ডা: সায়েফ আহমদ:
স্মৃতিতে ডা: মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ- এক আপোষহীন সংগ্রামী নেতার জীবন ও কর্ম:
১৯৭৭ সালের জুলাই মাসের কোন এক দিনে সিলেট এম সি কলেজের তৃতীয় ছাত্রাবাসে আব্দুল্লাহ ভাইয়ের সাথে আমার প্রথম পরিচয়। নবম এবং দশম শ্রেণীর লজিং জীবন শেষ করে অজানা অচেনা গভীর অরণ্য পরিবেষ্টিত সিলেট এমসি কলেজে আমার প্রথম হোস্টেল জীবন। আব্দুল্লাহ ভাই ১৯৭৬ সালে সিলেট সরকারি স্কুল থেকে কৃতিত্বের সাথে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করে তৃতীয় ছাত্রাবাসের আবাসিক ছাত্র হিসাবে আমার একজন একনিষ্ঠ অভিভাবক হিসেবে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেন।
তৃতীয় ছাত্রাবাসের হোস্টেল জীবন আমার জীবন পরিবর্তনের এক মাইল ফলক। একই সময়ে জনাব ফরিদ আহমদ রেজা ভাই, ইঞ্জিনিয়ার নাসির ভাই, মরহুম জেলা জজ টিপু ভাই সহ বহু গুণীজনের সান্নিধ্য আমার কলেজ জীবনের পরম পাওয়া। এক অনাবিল শান্তির পরিবেশে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দুটি বছর অতিবাহিত করার সুযোগ মহান আল্লাহর অপার মহিমা।
ফজরের আযানের সময়, রেজা ভাই এবং আব্দুল্লাহ ভাই সকল রুমে রুমে গিয়ে আমাদেরকে ঘুম থেকে তুলতেন। হোস্টেলের অধিকাংশ ছাত্ররাই মসজিদে ফজরের নামাজে উপস্থিত হতেন। রেজা ভাই প্রায় দিন ফজরের জামাতে ইমামতি করতেন। রেজা ভাইয়ের সুললিত কন্ঠে সূরা নাবার তেলাওয়াত আজও কানে ভেসে আসে।
আব্দুল্লাহ ভাইয়ের তত্ত্বাবধানে নবাগত সকল ভাইয়েরা ফজরের পরে নিয়মিত কোরআন অধ্যয়ন করতাম। ফজরের পরে কোরআন তেলাওয়াতের গুনগুন শব্দ ছিল তৃতীয় ছাত্রাবাসের একক বৈশিষ্ট্য। জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া সেই ছাত্রাবাসে আজ এগুলো শুধুই অতীত স্মৃতি। যুগের পথ পরিক্রমায় শকুনের হিংস্র থাবা, অপসংস্কৃতি সয়লাবে আজ ভেসে গেছে সেই অতীত ইতিহাস এবং ঐতিহ্য। কেউ জানে না সেই ঐতিহ্যের অতীত কোন দিন ফিরে আসবে কিনা।
কুরআন অধ্যয়ন করতে হবে, অর্থসহ পড়তে হবে। স্কুল জীবনে তা কখনো শুনিনি। নিয়মিত নামাজ আদায়ের তেমন অভ্যাস আমার ছিল না। নামাজ পড়তে আম্মার পেরেশানির অন্ত ছিল না। ফজরের পরে সুরা ইয়াসিন পড়লেই আম্মা মহা খুশি। আম্মাকে খুশি করার জন্য স্কুল জীবনে সুরা ইয়াসিনের তেলাওয়াত করা হতো। এমতাবস্থায় তৃতীয় ছাত্রাবাসের অনাবিল পরিবেশ ছিল জীবন গঠনের উত্তম হাতিয়ার। আর আব্দুল্লাহ ভাই ছিলেন আমাদের পথপ্রদর্শক।
অন্য ছাত্রাবাস গুলোতে এমন পরিবেশ ছিল না। চতুর্থ এবং পঞ্চম ছাত্রাবাসে রাজনৈতিক বড় ভাইয়েরা থাকতেন। বড় বড় নেতাদেরকে দেখলে তখন ভয় লাগতো। পরিবেশগত কারণে আমরা সেসব ছাত্রাবাসে তেমন যেতাম না।
আব্দুল্লাহ ভাই ছিলেন সংগঠনের সাথী। পড়াশোনার দিকনির্দেশনা এবং জীবন গড়ার তাগিদে আব্দুল্লাহ ভাইয়ের রুমে যেতাম। তার পড়ার টেবিল, বইয়ের সেলফ, বিছানা, কাপড়-চোপড় রাখার হ্যাঙ্গার, এক কথায় তার পরিপাটি জীবন ছিল অনন্য, অনুকরণীয়। হাতের লেখা ছিল এত সুন্দর যা তুলনাহীন। ছাত্র হিসাবে তিনি ছিলেন দারুন মেধাবী। বিভিন্ন বিষয়ে তার নোট খাতা দেখলে চোখ জুড়িয়ে যেত। এমন পরিপাটি তথ্য নির্ভর নোট খাতা, আমার ছাত্র জীবনে আমি আর কারো দেখিনি। রুমে গেলে ছোট ভাই হিসাবে আদর আপ্যায়নের কোন কমতি ছিল না। আর কথাবার্তা এবং বাচনভঙ্গি ছিল মোহনীয়। খুব সহজেই তিনি কাউকে আপন করে নিতে পারতেন। তার প্রতিটি পদচারণা আমাদের জন্য ছিল অনুকরণীয়।
তিনি ছিলেন অদম্য সাহসী এবং ধৈর্য সহিষ্ণুতার চরম পরাকাষ্ঠা। রাজনৈতিক কারণে ১৯৭৮ সালে হোস্টেলের কয়েকজন সিনিয়র ভাই তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার উদ্যোগ নিলে, তিনি অত্যন্ত ধৈর্য এবং সাহসিকতার সাথে পরিস্থিতির মোকাবেলা করেছিলেন। সেদিন তার সাহসিকতায় আমাদের সকলের আস্থা এবং প্রশংসা অর্জন করেছিলেন।
১৯৭৯ সালে তিনি ওসমানী মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। শামসুদ্দিন ছাত্রাবাসের আবাসিক ছাত্র হিসাবে ১৯৮১ সাল থেকে ৮৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ মেডিকেল কলেজের ছাত্র জীবনে একই হোস্টেলের বাসিন্দা হিসাবে তিনি ছিলেন আমার আদর্শ। ছাত্র অবস্থায় ও তিনি ছিলেন জ্ঞানপিপাসু। একজন দায়ী হিসেবে কোরআন হাদিসের উপর ছিল তার প্রগাঢ় জ্ঞান। দীর্ঘ ছাত্র জীবনে অসংখ্য টিএস, টিসি এবং সববেদারীতে তার কোরআনের আলোচনা ছিল অদ্বিতীয়। তার যুক্তিনিষ্ঠ, তথ্যনির্ভর কুরআনের আলোচনা আমরা তন্ময় হয়ে শুনতাম। ছাত্র জীবনে সূরা হুজরাতের প্রথম রুকুর দারস কয়েক যুগ পর আজও হৃদয়ে অনুরণিত হয়।
১৯৮৪ সালে তিনি সিলেট শহর শাখার সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। ডাঃ আবুল বাশার ছিলেন তখন শহর শাখার সভাপতি। এই সময় তিনি মেননজাইটিস রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রায় এক সপ্তাহ অজ্ঞান ছিলেন। ঢাকা পিজি হাসপাতালে তাকে স্থানান্তরিত করা হয়। আমরা অনেকটা তার আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু মহান আল্লাহ তার অপার মেহেরবানীতে অসমাপ্ত দায়িত্ব পালনের জন্য তাকে সুস্থ করে আমাদের মধ্যে ফিরিয়ে দেন। দীর্ঘদিন পর্যন্ত অসুস্থতার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় তিনি কষ্ট পেয়েছেন। এই অবস্থায় ১৯৮৫ সালে তিনি সিলেট শহর শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। দীর্ঘ এক সেশন আমি ছিলাম তার সেক্রেটারি। আমাকে তিনি তিলে তিলে গড়েছেন। সেক্রেটারি হিসাবে আমার সকল অযোগ্যতাকে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখে, আমার যোগ্যতাকে বিকশিত করেছেন। সেক্রেটারি হিসেবে আমার অদক্ষতার কারণে কোনদিন আমার প্রতি তিনি রাগ করেন নি। ছোট ভাইয়ের মতো আমাকে সংশোধন করার জন্য তিনি শতভাগ দায়িত্ব পালন করেছেন। আমি তখন চতুর্থ বর্ষের ছাত্র।
১৯৮৪ সালে সেক্রেটারি থাকা অবস্থায় এমসি কলেজের অনাকাঙ্ক্ষিত ছাত্র সংঘর্ষে, কেন্দ্রীয় সভাপতি তাসনিমা আলম ভাই সহ তিনি গুরুতর আহত হন। তার সামনের সারির দাঁতগুলো ভেঙ্গে যায়। গাজী হিসাবে কৃত্রিম দাঁত সংযোজন করে আজও আব্দুল্লাহ ভাই তার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। সেই ছাত্র সংঘর্ষে তার নেতৃত্ব এবং সাহসিকতায় তিনি ইতিহাস গড়েছিলেন। তৎকালীন সময়ের ছাত্র জনতা আব্দুল্লাহ ভাইয়ের এই অবদান কখনো ভুলবেনা। সময়ের পথ পরিক্রমায় আজকের প্রজন্ম আব্দুল্লাহ ভাইকে না চিনারই কথা। কিন্তু আশির দশকের প্রজন্ম আব্দুল্লাহ ভাইকে ভুলে গেলে ইতিহাস অস্বীকার করার শামিল হবে।
তখন ছিল এরশাদ সরকারের স্বৈরশাসন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে অশান্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। ১৯৮৬ সালে কঠিন সেই পরিস্থিতিতে আমাকে সভাপতির দায়িত্ব দিয়ে তিনি ছাত্র জীবন শেষ করলেন। যে দায়িত্ব আমার কাঁধে এসে পড়েছিল, তার ভার বহন করার যোগ্যতা আমার ছিল না।
আব্দুল্লাহ ভাই হচ্ছেন আপোষহীন ব্যক্তিত্বের অধিকারী-
পিতা-মাতার একমাত্র সন্তান হিসেবে জৈন্তাপুরের গ্রামের স্কুলে পঞ্চম এবং অষ্টম শ্রেণীতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি লাভ করেন। তার পিতা ছিলেন স্কুল শিক্ষক। নবম শ্রেণীতে সিলেট সরকারি স্কুলে ভর্তি হন। সবসময় তিনি মেধার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। মেডিকেল কলেজের সবগুলো পরীক্ষায় তিনি সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হয়েছেন। পঞ্চম বর্ষে ছাত্রাবস্থায় ছোট্ট একটি ঘটনায় তৎকালীন সময়ের সার্জারি বিভাগের প্রধান, সামান্য ভুল বোঝাবুঝির কারণে তার উপরে ক্ষিপ্ত হন। এমবিবিএস ফাইনাল পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করার পরও মৌখিক পরীক্ষায় পরপর তৃতীয়বারের মতো তাকে ফেল করিয়ে দেন। আমাদের উদ্বেগের কোন শেষ ছিল না, আমরা আব্দুল্লাহ ভাইকে অনুরোধ করলাম অযাচিত হয়ে আমরা স্যারের কাছে মাফ চাই কিন্তু আব্দুল্লা ভাই নিজেকে নির্দোষ মনে করলেন এবং মাফ চাইলেন না। যার ফলে জীবন থেকে তার একটি বছর হারিয়ে গেল। এজন্য তিনি কখনোই উদ্বিগ্ন ছিলেন না। আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল এবং সবর ছিল তার জীবনের পাথেয়। তিনি ছিলেন আপোষহীন। অন্যায়ের কাছে তিনি কখনো মাথা নত করেননি।পৃথিবীতে আমাদের সেই সম্মানিত স্যার আজ আর বেঁচে নেই। আল্লাহ তাকে মাফ করে বেহেস্ত নসিব করুন-আজকের দিনে এই আমাদের প্রার্থনা। (চলবে)
(পরবর্তী পর্বে আব্দুল্লাহ ভাইয়ের জীবন ও কর্ম, অবশিষ্ট অংশ)
লেখক:বিশিষ্ট চিকিৎসক।সাবেক সভাপতি -বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, সিলেট মহানগর শাখা। সাবেক আমীর(ভারপ্রাপ্ত)-সিলেট মহানগর জামায়াত।
(এটি লেখকের “আমার জীবনের অতীত স্মৃতি ” ধারাবাহিক স্মৃতিচারণ ও আত্মজীবনীমুলক লেখার ১৪ তম পর্ব )
