গোলজার আহমদ হেলাল : আমি যখন মিরাবাজার খান চাচার বাসায় থাকতাম।তখন আসলে শহর সম্পর্কে তেমন কোন ধারণাই ছিল না।গ্রাম থেকে সবেমাত্র শহরে পদার্পণ ।ফলে অনেক বিষয় ই আমার জ্ঞানের বাহিরে।ছন্দানীটুলা থেকে পূর্বদিকে দাদাপীরের মাজার পশ্চিম দিকে নাইওরপুল ,উত্তরে আগপাড়া মসজিদ আর দক্ষিণে যতরপুর মসজিদ পর্যন্ত ছিল বৈকালিক ভ্রমনের পরিধি।আর বেশীদুর যেতে বাসা থেকে চাচী আম্মা বারণ করেছিলেন।
একবার দুটো মজার কাহিনী ঘটলো।যতরপুর মসজিদে যাওয়ার আগে ডানদিকে বেশ কয়েকটি সনাতন পরিবারের বসতি।এখানে একটি পূজার ঘরও আছে।রয়েছে পুরাতন একটি দীঘিও।আর বামদিকে শেখ রাহাদুজ্জামান(প্রকৌশলী,বুয়েট থেকে) এর বাসার পাশ দিয়ে ছোট একটা গলিপথ দিয়ে বেশ কয়েকটি মুসলিম পরিবারের আবাসস্থল।
ঐ জায়গায় ছিল ঝানু বুদির বাসা।সেখানে একদিন বেড়াতে গিয়ে ফিরতে বিলম্ব হওয়ায় অর্থাৎ সন্ধ্যা গড়িয়ে যাওয়ায় বাসায় যেতে বিড়ম্বনায় পড়েছিলাম।ঝানু বুদি খান চাচার বাসায় চাচী কে বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করতেন।বয়োবৃদ্ধ সেই মহিলা সেই ভোরবেলা থেকে রাত অবধি বাসার কাজে ব্যস্ত থাকতেন।
সকালের নাস্তা,দুপুরের খাবার ,সন্ধ্যাকালীন নাস্তা,রাতের খাবার ও বহিরাগত লোকজনের মেহমানদারীতে ঝানু বুদির জুড়ি নেই।মাঝে মধ্যে তাঁকে সহায়তা করতে তার মেয়েরা আসতো।এক ছেলে ও তিন মেয়ের সুখের সংসার।মেয়ে তিনটি খুবই চৌকস ও নানা গুণে গুণান্বিত।
সুন্দর ,চরিত্রবান,সদাহাস্যোজ্জ্বল ও মনোমুগ্ধকর নারীর যেন প্রতিকৃতি।ঝানু দি এত কষ্টের মাঝেও কিশোরী তিনটিকে কিশোরীমোহন বালিকা স্কুলে পড়াতেন।শিল্পী,রিপা আর শিউলীকে যেন বিদ্যা-শিক্ষা করানোই তাঁর একমাত্র লক্ষ্য।
ভারতে উগ্রবাদী হিন্দু সমাজ বাবরী মসজিদ ভেঙ্গেছিল।সময় সম্ভবত ১৯৯২ সাল।১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারতে উগ্রপন্থী হিন্দু শিব সেনার সদস্যারা বাবরী মসজিদের উপর হামলা চালায়। এর প্রতিক্রিয়ায় পুরো ভারত জুড়ে ও বাংলাদেশের কিছু অংশে হিন্দু – মুসলমানদের মধ্যে দাঙ্গা শুরু হয়।
প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ সিলেটেও হয়।আমি বাসা থেকে বের হয়ে নাইওরপুল কামরান ফার্মেসীতে পৌছামাত্র একটি উত্তেজিত জনতার মিছিল প্রত্যক্ষ করি।পরবর্তীতে সেখান থেকে সোবহানীঘাট হয়ে বাসায় ফিরতে প্রায় ঘন্টা তিনেক বিনষ্ট হয়।
নতুন শহরের পরিধি যখন বাড়তে থাকল তখন অনেক কিছুই দৃষ্টিবন্দী হতে থাকল।মানুষের দৃষ্টি ,মস্তিষ্ক কিংবা হৃদয়ের কাছে super computer এবং উন্নতমানের camera পরাজিত।কেননা এগুলো মানুষই মানুষের বিভিন্ন organ কে সামনে রেখেই তৈরী করেছে।
আমি অবাক বিষ্ময়ে তাকালাম আর দেখলাম মাজার আর মাজার।বিভিন্ন অলি আউলিয়ার মাজার।শাহজালালের দেশ।মাজার তো থাকবেই।তবে বৈপরীত্য দেখলাম ওরসে।বৈপরীত্য গানের মাঝে।বৈপরীত্য ধ্যানে।এগুলো ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের প্রয়োজন মনে করছি না।
কিছু দিন পূর্বে আউলিয়াভক্ত ময়না মিয়ার আমন্ত্রণে সৈয়দপুর জাহানপুর মাজারে বার্ষিক ওরস ও মাহফিল দর্শন করেছিলাম।বিশাল উৎসব।পাহাড়ের মাঝে টিলার ফাঁকে ফাঁকে একেকটি প্যান্ডেলে হাজারো জনতার ঢল।পুরুষের পাশাপাশা নারী ও শিশুদের আনন্দ উৎসবে অংশ নিতে দেখা গেলো।
ময়না মিয়ার ছেলে সরকারী কলেজে পড়াশুনা করে।পূর্ব সিলেটের নামকরা খেলোয়াড়।আলাপচারিতায় ময়না ভাই বললেন,”ভাই,আপনে হয়ত খারাপ পাইবা আমারে।আমারও ছেলে সন্তান বড় অইছে,ইতা তারাও ভালা পায় না।আমি বাদ দেয়ার চেষ্টা করিয়ার,কিন্তু পারছিনা।গান বাজনা করলে একটু আরাম পাই,শান্তি পাই।”
শান্তির জন্য ময়নাভক্তগণ দলবেধেঁ মাজারে যায়,বন্দনা করে,পূঁজা করে।আবেগ আর অনুভূতির মিশ্রিতরুপ কোথায় ধাবিত হচ্ছে তা তো জানে না ময়নারা।
শহরের পরিধি বেড়ে আজ আমি অনেক দূর এসেছি।মহানগরে পদার্পণ করেছি।শাহজালের স্মৃতিধন্য এ শহরে শাহজালের মিশন পর্যুদস্ত।যুগে যুগে যারা স্মরণীয় বরণীয় হয়েছেন তাদেরকে স্মরণ করতে হবে সৎকর্মের মাধ্যমে। মনগড়া কোন মতবাদে শান্তি আসতে পারে না।
জীবন সম্পর্কে চারটি অতিপ্রাকৃত মতবাদ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ,দুনিয়ার মানুষ যেটি ই গ্রহণ করুক না কেন এর মাঝে থাকবেই।মানুষ ও বিশ্ব জাহান সম্পর্কে যে চারটি মতবাদ স্থিরীকৃত হয়েছে তার মধ্যে ইসলাম বাদে বাকি সকলটিই ভ্রান্ত। এর মধ্যে প্রথমটি বস্তুবাদি ধ্যান ধারনার উপর প্রতিষ্টিত(বিশ্বজাহান আকস্মিক ঘটনার বাস্তব প্রকাশ….), ২য় টি নিছক কল্পনা নির্ভর (পৌরাণিকতার তেলেসমাতি জগত ….)আর ৩য় টি একটি অসামাজিক মতবাদ(বৈরাগ্যবাদী…)।
সবচেয়ে বড় কথা হলো ইসলামে কোন রুপ নেই,গ্রুপ নেই,আলাদা কোনো গন্ধ নেই। ইসলাম তাঁর স্বমহিমায় গরীয়ান।কোন কাল বা গোষ্ঠী তা বদলাতে পারে না।
লেখক:নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আলোকিত সিলেট।
সহ সভাপতি, সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব।
