গোলজার আহমদ হেলাল : ২৮/১২/১৯৯৮ সাল ।রমজান মাস। কনকনে শীত । আমি তখন এম.সি. কলেজে পড়ি। বি এস সি অনার্স (গণিত) ২য় বর্ষে । আবাসিক ছাত্র ছিলাম। ১ম ছাত্রাবাসে থাকতাম। যেটাকে মুসলিম ছাত্রাবাস বলা হয়।
পাশেরটি হিন্দু ছাত্রাবাস । শহীদ শ্রীকান্ত ছাত্রাবাস নামে সেটি পরিচিত।
এম .সি. কলেজ ছাত্রাবাস একটি বিশ্ব- ঐতিহ্য। নান্দনিক স্থাপত্য কলায় নির্মিত এর প্রতিটি ভবন। সবুজের ঘাসের সমারোহ , চারিদিকে নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য , মাঠে গবাদিপশুর আনা- গোনা, উত্তর- পূর্বদিকে টিলা এবং সেখানে স্বচ্ছ পানির স্রোতধারা সবমিলিয়ে চোখ – জুড়িয়ে যেত।
লেখা-পড়ার শান্ত পরিবেশ ও মেধাবী ছাত্রদের পদচারনায় মুখরিত প্রতিটি ছাত্রাবাস । আনন্দময় দিনগুলির কত স্মৃতি , কত কথা কিন্তু সেখানে তো ফিরে যাওয়া সত্যিই কল্পনাতীত ।
সে সময় আমার জীবনে এক দু:সহ ঘটনা ঘটে যায়। ঐ দিন রাত্রে পুলিশ আমাকেসহ আমরা তিনজনকে গ্রেফতার করে । আনুমানিক রাত সাড়ে দশটা কিংবা এগারোটা হবে । আমার সাথে ছিলেন আমারই সহপাঠি পদার্থবিদ্যা বিভাগের ছাত্র মোকাম্মেল হোসেন রিপন(বর্তমানে একটি কলেজে শিক্ষকতা করেছেন) এবং স্নেহের ছোট ভাই দ্বাদশ – বিজ্ঞানের ছাত্র ইকবাল আহমদ ( সিকৃবি থেকে ডিভিএম পাশ করে বর্তমানে সরকারী চাকুরীতে আছেন ,বিসিএস- ক্যাডারভুক্ত কর্মকর্তা)।
রিপন ভাই ৪র্থ ছাত্রাবাসে থাকতেন যেটাকে পূর্বাঞ্চলীয় ছাত্রাবাস বলা হয়।আর ইকবাল আমারই হলের আমার পাশের কক্ষের বাসিন্দা। আমি ১০৯ নং কক্ষে, আর সে থাকত ১০৮ নং কক্ষে।
২৮ শে ডিসেম্বর ১৯৯৮ দুপুরে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (তৎকালীন সরকারী ভেটেরিনারী কলেজ ) দু’ দল ছাত্রদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এরই জের ধরে রাত্রে এম.সি. কলেজের ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও আমরা গ্রেফতার হই।
গ্রেফতারের পর আমাদের কোতোয়ালী থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। কিছুক্ষন পর এস.পি সাহেব আসলেন। আমাদের কে তৎকালীন এস.পি সাহেব অনেক কথা বললেন। নামটা মনে নেই। খুবই ভালো একজন সরকারী কর্মকর্তা । পুলিশ বাহিনীতে এ ধরনের কর্মকর্তা বিরল। তারঁ আচরনে আমরা মুগ্ধ হয়েছি , প্রীত হয়েছি ।তিনি এম.সি কলেজের অনেক সুনাম করলেন এবং আমরা মেধাবী ছাত্র একথা স্বীকৃতি দিতে দ্বিধাবোধ করলেন না।
যাই হোক -মামলা হলো। ষড়যন্ত্রমুলক ও অন্যায়ভাবে আমাদেরকে তিন- তিনটি মামলায় অভিযুক্ত করা হলো। এ জীবনে কাউকে ফুল দিয়ে আঘাত করেছি-এটাও আমার জানা নেই । বরঞ্চ আঘাত প্রাপ্ত হয়েছি , নিষ্পেষিত হয়েছি। তারপর ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।
কোরআনে আল্লাহ বলেছেন :مَا أَصَابَ مِنْ مُصِيبَةٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ وَمَنْ يُؤْمِنْ بِاللَّهِ يَهْدِ قَلْبَهُ “আল্লাহর হুকুম ছাড়া কোন বিপদ আসে না। আর যে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে তিনি তাঁর অন্তরকে সঠিক পথের সন্ধান দেন।” (সূরা তাগাবুনঃ ১১)..মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেন: “তুমি বলে দাও ! আল্লাহ আমাদের জন্যে যা নির্ধারন করে (লিখে) দিয়েছেন তা ছাড়া অন্য কোন বিপদ আমাদের উপর আসতে পারে না, তিনিই কর্ম বিধায়ক আর সকল মুমিনেরই কর্তব্য হলো যে তারা যেন নিজেদের যাবতীয় কাজে আল্লাহর উপর নির্ভর করে (তাওবাহ-৫১)।
আমার গভীরভাবে মনে পড়েছে সিলেটের সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব শ্রমিক অঙ্গনের অন্যতম নেতা , মেট্রোপলিটন হাসপাতালের চেয়ারম্যান শ্রদ্ধেয় হাফিজ আব্দুল হাই হারুন সাহেব কে যিনি অত্যন্ত কষ্ট করে প্রচন্ড ঠান্ডা উপেক্ষা করে শেষ রাত্রে আমাদেরকে থানা হাজতে সেহরীর খাবার নিয়ে গিয়েছিলেন । তারঁ এ অপরিসীম ত্যাগ ভুলার মতো নয়। থানা হাজত খুবই কষ্টকর স্থান। যেখানে বসার মতো পর্যাপ্ত জায়গা থাকে না । এর মধ্যে সংযুক্ত টয়লেটে খুবই দুর্গন্ধ। নানা মনের নানা জাতের মানুষ একই কক্ষে গাদাগাদি করে থাকতে হয়। সেদিন রাত্রে সেখানে আমাদের শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল। মনে হয়েছিল এই বুুঝি প্রাণ বায়ু বের হয়ে যাবে ।সুস্থ মানুষ অসুস্থ হতে সময় লাগে না।
যথারীতি ২৯/১২/৯৮ তারিখে আদালতে আমাদেরকে হাজির করা হলো । বাংলাদেশের সংবিধানে উল্লেখ আছে গ্রেফতারকৃত কোন ব্যক্তিকে ২৪ ঘন্টার মধ্যেই নিকটতম ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে । পুলিশ কাল বিলম্ব না করে সদর হাকিম আদালতে আমাদেরকে উপস্থাপন করলো। কিন্তু , বিধি- বাম, সে দিন বিজ্ঞ ১ম শ্রেনীর হাকিম জামিন না- মঞ্জুর করে আমাদের কে জেলে প্রেরনের আদেশ দিলেন।
আমার মনে পড়েছে জেলে প্রবেশের দিন আর জেল থেকে মুক্তির দিন আমাদের মাগরিবের নামাজ ক্বাজা হয়েছিল। বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষ করে কারাগার নামক লাল দালানের অন্ধ প্রকোষ্টে প্রবেশও করতে হয় বেরও হতে হয়। জেল সম্পর্কে যাদের ন্যূনত্যম অভিজ্ঞতা আছে । তারাঁ তা ভাল করে অবগত আছেন । সেই ব্রিটিশ প্রবর্তিত নিয়ম- কানুন থেকে আমরা স্বাধীন হয়েও মুক্ত হতে পারেনি শতভাগ । ঠিক সন্ধ্যার পূর্ব মুহুর্তে আমাদের কে আদালতের হাজত খানা থেকে প্রিজন ভ্যানে করে জেলে নিয়ে যাওয়া হলো ।
জেলে আমরা প্রবেশ করলাম । আমাদের কে আমদানী ওয়ার্ডে রাখা হলো । আমরা তখনও জেলখানার সম্বলগুলি ( থালা , বাটি , কম্বল ) পাইনি । ছাত্র জেনে সে ওয়ার্ডের বাসিন্দারা যথেষ্ট সহযোগিতা করলো আমরা তিনজনকে ।কোনরকম শীতের দীর্ঘ রাত্রি সেদিন চিন্তিত মনে পাড়ি দিলাম।
লেখক:নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আলোকিত সিলেট।
সহ সভাপতি, সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব।
