মোহাম্মদ গৌছ উদ্দিন তালুকদার: সম্মানিত পাঠক ও পাঠীকা বৃন্দ: আস্সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওবারাকাতু।
এ জীবনে প্রথম না লিখে আর পারতেছি না। জীবনের নানা ঘটনার অভিজ্ঞতাতে এবং নানা মানুষের সংগে সংশ্রবের অভিজ্ঞতায় আমাদের ব্যবহারেরও পরিবর্তন ঘটে। যদি কোনো ব্যক্তির সংস্পর্শে এসে আমাদের ইতিবাচক অভিজ্ঞতা হয় তবে আমাদের দৃষ্টি ভঙ্গিও ইতিবাচক হয়। আবার অভিজ্ঞতা নেতিবাচক হলে দৃষ্টিভঙ্গিও হবে নেতিবাচক। আমরা জানি পৃথিবীর শুরু থেকে সকল প্রজাতিরাই সংগ্রাম করে আসছে এবং চলছে, চলবেই শেষ পর্যন্ত। আজকের পৃথিবী বিগত এক হাজার বছরের থেকেও আধুনিক ও পরিবর্তনশীল। যা ভবিষ্যতের ১ঘন্টার সময়ের চেয়ে বেশি পরিবর্তনশীল ভাবে আধুনিক হচ্ছে। তাই বলতে চাই আমরা রাজনীতিবীদ নয়। তবে বর্তমান বাস্তবতা থেকে বলতে চাই। আমাদের এই পরিবার থেকে সমাজে, মাঠ থেকে হাঠে, গঞ্জ থেকে শহরে, প্রত্যেকেরই জীবন সংগ্রামের মধ্যে ব্যস্ত। এবং জীবনের শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত সংগ্রাম চলবেই। এক কালে মানুষ, সাধারণ পশু পাখির মতো অসহায় ও বর্বর জীবন যাপন করতো। সেই মানুষ আজ বিশ্ব জয়ী। অথচ পশু পাখিরাই সেই লক্ষ বছর আগেকার জীবন কাটাচ্ছে। মানুষের এই অগ্রগতির পিছনে মূল শক্তি হচ্ছে ‘ভাষা’। প্রকৃত পক্ষে ‘ভাষা’ মানব জাতীর প্রতি মহান আল্লাহর পক্ষে এক অপার অনুগ্রহ বা দান। ভাষাবীদ ড. শহীদুল্লাহ’র মতে মানুষ/জাতী যে ধ্বনি বা ধ্বনি সকল দ্বারা মনের ভাব প্রকাশ করে তাকে ভাষা বলে। চলমান একুশে ফেব্রুয়ারী মাস আমাদের মাতৃভাষার মাস। অনেক ইতিহাস ও রক্তাক্ত, ক্ষতÑবিক্ষতের মাস। একুশে ফেব্রুয়ারী আমাদের অহংকার ও গৌরবের মাস। এই মাসে ভাষার জন্য সংগ্রাম করে, বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে কত জানা ও অজানা মানুষগুলো জীবন দিয়েছেন, ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিখা আছে। তাদের মধ্যে রফিক, জব্বার, বরকত, সালাম গং। তাই আমরা এই মাসটির ‘২১শে ফেব্রুয়ারী’ দিনটিকে অনেক অহংকার, গৌরব, মর্যাদা ও সম্মানের সহিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে পালন করে থাকি। শুধু আমরাই নয়, আমাদের আগের ও পরের প্রজন্মরাসহ সমগ্র পৃথিবী এই দিনটিকে হৃদয় ভরা মর্যাদার সাথে পালন করছে আর করবে। বর্তমানে এই দিনটিকে প্রত্যেক সুশিল সমাজ থেকে শুরু করে শিক্ষিত, অর্ধ-শিক্ষিত ও অশিক্ষিত এবং সর্বস্তরের মানুষ হৃদয় ভরা মর্যাদার সাথে কালো বেইজ বুকের মধ্যে পরিধান করে পালন করি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন শুরু করেছিল সুশীল ও রাজনীতিবিদ ছাত্র সমাজ। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, এই দেশের ৫৫% মানুষ এই বাংলা ভাষা/ মায়ের ভাষায় কথা বলছে। তাই যাতে বাংলা ভাষা/ মায়ের ভাষা আমাদের এই পূর্ব-পাকিস্তানের বাংলা মাতৃভাষা রাষ্ট্রভাষা হয় এটাই ছিল একমাত্র দাবী। দেশ আগের থেকে খারাপ থাকার জন্য, আগের চাইতে কম অধিকার পাবার জন্য সঙ্গবদ্ধ হয়নি, বরং অধিকার নিশ্চয়তা পাবার জন্য একত্রিত হয়েছিল। যাতে করে একবাক্যে, এক সাথে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, মায়ের ভাষার ঐতিহ্যকে কোন ভাষা পরিবর্তন না করতে পারে। এই দূরত্ব পৃথিবীর উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে দ্বার-প্রান্তে পৌছায় সেই জন্য অঝোর রক্ত দিয়ে সংগ্রাম করেছিল। খেয়াল করে দেখবেন, আজ আমাদের দেশের প্রজন্মরা অতিতকে ভুলে গিয়ে অন্যের সংস্কৃতিকে ধারণ করে গর্ববোধ করে। আন্তর্জাতিক ভাষা হিসাবে শিখছে ইংরেজী, আধুনিক ভাষা হিসাবে শিখছে হিন্দি, ইসলামিক ভাষা হিসাবে শিখছে আরবি, ফার্সি, উর্দূ,। শুধু এই নতুন প্রজন্মে নয় সর্বেেত্র বাংলার ব্যবহারে সবচেয়ে বড় বাধা ‘হীনমন্যতা’৷ মধ্য যুগে বাংলার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস বলে; বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ ও উন্নতির জন্য সুলতানি ও মুঘল শাসন কালে অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ বিষয়ে যার নাম উল্লেখ করা প্রয়োজন তিনি হলেন ইলিয়াস শাহী বংশের সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ, ১৩৯৩ থেকে ১৪১১ খ্রী: তাঁর শাষন কালে প্রথম বাঙ্গালী মুসলমান কবি শাহ মুহাম্মদ ছগীর তার প্রণয়ন মূলক কাব্য ‘ইউসুফÑজুলেখা’ রচনা করেন। তাদের মধ্যে দৌলত উজির, বাহরাম খান, ও দোনা গাজীর নাম উল্লেখ যোগ্য। বিশিষ্ট বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম, সত্যেন বসুর মতো মানুষ বাংলায় বই লিখেছেন৷ এই বই লেখার পর তাঁরা বলেছেন, বাংলায় বই লিখতে গিয়ে তাঁদের কোনো সমস্যাই হয়নি৷ সব কিছুই সাবলীলভাবে প্রকাশ করতে সম হয়েছেন৷ তবুও আমরা বাংলা নিয়ে হীনমন্যতায় ভুগছি। এমন কিছু নেই যা বাংলায় প্রকাশ করা যায় না৷ তারপরও দীর্ঘ চেষ্টার পর সব জায়গায় বাংলার প্রচলন করা যায়নি৷এমন মন্তব্য আমাদের বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের৷ উল্লেখ্য, সর্বেেত্র অবিলম্বে বাংলা ভাষা ব্যবহারে কার্যকর পদপে গ্রহণের কেন নির্দেশ দেয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে গত বছর রূল দিয়েছিল হাইকোর্ট৷ বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক এবং বিচারপতি এ বি এম আলতাফ হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এক রিটের প্রাথমিক শুনানির পর, ঐ রুল দিয়েছিল৷ একই সঙ্গে দূতাবাস ও বিদেশি প্রতিষ্ঠান ছাড়া দেশের সব সাইনবোর্ড, ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বিজ্ঞাপন, গাড়ির নম্বর প্লেট, ব্যক্তিগত নাম ফলক এক মাসের মধ্যে বাংলায় লিখার জন্যও সংশ্লিষ্টদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছিল আদালত৷
এরপর ১লা এপ্রিল নির্দেশনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদনটি আদালতে দাখিল করতে বলা হয়েছিল বিবাদীদের৷ সে সময় আদালতে রিটের পে শুনানি করেন আইনজীবী ইউনূস আলী আকন্দ৷ আর রাষ্ট্রপে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিশ্বজিত রায়৷ আদালতের আদেশের পর ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘‘১৯৮৭ সালের মার্চে পাস হওয়া আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের সর্বত্র, অর্থাৎ সরকারি অফিস, আদালত, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজন ছাড়া অন্যান্য সর্বেেত্র বাংলা ব্যবহার করবে৷ নথি ও চিঠিপত্র, আইন আদালতের সওয়াল-জবাব এবং অন্যান্য আইনানুগত কার্যাবলী অবশ্যই বাংলায় লিখতে হবে৷ উল্লেখিত কোনো কর্মস্থলে যদি কোনো ব্যক্তি বাংলা ভাষা ব্যতীত অন্য কোনো ভাষায় আবেদন বা আপিল করেন, তাহলে তা বেআইনি ও অকার্যকর বলে গণ্য হবে৷ যদি কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী এই আইন অমান্য করেন তাহলে উক্ত কাজের জন্য তিনি সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধির অধীনে অসদাচরণ করেছেন বলে গণ্য হবে৷
এর পরের ঘটনা৷ সর্বেেত্র বাংলা ভাষা ব্যবহারে কার্যকর ব্যবস্থা প্রবর্তনের নির্দেশনা চেয়ে বাংলায় লেখা একটি রিট আবেদন করা হয়৷ সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবী ইউনূস আলী আকন্দ রিটটি করেছিলেন৷ রিটে বলা হয়, আইন প্রণয়নের পর এতদিন অতিবাহিত হলেও সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীরা এই আইন ঢালাওভাবে অমান্য করে যাচ্ছেন৷ এখনও সেভাবে কারো বিরুদ্ধে বিধি অনুসারে কোনো ব্যবস্থাও নেয়া হয়নি৷
সত্যিই তো৷ প্রায় বছরখানেক হতে চললো কিন্তু বাংলাদেশে ইংরেজির ব্যবহার কোনোভাবেই কমেনি, হিন্দি, উর্দূ ব্যবহার পর্যায়ক্রমে বাড়ছে,৷ বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের কথায়, ‘‘বাংলা ভাষা মোটেও দুর্বল ভাষা নয়৷ সর্বেেত্র বাংলার ব্যবহার এখন সময়ের দাবি৷ তিনি বলেন, উচ্চ আদালতের ঐ আদেশ ছিল সময়োচিত৷ এখনও সময় আছে৷ সরকারকে এ ব্যাপারে উদ্যোগী হয়ে এগিয়ে আসতে হবে৷
শামসুজ্জামান খান বলেন, ‘‘বাংলাদেশে যে তিন ধরনের শিা ব্যবস্থা রয়েছে তাতে অর্ধশিতি মানুষ তৈরি হচ্ছে৷ বাংলা ভাষায় যে শিকরা শিার্থীদের শেখাচ্ছেন, তাঁরাই ভালোভাবে বাংলা জানেন না৷ শিার্থীদের ভুল বাংলা শেখানো হচ্ছে৷ আর ইংরেজি মাধ্যমে যারা পড়ছে, তারা বাংলা না জানার কারণে ইংরেজিও ভালোভাবে শিখতে পারছে না৷ মাতৃভাষা না জানলে অন্য ভাষাও ঠিকমতো উপলব্ধি করা যায় না৷ এছাডা মাদ্রাসা শিায় যারা পড়ছে, তারা স্বাধীনতা সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলন, এ সব সম্পর্কে কিছুই জানে না৷ তারা যে আরবি পড়ছে, তাও আবার বাংলায়৷ ফলে তাদের কোনো শিাই ঠিকমতো হচ্ছে না৷ তাই এ সব ব্যাপারে শিা মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নিতে হবে৷ ঢেলে সাজাতে হবে শিা ব্যবস্থাকে৷ একমাত্র তবেই বাংলার প্রয়োগ ঠিকমতো হবে৷”
‘‘বাংলা ভাষার বিকৃতিকারীরা সফল হবেন না৷ কারণ এ ভাষার নিজস্ব শক্তি আছে’’
ভিন্নদেশী ভাষার সাথে মিশ্রিত হয়ে আজ বাংলা ভাষা/ মায়ের ভাষা পুরোটাই আহত, হয়তো সেদিন বেশি দূরে নয় যেদিন নিহত হবে আমার মায়ের ভাষা । সর্বেেত্র বাংলার ব্যবহারে সবচেয়ে বড় বাধা হীনমন্যতা৷ পশুর মতন সংখ্যা গরিষ্ঠ হয়ে আমাদের লাভ কি? যদি গৌরব করিবার মতো কিছু না থাকে। আজকের এই সোনার বাংলাদেশে যে পরিস্থিতি হচ্ছে তা বর্তমান ও ভবিষ্যতে জন্য খুবই বিপদজনক হিসাবে দাড়াঁবে। যা দেশের রাজনীতিবিদরা এটিকে উপলব্ধি করতে পারতেছে না বলে হবে না, পারলেও তারা ক্ষমতার ধাপটের জন্য কুলষিত করছে। কিন্তু এটির জন্য একদিন সমস্ত জাতীকে মাশুল দিতে হবে এবং এখনো দিতেছে। তাই এই বিপদমূখী সময় থেকে এই জাতীকে বাচাঁতে হলে কঠোর সিদ্ধান্ত থেকে দেশের রাজনীতিবিদদের কুলষিত মন থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমাদের একটি মাত্র পরিবার থেকে কালক্রমে একটি সমাজ ও একটি রাষ্ট্র গঠন করা হয়েছে। আর এই সমাজ/ রাষ্ট্রকে সুন্দর ও সুশীল ভাবে পরিচালনা করে থাকেন যোগ্য নেত্রীত্বকারী ও সৎ নিষ্ঠাবান ব্যক্তিরাই। তাই তারাও পর্যায়ক্রমে পরিচালনা করে আসছেন, তারা হচ্ছেন আমাদের সর্বস্তরের জনগণের মাথার তাজ। এদেশের জাতীর স্বপ্নকে পূরণ করে আসছেন বর্তমান ও আধুনিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মতো প্রত্যেকেরই স্বপ্ন হচ্ছে দেশটিকে আরো উন্নয়ন করা। আর আপনারাও তাই করছেন। কিন্তু বর্তমানে যে অবস্থা তৈরী হয়েছে তা জাতীর জন্য অমঙ্গল ছাড়া আর কিছু বয়ে আনবে না। সুতরাং সমস্যা থেকে দূরে সরে যাওয়া সমস্যা সমাধানের কোন পথ না। সমস্যাকে মোকাবেলা করতে হয় সমস্যার ভেতর থেকে। আমরা সমাজে বাস করি। তাই যা কিছু সমাজের জন্য ভালো নয়, সেটা আমাদের জন্যও ভালো নয়। তাই আসুন আজকের এই দিনের উপলক্ষে আমরা সকল ভেদাভেদ ভুলে নতুন করে এই জাতীর আশা আকাংখার দিকে নজর রেখে এই দেশকে আমাদের স্বপ্নের সোনার দেশ গড়ে তোলার শপথ গ্রহণ করি। এবং উভয় এই জাতীকে কাল্পনিক কিছু অসাধু ও চরিত্রাসী বিপদজনকগ্রস্থ জ্ঞানী গুনি থেকে বিরত থাকি। জাতীর স্বপ্ন পূরণ করতে আমরা সর্বদা সচেষ্ট থাকবো। তাই কবির ভাষায় বলতে চাই যিনি সহেন তিনিই রহেন, কীর্তিমানের মৃত্যু নেই, আপনারাও বেচে থাকবেন যার যার কীর্তিত্বের উপর। আর মানুষ বাচে তার অন্তরে, সমালোচনায় নয়। আশা করি এসব আমাদের রাজনীতিবিদদের ভালো জানা আছে।
শুভ বুদ্ধির উদয় হউক, জাতী স্বত্ত্বার জয় হোক।
