নানা কারণে আশুরা প্রসিদ্ধ। আমাদের কাছে কারবালার প্রান্তরে হোসাইন রাঃ এর শাহাদাত একটি বিয়োগান্তক ও হৃদয়বিদারক ঘটনা যা প্রতিটি মুসলিমের মনকে আবেগাপ্লুত না করে পারেনা। কেননা রাসুল সঃ এর প্রিয় দৌহিত্রের এ তিরোধান কোন অর্থেই মেনে নেয়ার কোন সুযোগ নেই।
★ হোসাইন রাঃ এর শাহাদাত ও রাজতন্ত্রের গোড়াপত্তন★
*************************
রাসুল সঃ এর ইন্তেকালের পর মুসলিম মিল্লাত ৩০ বছর খোলাফায়ে রাশেদার নেতৃত্বে ন্যায় ও সত্যের পথে পরিচালিত হয়। ইয়াজিদের ক্ষমতায় আরোহন খোলাফায়ে রাশেদার নীতি অনুস্মরণে স্বাভাবিক পন্থায় হয়নি। ফলে ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়া রাঃ শাসনামল থেকেই রাজতন্ত্রের গোড়াপত্তন। রসুল সঃ এর ভবিষ্যতবানী, খুলাফায়ে রাশেদার মূলনীতি অনুযায়ী রাজতন্ত্র হক ও গ্রহণযোগ্য ছিলোনা এবং নয়ও। তাছাড়া ইয়াজিদের ব্যক্তিগত চরিত্র মোটেই ইসলামী খেলাফত কিংবা ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার অনুকুল হিসেবে বিবেচিত হয়নি। কারবালার বিয়োগান্তক ঘটনা ইসলামী খেলাফত ব্যবস্থাকে চূড়ান্তভাবে বিলীন করে দেয় যা ছিল বিরাট একটি অন্যায়। আর এ কারণেই হেসাইন রাঃ এ অন্যায়কে মেনে নিতে পারেননি। ফলে জীবন দিয়ে তিনি সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। হোসাইন রাঃ এ অন্যায়ের প্রতিবাদ না করলে ইসলামের মহা একটি সত্য অন্যায়ের যাতাকলে নিষ্পেষিত হয়ে যেত। এছাড়া আহলে বাইয়্যেতের প্রতি যে আচরণ ইয়াজিদের নেতৃত্বে করা হয় তা যেকোন মুসলমানের পক্ষেই মেনে নেয়া খুবই কষ্টকর এমনকি অসম্ভব বটে।
★ মাওঃ মওদুদী রাহিঃ এর সমালোচনা ও বাস্তবতা
*********************************
ইয়াজিদের নেতৃত্বে রাজতন্ত্র ছিল ইসলামী খেলাফত ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ইসলামের ইতিহাসের এ টার্ণিং পয়েন্টের একটি নির্মোহ বিশ্লেষণের ইতিহাসিক প্রয়োজন ছিল। মাওঃ মওদুদী রাহিঃ তাঁর “খেলাফত ও রাজতন্ত্র” বইয়ে এর একটি নির্মোহ তথ্যবহুল আলোচনা করেছেন এবং ঐ বইয়ের শেষদিকে সমালোচনার জবাব দিয়ে তিনি বইটি রচনার প্রয়োজনীয়তা ও প্রেক্ষাপট বর্ননা করেছেন। এতে মাওঃ মওদুদী রাহিঃ সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা সম্পর্কে কোন কটাক্ষ করেননি বরং তিনি শুধু রাজতন্ত্রের ত্রুটি ও খেলাফত ব্যবস্থার অপরিহার্যতা বিশ্লেষণ করেছেন মাত্র। তিনি সমালোচনার জবাবে পরিষ্কার ভাষায় সাহাবায়েকেরাম রাঃ দের মর্যাদার হানী হয় সে নিয়্যতে তিনি কোন বর্ণনা করেননি বরং এ বিষয়ে হাফেজ ইবনে কাছির রাহিঃ সহ মুফাসসির-মুহাদ্দীস ও ঐতিহাসিকদের বিভিন্ন বর্ণনার সন্বয় করে তিনি তার মতামত ব্যক্ত করেছেন মাত্র। মাওঃ মওদুদী রাহিঃ এর সমালোচকরা আসলে তাঁর অনবদ্য রচনা”খেলাফত ও রাজতন্ত্র” বইটি নিরপেক্ষ ও সত্যসন্ধানী মন নিয়ে পাঠ করলে প্রকৃত সত্যের সন্ধান পেতেন এবং সমালোচনা করার চাইতে মাওলানাকে দোয়া দিতেন বলে আমি মনে করি।
মাওঃ মওদুদী রাহিঃ এর সাহিত্য ভান্ডার অধ্যয়ন করে তাঁকে কখনই সাহাবা বিদ্ধেষী কিংবা নবী-রাসুলগণের সমালোচনাকারী মনে হয়নি। বিশেষকরে তাঁর অনবদ্য রচনা; ইসলাম পরিচিতি, নামাজ-রোজা-হজ্ব-জাকাত-জিহাদের হাকীকত সিরিজ, ইসলামী আন্দোলন সাফল্যের শর্তাবলী, কাদিয়ানী ফেরকা নিয়ে লিখনী ইত্যাদী লেখা পড়লে তাঁকে দ্বীনের একজন খাঁটি মুজাহীদ-মুজাদ্দেদই মনে হবে। মজার বিষয় হলো মাওলানাকে তাঁর সমালোচনাকারীরা কাদিয়ানী ফেতনার সাথে তুলনা করতেও কুন্ঠাবোধ করেনি অথচ তিনি কাদিয়ানীদেরকে কাফির ফতোয়া দিয়ে ফাঁসীর দন্ড প্রাপ্ত হয়ে ছিলেন; আফসোস!
মাওঃ মওদুদী রাহিঃ শুধু একজন লেখকই ছিলেননা; তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীতে ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত প্রতিষ্ঠার একজন দূরদর্শী চিন্তানায়ক। তাঁর সাহিত্য লক্ষ-কোটি আধুনিক শিক্ষিত লোককে আলোর সন্ধান দিয়েছে। মাওলানা নিজেও বলতেন বিরোধীদের সমালোচনার জবাবে সময় ব্যয় করার চাইতে তিনি সত্য উদঘাটনে ও প্রতিষ্ঠায় সময় কাজে লাগাতে চান। তাই তিনি সফল হয়েছেন। বিশ্বের শতাধীক দেশে নিজ নিজ ভাষায় অনুদিত হয়ে উনার সাহিত্য বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে আর উনার সমালোচকরা তীমীরেই রয়েগেছেন এবং এভাবেই থাকবেন।
আমরা মওদুদী রাহিঃ কে মাযহাবের ইমাম হিসেবে অনুস্মরণ করিনা বরং তিনি কুরআন-হাদীসের আলোকে যে সাহিত্য রচনা করে গেছেন তা পড়ি এবং প্রকৃত সত্যটাই গ্রহণ করি। মাওলানাও উনাকে অন্ধ অনুস্মরণ করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন” ” ইসলামের বিষয়ে জানতে গিয়ে আমি দেখিনি কোন পীর-বুজুর্গ কি বলেছেন বা কি করেছেন, বরং আমি দেখেছি আলকুরআন কি বলেছে এবং রসুল সঃ কি করেছেন ও কি বলেছেন ”
আসুন সকল সমালোচনার উর্ধে উঠে আলকুরআন ও আলহাদীস বুঝে পড়ার চেষ্টা করি এবং নিজ নিজ অবস্থান থেকে হোসাইন রাঃ ত্যাগ সামনে রেখে একমাত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের কাজ করি। মহান আল্লাহ আমাদেরকে কবুল করুন, আ-মীন।
লেখক: সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবি ও কলামিস্ট।
