এরশাদ – একটি জীবন্ত কার্টুন!

by News Room
দিলরুবা সরমিন

সময়ের সেনাপ্রধান, রাষ্ট্রপতি, স্বৈরশাসক, বহু সেলিব্রেটি নারীর নায়ক, কবি ( অন্যের লেখা কবিতা নিজের নামে চালিয়ে দেয়া), গীতিকার ও স্বঘোষিত পল্লী বন্ধু এরশাদ গতকাল নাট্যকর ও অভিনেতা হিসাবেও পূণরায় জন্ম নিলেন যদিও অভিনেতা তিনি জীবনের শুরু থেকেই এবং তাঁর অভিনয়শৈলী এতটাই নিপুণ যে, অস্কার পাবার কোন সুযোগ বাংলাদেশ পেলে লে জে হো মো এরশাদ ছাড়া আর কারো পাবার সুযোগ ছিল না বা আগামীতেও জন্মাবেন না।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো এই যে, তাঁর এই বহুগুণ আমাদের সকলের জানার পরও আমরা কেউই তাঁকে ছাড়তে পারি না। তিনিই আমাদের ‘কমন ফ্যাক্টর’। এর পিছনে অনেক কারণ থাকতে পারে যা আমার মতো সাধারণ মানুষের জানা সম্ভব নয়। তবে তিনি যে সত্যি সত্যি ‘কেন্দ্রবিন্দু’ সেটা বলাই বাহুল্য। তাঁর মতো একজন বহুরুপী, বহুচারী, বহুনীতি সম্পন্ন মানুষকে আমরা না পারি ফেলতে না পারি গিলতে। অনেকটা ‘নীলকণ্ঠের’ ভূমিকাই পালন করছি লে জে হো মো এরশাদকে নিয়ে।

জেনারেল জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের সাথে তাঁর কী সম্পর্ক ছিল বা ছিল না একথা বাংলাদেশের মানুষ কোনদিনই জানতে পারবেন না। কারণ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সাহেবকে যে বা যারা হত্যা করেছিল তাদেরকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়েছে। সুতরাং জীবন্ত সাক্ষী খুঁজে পাওয়া ভার। যদিও বর্তমান বিকল্প ধারার নেতা, সাবেক রাষ্ট্রপতি, বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও নেতা, একাধিকবার বিএনপির নানা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী জনাব ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী হয়তো চাইলে রাষ্ট্রপতি জিয়ার হত্যা সম্পর্কে সত্য বয়ান দিতেই পারেন। কারণ সেই দুর্বিষহ রাতে তিনিই তো ছিলেন রাষ্ট্রপতির ঠিক পাশের কক্ষে!

আসা যাক নব্য নব্য ধারার নাট্যকার ও সুনিপুণ অভিনয় শিল্পী এরশাদ প্রসঙ্গে। কামরুল হাসান সাহেব এই অভিনেতার অভিনয় নৈপুণ্য  আর সহ্য করতে না পেরে শেষ অব্দি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন এই কার্টুন এঁকে, ‘দেশ আজ বিশ্ব বেহায়ার খপ্পরে।’ তাঁর আঁকা সেই শেষ ছবিটি ১৯৭১ সালে ইয়াহিয়া খান এর সেই দানবীয় পোস্টারের মতই সমান জনপ্রিয় হয়েছিল। তারপরও কী অদ্ভুতভাবে এই গুণি শিল্পী লেজেহোমো এরশাদ সাহেব নানান পাঁকের থেকে নিজেকে ধীরে ধীরে  ছাড়িয়ে নিয়ে এখোনো অব্দি দোর্দ- প্রতাপে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জেঁকে বসে আছেন। সেলুকাস!

শুধু তাই নয় বাংলাদেশের দুই নারী নেত্রী  বাংলাদেশের রাজনীতিতে হোমো এরশাদকে একটি ফ্যাক্টর বানিয়েও ফেলেছেন। তাই জনগনণ কোন অবস্থাতেই বিস্মিত হবে না এরশাদ আবার প্রেসিডেন্ট বা প্রাইম মিনিস্টার হলে। কারণ এরশাদ যখন যা ইচ্ছা তাই

বলছেন, যখন যা ইচ্ছা তাই করছেন। তাঁর কোন কিছুই বলাতে বা করাতে কোন বাঁধাই নাই। তাঁর মতো স্বাধীন নাগরিক এদেশের কোন পাগল বা শিশুও নয়। তিনি যে সব কথা বলেন বা যে সব কাজ করেন সেগুলো কোন পাগল করলে নিশ্চিত পাগলা গারদেও সেলে বাকী জীবনটা তাকে কাটাতে হতো। আর কোন শিশু করলে? আছেই তো ‘সংশোধন কেন্দ্র’ সোজা সেখানেই বাকি জীবনটা কাটাতে হতো সেই ‘শিশু কারাগারে’। সংশোধনের নামে আরো অমার্জনীয় অপরাধ শেখার জন্য।

কিন্তু জনাব এরশাদকে এই সব কোনো ফুলসিরাতই পার হতে হয়নি। হবেও না। কারণ তিনিও বুঝে গিয়েছেন রাজনীতির পালস বিট ও আম জনতার অক্ষমতা!

তা সে তিনি যাই বুঝুক তাঁর বলা সকল বক্তব্যেও ভিডিও চিত্র কিন্তু যথারীতি টেশিভিশন চ্যানেলগুলোতে আছে। যদিও আমি জানি তিনি সময়মত সেগুলোও বদলে দিতে পারেন। শুধু তো এখানেই শেষ নয়  তাঁর সর্বশেষ বক্তব্য যা নিয়ে এখন দেশব্যাপী ঝড় উঠেছে সেটা যে কত বড় দ-নীয় অপরাধ সেটা জেনে, শুনে বুঝেই তিনি বলেছেন। কারণ হয়তো দেখা যাবে কালই তিনি তাঁর আরেকটি বক্তব্যে বলে দিবেন, আমি এটা বলতে চাই নি আমাকে দিয়ে ‘ভাবী’/ ‘বুবু’ বলিয়েছেন। ব্যস! এরশাদের কেল্লা ফতেহ । মাঝখান দিয়ে বিপদে পড়ে যাবেন ‘ভাবী’ ‘বুবু’ গং।

এরশাদ যা বললেন তার ফলে কেবল আম জনতার হাস্যরস সৃষ্টি হলেও তাকে এত বোকা বা ন্যাকা ভাবার কোনই কারণ নাই। তিনি যা বলেছেন অত্যন্ত গভীর ভাবে চিন্তা ভাবনা করেই বলেছেন। তিনি কী বললেন? ‘তাঁকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হলে তিনি নিজ অস্ত্র দিয়ে আত্মহত্যা করবেন।’ এক সময়ের সেনাপ্রধান, দেশপ্রধান, পার্টি প্রধান এই ধরনের কথা বলতে পারেন? কখন

বলেন?

১। যখন তিনি নিশ্চিত যে তিনি এমন কিছু করেছেন যার ফলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে।

২। যখন তিনি পাগল হয়ে যান বা তাঁর সকল বোধশক্তি, স্মৃতিশক্তি লোপ পায় বা মতিভ্রম ঘটে।

৩। যখন তিনি দিশেহারা হয়ে যান।

৪। যখন কেউ তাকে দিয়ে একথা বলান।

আরো অনেক কারণ থাকতে পারে তবে এরশাদের মতো লোকের এই সব কোনো কিছুই শেষ কথা নয়। তিনি সকালে একজনকে আপন বোন বানান তো বিকালে আরেকজনকে আপন ভাবী বানান। তবে তিনি যাই বানান আমাদের নেত্রীরা কিন্তু তাই মেনে নেন এবং তাঁর কথার কোনো প্রতিবাদ না করেই ‘ভাবী বা বোন’ হয়ে যান।

সে যাই হোক তাঁর মতো নীতিভ্রষ্ট রাজনীতিবিদ ( অবশ্য জানিনা কার  নীতি আছে ) যা ইচ্ছা তাই করতে পারে। তাঁর প্রসঙ্গে একটি গল্প বলে শেষ করতে চাই। গল্পটি মোটামুটি সকলেরই জানা। এক গ্রামে এর অতিশয় শয়তান প্রকৃতির লোক ছিল। সারা জীবন শুধু গ্রামের মানুষদের জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মেরেছে। তো তার মৃত্যুও সময় উপনীত হলো । তখন সেই বুড়ো গ্রামের লোকজনদেরকে ডেকে বললো, আমি সারাজীবন তোমাদের অনেক ক্ষতি করেছি। কষ্ট দিয়েছি। তোমরা আমাকে মাপ করে দিও । তখন সহজ সরল গ্রামবাসী একবাক্যে মৃত্যুপথযাত্রী সেই শয়তান বুড়োকে মাপ করে দিল। তখন সেই বুড়ো উপস্থিত সকলের কাছে তাঁর মনের শেষ ইচ্ছা ব্যক্ত করলো যে, যেহেতু আমি তোমাদেরকে এত জ্বালিয়েছি তাই তোমরা আমার লাশটা চৌরাস্তার মোড়ে ঝুলিয়ে রেখ যেন যার যা রাগ ক্ষোভ ঘৃণা বা দুঃখ  আছে সেটা আমার উপর ঝাড়তে পারে।

সকলেই সমস্বরে রা রা করে উঠলো। তা কী হয়? একটি মৃতকে এভাবে রাখা সম্ভব? ছি! এ ধর্ম বিরোধী। আমরা পারবো না। কিন্তু বুড়ো নাছোড়! অত:পর কী আর করা? একে তো মৃত্যুপথযাত্রী তার উপরে পাক্কা শয়তান লোক। সুতরাং শেষ অব্দি সেই বুড়োর মৃত্যুর পর গ্রামবাসী তার শব কষ্ট করে টেনে টুনে এনে চৌরাস্তায় ঝুলিয়ে রাখলো। মুখে মুখে এই কথা রটে যেতে লাগলো। দলে দলে লোকজন এসে সেই শয়তান বুড়োটার লাশ দেখে যেতে লাগলো  আর যার যা মনে ও মুখে আসে বলে যেতে লাগলো। কেউ শোকে মাতম। কেউ বা ঘৃণায় কাতর। কেউ ধর্ম ভয়ে ভীত।

কিন্তু বুড়ো যে মৃত্যুর পরও গ্রামবাসীকে জ্বালাবর ফন্দি এঁটে বসে আছে সেকথা আর কেই বা জানতো ? জানতে পারলো তখন যখন পুলিশ এসে গ্রামবাসীকে ধরে নিয়ে গিয়ে আচ্ছা ঠ্যাঙ্গানি দিল এই বলে যে মানুষ হয়ে তোরা লাশ দাফন না করে  মানুষের লাশ টাঙিয়ে রেখেছিস? তোরা এত খারাপ? আইন ভঙ্গ করছিস? কে শোনে আর গ্রামের সাধারণ লোকের কথা? সব শুদ্ধ জেলে। গ্রামবাসী তখন হাঁড়ে হাঁেড় বুঝলো জীবিত বুড়োর ফন্দি যা সে মৃত্যুর পরও বাস্তবায়ন করে গেল।

এরশাদ এবং আত্মহত্যা – নিয়ে আর কিছু বলার আছে কী?

দিলরুবা সরমিন

আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী।

You may also like

Leave a Comment