বিএনপির ‘অবিচুয়ারি’ লেখার সময় এখনো আসেনি: রোবায়েত ফেরদৌস

by News Room

বিএনপির ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে চ্যানেল আই অনলাইন বিএনপির বর্তমান অবস্থা ও অবস্থান সম্পর্কে আমার মতামত জানতে চায়। আমি বলেছিলাম, রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি একই সঙ্গে বেশ শক্তিশালী আবার ভয়ঙ্কর দুর্বলও বটে। কেন এ দ্বৈধ বা মিশ্র মন্তব্য? আমি ব্যাখ্যা দিয়েছিলাম, বিএনপি শক্তিশালী কারণ এ মুহূর্তে নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে, আমার প্রতীতি, বিএনপি সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ করবে। অর্থাৎ সারা দেশে বিএনপি ভোটারদের বিপুল সমর্থন কুড়াতে পারবে। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, এ সমর্থন কেবল বিএনপির প্রতি বিএনপিমনাদের সমর্থন নয়, বরং ক্ষমতাসীনদের প্রতি মানুষের প্রত্যাখ্যান। এর সঙ্গে তুলনা করা যায়, ১৯৫৪ সালের নির্বাচনকে; ‘৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের বিজয় যুক্তফ্রন্টের প্রতি ইতিবাচক সমর্থন নয়, বরং মুসলিম লীগের প্রতি প্রত্যাখ্যান। ‘সিফোলজি’ বা ‘ভোটবিদ্যায়’ যাকে বলে নেতিবাচক ভোট। আবার রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি বর্তমানে খুবই দুর্বল এ কারণে যে, সরকারবিরোধী আন্দোলন করার সাংগঠনিক কোনো জোর তার নেই। দেশজুড়ে বিশাল নেটওয়ার্ক আর জনভিত্তি থাকলেও সরকারবিরোধী আন্দোলনে বার বার ব্যর্থ হচ্ছে দলটি। বিএনপি ‘হাতি’, এটা ঠিক- কিন্তু মামলা-হামলা, জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে ‘মত্তহস্তি’ হয়ে শক্তি প্রদর্শন করার ক্ষমতা সে হারিয়ে ফেলেছে। হাতি তবে কাদায় পড়েছে, ফলে আওয়ামী লীগ তো বটেই, জাসদ-বাসদের মতো ‘রাজনৈতিক চামচিকারাও’ তাকে লাথি মারছে।

অনেকে যে বলছেন, গেল ৩৭ বছরে বিএনপি এত তীব্র সংকটে পড়েনি, তাদের কথায় সত্যতা আছে বইকি। গুনে গুনে নয় বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে আছে বিএনপি; কেন্দ্র থেকে তৃণমূল- সংগঠনের অবস্থা ভীষণ নাজুক। হুমকি-ধমকি আর হামলা-মামলায় প্রতিনিয়ত ঝাঁজরা হচ্ছেন নেতা-কর্মীরা। খোদ দলের নেত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ১৮টি, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুলের নামে ৮০টিরও বেশি মামলা। সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশান্তরিত, কেন্দ্রীয় নেতারা কিংবা যুবদল-ছাত্রদল নেতা-কর্মী সবার বিরুদ্ধেই সারা দেশে কয়েক হাজার মামলা চলছে। বোঝা যায় অবস্থা বেশ সঙ্গিন! প্রশ্ন হচ্ছে, যে দল চার দফায় মোট ১৩ বছর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠান ছিল, তার অবস্থা কেন এ রকম করুণ হলো?

বিএনপির অধঃপতনের রসায়ন বহুবিধ- এক. ৩৭ বছরে দলের অভ্যন্তরে কখনই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা না হওয়া, ফলে সংকট মোকাবিলার ‘কোপিং স্ট্র্যাটেজি’ কী হবে দলটি তা স্থির করতে পারেনি; দুই. সাংগঠনিক দুর্বলতা- কেন্দ্র থেকে প্রান্ত দলের সাংগঠনিক অবস্থা ভীষণ এলোমেলো, গুছিয়ে শক্তি অর্জনের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ এখন পর্যন্ত চোখে পড়ছে না; তিন. বিগত সাত বছরেও বিএনপি তার জাতীয় কাউন্সিল সম্পন্ন করতে পারেনি, অঙ্গসংগঠনসহ সাংগঠনিক জেলার বেশির ভাগ কাজ চলছে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে; চার. দল চলছে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব দিয়ে- এখনো পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব ঠিক করতে না পারা দলের আরেকটি দুর্বলতা; পাঁচ. অতিমাত্রায় নেত্রীকেন্দ্রিকতা- সব সিদ্ধান্ত ও ক্ষমতা কেবল একজন নেত্রীর হাতে কুক্ষিগত থাকা, যদিও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগসহ দেশের সব রাজনৈতিক দলই এ দোষে দুষ্ট, এ কারণে দলে দ্বিতীয়/তৃতীয় পর্যায়ের নেতৃত্বের বিকাশ ঘটে না, নতুন নেতৃত্ব তৈরি হয় না, আখেরে যা দেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি নির্মাণের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়; ছয়. তারেক রহমান, হাওয়া ভবন ও ওই সময়কার সর্বগ্রাসী দুর্নীতির যে ইমেজ তার হ্যাঙওভার বিএনপি এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি; সাত. মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে যুক্ত জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপির গাঁটছড়া বন্ধন- এ কারণে সরকার বাকি বিশ্বে বিএনপিকে জঙ্গিবাদ, ধর্মীয় উগ্রবাদের দোসর হিসেবে চিহ্নিত করে চলেছে- পশ্চিমা বিশ্ব ও ভারতীয় রাজনীতিতে এর তাৎপর্য ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী; এর বাইরে অনেকে মনে করেন, রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকাকালে বিএনপি স্বচ্ছতা ও সততার পরিচয় যেমন দিতে পারেনি, তেমনি বিরোধী দলে থাকাকালে দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকাও রাখতে পারেনি। বিএনপি তাদের রাজনীতি চালাচ্ছে একেবারেই গতানুগতিক ধারায় যেখানে মেধা-মনন, নতুনত্ব বা সৃজনশীলতার কোনো ছোঁয়া থাকছে না, আন্দোলনের ন্যায্যতা তৈরির জন্য গণমাধ্যম ও সিভিল সোসাইটির সমর্থন টানতেও সে ব্যর্থ হয়েছে, আন্তর্জাতিক যোগাযোগেও বিএনপি কার্যত কোনো সাফল্য দেখাতে পারেনি। এই যখন অবস্থা তখন প্রশ্ন হলো- খালেদা জিয়া কি পারবেন খাদের কিনার থেকে বিএনপিকে টেনে তুলতে? কাদায় শুয়ে পড়া হাতি কি আবার ডাঙায় উঠতে পারবে? কাদা ঝেড়ে ফেলে, সাফ-সুতোর করে, নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করা কি আদৌ সম্ভব? এ এক মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন; তবে ইতিহাস বিএনপির পক্ষে; ইতিহাস বলছে, জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পরে, এরশাদের ক্ষমতা দখলের সময়, ‘৮৬-এর নির্বাচনকালে বিএনপি ভাঙনের মুখে পড়েছিল, বিএনপি সেটা দারুণভাবে কাটিয়ে উঠেছে; হুদা-মতিন উদ্যোগ, শাহ আজিজ পর্ব, কে এম ওবায়দুর রহমান পর্যায়, এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী পর্ব, কর্নেল অলির উদ্যোগ কিংবা আবদুল মান্নান ভূঁইয়া পর্ব- এ রকম বেশ কয়েকবার বিএনপি ভাঙনের মুখে পড়ে। ওয়ান-ইলেভেনের মাইনাস টু অভিঘাত থেকেও দলের নেত্রী নিজেকে সারভাইভ করতে সক্ষম হন। বর্তমানে বিএনপিকে নিঃস্ব মনে হতে পারে, কারণ তুমুল এক বৈরী পরিস্থিতি তাকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে; কিন্তু বিএনপির ‘অবিচুয়ারি’ লেখার সময় বোধ হয় এখনো আসেনি। কারণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি আর জনমানসের রুচির যে মান সেখানে বিএনপির মতো দলের জায়গা এখনো রয়েছে, আওয়ামী লীগ তাকে ধ্বংস করতে চাইলেও ‘সামাজিক বাস্তবতার’ কারণেই বিএনপির প্রাসঙ্গিকতা আরও অনেক বছর রয়ে যাবে; ঠিক যে সমাজবাস্তবতার কারণে বর্তমান চরিত্র নিয়ে আওয়ামী লীগ টিকে থাকবে, একই কারণে বিএনপিও থাকবে। একটা ‘থিসিস’ হলে অন্যটা ‘অ্যান্টিথিসিস’- বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি আরেকটির অস্তিত্বের শর্ত হয়ে গেছে। এ দুয়ের ‘সিনথিসিস’ কীভাবে হয় তা দেখার অপেক্ষায় রইলাম।

 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

You may also like

Leave a Comment