গত ২৫ সেপ্টেম্বর শুক্রবার সিলেটের এমসি কলেজে স্বামী-স্ত্রী ঘুরতে গেলে স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে গণধর্ষণ করে সেই কলেজের ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নেতারা। পুরো পৃথিবী যখন এই করোনা মহামারিতে থমকে গেছে, বাংলাদেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যখন বন্ধ তখন এমসি কলেজের মতো বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করছে ক্ষমতাসীনদের ভ্রাতৃপ্রতিম এ সংগঠনের নেতারা। এই করোনা মহামারির সময়েও বাংলাদেশে ঘটে যাচ্ছে একের পর এক নারী ধর্ষণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদপত্রসহ বিভিন্ন মাধ্যমে সেগুলো সামনে আসছে, ভাইরাল হচ্ছে।
ধর্ষণের প্রতিবাদে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন মহানগর সংসদ ভিকারুন্নেসার দেয়ালে ধর্ষণ বিরোধী গ্রাফিতি আঁকতে গেলে পুলিশ সেখানে বাধা দেয় এবং সেখান থেকে মহানগর সংসদের সভাপতি জহরলাল রায় এবং শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক সাদাত মাহমুদকে গ্রেপ্তার করে। থানায় নিয়ে গিয়ে নেতাদের ওপর বর্বর নির্যাতন চালায় পুলিশ। ওই রাতে ছাত্র নেতাদের গ্রেপ্তার ও থানায় নিয়ে গিয়ে নির্যাতনের প্রতিবাদে পরের দিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘেরাও কর্মসূচি দেয়া হয়। সেই ঘেরাও কর্মসূচিতে বাধা দেয় পুলিশ প্রশাসন।
গত ৪ অক্টোবর রাতে নারী নির্যাতনের একটি ভিডিও ভাইরাল হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে। ভিডিওটি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের একটি ঘটনার। যেটি ঘটেছিল ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার প্রায় এক মাস আগে। ভিডিওটিতে দেখা যায় কয়েকজন পুরুষ মিলে একজন নারীকে বিবস্ত্র করে তার ওপর অকথ্য নির্যাতন করছে।
সারাদেশে অব্যাহত ধর্ষণ এবং বিচারহীনতার প্রতিবাদে গত ৫ অক্টোবর শাহবাগে গণঅবস্থান নিয়ে শুরু হয় ‘ধর্ষণ এবং বিচারহীনতা’র বিরুদ্ধে আন্দোলন। ওইদিন বেলা ১১টায় একটি প্রতিবাদী মিছিল শেষে শাহবাগে অবস্থান নেয়া হয়। দিনব্যাপী চলে সেই অবস্থান কর্মসূচি। সেখানে নেতৃত্ব দেয় বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন। এরপর বিকেল ৪টায় লাঠি মিছিল করে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ৬ অক্টোবর আবারও বেলা ১১টায় শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে অবস্থান নেয়া হয়। সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শেষে কালো পতাকা মিছিল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে যাত্রা শুরু হয়। শান্তিপূর্ণ কালো পতাকা মিছিলটি হোটেল শেরাটনের সামনে গেলে পুলিশের ব্যারিকেডের সম্মুখীন হয়। পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে মিছিলটি সামনে এগোতে চাইলে পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করে। সেই লাঠিচার্জে আমি আসমানী আশা (বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক) সহ আরো অন্তত ১০ জন আহত হই। আমিসহ যে নারী কমরেডরা ছিলাম আমাদেও গায়ে হাত দেয় সরকারের সেই লাঠিয়াল বাহিনী। সেখানে মহিলা পুলিশ থাকা সত্ত্বেও পুরুষ পুলিশেরা আমাদের ওপর নিপীড়ন চালায়। কালো পতাকা মিছিলে পুলিশি হামলার প্রতিবাদে ৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় মশাল মিছিল করা হয়। ওইদিনই রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছাত্রলীগ আমাকে নিয়ে ‘গুজব’ ছড়াতে থাকে। আমাকে ছাত্রদলের নেত্রী নাতাশার পরিচয় দিয়ে তারা বিভিন্ন ছবি এবং ভিডিও ফেসবুকে প্রচার করে। ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতা সঞ্জীত তার ফেসবুক থেকে একটি পোস্ট করে এবং তার কর্মীরা সেটি শেয়ার দেয়। এর পর থেকে আমাকে ফোন, মেসেজ দিয়ে হুমকি-ধামকি দেয়া হয়।
গত ৯ অক্টোবর শুক্রবার ধর্ষণবিরোধী মহাসমাবেশ করা হয় এবং সেখান থেকে ৯ দফা পেশ করা হয়। সেইসাথে লাগাতার কর্মসূচির ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে সারা বাংলাদেশে ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। বিভিন্ন জেলায় আন্দোলনে বাধা দেয়া হয় এবং পুলিশ ও ছাত্রলীগ হামলা চালায়। সেখানে ছাত্র ইউনিয়নসহ অন্যান্য সংগঠনের নেতারাও আহত হন। বাংলাদেশ যে ধর্ষণের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে এর পেছনে মূল কারণ হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। একের পর এক ধর্ষণ, নারী নিপীড়নের ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। কিন্তু কোনোটিরই সুষ্ঠু বিচার হচ্ছে না। আমরা মনে করি, যদি তনুর ধর্ষণকারীদেও বিচার এদেশ করতে পারত, আফছানা ধর্ষণের বিচার করতে পারত তাহলে বাংলাদেশে আজ ধর্ষণের এই মহামারি দেখতে হতো না। কোনো একটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে সেটি নিয়ে আন্দোলন করা হলে ধর্ষককে গ্রেপ্তার করা হলেও কিছুদিনের মধ্যে সে জামিনে মুক্তি পেয়ে যায়। উপরন্তু আমরা দেখেছি ধর্ষণের শিকার নারী যখন বিচার চাইতে যায় তখন সে আবারও হেনেস্তার শিকার হয়। আমরা মনে করি এই যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি এর পেছনে রাষ্ট্রব্যবস্থা জড়িত। এই সরকারের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থেকে ধর্ষকরা নির্বিচারে-অবাধে ধর্ষণ করছে এবং তারা প্রকাশ্যে বুক টান করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই রাষ্ট্রব্যবস্থা, এই সরকার নারীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ, ধর্ষকদের বিচার করতে ব্যর্থ। অন্যদিকে আমরা যখন ধর্ষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করি, প্রতিবাদ করি তখন এই সরকার তার লাঠিয়াল বাহিনী লেলিয়ে দিয়ে আক্রমণ চালায় আন্দোলনকারীদের ওপর। ফ্যাসিস্ট কায়দায় রাষ্ট্র পরিচালনা করায় সরকার প্রতিদিন নতুন নতুন ধর্ষকের জন্ম দিচ্ছে। বাংলাদেশকে ধর্ষণমুক্ত করতে এই রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তন জরুরি।
লেখক: শিক্ষা ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
