কাজী আশরাফ:
ঈদ মানে আনন্দ
ঈদ মানে খুশি
ঈদ মানে ভালোবাসা
ঈদ মানে হাসি।
হাসি-আনন্দ, খুশিতে ভরা ঈদ আসে বছর ঘুরে প্রতিবার। কিন্তু এই আনন্দ কখনও পুরনো হয় না। বরং শাওয়াল মাসের প্রথম এই দিনটিকে ঘিরে থাকে প্রতীক্ষা। রোজা এলেই শুরু হয় দিন গণনা। সেই অপেক্ষার দিন ফুরায় এক মাস পর। দীর্ঘ একমাস রোজা বা সংযম পালনের পর ঈদ সবার জন্য নিয়ে আসে খুশির বার্তা। ছেলেমেয়ে, বড়ছোট নির্বিশেষে সবাই মেতে ওঠেন আনন্দে। এ দিন ভেদাভেদ ভুলে যাওয়ার দিন। পৃথিবীব্যাপী এই একই বার্তা নিয়ে উদযাপিত হয় ঈদ। এ দিন বিভিন্ন দেশে মুসলিমরা ঈদের খুশিকে ভাগাভাগি করে নিতে চান অন্যের সঙ্গে। দেশটি পৃথিবীর যে প্রান্তেই হোক, মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা ঈদ উদযাপন করেন কমবেশি একইভাবে। মোদ্দা কথা, ঈদের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে গোসল সেরে বাড়ির পুরুষ সদস্যরা নামাজ পড়তে যান। নামাজ শেষে কোলাকুলির মাধ্যমে শুরু হয় ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়। এরপর আত্মীয়স্বজন পাড়াপ্রতিবেশীদের বাসায় বেড়াতে যাওয়া, মিষ্টিমুখ করা, সবার খোঁজখবর নেয়া- এই হলো মূল আনন্দ।ঈদ একদিন হলেও ঈদ পরবর্তী কয়েকটা দিন এর রেশ থাকে। ঈদের আগের রাতকে ‘চান রাত’ বলে। ছেলেমেয়েরা আতশবাজি আর পটকা ফুটিয়ে এই রাতে হৈ হল্লা করে। এই উপমহাদেশে ঈদ-উল ফিতরের খাবার হিসেবে প্রাধান্য পায় সেমাই এবং মিষ্টি। তবে পৃথিবীর সব দেশেই সব জাতিতেই ছোটরাই আনন্দে থাকে এগিয়ে। ওদের মাঝেই ধরা দেয় সত্যিকারের উৎসব। প্যালেস্টাইনের শিশুরা সকালে ঘুম থেকে উঠেই ঈদের নতুন জামা পরে নেয়। এরপর সবাই মিলে যায় ঈদগাহে। তারপর সবার সঙ্গে ঈদের কোলাকুলি। মহিলারা রাতে কায়েক নামে এক ধরনের মিষ্টি তৈর করেন এবং ঈদের দিন সেটি সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করে খাওয়ার জন্য মসজিদে নিয়ে আসেন। নামাজ শেষে সবাই কবরস্থানে গিয়ে তাদের মৃত আত্মীয়স্বজনের জন্য দোয়া করেন। এরপর বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের বাসায় তারা বেড়াতে যান। এই সংস্কৃতি আমাদের দেশেও দেখা যায়।
প্যালেস্টাইনে ঈদের বিশেষ আকর্ষণ হচ্ছে ভেড়ার মাংস। যাদের সামর্থ্য আছে তারা পুরো ভেড়া রোস্ট করেন, আর অন্যরা মানসাফ নামে ভেড়ার মাংসের একটা ডিশ রান্না করেন। তিউনিসিয়ায় ঈদের নামাজের আগে ফেতরা সংগ্রহ করা হয়। নামাজ শেষে বাসায় গিয়ে সবাই নতুন জামাকাপড় পরে ঘুরতে যান। সেখানে তারা প্রত্যেক বাসাতেই কিছু মিষ্টি বিতরণ করে। আর প্রত্যেক বাড়িতে গিয়ে তাদের মিষ্টি খেতেই হবে। দুপুরে পরিবারের সবচেয়ে বড় সদস্যের বাসায় সবাই একত্রিত হয়ে দুপুরের খাবার খাওয়াটাও তাদের রেওয়াজ।জর্ডানে তিন দিন ধরে মুসলিমরা তাদের আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে ঘুরে বেড়ান। এ সময় মহিলারা খেজুর থেকে বিভিন্ন ধরনের খাবার তৈরি করেন। এ ছাড়াও জর্ডানের ঈদ আতিথেয়তায় অন্যতম উপাদান হচ্ছে অ্যারাবিক কফি এবং চকোলেট। সিঙ্গাপুরে সুলতান মসজিদ এবং আর স্ট্রিট অঞ্চলটিতে মুসলিমদের বসবাস। তাই ঈদের সময় সেখানে উৎসবের বন্যা বয়ে যায়। আঞ্চলিকভাবে ঈদকে ‘হরি রয়া পসা’ বলা হয়। ঈদের এক মাস আগে থেকেই বাড়িঘর, দোকানপাটে শুরু হয়ে যায় আলোকসজ্জা। ঈদের দিন মুসল্লিরা সবাই ঈদের জামাতে যোগ দিতে রওনা হন সুলতান মসজিদের দিকে। নতুন জামাকাপড় পরে ঈদের নামাজ শেষে তারা বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তারপর শুরু হয় ঘুরে বেড়ানোর পালা।
মালয়েশিয়ানরা ঈদের বিশেষ খাবার হিসেবে বাঁশের কোটরে ভাত রান্না করে। একে ‘লেম্যাঙ’ বলে। নারকেল গাছের পাতা দিয়ে পাত্র তৈরি করে ভাত রান্না করে তারা। এটিকে বলে কেটুপাট। বন্ধুবান্ধব এবং পরিবারের অন্যদের নিয়ে তারা এই খাবারটি মাংস, তরকারিসহ খেয়ে থাকেন। ঈদের দিনটি হচ্ছে ভুলত্রুটি ক্ষমা করার দিন। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী এদিন ছোটরা বড়দের সামনে এসে মাথা নিচু করে তাদের ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আর রোজার পর ঈদের উৎসব চলে এক মাস ধরে। অবশ্য সবচেয়ে বেশি আনন্দ করা হয় প্রথম তিন দিনেই। এ সময় তারা একে অপরকে ‘সেলামত হরি রয়া’ বলে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। বিভিন্ন রকমের পণ্য নিয়ে পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানিরা। খাবারদাবার থেকে শুরু করে খেলনা- সবকিছুই পাওয়া যায় এই মেলায়।সউদি আরবের ওয়াহাদাইতরা মনে করেন, প্রকৃত মুসলমানদের উৎসব শুধু দুটি। ঈদ-উল ফিতর এবং ঈদ-উল আজহা। এ ছাড়া অন্য কোনো উৎসব উদযাপনকে তারা শিরক বলে মনে করে। সউদি আরবে জাতীয় পর্যায়েও শুধু এই দুটি ঈদ উদযাপন করা হয়। অন্যান্য দিবস যেমন জাতীয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী, মৃত্যুবার্ষিকী ইত্যাদি তারা উদযাপন করে না। ইউনাইটেড আরব এমিরেটসে পুরুষ এবং নারীদের জন্য ঈদের দিন বিশেষ ধরনের পোশাক পরার রীতি আছে। পুরুষরা ‘কান্দর’ নামে এক ধরনের সাদা পোশাক পরে। মাথায় দেয় গাহফিহ নামের এক ধরনের গোল টুপি। নারীরা ‘থাউব’ নামের বিশেষ এক ধরনের পোশাক পরে। দিনটি তারা নেচে, গেয়ে আর আনন্দ করে কাটিয়ে দেয়।ঈদের সময় তুরস্কের লোকেরা অন্যান্য দেশের মুসলিমদের মতোই একজন আরেকজনের বাসায় বেড়াতে যান। এ সময় ছোটরা বড়দের আশীর্বাদ লাভের আশায় তাদের হাতে চুমু খায়। সেখানকার রীতি অনুযায়ী ছোটরা হাতে চুমু খেলে তাদের টাকা-পয়সা বা উপহারসামগ্রী দিতে হয়। এ দিন তারা শুধু মিষ্টি জাতীয় খাবার দিয়ে সবাইকে আপ্যায়ন করে।
কুয়েতে দুই ঈদের পাশাপাশি নবীর জন্ম এবং মৃত্যুদিনগুলোকেই জাতীয়ভাবে পালন করা হয়। সাধারণ আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি এ দেশের মানুষ ঈদের দিন ভেড়ার মাংস দিয়ে ভোজের আয়োজন করে। পুরুষরা বিশেষ ধরনের তলোয়ার নৃত্য বা আর্ধা প্রদর্শন করে।
ইরানে শিয়া প্রাধান্য থাকায় ঈদের চিত্রটা একটু অন্যরকম। এখানে অনেকটা অনাড়ম্বরভাবেই ঈদ-উল ফিতর পালন করা হয়। তাদের মতে এই ঈদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে দান। তাই অভাবগ্রস্তদের মধ্যে তারা খাবারদাবার বিতরণ করেন। খাবারের মেনুতে থাকে কাবাব, ভাত, গ্রিল করা টমেটো, বিভিন্ন সবজি আর দই।
পশ্চিমা দেশগুলোতে ঈদ উদযাপনের চিত্র একটু অন্যরকম। সেখানে মুসলিম আধিপত্য না থাকায় ঈদ অনেকটা অনাড়ম্বরভাবে পালিত হয়। তবে সব জায়গাতেই মুসলমানরা একত্রিত হয়ে নামাজ আদায়ের পর শুভেচ্ছা বিনিময় করে। য়ের কাজটুকু করেন। যেমন অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ঈদ উপলক্ষে বিশাল এক জনসমাগম হয়। এরপর চলে বিশাল ভোজ। মালয়েশিয়ান, ইন্দোনেশিয়ান, ইনডিয়ান, পাকিস্তানি আর বাংলাদেশি খাবারের লোভে অনেকেই সেখানে এই দিনে জড়ো হন।

