সম্প্রচার নীতিমালা বাতিলের দাবি বিএনপির

by News Room

ডেস্ক :

মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা বাতিলের দাবি জানিয়েছে বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপি।
মঙ্গলবার বিকেলে বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে জরুরি এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান এ দাবি জানান।
তিনি বলেন, ‘সরকার নিজেদের দুর্বলতা জনসম্মুখে প্রকাশ হওয়ার ভয়ে গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের জন্য এই নীতিমালা প্রণয়ন করছে। এর মাধ্যমে তারা গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করতে চায়।’
মঈন খান বলেন, ‘এই নীতিমালার মাধ্যমে শাসকগোষ্ঠী তাদের অপকর্ম ও ব্যর্থতার চেপে রাখতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
বিএনপির স্থায়ী এই কমিটির এই সদস্য বলেন, নির্বাচনের নামে প্রহসনের মাধ্যমে মেয়াদ প্রলম্বিত করে ক্ষমতায় টিকে থাকা বর্তমান প্রশ্নবিদ্ধ মন্ত্রিসভা জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা অনুমোদন দিয়েছে।

এর নাম ‘সম্প্রচার নীতিমালা’ করা হলেও উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতার দিক থেকে এটি মূলত ‘সম্প্রচার নিয়ন্ত্রণ ও দলন নীতিমালা।’

তিনি বলেন, এই সম্প্রচার মাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, জনগণের আন্দোলন-সংগ্রাম, সরকারের বাইরের সকল রাজনৈতিক-সামাজিক-পেশাজীবী সংগঠনের বক্তব্য এবং গণবিচ্ছিন্ন শাসকদের অপকর্ম ও ব্যর্থতার সমালোচনা বন্ধ করার উদ্দেশ্যেই এই কালাকানুন তৈরি হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

মঈন খান বলেন, এই জঘণ্য কালাকানুন অমান্য করলে শাস্তির বিধান রেখে সম্প্রচার মাধ্যমকে ভয় দেখিয়ে সম্পূর্ণভাবে শাসকগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণাধীন করার অপচেষ্টা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, সাংবাদিকদের পেশাগত সংগঠনসহ বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও সচেতন নাগরিকবৃন্দ ইতোমধ্যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণের উদ্দেশ্যে প্রণীত এই কালাকানুনের বিরুদ্ধে সমালোচনা মুখর হয়েছেন। আমরাও এর তীব্র নিন্দা জানিয়ে হীন উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত এই কালাকানুন অনতিবিলম্বে বাতিলের দাবি জানাচ্ছি।

মঈন খান বলেন, এই তথাকথিত নীতিমালায় একটি সম্প্রচার কমিশন গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের দ্বারা গঠিত একটি সার্চ কমিটি ওই কমিশন গঠন করবে। এর অর্থ হচ্ছে, ওই কমিশন হবে সম্পূর্ণভাবে সরকারের পছন্দের ও আজ্ঞাবহ একটি কমিশন।

তিনি বলেন, এই কমিশনকে বিধি প্রণয়নসহ সম্প্রচার-মাধ্যম নিয়ন্ত্রণের সীমাহীন ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে। এরা মিডিয়ার স্বাধীনতা হরণ ও সরকারের আজ্ঞাবহ প্রোপাগান্ডা মেশিনারিতে পরিণত করার এক বিপজ্জনক অস্ত্র হিসাবে কাজ করবে।

মঈন খান বলেন, এই কমিশন গঠনের আগ পর্যন্ত সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় কমিশনের সকল ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অধিকারী থাকবে এবং তারা তা প্রয়োগ করতে পারবে। তার অর্থ হচ্ছে বেসরকারি সম্প্রচার মাধ্যমগুলোও সরাসরি সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। আর এতে মতপ্রকাশ, সংবাদ প্রচার ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা পুরোপুরি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।

বিএনপির সিনিয়র এই নেতা বলেন, নতুন সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানসমূহকে লাইসেন্স দেওয়ার কর্তৃত্বই কেবল নয়, যেসব প্রতিষ্ঠান বর্তমানে সম্প্রচারে রয়েছে তাদেরকে আবারো নতুন করে লাইসেন্স নেওয়ার বিধান করে সরকার ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যত অনিশ্চিত করে ফেলেছে।

এসব গণমাধ্যম আজ্ঞাবহ ও ক্রীড়ানক না হলে যে তাদেরকে লাইসেন্স দেওয়া হবে না, তা বলাই বাহুল্য বলে মন্তব্য করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই নেতা।

মঈন খান বলেন, এই নীতিমালায় অনুষ্ঠানে সরাসরি বা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক দলের বক্তব্য বা মতামত প্রচার করা যাবে না বলে বিধিনিষেধ আরোপ করে বিরোধী দলের সভা-সমাবেশ, প্রেস কনফারেন্স সরাসরি কিংবা ধারণ করে প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। তথাকথিত নীতিমালায় আইন-শৃঙ্খলা ভঙ্গ করতে উৎসাহ প্রদান করতে বা সহানুভূতি সৃষ্টি করতে পারে এমন অনুষ্ঠান ও বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কোনো বিদ্রোহ, নৈরাজ্য ও হিংসাত্মক ঘটনা প্রদর্শন করা এবং আইন-শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে বা আইন অমান্য করার পক্ষে সহানুভূতি সৃষ্টি করে এমন কিছু দেখানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া সরকারের পছন্দের নয় এমন রাজনৈতিক কর্মকা-, জনগণের আন্দোলন, পেশাজীবীদের সংগ্রাম ও মানুষের অধিকারের পক্ষের মতামতকে নিয়ন্ত্রণ করার কালাকানুন হিসাবেই জারি করা হয়েছে এই নীতিমালা। এর ভয়াবহ ও যথেচ্ছ অপব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে।

মঈন খান বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার নামে বিভিন্ন বাহিনীকে সরকার ভয়ঙ্করভাবে অপব্যবহার করছে। এসব বাহিনীর একশ্রেণির সদস্য জনবিচ্ছিন্ন সরকারের আশকারা পেয়ে বিভিন্নস্থানে খুন-খারাবি, চাঁদাবাজি, অপহরণ, গুমসহ গুরুতর সব অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। এই সময়ে তথাকথিত নীতিমালায় তাদের ভাবমূর্ত্তি বিনষ্ট করে এমন দৃশ্য প্রদর্শন বা বক্তব্য প্রদান নিষিদ্ধ করে এসব জঘন্য অপরাধকেই উৎসাহিত করা হয়েছে। এতে জনগণের জানমাল-সম্পদের নিরাপত্তা আরো বিপন্ন হবে এবং জনগণের কাছে বিভিন্ন বাহিনীর জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা মোটেও থাকবে না।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, স্বাধীনতার পর তারা ১৯৭৩ সালের প্রেস এন্ড পাবলিকেশন্স এ্যাক্ট’র মাধ্যমে সংবাদ মাধ্যম ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা খর্ব করেছে। একের পর এক সংবাদ মাধ্যমের প্রকাশনা নিষিদ্ধ করেছে। দেশের খ্যাতনামা সাংবাদিকদের কারাগারে নিক্ষেপ করেছে।

মঈন খান বলেন, ১৯৭৪ সালের কুখ্যাত বিশেষ ক্ষমতা আইনে তারা সাংবাদিকদের হেনস্থা করেছে। এরপর গণতন্ত্র হত্যা করে একদলীয় বাকশাল কায়েমের পটভূমিতে সরকারি নিয়ন্ত্রণে ৪টি পত্রিকা রেখে দেশের সব সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করেছে। হাজার হাজার সাংবাদিককে পেশাচ্যুত ও বেকার করেছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই নেতা বলেন, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে দৈনিক বাংলা, টাইমস, বিচিত্রাসহ বহু পত্রিকা বন্ধ করেছে এই শাসকগোষ্ঠী। সাংবাদিকরা বেকার হয়েছেন। এবারও দৈনিক আমার দেশসহ অনেক পত্রিকা বন্ধ করা হয়েছে। সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে জেলে ভরা হয়েছে। সাগর-রুনিসহ বহু সাংবাদিক নির্মমভাবে হত্যা হয়েছেন। সঠিক তদন্ত ও বিচার পর্যন্ত হয়নি।

তিনি বলেন, চ্যানেল ওয়ান, দিগন্ত ও ইসলামিক টিভি জোর করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সংবাদ ও টক-শোগুলো নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এইসব নিয়ন্ত্রিত অবস্থার মধ্যেও সরকার প্রধান নিজেই টক-শোর সামান্য সমালোচনার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে চলেছেন। সম্প্রতি একজন মন্ত্রী প্রকাশ্যেই ঘোষণা করেন যে, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা অচিরেই কেড়ে নেওয়া হবে। তার আলামত হিসেবেই সম্প্রচার মাধ্যম নিয়ন্ত্রণের এই তথাকথিত নীতিমালা অনুমোদন দেওয়া হলো বলে আমরা মনে করি।

মঈন খান বলেন, এই তথাকথিত নীতিমালায় বিকল্প মিডিয়া হিসেবে গড়ে ওঠা সোশ্যাল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট ওয়েবসাইটগুলো নিয়ন্ত্রণেরও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।

বিএনপির এই নেতা বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করার পথ ধরেই অতীতে আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রকে হত্যা করে মানুষের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। বিএনপি গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ফিরিয়ে এনেছে। শহীদ জিয়াউর রহমান মতপ্রকাশ ও সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছিলেন।

মঈন খান বলেন, ১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার সরকার বিশেষ ক্ষমতা আইনসহ সাংবাদিকতার স্বাধীনতা-বিরোধী আওয়ামী কালাকানুনগুলো বাতিল করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছিলো। কাজেই গণতন্ত্র ও মানুষের মৌলিক অধিকারের পক্ষে আমাদের সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে। আজ গণতন্ত্র রক্ষা এবং সাংবাদিকতা ও অবাধে মত প্রকাশের স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখার সংগ্রাম একাকার হয়ে গেছে। এই সংগ্রামে দেশবাসীসহ আমরা আপনাদের অর্থাৎ সাংবাদিক সমাজেরও সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা আশা করি।

বিএনপির সিনিয়র এই নেতা বলেন, আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি জনবিচ্ছিন্ন সরকার দিশেহারা হয়ে মানুষের সব অধিকার কেড়ে নিয়ে নিজেদের টিকিয়ে রাখার যে অপচেষ্টা শুরু করেছে তা ব্যর্থ হবে। মানুষের অধিকার ফিরে আসবে ইনশাআল্লাহ্।

এসময় জনগণের মতপ্রকাশের অবারিত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দল, সকল অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন এবং সকল গণতান্ত্রিক শক্তিকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সারাদেশে সোচ্চার হওয়ার ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানান বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই নেতা –

You may also like

Leave a Comment