#নারী কেন অন্দরে?

by News Room

নলিনী চৌধুরী

যখনই কোন কাজের বিনিময়ে নির্দিষ্ট কোন বেতন থাকেনা, তখনই সে কাজটিকে সেবামূলক কাজ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু যখন কোন সেবামূলক কাজ করতে কাউকে দিনের পর দিন বাধ্য করা হয় অর্থাৎ কাজটি কারো মাথার উপর চাপিয়ে দেওয়া হয় তখন সেটি আর সেবামূলক কাজ থাকেনা, তখন সেটিকে নির্যাতন বলা হয়।

প্রতিটি মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন, যদি স্বাধীনতার সংজ্ঞা হয় অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ণ না করা, অন্যের স্বনির্ভরতা এবং ব্যক্তিত্বের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান রাখা। একজন মানুষ তখনই নির্যাতিত হয়, যখন তাকে কোন কাজে বাধ্য করা হয়, সে কাজের নির্দিষ্ট কোন বেতন থাকেনা, এবং সে কাজটি তার যোগ্যতা অনুযায়ী সম্মানজনক হয়না। প্রতিটি কাজই সম্মানজনক কিন্তু যখন কোন কলেজ শিক্ষিকা হবার উপযুক্ত কোন মানুষকে শিক্ষকতা করতে না দিয়ে রান্নাঘরের কাজ করতে বাধ্য করা হয় তখন সেটি ভয়ঙ্কর নির্যাতন।

মেয়েদের যোগ্যতাকে ত্যানা প্যাঁচিয়ে অস্বীকার করা আর কোন পুরুষকে বস্ত্রহীন আর বাসস্থানহীন করে রাস্তায় পাগল সাজিয়ে বের করে দেওয়া একই কথা। সমাজে প্রায় সকল মানুষই বলে থাকে, মেয়ে হয়ে জন্ম নিয়েছো যখন ঘরের কাজ করতেই হবে। মেয়েদের অনেক কিছু করার ক্ষমতা আছে এটা তারা মেনে নিতে চায় না। পুরুষ কখনো সন্তান গর্ভে ধারণ করতে জানেনা, প্রসব যন্ত্রণা সহ্য করতে জানেনা, সন্তান জন্ম দিতে গিয়েও জীবন দিতে জানেনা, স্ত্রীর কষ্টকেও অনুভব করতে জানেনা।

পুরুষের ধৈর্যশক্তি নারীর চেয়ে অনেক কম হয়। যখনই কারো উপর নির্দিষ্টভাবে ঘরের কাজগুলো চাপিয়ে দেওয়া হয়, পিতার সম্পত্তি থেকে তাকে বঞ্চিত করা হয়, তখনই তাকে পুরোপুরি অসহায় একজন মানুষ হিসেবে তৈরী করা হয়, যেন কারো অনুগ্রহ ছাড়াই কোনভাবেই তার বেঁচে থাকা সম্ভব না হয়, যা আমাদের সমাজে প্রায় প্রতিটি পরিবারেই তৈরী করা হয়। মেয়ে যদি শিক্ষিত হতে চায় তবে তাকে রান্নাঘর কিংবা অন্দরমহল নামক পাহাড় মাথায় নিয়ে পরীক্ষার হলে প্রবেশ করতে হয় এবং পাহাড় ঠিক মাথার তালুতে বহন করেই পরীক্ষার উত্তরপত্রে সে যা বমি করে সেটাই তার অর্জন। মেয়েরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত হয় বাবা–মায়ের কাছেই। বাবা–মায়ের কাছ থেকেই তার প্রথম বঞ্চিত জীবনের শুরু। মেয়ের জন্মের পরেই প্রথম স্বপ্ন দেখা হয়, সে পরের ঘরে যাবে। এজন্য তাকে অন্যের সেবা করার জন্যই বাবা–মা প্রস্তুত করে থাকেন। এতে বিড়ম্বনা সইতে হয় মেয়েকে, দিনের পর দিন অন্যের সেবা তার উপর চাপিয়ে দেওয়ার কারণে সে কষ্টে থাকে এবং একটা সময় সবার উপর শ্রদ্ধা হারায়, শারীরিক অসুস্থতা, দুর্বলতা কিংবা জীবনের শেষ সময়ে যখন সে কারো সেবা করতে অক্ষম হয়ে পড়ে তখন প্রতিবাদ করে বসে, অসভ্যের মতো বাক্য প্রসব করে, দায়িত্ব পালনে অবহেলা করে, তার পাশে যারা থাকে, কাজের মেয়ে, ছেলের বৌ কিংবা অন্য কেউ হোক, তাদের প্রতি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। সমাজ তাকে খারাপ বলে, তবুও সে ততোদিনে স্বামীর গৃহকে সন্তান জন্ম দিয়ে পাকাপোক্তভাবে হজম করে ফেলেছে, তখন আর তাকে বের করে দেওয়া খুব এক সহজসাধ্য ব্যাপার নয়।
.
নারী মা হয়, একজন শিক্ষিত নারীর সন্তান শিক্ষিত হবে, এটাই স্বাভাবিক। নারীর কাজ যদি বাসন মাজা হয়, তাহলে তার সন্তান ততোটুকুই অভিজ্ঞতা অর্জন করবে। আর যদি নারী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হয়, তাহলে সে সন্তান ততোটুকুই যোগ্য হবে। নেপোলিয়ন বলেছিলেন “তোমরা আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের শিক্ষিত জাতি উপহার দেবো।” জন স্টুয়ার্ট মিল তার উপযোগবাদে বলেছেন, “কোনো কাজ তখনই নৈতিকভাবে সঠিক বলে গণ্য হবে, যখন সেটি সর্বাধিক সংখ্যক মানুষের জন্য সর্বাধিক সুখ বা মঙ্গল বয়ে আনে।” বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রে সকল মানুষকে একসাথে শিক্ষিত এবং স্বনির্ভর করে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এজন্য যদি সকল নারীকে শিক্ষিত এবং স্বনির্ভর করা যায়, তাহলে রাষ্ট্রে কোন অসহায় অশিক্ষিত সন্তান থাকবেনা।বাবা–মায়ের বিচ্ছেদ হয়ে গেলেও একজন স্বনির্ভর মা তার সন্তানকে মানুষ করতে পারে।

আমাদের সামাজিক পরিস্থিতির কারণে, ছেলের চেয়ে মেয়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা অনেক বেশি হওয়া প্রয়োজনীয়, সেখানে বাবা–মাই ছেলের চেয়ে মেয়েকে শিক্ষাগত যোগ্যতায় পেছনে রাখতে চান। ছেলে বাবা–মায়ের পাশেই থাকে, সে যদি অযোগ্য ও হয়, তাকে কেউ কখনো ঘর থেকে বের করে দিবেনা, অন্যের অনুগ্রহ নিয়ে তার বাঁচার প্রয়োজন নেই। সে যদি রান্নাবান্নাসহ ঘরের সকল কাজ করে সেটা বাবা–মায়ের জন্য আশীর্বাদ। কারণ, মেয়ে বাবা–মায়ের পাশে থাকেনা, ছেলেই বাবা–মায়ের পাশে থাকে। ঘরের কাজ পারলে বাবা–মা নিজ সন্তানের কাছ থেকেই সেবা পাবেন এবং এটাই সবচেয়ে খাটি সেবা। ছেলের বউ যদি চাকরী করে তাহলে সে অবশ্যই শ্বশুর শাশুড়িকে টাকা দিবে। কিন্তু সেবা করতে যদি তাকে বাধ্য করা হয়, দিনের পরদিন সেই সেবাটি খাটি না হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, সেখানে ফাঁকি থাকবে। সেবার সাথে ভালবাসার সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এটা কেবল নিজের সন্তানের কাছেই আশা করা যায়। অন্যের কাছে এ সেবা পেলে এটা কেবল বোনাস। এজন্য শুধু মেয়েকে নয়, ছেলেকেও ঘরের কাজ করলে সেটা সবার জন্য মঙ্গল বয়ে আনে। আবার অন্যদিকে মেয়ে যদি চাকুরীজীবীও হয়, তাহলে শ্বশুরবাড়ি থেকে সে ই বাবা–মাকে টাকা পাঠাতে পারবে। মেয়েদের চাকুরী ছেলেদের চেয়ে বেশি প্রয়োজনীয়। অথচ আমাদের সমাজ তার পুরোটাই উল্টো। বলছিনা, ছেলে শুধু ঘরের কাজ করবে, ছেলে এবং মেয়ে উভয়কেই ঘর এবং বাইরের কাজ করতে হবে।

এই উল্টো সমাজে আরো অনেক উদ্ভট ব্যাপার আছে। স্পষ্টভাবে সেটা বুঝাতে হলে প্রশ্ন করতে হবে, কতটা ছেলে ঘরজামাই হিসেবে সংসার করতে পারবে? আর সেই ছেলের কাজ যদি হয় শ্বশুর বাড়ির সবার সেবা করে যাওয়া? নিজেকে মেয়ের জায়গায় চিন্তা করলে এই পুরুষ সমাজ অজ্ঞান হয়ে যাবার কথা, অথচ অপদার্থের মতো মেয়েকে নিয়ে বুলি ছুড়তে এদের মুখে বাঁধেনা। আমাদের সমাজে মেয়েরা বাবা–মায়ের কোন সম্পদ পায়না। আবার পরের ঘরে অন্যের সেবিকা হিসেবেই তাকে যেতে হয়। সুতরাং ছেলের চেয়ে মেয়েই অসহায়। এজন্য মেয়েকেই শিক্ষিত করে প্রতিষ্ঠিত করা উচিৎ, যেন সে কারো উপর নির্ভরশীল না হয়। জীবনে যেকোন বিপদে সে যেন নিজের যোগ্যতার উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতে পারে। মেয়ের চাকরী হচ্ছে তার বাবা–মায়ের চেয়েও আপনজন। মেয়ের শিক্ষা হচ্ছে তার সন্তানের চেয়েও আপনজন। সারাজীবন কারো সেবা করলে কিছু পাওয়া যায়না, দিনশেষে নিজের যোগ্যতা নিয়েই লড়াই করতে হয়।

আমি অনেক আত্মীয় অনাত্মীয়কে রান্না করে খাইয়েছি, প্রায়ই কেউ জিজ্ঞেস করেনি কে রান্না করেছে, পাছে আমার রান্নার প্রশংসা করতে হয়। প্রায়ই আমি হাসপাতালে রোগীর সেবা করেছি, সময় হলে দেখেছি, আমার পরীক্ষা খারাপ করার জন্য তাদের প্রচেষ্টার কোন সীমা ছিলনা। আমি বিনা বেতনে ছাত্র পড়িয়েছি, ছাত্রেরও আমার প্রতি অভিযোগ ছিল, ছাত্রের মায়েরও ছিল। আমি বিনা বেতনে অগণিত সেবা করেছি, সে সেবার বিনিময়ে তারা আমাকে দুর্বল ভেবেছে, তিরস্কার করেছে, অবাঞ্চিত ঘোষণা করেছে, কৃতজ্ঞতা তো দূরের কথা। অগণিত মানুষকে ভালবেসেছি, বিনা কারণেই ভালবাসার বিনিময় ছিল অপমান, বরং আমাকে স্বার্থপর বলেই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নিকৃষ্টদের দলে ফেলে দেওয়া হয়েছে প্রায়ই। এ জগতে কাউকে সেবা করার বিনিময় অপমান কিংবা অকৃতজ্ঞতা সেটা মাথায় রেখেই আমি কারো সেবা করি, আমি আমার মানবিক কর্তব্য পালন করি। কাউকে সেবা করলে সেটা মনে রাখিনা, সাথে সাথে ভুলে যাই। অনেকে বলে আমি সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম নিয়েছি, আমি সেই সোনাকে রুপা কিংবা তামা কিংবা ব্রোঞ্জে নয়, একেবারে কাদায় পরিণত করেছি। তারপর কাদা খেয়েছি, কাদা মাড়িয়েছি এবং কাদার বিদঘুটে স্বাদ গ্রহণ করেছি, কর্দমাক্ত দুর্গন্ধ দেহ নিয়েই ঘুমিয়েছি তবু খাটি জগতের সন্ধান চেয়েছি।

মানবজাতির কল্পনাবিলাসী মানসিকতা আমাকে অবাক করেছে, ভালবাসাকে হাস্যকর উপাদেয় বানিয়ে দেহের খেলা আমাকে আতঙ্কিত করেছে। কাদার গন্ধ অনেকটা বিদঘুটে কিন্তু কোন কৃত্রিমতা নেই। সোনার মধ্যেই ভয়ঙ্কর কৃত্রিমতা খুঁজে পেয়েছি, জেনেশুনে ঠকছি এবং সেই ঠকাকে কৃতিত্ব হিসেবেই দেখছি। আমি কাদার গন্ধ বুঝতে পারি বলে সোনার কৃত্রিমতাকেও বুঝতে পেরেছি। এ সমাজে ত্যাগের মূল্য কিংবা বিনিময় নেতিবাচক হয়। তাই সেবা যদি কোন মানুষকে সারাজীবনের জন্য চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেটা কত ভয়ঙ্কর নির্যাতন, সেটা বলার অপেক্ষা রাখেনা। দিনের পরদিন এই নির্যাতনের শিকার হচ্ছে সমস্তটা নারী জাতি। ঘরের কাজ পুরুষের যেমন দায়িত্ব, নারীরও তেমন। একতিল পরিমাণ বেশি যদি সেটা নারীর উপর চাপিয়ে দেওয়া হয় তাহলে সেটা নির্যাতন বলেই গণ্য হয়। স্বামী স্ত্রী দুজন চাকরীজীবি হলে ঘরের কাজ সমানভাবেই দুজনকে করতে হবে। আর মা–বাবার সংসারে মেয়ে এবং ছেলে উভয়েই ঘরের কাজ করবে। শিক্ষা এবং চাকরীর ক্ষেত্রে ছেলের চেয়ে মেয়েকেই বেশি প্রাধান্য দিতে হবে। তাহলে নারী অন্যের বোঝা হবেনা, বিকশিত সন্তান জন্ম দিবে, বাবামায়ের ভবিষ্যৎ হবে। নারী অন্দরমহল থেকে মুক্তি পাক, রন্ধনমহল থেকে মুক্তি পাক।

You may also like

Leave a Comment