বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল:-
এক.
সৈয়দ মোস্তফা কামাল ছিলেন ইসলামি তাহজীব তামাদ্দুনে বিশ্বাসী এক বিচিত্র প্রতিভার খান্দানী লেখক, অভিজাত গবেষক। তাঁর জীবন ছিল বৈচিত্রময়। মুসলিম সমাজ-সভ্যতা-জাতিসত্তার বৈরী শক্তির বিপরীতে তাঁর ভূমিকা ছিল কাণ্ডারি সদৃশ। তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা, দরাজদিল কলমযোদ্ধা। সিলেট তথা বাংলাদেশের ক্যানভাসে সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র। সব্যসাচী এ কলমসৈনিক ছিলেন সত্য-সুন্দরের প্রতি সুদৃঢ়ভাবে সমর্পিত, সাহসী, নির্ভীকচিত্ত। তিনি ছিলেন একাধারে রম্যসাহিত্যিক, শেকড়সন্ধানী গবেষক, সমালোচক, ইতিহাসবেত্তা ও সংগঠক। প্রজ্ঞায় তাঁর বিশিষ্টতা তাঁকে সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল। একজন বাগ্মী হিসেবেও তিনি ছিলেন সমুজ্জ্বল। জীবনের সোনালী সময় ব্যয় করেছেন ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতির মৌলিক গবেষণায়।
বরেণ্য এ লেখক তাঁর প্রতিভার সৃষ্টিময় আলোক ছড়িয়ে দিয়েছেন বিপুল সংখ্যক গ্রন্থে, প্রকাশিত-অপ্রকাশিত প্রবন্ধ, নিবন্ধ ও কবিতায়। জাতিসত্তার স্বরূপ উন্মোচন, বিকাশ ও বিনির্মাণে তাঁর ক্ষুরধার লেখনি এক অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছে। সময়ের অভিজ্ঞতাকে উপজীব্য করে তিনি সভ্যতার পথ নির্মাণে ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। মনের মাধুরী মিশিয়ে জীবনের রঙতুলি দিয়ে সমাজের আয়না তৈরি করাই ছিল তাঁর কাজ।ইসলামি রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদের ভাষায় তাঁর সাহিত্যচর্চার স্বরূপ উদ্ভাসিত হয়েছে অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে, ‘তবু দেখা যায় বহুদূরে হেরার রাজতোরণ’। হেরা’র আলোকমালায় শোভিত ছিল এ লেখকের মানস এবং তাঁর সৃষ্টির মনোভূমি। জীবন ও জগৎকে প্রজ্ঞাপিপাসা থেকে মুক্ত করে জ্ঞানসুধায় সিক্ত করতে তিনি ছিলেন সদা তৎপর। জাতির আত্মপ্রতিষ্ঠা ও আত্মগৌরব পুনরুদ্ধারে তাঁর কলম ছিল আপোষহীন। তাই তিনি ছিলেন হৃত ঐতিহ্যের অন্যতম ধারক ও বাহক। তাঁর লেখায় স্বকীয় ইতিহাস-ঐতিহ্য, ইসলামি সংস্কৃতি বাঙ্ময় হয়ে ফুঠে উঠেছে। তিনি ছিলেন জাতিসত্তার অনবদ্য নির্মাণশিল্পী।
সৈয়দ মোস্তফা কামাল ছিলেন মূলত সিলেটি ইতিহাস-ঐতিহ্যের সফল উপস্থাপক। তাঁর গভীর পর্যবেক্ষণ ও গবেষণায় সিলেট অঞ্চলের ভৌগলিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক রূপচিত্র আপন মহিমায় ভাস্বর হয়ে উঠেছে। সিলেটের মরমি সাহিত্য, মুসলিম কৃষ্টি ও ইতিহাস, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পৃথক আঙ্গিকে উপস্থাপিত হয়েছে। আর এ অঞ্চলের মানুষের সুখ-দুঃখ, অবহেলা-বঞ্চনা, হতাশা ও আশাবাদের সোনালী অধ্যায় তাঁর কলমের কুশলী ছোঁয়ায় নতুন রূপ লাভ করেছে। আমরা তাঁর লেখার মাধ্যমে গৌরবময় অতীত, ক্ষয়িষ্ণু বর্তমান এবং অনাগত ভবিষ্যতের দিক-নির্দেশনা খুঁজে পাই। ঐতিহ্যের আয়নায় নিজেদের অবলোকন করে গৌরবান্বিত হই। ভবিষ্যৎ বংশধর খুঁজে পায় আত্মমর্যাদার সাথে সঠিক পথে বিচরণের সন্ধান।
তিনি ছিলেন সিলেটের ঐতিহ্য উদ্ধারে এক সাহসী নির্ভীক নাবিক, সফল ডুবুরী। তিনি ছিলেন পথপ্রদর্শক, দিকনির্দেশক। তাঁর সম্পর্কে অনেক গুণীজন মূল্যায়নধর্মী আলোচনা করেছেন। বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী কথাশিল্পী অধ্যাপক শাহেদ আলীর ভাষায়Ñ‘আপনার নিবেদিত জীবনের স্বীকৃতি অবশ্যই পাবেন। আপন ঐতিহ্যের গৌরবে আপনার মতো গর্বিত লোক আমাদের দেশে বিরল।’ দেশের বিশিষ্ট গবেষক দেওয়ান নূরুল আনোয়ার হোসেন চৌধুরী তাঁর মূল্যায়নে বলেনÑ‘সৈয়দ মোস্তফা কামাল একজন শেকড়সন্ধানী লেখক। সিলেটের সাহিত্য সংস্কৃতির অঙ্গনে এক সুপরিচিত নাম।জাতিসত্তার বিকাশ ও বিনির্মাণে তার লেখনী সুধী-মহলে সমাদৃত।’
এ রম্যসাহিত্যিক এক সময় সিলেটের অধুনালুপ্ত সিলেট সমাচার ও দৈনিক জালালাবাদী পত্রিকায় ‘মুন্সী জবান উল্লাহ’ ছদ্মনামে কলম লিখে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জনে সক্ষম হন। তিনি সিলেটের সাহিত্যাঙ্গনে সুদীর্ঘ সময় ধরে একজন নিবেদিতপ্রাণ অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেছেন। নেতৃত্ব দিয়েছেন সাহিত্যিক-লেখক, কবি ও সংস্কৃতিসেবীদের। জীবনের শেষ লগ্ন পর্যন্ত তাঁর কলম ছিল সমানভাবে সচল। ত্যাগ, সত্যনিষ্ঠা, মাটি-মানুষ ও মানবতার প্রেমে, কল্যাণে তাঁর অবদান সুবিশাল। তাঁর লেখালেখির পরিধি ব্যাপক এবং এতো বেশি শাখায় তিনি বিচরণ করেছেন যে স্বল্প পরিসরে এর বর্ণনা সম্ভব নয়। সমাজ, সাহিত্য-সভ্যতাকে এ ত্যাগী লেখক দান করেছেন হাজারো উপাদান, অফুরন্ত ঐতিহ্যের ভাণ্ডার। তাঁর সৃজনীশক্তি ছিল মনোমুগ্ধকর ও আকর্ষণীয়। তাঁর ঋণ অপরিশোধযোগ্য। আদর্শ সমাজ গঠনে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য। তাঁর সকল কর্মই ছিল সৃজনশীল ও গঠনমূলক। তাঁর কর্মের যথাযথ মূল্যায়ন করা তাই আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব।
সৈয়দ মোস্তফা কামাল ছিলেন অত্যন্ত বন্ধুবৎসল, সদালাপী, সুন্দর স্বভাবসম্পন্ন সুশীল মানুষ। বিশ্বাস ও আকীদায় একজন খাঁটি মুসলমান হিসেবে সর্বমহলে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল প্রশ্নাতীত। আতিথেয়তা ও পরোপকার ছিল তাঁর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য ও মহৎগুণ।
এ সুপণ্ডিত ব্যক্তি অনেক স্বীকৃতি ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। এগুলো তাঁর প্রতিভার স্বীকৃতি ও গৌরবময় অবদানের স্মৃতিচিহ্ন। সিলেটের ইতিহাস, ঐহিত্য সংরক্ষণ ও লালনে সৈয়দ মোস্তফা কামালের ভূমিকা অমর, অম্লান হয়ে থাকবে দীর্ঘকাল। সমাজ-সভ্যতার ইতিহাসে তাঁর সৃষ্টিকর্ম যুগ যুগ ধরে স্মরিত হবে।দুই.
ইতিহাস-ঐতিহ্যের শেকড়সন্ধানী গবেষক, রম্যলেখক মোস্তফা কামালের মৃত্যুতে ২২ ডিসেম্বর, ২০১৩ সন্ধ্যা ৬টায় নগরীর দরগা গেটস্থ কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের সাহিত্য আসর কক্ষে এক শোকসভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের সভাপতি হারুনুজ্জামান চৌধুরীর সভাপতিত্বে এবং সহ-সাধারণ সম্পাদক সেলিম আউয়ালের পরিচালনায় প্রকৌশলি নাসির উদ্দিনের কোরান তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত সভায় স্বাগত বক্তব্যে সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হামিদ মানিক বলেন, সৈয়দ মোস্তফা কামাল একজন সহজ-সরল-প্রাণবন্ত অকৃত্রিম মানুষ ছিলেন। তাঁর সঙ্গে সর্বশ্রেণির মানুষের হৃদয়ের সম্পর্ক ছিল। তিনি প্রায় অর্ধশতাব্দীকাল সাহিত্যচর্চা করেছেন। আমি তাঁর প্রকাশিত প্রায় বই পড়েছি। তিনি ছিলেন বৈচিত্রের কারিগর। তিনি রম্যরচনার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখেছেন। তাঁর রচনার প্রধান বৈশিষ্ট্য এ দেশের মাটি আর মানুষের প্রকৃত চিন্তা-চেতনা-ইমান-আকিদার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। তিনি যে আদর্শকে কেন্দ্র করে লেখালেখি করেছেন তা যেন আমরা ভুলে না যাই। তাঁর মিশনকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। প্রবীণ আইনজীবী আজিজুল মালিক চৌধুরী বলেন, সৈয়দ মোস্তফা কামাল আমার কলেজ জীবনের বন্ধু। আমরা একসঙ্গে এমসি কলেজের হোস্টেলে ছিলাম। ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি প্রথম ‘রঙের বিবি’ প্রকাশ করলে আমাদের শিক্ষকরা বলেছিলেন, তুমি একদিন বড় সাহিত্যিক হবে। সত্য-ই তিনি সারাজীবনের চেষ্টায় বড় সাহিত্যিক হয়েছেন। আমার মতে, সিলেটে কবি দিলওয়ারের পরেই সৈয়দ মোস্তফা কামালের স্থান। প্রবীণ আইনজীবী, মুক্তিযোদ্ধা মুজিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, সৈয়দ মোস্তফা কামালের সঙ্গে আমার পঞ্চাশ বছরের সম্পর্ক। আইয়ুব খানের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনে তিনি ছাত্রনেতা হিসেবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তখন এমসি কলেজের ছাত্র সংসদের নির্বাচনে আমরা ছাত্র ইউনিয়নের বিরুদ্ধে আইডিয়েল গঠন করে বিজয়ীও হয়েছিলাম। ষাটের দশকের প্রায় সবগুলো ছাত্র আন্দোলনে সৈয়দ মোস্তফা কামালের ভূমিকা ছিল। এ নিয়ে তাঁর একটি বইও আছে। প্রফেসর আজিজুররহমান লস্কর বলেন, সৈয়দ মোস্তফা কামাল ছিলেন আমার সহপাঠী। তখন আমি এইডেড স্কুলে পড়তাম আর তিনি পড়তেন রসময় স্কুলে। সে-সময় তিনি এইডেড স্কুলের এক অনুষ্ঠানে এসে হারমনিয়াম বাজিয়ে গান গেয়েছিলেন। তিনি ছোটবেলা থেকেই খুব আমোদপ্রিয় মানুষ ছিলেন। তিনি খুব মেধাবী মানুষ ছিলেন। তাঁর মেধার সঙ্গে আদর্শও ছিল। প্রবীণ রাজনীতিবিদ, অ্যাডভোকেট মওলানা আব্দুর রকিব বলেন, সৈয়দ মোস্তফা কামাল প্রথমে ‘রঙের বিবি’ লেখেন আমার সম্পাদিত ম্যাগাজিনে। তখন এমসি কলেজে নিয়ম ছিল, কলেজ থেকে কোনও ম্যাগাজিন প্রকাশ করতে হলে কর্তৃপক্ষকে লেখাগুলো দেখাতে হতো। কিন্তু তাঁর এই লেখা আমি প্রিন্সিপালকে না দেখিয়েই প্রকাশ করে প্রচুর ধমক খেয়েছিলাম। সৈয়দ মোস্তফা কামাল একজন প্রকৃত মুসলমান ছিলেন। কেমুসাসের সহ-সভাপতি আফতাব চৌধুরী বলেন, আমি সৈয়দ মোস্তফা কামালকে অগ্রজ হিসেবে মনে করতাম। তিনি আমাকে আদর করতেন, øেহ করতেন। এখন আমি তাঁর অভাবকে প্রচণ্ডভাবে অনুভব করছি। অধুনালুপ্ত সিলেট পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান আ.ফ.ম. কামাল বলেন, ইসলামি ফাউন্ডেশনের অফিস যখন নয়াসড়কে ছিল তখন আমি প্রায়ই সৈয়দ মোস্তফা কামালের সঙ্গে দেখা করতে যেতাম। তিনি আমাকে স্মৃতিচারণ লেখার জন্য খুব তাগিদ দিতেন। কবি কালাম আজাদ বলেন, সৈয়দ মোস্তফা কামাল মুসলিম চৈতন্যের সিপাহসালারের ভূমিকা পালন করেছেন। আমি যখন প্রথম এমসি কলেজে আসি তখন তিনি ছিলেন আমাদের হিরো। একটা সময় তিনি ছিলেন খুব চঞ্চলপ্রাণ। মুসলিম মননের প্রতীক হিসেবে পরে তাঁকে আমরা আবিস্কার করি। সর্বোপরি তিনি একজন ভাল মানুষ ছিলেন। প্রবীণ ক্রীড়া সংগঠক এহিয়া রেজা চৌধুরী বলেন, সৈয়দ মোস্তফা কামালের ভাবনায় সর্বদা কাজ করত এ দেশের মানুষ যদি ইমান-আকিদাচ্যুত হয়ে যায়। তাঁর ইমানি দৃঢ়তা ছিল খুব বেশি। ইমান-আকিদা বিষয়ক সিলেটের প্রায় সব আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল খুব বেশি। ব্যবসায়ী এমএ জলিল বলেন, ‘সৈয়দ মোস্তফা কামাল ছিলেন আমার স্কুলের সহপাঠী। তাঁকে আমি জীবনে অনেকভাবেই দেখেছি। তিনি ছিলেন একজনশেকড়সন্ধানী মানুষ। কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের কোষাধ্যক্ষ সৈয়দ মুহিবুর রহমান বলেন, অনেকে দুঃখপ্রকাশ করে বলছেন, যারা সৈয়দ মোস্তফা কামাল কর্তৃক উপকৃত তাদের অনেকে তাঁর মৃত্যুতে আজ সামান্য শোকবার্তাও পাঠায়নি। আমি বলি, আমরা যদি তাঁর মিশন নিয়ে চলতে পারি তবে ওদের শোকবার্তা না পাঠালেও কোন ক্ষতি নেই। আকবরের প্রাসাদকে মানুষ স্মরণ রাখে না, স্মরণে রাখে জ্ঞানীদের জ্ঞান। স্কলার্স হোমের প্রিন্সিপাল ব্রিগেডিয়ার জুবায়ের সিদ্দিকী (অব.) বলেন, সৈয়দ মোস্তফা কামাল সত্যিকার অর্থে একজন শেকড়সন্ধানী গবেষক ছিলেন। তিনি এই সিলেটের ইতিহাস-ঐতিহ্যের জন্য অনেক তথ্য-তত্ত¡ রেখে গিয়ে এই অঞ্চলের মানুষকে ঋণী করে গেছেন। কবি মুকুল চৌধুরী বলেন, সৈয়দ মোস্তফা কামাল ইসলামি ফাউন্ডেশনে আমাদের সহকর্মী ছিলেন। তিনি ইসলামি ফাউন্ডেশনে ২১ বছর কর্মরত ছিলেন। শেষদিকে তিনি ছিলেন আমার অভিভাবক। তিনি ছাড়া কেউ কোনও দিন আমাকে ‘তুই’ বলে সম্বোধন করেনি। যে কোনও সমস্যা হলেই তিনি বলতেন ‘কিছু-ই হবে না, আল্লাহ ভরসা।’ তিনি জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন তাঁর আল্লাহ ভরসা কতটুকু সত্য। ব্যাঙ্কার আশরাফ চৌধুরী খালেদ বলেন, সৈয়দ মোস্তফা কামাল শেকড়সন্ধানী ছিলেন। তাঁর খুব ইচ্ছে ছিল গ্রামে কিছু একটা করার, কিন্তু অর্থনৈতিক কারণে পারেননি। ইমাম প্রশিক্ষণ অ্যাকাডেমির পরিচালক মওলানা শাহ নজরুল ইসলাম বলেন, সৈয়দ মোস্তফা কামাল একজন ভাল মানুষ ছিলেন। অন্য কারও সংকটের খবর পেলে তিনি নিজের সংকট মনে করতেন। তিনি শুধু লেখক ছিলেন না, তিনি লেখকদের অভিভাবকও ছিলেন। তিনি নেপথ্যে থেকে লেখকদের সাহায্য করেছেন। এই সিলেটে যাদের কথা কোনও দিন ইতিহাসের আলোচনায় আসত না তিনি খুঁজে খুঁজে তাদের কথা লিখেছেন। তিনি নির্মোহভাবে ইতিহাসচর্চা করেছেন। তিনি শত্র“-মিত্র সবার কথা লিখেছেন। প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধা আলি ইসমাইল বলেন, সৈয়দ মোস্তফা কামাল একজন সিলেটপ্রেমী মানুষ ছিলেন। তাঁকে আমি অত্যন্ত শ্রদ্ধাকরি। মওলানা ফজলুল করিম আজাদ বলেন, সৈয়দ মোস্তফা কামালের মুখে রহস্যময়ী এবং বেহেস্তি একটা হাসি সবসময় থাকত। তিনি র্শিক ও তাওহিদের মধ্যে পার্থক্যকে খুব ভাল করেই বুঝতেন। কেমুসাসের নির্বাহী সদস্য অ্যাডভোকেট কয়সর আহমদ বলেন, সৈয়দ মোস্তফা কামাল ছিলেন ব্যক্তিগতভাবে সহজ-সরল। চেহারা ছিল নুরানি। ছোটবেলা আমার খুব প্রিয় ছিল তাঁর লেখা ‘মুন্সি জবানউল্লার জবানবন্দী’।
তিনি ছিলেন তৌহিদবাদী লেখক। দৈনিক কাজিরবাজার পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ সুজাত আলী বলেন, সৈয়দ মোস্তফা কামাল নামের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ‘রঙের বিবি’ পাঠের মাধ্যমে। তাঁর জীবনযাপন ছিল খুবই সহজ-সরল। মাসিক বিশ্ববাংলার সম্পাদক মুহিত চৌধুরী বলেন, সৈয়দ মোস্তফা কামাল ছিলেন প্রজ্ঞা ও বোধের বটবৃক্ষ, যার নীচে আমরা আশ্রয় নিতাম। কেমুসাসের সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক সৈয়দ মবনু বলেন, এই সিলেটের সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনে যারা এখনও মুরুব্বি তাদের বেশিরভাগই আমার বাপ-চাচা-মামাদের বন্ধু-বান্ধব মামা কিংবা চাচা। সৈয়দ মোস্তফা কামাল আমার মামার বন্ধু মামা ছিলেন। তিনি নিজের ভাগিনার মতোই আমাকে øেহ এবং শাসন দুটোই করতেন। কিন্তু আমি আতঙ্কিত আমার মামা-চাচাদের সংখ্যা দিন দিন হ্রাস পেতে পাচ্ছে। সৈয়দ মোস্তফা কামাল চলে গেলেন। এখন কে এসে আমাকে মধুর সুরে মামু বলে বিভিন্ন উপদেশ দেবেন? আমার বিশ্বাস, তিনি একজন বেহেস্তি মানুষ ছিলেন। কবি বাছিত ইবনে হাবীব বলেন, সৈয়দ থেকে শুরু করে কামাল পর্যন্ত নামের প্রত্যেকটা অর্থ তাঁর জীবনে সফল। মাসিক শাহজালালের সম্পাদক রুহুল ফারুক বলেন, আমার ছাতকের ইতিহাস বইটি মূলত তাঁর প্রেরণায় লিখেছিলাম। তিনি সর্বদা আমাকে শেকড়ের সন্ধানী হওয়ার পরামর্শ দিতেন। ভিন্নধারা পত্রিকার সম্পাদক জাহেদুর রহমান চৌধুরী বলেন, সৈয়দ মোস্তফা কামাল ছিলেন আফজাল চৌধুরী ফাউন্ডেশন এবং সিলেট সংস্কৃতি কেন্দ্রের সভাপতি। আজ আমি বড় বেশি নিজেকে শূন্য মনে করছি।গীতিকার সায়িদ শাহিন বলেন, আমি খুব ছোট মানুষ, তবে আমারও কিছু স্মৃতি আছে তাঁকে নিয়ে। তবে সবচাইতে বড় কথা, আমি তাঁর সামনে তাঁর লেখা গান গেয়েছি আমার নিজের সুরে। শিশু সাহিত্যিক জসিম আল-ফাহিম বলেন, সৈয়দ মোস্তফা কামালের কাছে আমি চিরঋণী থেকে গেলাম। তিনি খুবই মহৎ একজন মানুষ ছিলেন। আমার মতো বেকার একজন মানুষকে তিনি চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। সভাপতির বক্তব্যে হারুনুজ্জামান চৌধুরী বলেন, শোকসভায় সাধারণত স্মৃতিচারণ হয়। আজও তাই হয়েছে। হজরত রাসুল (সা.)-এর সাহাবিরা প্রত্যেকে মনে করতেন তাঁকে রাসুল সবচেয়ে বেশি মহব্বত করেন। আজকের স্মৃতিচারণগুলো থেকে আমার মনে হলো, সৈয়দ মোস্তফা কামালের মধ্যেও এই গুণ ছিল। আমরা দেখেছি রাসুলের (সা.) গুণে গুণান্বিত হওয়ার নিরন্তর প্রয়াস ছিল সৈয়দ মোস্তফা কামালের মধ্যে। আমি এই শোকসভায় আসার পূর্বক্ষণে আমার বন্ধু ফরিদ আহমদ রেজা লন্ডন থেকে ফোন করে প্রশ্ন করলেন, ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে সিলেট থেকে যে তিনজন ব্যক্তি (কবি দিলওয়ার, প্রফেসর মো. আবুল বশর এবং মরমি গবেষক সৈয়দ মোস্তফা কামাল) বিদায় নিলেন তাদের শূন্যস্থান কি পূরণ হবে? আমরা এ প্রশ্নের উত্তরে যেতে পারছি না। সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তাই তাদের শূন্যস্থান সহজে পূরণ হবে কিনা এ প্রশ্ন থেকে যাবে।
শোকসভায় সৈয়দ মোস্তফা কামালকে নিবেদন করে স্বরচিত কবিতা ‘আহত আত্মায় শোকের প্লাবন’ পাঠ করেন কবি নাজমুল আনসারী, ‘চিরসবুজ ঘুমের ঘোরে’ পাঠ করেন আমিনা শহিদ চৌধুরী মান্না এবং ‘শিকড় খুঁজি’ পাঠ করেন সৈয়দ মুক্তাদা হামিদ। অনুষ্ঠানের শেষে মোনাজাত পরিচালনা করেন মাওলানা শাহ নজরুল ইসলাম।
সৈয়দ মোস্তফা কামাল : সিলেটি ঐতিহ্যের ভাষ্যকার
363
previous post
