আজকের দিনে আমরা সবাই বলে থাকি নারীপুরুষ সমান অধিকার। আসলেই কি সমান অধিকার পেয়ে থাকেন নারীরা? অনেক ক্ষেত্রে নারীরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকেও বঞ্চিত হন। অনেকেই আবার লোক লজ্জার ভয়ে মুখ ফোটে কিছু বলতে পারেন না। যেমনিভাবে মিতু বলতে পারেনি তার স্বামীর পরকীয়া প্রেমের কথা। আঠার বছরের সংসার জীবন তাদের। দুই মেয়ে নিয়ে খুব সুখের সংসার ছিল তাদের। দুই মেয়েই পড়াশুনা করে। বড় মেয়ে এস.এস.সি পরীক্ষা দিয়েছে আর ছোট মেয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে। মিতুর স্বামীর নাম সুফিয়ান। ছোটখাটো ব্যবসা করেন। মিতুর সঙ্গে বিয়ের পর থেকে কখনই তাদের দুজনের মনে দুজনকে নিয়ে সন্দেহ জাগেনি। অনেক আত্মবিশ্বাস ছিল তাদের মাঝে। বিশ্বাসের খুঁটিটা ছিল আবদ্ধ। হঠাৎ করেই সুফিয়ানের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লিপি নামের একটা মেয়ের আগমন ঘটে। সুফিয়ান ব্যবসার খাতিরে যতটা সম্ভব লিপিকে সাহায্য করে। লিপি জানত সুফিয়ান বিবাহিত এবং তার দুইটি মেয়ে আছে। এসব জানা সত্ত্বেও সুফিয়ানের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে লিপি। লোভ সামলাতে পারেনি সুফিয়ান টাকা পয়সা দেখে। সুখের জীবনে কাটা হয়ে প্রবেশ করে লিপি। সুফিয়ানকে লিপির প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য বার বার দেখা করে লিপি। বাসায় রান্না করে দাওয়াত খাওয়াতো। একটা সময় সুফিয়ানও লিপির পাতা ফাঁদে পা দিতে বাধ্য হয়। সুফিয়ান লিপির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যায়। আর এদিকে নিজের সংসারের প্রতি বেখেয়াল হয়ে পড়ে। ঠিকমত স্ত্রী-মেয়েদের সাথে কথা বলে না। প্রায়ই হালকা কথার ওপর সুফিয়ান মিতুর সাথে ঝগড়া করে। মিতু বুঝতে পারে না হঠাৎ কি হলো তাদের ঘরে? মিতু মেয়েদের সাথেও শেয়ার করতে পারছে না ওদের বাবার কথা। হঠাৎ একদিন সুফিয়ানের বন্ধু সুফিয়ানকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে না পেয়ে বাসায় আসেন। মিতুকে জিজ্ঞাসা করেন সুফিয়ানের কথা? মিতু বলে-ওতো কাজে গেছে। সুফিয়ানের বন্ধু বলেন-না ভাবী তাকেতো আমি আজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পাইনি। আজ সে যায়নি। মিতু তখন সুফিয়ানকে ফোন করে। সুফিয়ান বলে-আমি তো কাজ করছি প্রতিষ্ঠানে। অথচ সুফিয়ান প্রতিষ্ঠানে ছিল না। যাই হোক সুফিয়ানের বন্ধু যে বাসায় এসেছিল তা মিতু বলল সুফিয়ানকে। সুফিয়ান উত্তরে বলল, না মানে আসলে সে হয়তো ভুল দেখেছে। আমি ছিলামতো আমার কাজে। আমতা আমতা করে উত্তর দিল সুফিয়ান। মিতু বুঝতে পারল যে সুফিয়ান মিথ্যে বলছে। কিন্তু কেন এই মিথ্যে কথা বলতে হলো সুফিয়ানকে সেইটাই জানতে চাইছে মিতু। আস্তে আস্তে স্ত্রীর আর মেয়েদের প্রতি যে দায়িত্ব তাও যেন কমিয়ে দিচ্ছে সুফিয়ান। মেয়েরাও তাদের বাবার পরিবর্তন বুঝতে পারে। মিতু কেঁদেই যাচ্ছে। কাকে বলবে কি করবে বুঝতে পারে না। একদিন একটা কাজে মিতু মার্কেটে যায়। তখন সুফিয়ানকে মার্কেটে দেখে একটা মহিলার সাথে। মিতু তখন আড়ালে সরে যায়। সুফিয়ান দুইটা শাড়ি কিনে উপহার দিচ্ছে লিপিকে। তা দেখে মিতুর চোখে জল চলে আসে। বুঝতে পারে না সুফিয়ানের সঙ্গে থাকা মহিলাটি কে? এভাবে বেশ কয়েকদিন চলে যায়। হঠাৎ একদিন ডাক্তারের চেম্বার থেকে ফোন আসে মিতুর মোবাইলে। মিতু ফোন রিসিভ করতেই বুঝতে পারে মিতুর বান্ধবীর কন্ঠ। মিতুর বান্ধবী বলে কি ব্যাপার। তুই অসুস্থ নাকি? একটু আগে দেখলাম দুলাভাই ডাক্তারের চেম্বার থেকে যাচ্ছেন সঙ্গে বোরকা পরা তুই মনে হয়। তখন মিতু বলে হ্যাঁ সামান্য অসুস্থ। এই বলে ফোনটা রেখে দিল। মিথ্যে কথা ছাড়া আর কি বা বলবে সে। স্বামীর এমন অভিনয়ের কথা বলা যায় কি? যে স্বামী সন্তান আর স্ত্রীদের প্রতি এত ভালবাসা ছিল। তা এত সহজেই কি করে মুছে গেল বুঝতে পারে না মিতু। মিতুর ভাই প্রতিদিন ওদের বাসায় আসতো ওদের ভাগনীদের পড়াশুনার জন্য। মিতু তার ভাইকে সবকিছু খুলে বলল। অনেক কান্নাকাটি করল। ভাই মিতুকে শান্তনা দিল। মিতু ভাইকে বলল যা করবি ভাই একটু সাবধানে করবি। জানিসতো আমার দুইটা মেয়ে আছে। ওদেরতো বিয়ে দিতে হবে। যাই হোক এভাবে বেশ কয়েকদিন কেটে গেল। একদিন মিতু ও তার ভাই-ভাগনি মিলে টেলিভিশন দেখছে সঙ্গে সুফিয়ানও। হঠাৎ সুফিয়ানের মোবাইলে ফোন আসে। সুফিয়ান ফোনটা কেটে দেয়। অল্প কিছুক্ষণ পর সুফিয়ান মোবাইলটা নিয়ে বাথরুমে যায় এবং কথা বলে। সুফিয়ানের কথাগুলো ঘরের সবাই শুনতে পায়। ঘরের সবার সন্দেহ আরো বেড়ে গেল। সুফিয়ান ঢাকায় যাবার কথা বলে দুই দিন ঘরে থাকেনি। লিপিকে নিয়ে বেড়াতে গিয়েছিল। সেই খবরটাও মিতু জেনে যায়। মিতু আর চুপ থাকলো না। বাসায় আসার পর সুফিয়ানের কাছে জানতে চাইলো মিতু যে সুফিয়ান কি শুরু করেছে? সুফিয়ান উত্তর দেয় কি করেছি আমি। তখন মিতু যা যা জানে সব বলল। সুফিয়ান যেন আরো চড়াও হয়ে উঠল। মিতুকে রাগের চটে চড়-থাপ্পড় মেরে চলে গেল। অনেক দিন তাদের ঝগড়া চলল। কেউ কারো সাথে ভালোভাবে কথাও বলে না। এমনকি মেয়েদের সাথেও না। মেয়েরাও বুঝতে পারে বাবা পরকীয়া প্রেমে আসক্ত হয়েছে। কিন্তু মেয়েরা কার কাছে গিয়ে এসব বলবে বুঝতে পারছে না। এসব কথা জানাজানি হলে তাদের মান-সম্মানও থাকবে না। আবার বিশ্বাস করতেও কষ্ট হচ্ছে তাদের বাবার বয়সটাতো এখন এমন নয় যে পরকীয়া প্রেম করবে। মায়ের সাথে এসব কথাই শেয়ার করে মেয়েরা। এদিকে মিতুর ভাই সুফিয়ানের সঙ্গে দেখা করে আকার ইঙ্গিতে অনেক বুঝানোর চেষ্টা করে। সুফিয়ানের মোহটাও কেটে গেল। বুঝতে পারল সুফিয়ান, সে যে কাজগুলো করছে তা ঠিক করছে না। নিজের সব দোষ স্বীকার করল মিতুর কাছে। মিতু কী করবে। একদিকে মেয়েরা অন্যদিকে স্বামী। স্বামীর ভাগ তো কাউকে দেওয়া যায় না। আর স্বামী যা করেছে তাতে তাকে কী করে ক্ষমা করা যায়। আর যদি স্বামীর সাথে রাগ করে মেয়েদের নিয়ে চলে যায় তাহলে মেয়েদের ভালো জায়গায় বিয়ে দিতে পারবে না। এসব কথা চিন্তা করে আবার আগের মত স্বামীকে বিশ্বাস করতে শুরু করল মিতু। আর সুফিয়ানকে একটি কথাই বলল যে, সুফিয়ান যে কাজটা আজ তুমি করেছ, সেই কাজটা যদি আমি করতাম, আমি যদি তোমার মত ঢাকায় যাবার নাম করে দুই দিন অন্য কোনো পুরুষের সাথে থাকতাম তাহলে কি পারতে তুমি আমাকে মেনে নিতে? নিশ্চয় না।আমাকে চরিত্রহীন বলে তোমার সংসার থেকে তাড়িয়ে দিতে। অথচ তোমার বেলায় দেখ, আমি তোমাকে ক্ষমা করেছি, তবে একটা কথা মনে রেখ সাদা কাপড়ে দাগ লাগলে সে দাগ আর পরিষ্কারভাবে উঠে না। কিছুট হলেও থেকে যায়। ঠিক তেমনি তুমিও আমার বিশ্বাসের মাঝে ফাটল ধরিয়ে দিলে। আমাদের এত বছরের সংসার। ভালোই তো কাটছিল আমাদের। ভালোবাসার কমতি ছিল না। তাহলে কি করে অন্য মেয়ে সুযোগ পায় আমাদের পরিবারে ঢুকার। তোমার মাঝে নিশ্চয়ই দুর্বলতা ছিল যা তোমাকে আমাদের ভালবাসার সংসার এর কথা ভুলিয়ে দিয়েছে। এই কথাগুলোতো আমি বাইরের কারো কাছে শেয়ার করতে পারব না তাই তোমাকেই আমার জমে থাকা কষ্টের কথা বললাম। তুমি ভুল করেও কি ভেবে দেখছ কতটা কষ্ট দিয়েছ তুমি আমাদেরকে? তোমাদের পুরুষদের বেলা অনেক কিছুই মাফ হয়ে যায়। আর আমাদের নারীদের বেলা কোনো ক্ষমা থাকে না। আর লিপিতো একটা নারী। নারী হয়ে সে কিভাবে অন্য নারীর ক্ষতি করতে পারলো? সবই আমাদের বিবেকের কাছে হার মানে। সুফিয়ান মিতুকে বলে প্লিজ মিতু আমাকে ক্ষমা কর। আমি আবার তোমাদেরকে আগের মত করে আমার কাছে পেতে চাই। সুখের সংসারে। এ পথে যারা হাঁটছেন তারা যেন তাদের ভুলটা বুঝতে পারেন। কেউই চায় না তাদের সংসারে এমন অশান্তি আসুক। সবার সুখের সংসার কামনা করছি।
169
previous post
