আমার লাশের খবর বন্ধু শুনবে একদিন জানি,কাঁদবে সবাই ফেলবে শুধু দু’নয়নের পানি(২২)

by News Room

গোলজার আহমদ হেলাল:  ছোট ভাই শিপনের নিমন্ত্রণে এবার সরস্বতী পূজায় অংশ নিতে হয়েছিল।বেশ কিছুকাল যাবত সনাতন ধর্মালম্বীদের অনুষ্ঠানে যাওয়া হয়নি।নানা ব্যস্ততা ওঅফিসের কাজকর্মের দরুণ পরিচিত -ঘনিষ্ঠ হিন্দু ভাই-বোনদের আমন্ত্রণ রীতিমত রক্ষা করা যাচ্ছে না।এবার সেই সুযোগটা আর হাতছাড়া করিনি।

আজ হতে প্রায় দু’ যুগের পূর্বে আমরা রীতিমত হিন্দুদের আচার-অনুষ্ঠান উপভোগ করতাম।আমাদের পাশের গ্রামের দুটি পাড়া ডৌডিক পূর্ব ও ইন্দারজু কুমারপাড়ায় প্রচুর সনাতন ধর্মের লোকের বসবাস।ধর্মপরায়ণ ওপূজাভক্ত এ পাড়াগুলোর লোকজন প্রায় সব ধর্মীয় অনুষ্ঠান ই পালন করতে পিছিয়ে ছিলেন না।পূজামন্ডপগুলোতে হিন্দু-মুসলমানদের সরব উপস্থিতি উভয় জাতির সম্প্রীতির বন্ধনকে অটুট রাখতে ভূমিকা রাখত।

গেল বছর মৌসুমীর বিয়ের আলাপ-আলোচনা চলছিল।দিদি এবং দাদা মেয়ের প্রাক-বিবাহ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে খুব করে বলেছিলেন।আমি অনুষ্ঠানের শেষভাগে অংশগ্রহণ করে তাদের নিমন্ত্রণ রক্ষা করেছিলাম।

গতকাল (০১/০২/১৭)সকালে শিপনের ফোন।দাদা কোথায় আপনি?আজ আপনাকে আসতে হবে।রাত ৮ টায় আসবেন।মিস করবেন না,প্লিজ।আজ আমাদের সরস্বতী পূজা।

ভৈরব তলার সন্ধ্যাকালীন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আপনাকে থাকতে হবে।চেয়ারম্যান ও মেম্বার সাহেবও আসবেন।

শিপনের কথা ফেলা যায় না।স্নেহের ছোট ভাই। নাথপাড়ার এক অভিজাত পরিবারের সন্তান সে।এলাকার গণ্যমান্য সর্বজন শ্রদ্ধেয় চিকিৎসক সুশান্ত বাবুর ছোট ছেলে।যেমন ভদ্র তেমন নম্র।মার্জিত,রুচিশীল ও অমায়িক।কথাবার্তায় মধুরতা ও আভিজাত্যের ছাপ।

কিছু দিন আগে সংক্রান্তির সময় টিফিনভরা নানা ধরনের পিঠা পাঠিয়ে এ আনন্দেও আমাদের সম্পৃক্ত করেছিল।

যথারীতি রাত্রে তাদের অনুষ্ঠানে যোগ দিলাম।সেখানে আমাদের সেরেস্তার আইনজীবি সহকারী রমা দা,আমার বন্ধু দেবাশীষ,বই ব্যবসায়ী মজনউকে ও পেলাম।

শিপন ও তার সহপাঠিরা আমাকে রিসিভ করলো।সারাটা সময় তাদের অনুষ্ঠান দেখলাম। বিপুল সংখ্যক হিন্দু-মুসলমান,নর-নারী,বালক-বালিকা ও শিশুরা শান্তিপূর্ণভাবে আনন্দ করলো।কোন উশৃংখলতা নেই,নেই কোন অপসংস্কৃতি।এ যেন এক মিলন মেলা।

শিক্ষিকা লাকী চক্রবর্তীর দলীয় গান,সুষ্মিতা -সংগীতা ওস্নিগ্ধার একক গান,সুবোল ও হরিপদের মনমাতানো গান,নভেল ও অতুলদার জনপ্রিয় গান এবং প্রশাসনের লোক নির্মল দা র “চোখ বুজিলে দুনিয়া আন্ধার ও শেষ বিচারের আদালতে…”গান গুলো উপস্থিত জনগণকে বিমোহিত করে।

এস এস সি পরীক্ষার্থী সেবা রাণীর ধর্মীয় গান,জনপ্রিয় শিল্পী অপি দে র মন মাতানো গান “বকুল ফুল বকুল ফুল” দর্শকদের আন্দোলিত করে তুলে।

প্রবাসী নুরুল সরকারের মানবতাবাদী ও ঈশ্বরপ্রেমের গান অনুষ্ঠানের মাত্রা অনেক বাড়িয়ে তুলে।

হিন্দু ধর্মালম্বীদের বিশ্বাস, রাজহাঁসে বসে বিদ্যা ও জ্ঞানদাত্রী দেবী আসেন এ দিনেই।

প্রতিবছর মাঘ মাসের শুক্ল পক্ষের পঞ্চমী তিথিতে শ্বেতশুভ্র কল্যাণময়ী বিদ্যাদেবীর আবাহন করা হয়। ঢাক-ঢোল-কাঁসর আর শঙ্খধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠে বিভিন্ন পূজা মণ্ডপ।

সরস্বতী বিদ্যার ও ললিতকলার অধিষ্ঠাত্রী দেবী হিসেবে পুজিত হন। ঐশ্বর্যদায়িনী, বুদ্ধিদায়িনী, জ্ঞানদায়িনী, সিদ্ধিদায়িনী, মোক্ষদায়িনী এবং শক্তির আধার হিসেবে সরস্বতী দেবীর আরাধনা করা হয়।

সিলেট নগরীর নাথপাড়া সমাজ কল্যাণ সংস্থার উদ্যোগে গাছতলা মন্দিরে আয়োজন করা এ মহতী অনুষ্ঠানটা।অনেকদিন পর এতে অংশ নিলেও আমার কাছে মনে হয়েছে সনাতন ধর্মের লোকদের বিশ্বাসে কোন চির ধরেনি।

গ্রাম বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য ও ধর্মীয় ভাবাবেগের কোন কমতি নেই।আকাশ সংসকৃতি তাদেরকে বিচ্যুত করতে পারেনি।

৩০ বছর পূর্বে যা দেখেছি ,এখনও শিক্ষা ও সংস্কৃতি তে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ই দাদা দের অনুষ্টানে দেখলাম।তবে অনুষ্টানের ব্যবস্থাপনা,কাঠামো ও অঙ্গসজ্জা আগের চেয়ে অনেক অনেক উন্নত।প্রেম-প্রীতির বন্ধনে সমাজ আলোকিত হউক…জ্ঞানবান হোক প্রতিটি মানুষ উপস্থাপকের প্রাণময়ী সুর ঝংকারে তাহাই বিদিত হলো।

লেখক:নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আলোকিত সিলেট।
সহ-সভাপতি, সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব।

You may also like

Leave a Comment