জাতিসংঘের মহাসচিবের প্রতিনিধি জনাব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো চলমান সংকট নিরসনে বাংলাদেশে এসে ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রীসহ অনেক আওয়ামী লীগের উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রথম আলোচনার পরে উপদেষ্টা গওহর রিজভীর বক্তব্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ । তিনি বলেছেন ‘তারানকো সাহেবের নাকি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির ব্যাপারে কোন আগ্রহ নাই এবং তারানকোর মতে বিরোধী দলও নাকি এখন সেই দাবি নিয়ে আর সোচ্চার নয় এবং চলমান আন্দোলনও নাকি এখন সেই দাবী নিয়ে হচ্ছে না।’ তারানকো নাকি প্রধান মন্ত্রীকে প্রশ্ন করে জানতে চেয়েছেন ‘চলমান নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন করা যাবে কি না।’ জবাবে প্রধানমন্ত্রী নাকি বলেছেন এই বিষয়ে সাংবিধানিকভাবে যা কিছু করার শুধু মাত্র তা নির্বাচন কমিশনই করতে পারে। গওহর রিজভীর ভাষ্যমতে সংবিধান মোতাবেক নির্বাচন করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের এবং সংবিধান মোতাবেক নির্বাচন কমিশন যা করবে তাতে প্রধানমন্ত্রীর কোন আপত্তি নাই। গওহর রিজভী আরো বলেছেন যে প্রধানমন্ত্রী কোন অবস্থাতেই নির্বাচন কমিশনের কাজে কোন প্রকার হস্তক্ষেপ করেন না এবং করবেনও না। কাজেই চলমান সংকট তথা নির্বাচন পিছানোর যে আন্দোলন সেটাতে সরকারের কিছুই করার নাই। এখন সংবিধান মোতাবেক নির্বাচন কমিশন যা করবে তা প্রধানমন্ত্রী নিজেও মেনে নিবেন এবং তার দলও মেনে নেবে। তাই এখন বলা যায় চলমান সংকট সমাধানের বল এখন চলে গেছে নির্বাচন কমিশন অফিসে। একমাত্র নির্বাচন কমিশনই এখন নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন করে চলমান সংকটের সমাধান দিতে পারেন ।
যেহেতু প্রধানমন্ত্রী নিজেই সফররত জাতিসংঘের মহাসচিবের প্রতিনিধি তারানকোকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন তারানকোর অনুরোধে নির্বাচনের তারিখ সংবিধান মোতাবেক শুধুমাত্র নির্বাচন কমিশন পরিবর্তন করতে পারে তবে এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী তার কোনো আপত্তির কথাও তারানকোর কাছে তুলেন নাই বলে জানা যায়। সংবিধান মোতাবেক ঘোষিত নির্বাচনের মনোনয়ন পত্র দাখিলের শেষ দিন ছিল ২ ডিসেম্বর ২০১৩ এবং ওই দিনের পূর্বে নির্বাচন কমিশন যতবার প্রয়োজন ততবারই নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন করতে পারতেন। কিন্তু নির্বাচন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া শেষ হয়ে যাওয়ার পরে নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন করার কোন বৈধ ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের নাই। এবং প্রধানমন্ত্রী তা ভাল করেই জানেন। তাই তিনি অত্যন্ত সু-কৌশলে তারানকোকে প্রধান নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠাইয়া দিয়াছেন। তবে তিনি ইচ্ছা বা অনিচ্ছকৃত ভাবে হউক বা প্রকারন্তরেই হউক সাংবিধানিকভাবে নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন করিলে তা তিনি মেনে নেবেন বলে একটি বার্তা তারানকোর মাধ্যমে জাতিকে দিয়ে দিয়েছেন এবং এ ব্যাপারে তারানকোর কাছে কোন আপত্তিও না তুলে সেই ধারনাটিকে আরো বেশি বদ্বমূল করে দিয়েছেন। এখন তারানকোর প্রশ্ন মত চলমান সংকট নিরসনে বর্তমান নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তনটা মুখ্য সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার সময় তারানকো যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন নাই তখন নিশ্চয় কারও বোঝার বাকি নাই যে ১৮ দলীয় ঐক্যজোট বা বেগম খালেদা জিয়া চলমান সংকটের আপস মীমাংসার স্বার্থে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অবস্থান থেকে সরে আসতে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে হয়তো পর্দার আড়ালে রাজি হয়েছেন। এই অবস্থার পক্ষে প্রমাণ হিসাবে বিএনপির মুখপাত্র সালাহ উদ্দিনের সাম্প্রতিক বক্তব্যেও পাওয়া যায়। গোপন স্থান থেকে ভিডিও রেকর্ডকৃত তার প্রাত্যহিক বক্তব্যে দেখা যাচ্ছে নির্বাচন তফসিল বাতিল করার দাবিই তার বক্তব্যের মূখ্যদাবি। ৭ ডিসেম্বর ২০১৩ তারিখে সালাহউদ্দিনের বক্তব্যে নির্বাচনের তফসিল বাতিল না করলে নির্বাচন কমিশনকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে বলে হুমকি দেন এবং সকল সরকারি কর্মচারিদেরকেও নির্বাচনী দায়িত্ব পালন না করার জন্যও আহবান জানান।
চলমান সংকট এখন প্রায় একটি বিন্দুতে আসার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। তারানকো প্রধানমন্ত্রীর নিকট জানতে চেয়েছেন – ‘নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন করার সুযোগ আছে কি না।’ জবাবে প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন শুধুমাত্র নির্বাচন কমিশনার সংবিধান মোতাবেক নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন করতে পারে। পক্ষান্তরে বিরোধীদলীয় নেত্রী তার মুখপাত্রকে ঘোষণা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন যে নির্বাচন কমিশনকে আসামি করা হবে যদি তারা নির্বাচনের তফসিল বাতিল না করেন। তাই মনে হচ্ছে চলমান সংকটের সমাধান এখন নির্বাচনের তারিখের মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছে।
নির্বাচন কমিশন যদি এখন তারানকোর অনুরোধে সংবিধান মোতাবেক নির্বাচনের তারিখ বাতিল বা পরিবর্তন করে দেন তাহলে তারানকোর মধ্যস্ততায় নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন দুটি দলই মানতে বাধ্য হবে বা তিনি মানাতে বাধ্য করতে পারবেন। দৃশ্যত মনে হচ্ছে তারানকো হয়তো দুটি বিবাদমান দলকে আপস মীমাংসায় নির্বাচনে নিয়ে আসতে পারবেন। কিন্তু সাংবিধানিকভাবে সে ক্ষমতা এখন নির্বাচন কমিশনের হাতে নাই। সংকট এখন অন্য জায়গায় সৃষ্টি হয়েছে। তবে সবদল মেনে নিলে অসম্ভব কিছু নয় এবং নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন করা এখনও সাংবিধানিকভাবে সম্ভব।
নির্বাচন কমিশন পূর্বাপর চিন্তা না করে একগুয়েমিভাবে ভবিষ্যতের কোন পথ খোলা না রেখেই একতরফাভাবে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে দিয়েছেন। সংবিধান মোতাবেক ২৪ জানুয়ারি ২০১৪ সালের মধ্যে নির্বাচন করার সুযোগ সাংবিধানিক ভাবে ছিল। প্রয়োজনে সাংবিধানিক ভাবেই আরো তিন মাস সময় নেয়া যেত। নির্বাচন কমিশন যদি অন্ধের মতো কায়েমি স্বার্থে সরকারকে খুশি করারহীন উদ্দেশ্যে তার ঘোষিত তফসিলে নির্বাচন করার গো না ধরতেন তাহলে আজকে তিনি সংকট নিরসনের জন্য সবার মতামত নিয়ে তারিখ পুনঃনির্ধারিত করতে পারতেন। নির্বাচন কমিশন যদি ১ বা ২ ডিসেম্বর ২০১৩ তারিখ অন্ততঃ ৭ দিনের জন্য নির্বাচনের তারিখ পিছাইয়া দিতেন তাহলে আজকে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা অনুযায়ী সাংবিধানিকভাবে নির্বাচনের তারিখ বদল করা যেত এবং তাতে বিরোধী দলও এখন তাদেরকে আসামি করারও হুমকি দিতে পারতো না। যদি তখন একগুয়েমি করে শুধুমাত্র সরকারকে খুশি করার জন্য নির্বাচন তফসিল পরিবর্তন করার সুযোগ হাত ছাড়া না করতেন তাহলে আজকে খুব সহজেই চলমান সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব ছিল। কিন্তু চলমান সংকট নিরসনের একটি অতি সহজ সুযোগ নির্বাচন কমিশন শুধুমাত্র একগুয়েমি করে নষ্ট করেছেন । তাই জাতি পরবর্তী সকল সংকটের জন্য শুধু মাত্র নির্বাচন কমিশনকেই দায়ী করবে এবং তাদেরকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে ।
তারানকো কি এবারও ব্যর্থ হয়ে খালী হাতে ফিরে যাবেন? কিন্তু রাজনীতি ও কুটনীতির মহাজনেরা তা বিশ্বাস করে না। তারানকো যেহেতু জানতে চেয়েছেন ‘নির্বাচনের তারিখ পিছানো যাবে কি না’ এবং নিশ্চয় বিনা কারণে তত্ত্বাবধায়কের ইস্যু বাদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনা কবেন নাই । কাজেই বোঝা যাচ্ছে এবার তার লক্ষ্য খুবই সুনির্দিষ্ট। তারানকো প্রধানমন্ত্রীর সবচেয়ে অপছন্দনীয় তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুটিকে ছাড় দিয়ে তার সঙ্গে আলোচনায় অত্যন্ত সু-কৌশলে দক্ষ কূটনৈতিক কথার চালে সাংবিধানিক ভাবে নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তনের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি নিয়ে নিলেন। আবার বিরোধী শিবিরে গিয়ে তিনি হয়তো বিরোধীদলীয় নেত্রীকে তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুটি বাদ দিয়ে নির্বাচনের তফসিলের পরিবর্তনের ইস্যুটিকে সামনে এনে তা বাতিল করলে আপোষ মিমাংসা মেনে নিতে হয়তো রাজী করিয়েছেন। এই ব্যাপারে আসলে কি কথা হয়েছে তা এখনও আমরা স্পষ্ট করে জানি না। তবে এর বাইরে যে কোন কথার সুযোগ নাই তা সচেতন মহলের বুঝতে মনে হয় তেমন কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা না। এখন সবাই এটি ভাল কওে বোঝে যে সরকার র্নিদলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি কোন অবস্তাতেই মেনে নিবে না এবং তারা যে কোন অবস্থায় বিরোধীদলকে বাদ দিয়েই দশম সংসদের নির্বাচন করিয়ে নিবে । তার উপরে যদি বিরোধীদল তারানকোর কথা না শোনে তাহলে বিরোধীদলকে একাই চলতে হবে এবং তাদের ভোগান্তিও বাড়তে পারে ।
বিরোধীদলীয় নেত্রী যদি তারানকোর প্রস্তাব মেনে নেয় তাহলে সংকট নিরসনে মনে হয় তেমন কোন দেরি হবে না। যদি বিরোধীদল নির্বাচনের তফসিল বাতিলে সন্তুষ্ট হন তাহলে প্রধানমন্ত্রীর কথা মত যে কোনো দিন স্বল্পতম সময়ের মধ্যে বর্তমান সংসদের অধিবেশন আহবান করে নির্বাচন কমিশনের গৃহিত সব পদক্ষেপ সাংবিধানিকভাবে বাতিল করে সংবিধান সংশোধন করতে পারে। তখন প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা অনুযায়ী সাংবিধানিকভাবেই নির্বাচনের তারিখ পেছানো যেতে পারে। প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতির ফরমান জারি করেও নির্বাচন বাতিল করা যেতে পারে। নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন করলে বিরোধীদলের আন্দোলনের যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠিত হবে এবং এর সম্মানজনক পরিসমাপ্তিও ঘটবে। একই ভাবে বর্তমানের বাস্তবতার আলোকে র্নিদলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে বিরোধীদল সরে আসলে প্রধানমন্ত্রীরও নির্বাচন তফসিল থেকে সরে আসার সম্মানজনক সুযোগ সৃষ্টি হবে। প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রী তারানকোর সঙ্গে আলোচনায় ইতিমধ্যেই তারানকোকে অনেক গুরুত্ব দিয়েছেন। জাতিসংঘ ইতিমধ্যে বাংলাদেশের চলমান সংকট নিরসন না হলে উভয় নেত্রীকে হেগে আন্তর্জাতিক আদালতে উপস্থিত করানো হবে বলে চাপ সৃষ্টি করেছে। এখন উভয়দলই যদি তাদের অবস্থানে অনড় থাকেন তাহলে ‘নেসেসিটি অব ডকট্রিন’ হিসাবে অন্ততঃ আগামী পাঁচ বৎসরের জন্য সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও দায়িত্ব নিয়ে জাতির বৃহত্তর প্রয়োজনে জনগণের আস্থা নিয়ে জাতিসংঘের ছত্রছায়ায় দেশ প্রেমিক শক্তি ঐক্যবদ্ধভাবে আগাইয়া আসার সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে। হয়তো তার ফলে হয়তো পাঁচ বছরের জন্য দেশে রাজনীতি কঠিন হয়ে যেতে পারে এবং বর্তমান রাজনীতিতে জড়িত নেতা-নেত্রীগণ এবং তাদের তাবেদাররা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তবে দেশ-বিদেশের অনেকেই হয়তো শুধুমাত্র শাস্তির স্বার্থে সেই অবস্থা মেনেও নিতে পারে । তাই উভয় রাজনৈতিক শক্তির নেত্রী কাছে আমার বিনীত আবেদন তারানকোর নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তনের প্রস্তাব দেশ ও জাতির স্বার্থে মেনে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। দেশে সবচেয়ে শক্তিমান আপনারা। দেশভাল থাকলে সবচেয়ে লাভবান হবেন আপনারাই, আপনাদের আত্মীয় এবং তাবেদার ও চাকর বাকররাই কিন্তু ক্ষতি হলে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন শুধু আপনারা দুইজন এবং আপনাদের সন্তানেরা। তখন আপনার চার পাশের চাটুকারেরা কেউ থাকবে না – অতীতেও ছিল না – ভবিষ্যতেও তারা থাকবে না। যদিও আজকে তারাই আপনাদিগকে বিভিন্ন বাহানায় আপস করতে দিচ্ছে না । সকল দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভুলে দেশ ও জাতির স্বার্থ ও কল্যাণে কথাচিন্তা তারানকো যে সম্মানজনক আপসের সুযোগ আপনাদের উভয়কেই দিয়েছে তা গ্রহণ করা চরম বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এখন সিদ্ধান্ত আপনাদের এবং ভাগ্যও আপনাদের । নিজের জীবন ও ভবিষ্যৎ বিপন্ন করে আমি তো শুধু বলেই গেলাম !!!
মেজর মো. আখতারুজ্জামান (অব.)
সাবেক সংসদ সদস্য, কিশোরগঞ্জ-২(কটিয়াদী)
জাতিসংঘের মহাসচিবের প্রতিনিধি জনাব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো চলমান সংকট নিরসনে বাংলাদেশে এসে ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রীসহ অনেক আওয়ামী লীগের উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রথম আলোচনার পরে উপদেষ্টা গওহর রিজভীর বক্তব্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ । তিনি বলেছেন ‘তারানকো সাহেবের নাকি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির ব্যাপারে কোন আগ্রহ নাই এবং তারানকোর মতে বিরোধী দলও নাকি এখন সেই দাবি নিয়ে আর সোচ্চার নয় এবং চলমান আন্দোলনও নাকি এখন সেই দাবী নিয়ে হচ্ছে না।’ তারানকো নাকি প্রধান মন্ত্রীকে প্রশ্ন করে জানতে চেয়েছেন ‘চলমান নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন করা যাবে কি না।’ জবাবে প্রধানমন্ত্রী নাকি বলেছেন এই বিষয়ে সাংবিধানিকভাবে যা কিছু করার শুধু মাত্র তা নির্বাচন কমিশনই করতে পারে। গওহর রিজভীর ভাষ্যমতে সংবিধান মোতাবেক নির্বাচন করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের এবং সংবিধান মোতাবেক নির্বাচন কমিশন যা করবে তাতে প্রধানমন্ত্রীর কোন আপত্তি নাই। গওহর রিজভী আরো বলেছেন যে প্রধানমন্ত্রী কোন অবস্থাতেই নির্বাচন কমিশনের কাজে কোন প্রকার হস্তক্ষেপ করেন না এবং করবেনও না। কাজেই চলমান সংকট তথা নির্বাচন পিছানোর যে আন্দোলন সেটাতে সরকারের কিছুই করার নাই। এখন সংবিধান মোতাবেক নির্বাচন কমিশন যা করবে তা প্রধানমন্ত্রী নিজেও মেনে নিবেন এবং তার দলও মেনে নেবে। তাই এখন বলা যায় চলমান সংকট সমাধানের বল এখন চলে গেছে নির্বাচন কমিশন অফিসে। একমাত্র নির্বাচন কমিশনই এখন নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন করে চলমান সংকটের সমাধান দিতে পারেন ।
যেহেতু প্রধানমন্ত্রী নিজেই সফররত জাতিসংঘের মহাসচিবের প্রতিনিধি তারানকোকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন তারানকোর অনুরোধে নির্বাচনের তারিখ সংবিধান মোতাবেক শুধুমাত্র নির্বাচন কমিশন পরিবর্তন করতে পারে তবে এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী তার কোনো আপত্তির কথাও তারানকোর কাছে তুলেন নাই বলে জানা যায়। সংবিধান মোতাবেক ঘোষিত নির্বাচনের মনোনয়ন পত্র দাখিলের শেষ দিন ছিল ২ ডিসেম্বর ২০১৩ এবং ওই দিনের পূর্বে নির্বাচন কমিশন যতবার প্রয়োজন ততবারই নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন করতে পারতেন। কিন্তু নির্বাচন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া শেষ হয়ে যাওয়ার পরে নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন করার কোন বৈধ ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের নাই। এবং প্রধানমন্ত্রী তা ভাল করেই জানেন। তাই তিনি অত্যন্ত সু-কৌশলে তারানকোকে প্রধান নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠাইয়া দিয়াছেন। তবে তিনি ইচ্ছা বা অনিচ্ছকৃত ভাবে হউক বা প্রকারন্তরেই হউক সাংবিধানিকভাবে নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন করিলে তা তিনি মেনে নেবেন বলে একটি বার্তা তারানকোর মাধ্যমে জাতিকে দিয়ে দিয়েছেন এবং এ ব্যাপারে তারানকোর কাছে কোন আপত্তিও না তুলে সেই ধারনাটিকে আরো বেশি বদ্বমূল করে দিয়েছেন। এখন তারানকোর প্রশ্ন মত চলমান সংকট নিরসনে বর্তমান নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তনটা মুখ্য সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার সময় তারানকো যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন নাই তখন নিশ্চয় কারও বোঝার বাকি নাই যে ১৮ দলীয় ঐক্যজোট বা বেগম খালেদা জিয়া চলমান সংকটের আপস মীমাংসার স্বার্থে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অবস্থান থেকে সরে আসতে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে হয়তো পর্দার আড়ালে রাজি হয়েছেন। এই অবস্থার পক্ষে প্রমাণ হিসাবে বিএনপির মুখপাত্র সালাহ উদ্দিনের সাম্প্রতিক বক্তব্যেও পাওয়া যায়। গোপন স্থান থেকে ভিডিও রেকর্ডকৃত তার প্রাত্যহিক বক্তব্যে দেখা যাচ্ছে নির্বাচন তফসিল বাতিল করার দাবিই তার বক্তব্যের মূখ্যদাবি। ৭ ডিসেম্বর ২০১৩ তারিখে সালাহউদ্দিনের বক্তব্যে নির্বাচনের তফসিল বাতিল না করলে নির্বাচন কমিশনকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে বলে হুমকি দেন এবং সকল সরকারি কর্মচারিদেরকেও নির্বাচনী দায়িত্ব পালন না করার জন্যও আহবান জানান।
চলমান সংকট এখন প্রায় একটি বিন্দুতে আসার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। তারানকো প্রধানমন্ত্রীর নিকট জানতে চেয়েছেন – ‘নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন করার সুযোগ আছে কি না।’ জবাবে প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন শুধুমাত্র নির্বাচন কমিশনার সংবিধান মোতাবেক নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন করতে পারে। পক্ষান্তরে বিরোধীদলীয় নেত্রী তার মুখপাত্রকে ঘোষণা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন যে নির্বাচন কমিশনকে আসামি করা হবে যদি তারা নির্বাচনের তফসিল বাতিল না করেন। তাই মনে হচ্ছে চলমান সংকটের সমাধান এখন নির্বাচনের তারিখের মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছে।
নির্বাচন কমিশন যদি এখন তারানকোর অনুরোধে সংবিধান মোতাবেক নির্বাচনের তারিখ বাতিল বা পরিবর্তন করে দেন তাহলে তারানকোর মধ্যস্ততায় নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন দুটি দলই মানতে বাধ্য হবে বা তিনি মানাতে বাধ্য করতে পারবেন। দৃশ্যত মনে হচ্ছে তারানকো হয়তো দুটি বিবাদমান দলকে আপস মীমাংসায় নির্বাচনে নিয়ে আসতে পারবেন। কিন্তু সাংবিধানিকভাবে সে ক্ষমতা এখন নির্বাচন কমিশনের হাতে নাই। সংকট এখন অন্য জায়গায় সৃষ্টি হয়েছে। তবে সবদল মেনে নিলে অসম্ভব কিছু নয় এবং নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন করা এখনও সাংবিধানিকভাবে সম্ভব।
নির্বাচন কমিশন পূর্বাপর চিন্তা না করে একগুয়েমিভাবে ভবিষ্যতের কোন পথ খোলা না রেখেই একতরফাভাবে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে দিয়েছেন। সংবিধান মোতাবেক ২৪ জানুয়ারি ২০১৪ সালের মধ্যে নির্বাচন করার সুযোগ সাংবিধানিক ভাবে ছিল। প্রয়োজনে সাংবিধানিক ভাবেই আরো তিন মাস সময় নেয়া যেত। নির্বাচন কমিশন যদি অন্ধের মতো কায়েমি স্বার্থে সরকারকে খুশি করারহীন উদ্দেশ্যে তার ঘোষিত তফসিলে নির্বাচন করার গো না ধরতেন তাহলে আজকে তিনি সংকট নিরসনের জন্য সবার মতামত নিয়ে তারিখ পুনঃনির্ধারিত করতে পারতেন। নির্বাচন কমিশন যদি ১ বা ২ ডিসেম্বর ২০১৩ তারিখ অন্ততঃ ৭ দিনের জন্য নির্বাচনের তারিখ পিছাইয়া দিতেন তাহলে আজকে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা অনুযায়ী সাংবিধানিকভাবে নির্বাচনের তারিখ বদল করা যেত এবং তাতে বিরোধী দলও এখন তাদেরকে আসামি করারও হুমকি দিতে পারতো না। যদি তখন একগুয়েমি করে শুধুমাত্র সরকারকে খুশি করার জন্য নির্বাচন তফসিল পরিবর্তন করার সুযোগ হাত ছাড়া না করতেন তাহলে আজকে খুব সহজেই চলমান সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব ছিল। কিন্তু চলমান সংকট নিরসনের একটি অতি সহজ সুযোগ নির্বাচন কমিশন শুধুমাত্র একগুয়েমি করে নষ্ট করেছেন । তাই জাতি পরবর্তী সকল সংকটের জন্য শুধু মাত্র নির্বাচন কমিশনকেই দায়ী করবে এবং তাদেরকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে ।
তারানকো কি এবারও ব্যর্থ হয়ে খালী হাতে ফিরে যাবেন? কিন্তু রাজনীতি ও কুটনীতির মহাজনেরা তা বিশ্বাস করে না। তারানকো যেহেতু জানতে চেয়েছেন ‘নির্বাচনের তারিখ পিছানো যাবে কি না’ এবং নিশ্চয় বিনা কারণে তত্ত্বাবধায়কের ইস্যু বাদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনা কবেন নাই । কাজেই বোঝা যাচ্ছে এবার তার লক্ষ্য খুবই সুনির্দিষ্ট। তারানকো প্রধানমন্ত্রীর সবচেয়ে অপছন্দনীয় তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুটিকে ছাড় দিয়ে তার সঙ্গে আলোচনায় অত্যন্ত সু-কৌশলে দক্ষ কূটনৈতিক কথার চালে সাংবিধানিক ভাবে নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তনের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি নিয়ে নিলেন। আবার বিরোধী শিবিরে গিয়ে তিনি হয়তো বিরোধীদলীয় নেত্রীকে তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুটি বাদ দিয়ে নির্বাচনের তফসিলের পরিবর্তনের ইস্যুটিকে সামনে এনে তা বাতিল করলে আপোষ মিমাংসা মেনে নিতে হয়তো রাজী করিয়েছেন। এই ব্যাপারে আসলে কি কথা হয়েছে তা এখনও আমরা স্পষ্ট করে জানি না। তবে এর বাইরে যে কোন কথার সুযোগ নাই তা সচেতন মহলের বুঝতে মনে হয় তেমন কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা না। এখন সবাই এটি ভাল কওে বোঝে যে সরকার র্নিদলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি কোন অবস্তাতেই মেনে নিবে না এবং তারা যে কোন অবস্থায় বিরোধীদলকে বাদ দিয়েই দশম সংসদের নির্বাচন করিয়ে নিবে । তার উপরে যদি বিরোধীদল তারানকোর কথা না শোনে তাহলে বিরোধীদলকে একাই চলতে হবে এবং তাদের ভোগান্তিও বাড়তে পারে ।
বিরোধীদলীয় নেত্রী যদি তারানকোর প্রস্তাব মেনে নেয় তাহলে সংকট নিরসনে মনে হয় তেমন কোন দেরি হবে না। যদি বিরোধীদল নির্বাচনের তফসিল বাতিলে সন্তুষ্ট হন তাহলে প্রধানমন্ত্রীর কথা মত যে কোনো দিন স্বল্পতম সময়ের মধ্যে বর্তমান সংসদের অধিবেশন আহবান করে নির্বাচন কমিশনের গৃহিত সব পদক্ষেপ সাংবিধানিকভাবে বাতিল করে সংবিধান সংশোধন করতে পারে। তখন প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা অনুযায়ী সাংবিধানিকভাবেই নির্বাচনের তারিখ পেছানো যেতে পারে। প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতির ফরমান জারি করেও নির্বাচন বাতিল করা যেতে পারে। নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন করলে বিরোধীদলের আন্দোলনের যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠিত হবে এবং এর সম্মানজনক পরিসমাপ্তিও ঘটবে। একই ভাবে বর্তমানের বাস্তবতার আলোকে র্নিদলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে বিরোধীদল সরে আসলে প্রধানমন্ত্রীরও নির্বাচন তফসিল থেকে সরে আসার সম্মানজনক সুযোগ সৃষ্টি হবে। প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রী তারানকোর সঙ্গে আলোচনায় ইতিমধ্যেই তারানকোকে অনেক গুরুত্ব দিয়েছেন। জাতিসংঘ ইতিমধ্যে বাংলাদেশের চলমান সংকট নিরসন না হলে উভয় নেত্রীকে হেগে আন্তর্জাতিক আদালতে উপস্থিত করানো হবে বলে চাপ সৃষ্টি করেছে। এখন উভয়দলই যদি তাদের অবস্থানে অনড় থাকেন তাহলে ‘নেসেসিটি অব ডকট্রিন’ হিসাবে অন্ততঃ আগামী পাঁচ বৎসরের জন্য সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও দায়িত্ব নিয়ে জাতির বৃহত্তর প্রয়োজনে জনগণের আস্থা নিয়ে জাতিসংঘের ছত্রছায়ায় দেশ প্রেমিক শক্তি ঐক্যবদ্ধভাবে আগাইয়া আসার সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে। হয়তো তার ফলে হয়তো পাঁচ বছরের জন্য দেশে রাজনীতি কঠিন হয়ে যেতে পারে এবং বর্তমান রাজনীতিতে জড়িত নেতা-নেত্রীগণ এবং তাদের তাবেদাররা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তবে দেশ-বিদেশের অনেকেই হয়তো শুধুমাত্র শাস্তির স্বার্থে সেই অবস্থা মেনেও নিতে পারে । তাই উভয় রাজনৈতিক শক্তির নেত্রী কাছে আমার বিনীত আবেদন তারানকোর নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তনের প্রস্তাব দেশ ও জাতির স্বার্থে মেনে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। দেশে সবচেয়ে শক্তিমান আপনারা। দেশভাল থাকলে সবচেয়ে লাভবান হবেন আপনারাই, আপনাদের আত্মীয় এবং তাবেদার ও চাকর বাকররাই কিন্তু ক্ষতি হলে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন শুধু আপনারা দুইজন এবং আপনাদের সন্তানেরা। তখন আপনার চার পাশের চাটুকারেরা কেউ থাকবে না – অতীতেও ছিল না – ভবিষ্যতেও তারা থাকবে না। যদিও আজকে তারাই আপনাদিগকে বিভিন্ন বাহানায় আপস করতে দিচ্ছে না । সকল দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভুলে দেশ ও জাতির স্বার্থ ও কল্যাণে কথাচিন্তা তারানকো যে সম্মানজনক আপসের সুযোগ আপনাদের উভয়কেই দিয়েছে তা গ্রহণ করা চরম বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এখন সিদ্ধান্ত আপনাদের এবং ভাগ্যও আপনাদের । নিজের জীবন ও ভবিষ্যৎ বিপন্ন করে আমি তো শুধু বলেই গেলাম !!!
মেজর মো. আখতারুজ্জামান (অব.)
সাবেক সংসদ সদস্য, কিশোরগঞ্জ-২(কটিয়াদী) – See more at: http://dhakatimes24.com/2013/12/09/7683#sthash.eJBeCjoi.dpuf
