গোলজার আহমদ হেলাল :উচ্চ মাধ্যমিক পাসের পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার অদম্য বাসনা থাকার পরও চানস পেয়েও ভর্তি হইনি।অনেক দুর,দুরবর্তী হওয়ার কারণে।বাংলাদেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত।আমবাগান আর মতিহারের সবুজ চত্বর কে শেষ পর্যন্ত পেছনে ফেলে দেই।
ভর্তি হলাম শতবর্ষের ঐতিহ্যমন্ডিত নান্দনিকতায় ভরপুর এম সি কলেজে।আবাসিক ছাত্র হিসাবে কলেজের ১ম ছাত্রাবাস যাকে মুসলিম ছাত্রাবাস নামে ডাকা হয় সেখানেই সিট পেলাম।
একবার ছাত্রাবাসে নতুন ছাত্রদের নবীনবরণ(এইচ এস সি ১ম বর্ষ) অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
আমি তখন অনার্স ২য় বর্ষের ছাত্র।আমাদের ছাত্রাবাস তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন কামাল স্যার অথবা ইসলামউদ্দিন স্যার।যাই হোক নবাগত সংবর্ধনার দিন ক্ষণ ঠিক হল।বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা হল সুপার দিলেন।
ছাত্রাধিনায়ক(প্রিফেক্ট)এর নেতৃত্বে কাজ চলতে থাকল।প্রোগামের আগের দিন তত্ত্বাবধায়ক স্যার আমাদের নিয়ে বসলেন।ছাত্রদের পক্ষ থেকে কে কে বক্তব্য রাখবে ঠিক করা হল।নতুন ছাত্রদের পক্ষ থেকে স্নেহের রেজাউল,ইন্টার ২য় বর্ষ থেকে প্রিয় আবু সাঈদ,সম্মান ২য় বর্ষ থেকে আমি এবং মাস্টার্স থেকে যতদুর মনে পড়ে আং হক ভাই,কাশেয় ভাই ও ফজলু ভাই।
যথারীতি অনুষ্ঠান সূচী তৈরী তৈরী হল।
অনুষ্টানের দিন আসে,আমরা উৎফুল্ল।উৎসবমুখর পরিবেশে ছাত্রাবাস মিলনায়তনে আমরা উপস্থিত হই।নির্ধারিত দিন শুভ সন্ধ্যায় সংবর্ধনার দামামা বেজে উঠল।ইতোমধ্যে অতিথিরা আসন অলংকৃত করলেন।
কলেজের সম্মানিত প্রিন্সিপাল শ্রদ্ধেয় শ্রী নিবাস স্যার,শহীদ শ্রী কান্ত ছাত্রাবাসের সুপার রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শ্রদ্ধেয় অজয় স্যার,পূর্বাঞ্চলীয় ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়ক প্রাণীবিজ্ঞানের শ্রদ্ধেয় হামিদ স্যার,অনুষ্ঠানের সভাপতি হিসেবে আমাদের হল সুপার আসন গ্রহণ করেন।কোরআন তেলাওয়াতের পর ছাত্রাধিনায়ক স্বাগত বক্তৃতা করলেন।
কলেজের প্রিন্সিপাল কে প্রধান অতিথি পেয়ে আমরা অনেক খুশী।অন্যদিকে কথা বলার সুযোগকে হাতছাড়া করিনি।কারণ হোস্টেলের অনেক সমস্যা,ছাত্রদের বিভিন্ন দাবী দাওয়া হল সুপারকে বলতে বলতে নাভিশ্বাস।তাই এগুলোর পাশাপাশি ক্যাম্পাসের অনেক কাহিনী আমাদের বক্তৃতায় আমরা নিয়ে আসি।
তখন ১৯৯৭/৯৮ সাল।বহিরাগতদের আনাগোনা,ক্লাসচলাকালীন একশ্রেণীর ছাত্র
ছাত্র্রীদের বাহিরে আড্ডা দেয়া,সর্বোপরি বিভিন্ন পরীক্ষায় অবাধে নকল চলত।বিশেষ করে ল’র পরীক্ষায়।আমরা এম সি কলেজের নিয়মিত ছাত্ররা খুব বেশী মর্মাহত এবং ক্ষুব্ধ ছিলাম।আইন পরীক্ষার্থী ভাই বোনদের উপর।তারা এত বেশী অসদুপায় অবলম্বন করত যে তা ভাষায় প্রকাশের মতো নয়।পরিবেশ নাজুক হয়ে গিয়েছিল।এজন্য প্রিন্সিপাল স্যার কে পেয়ে আমাদের দাবী ,ক্ষোভ সব কিছুই বলে ফেলি।
শ্রী নিবাস স্যার।সদা হাস্যোজ্জ্বল প্রাণখোলা এক ভদ্রলোক।আমরা ইন্টার মিডিয়েটে তাঁকে রসায়ন বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে পেয়েছি।আমাদেরকে তিনি খুব স্নেহ করতেন।ক্লাসের পড়া তরল পদার্থের মত সহজেই বুঝাতে পারতেন।অসম্ভব বিনয়ী ,সাধু ও পন্ডিত ব্যক্তি।
আমার মনে পড়ছে আমার বক্তৃতা’ র সময় বলেছিলাম আজ শিক্ষআঙন থেকে আলবার্ট আনইন্সটাইন,আইজ্যাক নিউটন কিংবা আরিস্ততল, সক্রেটিস এর মত লোক বের হচ্ছে না।আজ কলেজে পড়া লেখার বিষাক্ত পরিবেশ।নকলের কারনে মেধাবীদের মেধার অবমুলায়ন হচ্ছে।
প্রিন্সিপাল সার তাঁর বক্তৃতায় বলেছিলন এগুলা সমাধান করা একা সম্ভব নয়।এই যে ‘গুলজার’ তুমি বলেছো, তোমার বক্তৃতা চমৎকার।তোমাদেরকেে এগিয়ে আসতে হবে।নতুবা সম্ভব নয়।
অজয় স্যার বলেছিলেন আজকে আনইন্সটাইন এর মত লোক বের না হলেও সাইফুর রহমানের মত লোক বের হচ্ছে।
অনুষ্টান খুব ভালই হয়েছে।
কাারণ সমাপনী লগ্নে প্রিন্সিপাল স্যারসহ নতুুন ছাত্রদের নিয়ে নৈশভোজও আমরা করেছি।এছাড়া এতে বিভিন্ন ছাত্রনেতৃবৃন্দও ছিলেন।
আমার বন্ধধুু সৈয়দ নকীব হোসাইনও ছিলেন।তিনি একটি ছাত্রসংগঠনের প্রতিভাধর নেতা ছিলেন।একাদশ শ্রেণী থেকেেই তার সাথে পরিচয়।শুনেছি তিনি হবিগঞ্জের এক বনেদী পরিবারের সন্তান।তাঁর বাবা একজন আইনজীবি।তার পরিবারের লোকজন বিচারবিভাগের সাথে ওতোপ্র্রতোভাবে জড়িত।দেশের দুজন প্রধান বিচারপতি এই ফেমিলীর’ই দান।নকীব ভাইয়ের বড় ইচচ্ছা ছিল আইন পড়েে বিচারবিভাগে প্রবেশ করে পরিবারের ঐতিহ্য ধরে রাখা।তা আর হয় নি।কারণ তার পূর্্বপুরুষ (বিচারক) মাানা করেন।বললেন এ অঙ্গন কলুষিত হয়ে গেছে।অবশেষে তিনি হলেন ব্যাংকার।
উক্ত অনুষ্ঠানে যে সকল বড় ভাইয়েরা বক্তব্য দিয়েছিলেন তাঁরা সকলেই আজ স্বমহিমায় উজ্জ্বল।আং হক ভাই তথ্য ক্যাডারের বড় কর্মকর্তা,কাশেম ভাই শিক্ষা ক্যাডারের বড় পদে আর ফজলু ভাই(তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা)একটি সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজি:হিসাবে কর্মরত।
রসায়ন বিভাগের বিজিত স্যার প্রায়ই ক্লাসে বলতেন তোমরা তো অনেক ভাল।অনেক মেধাবী ও প্রতিভাসম্পন্ন।এই যে আ্যাভোগেড্র প্রক্ল্প,মৌলিক গাস সমুহ দ্বি -পরমানুক,মার্কনিফের সুত্র,ই ইক্যুয়ুলটু এম সি স্কয়ার এই সুত্রগুলি অনেক সাধনা করে বের করেছেন বিজ্ঞানীরা। অনেক সময় লেগেছে। আর তোমরা খুব সহজেই তা আয়ত্ত করছ। কম সময়ে শিখে ফেলছ।এভাবে অনেক উৎসাাহ তিনি দিতেন।এবং রসায়নবিদ্যার জটিল তত্ত্বগুলো সহজেই আমাদেরকে বুঝাতেন।বিজিত স্যার ,তরুন শিক্ষক। অনেক মেধাবী এবং ভাল।এ ধরনের শিক্ষক এর তুলনা হয় না।সত্যিকার অর্থে বিজিত স্যারের মত একজন প্রভাষক বিরল।
লেখক:নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আলোকিত সিলেট।
সহ-সভাপতি, সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব।
