আমার লাশের খবর বন্ধু শুনবে একদিন জানি,কাঁদবে সবাই ফেলবে শুধু দু’নয়নের পানি (৩৯)

by News Room

গোলজার আহমদ হেলাল : ২০০১ সাল।নির্বাচনের বছর।জাতীয় নির্বাচন। সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চলছে জোট গঠনের তোড়জোড়।আওয়ামীলীগকে পরাভূত করতে বিএনপি মরিয়া হয়ে উঠে।সমমনা দলসমুহ নিয়ে তারা জোট গঠন করে।

মুলত জোট রাজনীতির এই ধারা শুরু করে বিএনপি। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে দলটি জামায়াতকে নিয়ে চারদলীয় জোট করে নির্বাচনে অংশ নেয় এবং সরকার গঠন করে। পরে ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে সঙ্গে নিয়ে ১৪ দলীয় জোট করে আওয়ামী লীগ এবং তারাও ক্ষমতায় আসে। পরে ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহন না করলেও নির্বাচনকে সামনে রেখে ২০ দলীয় জোট গঠন করেছিল বিএনপি। ক্রমে বড় জোট গঠনের ধারায় সর্বশেষ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি (জাপা) গঠন করেছে ৫৮ দলের জোট।

আমার মনে পড়ছে আমরা তখন কুলাউড়া উপজেলায় নির্বাচনী কাজ করছিলাম।আমাকে হাকালুকি হাওরপাড়ের ঐতিহ্যবাহী জনপদ ভুকশিমইল ইউনিয়নে প্রায় ৬মাস কাটাতে হয়েছে।সত্যিকার অর্থে ভুকশিমইল এক ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যমন্ডিত এলাকা।ওখানকার মানুষের আচার আচরণ আর মমতাপূর্ণ ভালবাসা আজো আমাকে নাড়া দেয়।আমি ঐ ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামে গিয়েছি,প্রতিটি বাড়ীতে গিয়েছি।তাদের মুগ্ধ ব্যবহারে আমি প্রীত হয়েছি।

আমি যখন প্রথম ভুকশিমইল ইউনিয়নে যাই,প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা চমৎকার।শান বাঁধানো।কুলাউড়া থেকে কাদিপুর ছকাপন হয়ে ভুকশিমইল দাখিল মাদ্রাসা পর্যন্ত যাই।সে সময় হাওড় ছিল উত্তাল।হাকালুকি হাওড়।দেশের বৃহত্তম এই হাওর অন্যতম বৃহৎ মিঠা পানিরও জলাভূমি।চারিদিকে থৈ থৈ পানি।রাস্তা ডুবু ডুবু করছে।দুরের গ্রামগুলো জলে নিমজ্জিত।নৌকা দিয়ে লোকজন চলাচল করছে।

আমি স্নেহের ফয়সলের বাড়ীতে রাত্রিযাপন করি।খালাম্মা নিজ ছেলের মত দরদভরা মন নিয়ে ভালবাসতেন।অনেকদিন থেকেছি ঐ বাড়ীত।খালাম্মা আমাদের খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে এতই যত্নশীল ছিলেন,গভীর রাতে যাওয়ার পরেও তিনি নিজেই আমাদেরকে খাবার সরবরাহ করতেন।সত্যিকার
অর্থে খালাম্মা এক উদার হৃদয়ের মহীয়সী নারী।তার তুলনা নেই।

আমি পেয়েছিলাম এক ঝাঁক সোনালী পায়রা।যারা আমাদের সাথে দিন রাত কাজ করত।কম বয়স।সবেমাত্র এরা দাখিল পরীক্ষা দিয়েছে।কিন্তু তাদের আন্তরিকতা,মমত্ববোধ,কর্তব্যনিষ্ঠা ও উৎসাহ উদ্দীপনা আমাদেরকে সে সময় বিমোহিত করেছিল।

আমার অত্যন্ত প্রিয় স্নেহাশীষ হোসাইন,জাকির,ইকবাল,খয়রুল,আলিমউদ্দিনসহ কয়েকজন।খয়রুলের বাড়ীতে ও কিছুদিন থেকেছি।যথেষ্ঠ মেহমানদারী হয়েছে।ভূলার মত নয়।মহেষগৌরীতে নজরুল ভাই,আতিক ভাইয়ের বাড়ীতেও থেকেছি।তবে নির্বাচনের পুর্ব পর্যন্ত সবচেয়ে বেশী দিন কাটিয়েছি প্রিয় আলিমউদ্দিনের বাড়ীতে।ভুকশিমইল
দাখিল মাদ্রাসার সন্নিকটে ভুকশিমইল টু কুলাউড়া রাস্তাসংলগ্ন বাড়ীটি যুগ যুগ ধরে কালের সাক্ষী হয়ে থাকবে।

আলিম উদ্দিনের আব্বার নাম আলকাছ মিয়া।সাদা মনের অধিকারী সহজ সরল নিরহংকার এক মানুষ।আমরা চাচা বলে ডাকতাম।দিনে ২/৩বার তাঁর সাথে সাক্ষাত হত।রাস্তার ধারে বসতবাড়ী হওয়ার সুবাদে তাঁর সাথে দেখা হয়ে যেত খুব সহজে।আমরা আমাদের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি আলকাছ চাচার বহির্ঘরে নোঙর করে রাত দুপুরে কোমর পানি ভেঙ্গে ফয়সলের বাড়ীতে অথবা হাঁটু জল ভেঙ্গে খয়রুলের বাড়ীতে যেতাম।প্রতিনিয়ত এ কান্ড অবলোকন করে একদিন চাচার মনে পীড়া দিল।আমাকে তাঁর বাড়ীটিতে থাকা খাওয়ার জায়গা করে দিলেন।

বড় ঘরে চাচা
র প্রবাসী বড় ছেলের সাজানো গোছানো কক্ষটি আমাকে বরাদ্দ করলেন।চাচা নির্বাচন পর্যন্ত ছেলের বউকে বাড়ীতে নাইওর পাঠিয়ে দিলেন।আলকাছ চাচার এ মহানুভবতা ও উদারতা ইতিহাসে বিরল।

যাই হোক চাচার বাড়ীতে অবস্থান শুরু করলাম।মহা আনন্দ।আনন্দে অভিভুত প্রিয় ফয়সল। গোলজার ভাইয়ের আর কষ্ঠ হবে না ভেবে।
চাচী আম্মা খুব স্নেহ করতেন।তিনি আমাকে তাঁর ছেলেদের মত দেখতেন।আমিও মা’ বলে সম্বোধন করতাম।মায়ের মত মমতা আর ভালবাসা দিয়ে আমাদের কাজে তিনি সহযোগিতা করেছেন।অচেনা অপরিচিত জায়গা।মানুষগুলোর সাথেও কোনও পুর্বাপর পরিচিত নেই,কোন যোগসুত্র নেই।তারপরও এ নিবিড় সম্পর্ক ইতিহাস হয়েই থাকবে।

চাচী আম্মা বয়স্ক এক নারী।কিন্তু আমাদেরকে প্রাণপন ভালবাসতেন।বিশেষ করে ভালো খাবারের কোন জুড়ি ছিল
না।জিয়া উদ্দিন ছোট ছিল।চাচা চাচীর কনিষ্ঠ সন্তান।আদরের দুলাল।মাদ্রাসা থেকে আসার পর মা’ তাকে মাছ ধরতে পাঠাতেন।বাড়ীর ধারের জমি থেকে ধৃত মাছ কত না মজা ছিল।সু স্বাদু ছিল।তা বলার ইয়ত্তা নেই।

ভুকশিমইলের সাংস্কৃতিক,অর্থনৈতিক,রাজনৈতিক ধর্ম ও জনসাধারণের জীবনাচার,প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ওশিক্ষাক্ষেত্রে অনবদ্য ভুমিকা অতুলনীয়।

মাস্টার শফিক স্যার,মতিউর ভাই,রইয়ব আলী ভাই,রাজা ভাই,সাঈদ মেম্বার,সাঈদুল,মাহতাব ভাই,মনসুর,আমার বন্ধু ডা:লুৎফুর সহ অনেকে আমার ঘনিষ্ঠ ছিলেন।অনেকের নাম স্মরণ হচ্ছে না।ক্ষমা সুন্দর দৃষ্ঠিতে দেখবেন।কুলাউড়া কে দৃশ্যপট থেকে সরানো যাবে না।আরো লিখব পরবর্তীতে….

লেখক:নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আলোকিত সিলেট।
সহ-সভাপতি, সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব।

You may also like

Leave a Comment