অভিজিত রায়কে হত্যা করা হয়নি : হত্যা করা হয়েছে মানব সম্প্রদায়কে: সৈয়দ মবনু

by News Room

কে বা কারা অভিজিত রায়কে হত্যা করেছে। কে অভিজিত, কি তার পরিচয়? এপ্রশ্নের উত্তরে আমি বলবোÑঅভিজিত একজন মানুষের ছেলে ছিল, একজন মানুষের ভাই ছিল, একজন মানুষের স্বামী ছিল, সে একজন মানুষ ছিল। মানুষ হত্যা মহাপাপ সর্বধর্ম বলে। ইসলামের মহান বাণী, যে একজন মানুষকে হত্যা করলো সে মূলত গোটা মানব সম্প্রদায়কে হত্যা করলো। অভিজিতের অপরাধ, সে ভাবতো এবং বলতো তার নিজের মতো করে। তার ভাবনা এবং বলা হয়তো শুদ্ধÑহয়তো ভুল। হয়তো তার ভাবনা ও বলার সাথে আমার সহমত আছে বা নেই। কিন্তু তাকে এভাবে হত্যা করতে হবে কেন ? মানুষ যখন তার দ্বিমতের জায়গায় নিজের মতো করে বলতে ব্যর্থ  হয়ে ুব্ধ হয়ে উঠে তখনই সে বিবেক-বুদ্ধি হারিয়ে ফেলে। আর তা হয় সাধারণত মূর্খতা বশত। অভিজিত রায়-এর ধর্মবিশ্বাসের সাথে আমাদের দ্বিমত আছে, কিন্তু তাকে হত্যা করা হবে কেন? বিষয়টাকে সরকারের প থেকে গুরুত্ব দিয়ে আমলে নিতে হবে।

অভিজিত রায় একজন লেখক ছিলেন। লেখকরা বড়ই অসহায় হয়ে থাকেন। আর যদি তিনি হন বাঙালী লেখক, তবে তো আর কোন দাম নেই। এভাবে বইমেলা থেকে যাওয়ার পথে লেখক হুমায়ূন আজাদকে কে বা কারা হত্যা করেছিল! সেই হত্যাকারিকে যদি গ্রেফতার করে শাস্তি নিশ্চিত করা হতো তবে আজ আর অভিজিত রায়কে প্রাণ হয়তো দিতে হত না। কে হত্যা করেছে অভিজিত রায়কেÑ কে হত্যা করেছে হুমায়ূন আজাদকে তা তদন্ত করে বের করার দায়িত্ব সরকারের। কারো কারো অভিযোগ ইসলামপন্থীদের কেউ কেউ একাজ করতে পারে। মূর্খতা ইসলামে নেই। ইসলামে যুদ্ধেরও একটা নীতি আছে। ইসলাম কখনও এমন হত্যা এবং অপকর্ম সমর্থন করে না। কেউ যদি আবেগ বশত তা করে থাকেন তাকে অবশ্যই হত্যার দায়ে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। ইসলামের নীতি হচ্ছেÑতোমরা মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দাও কৌশলে এবং ভাল ব্যবহারের মাধ্যমে। (আল-কোরআন)। চাকুÑদা দিয়ে গোপনে নিরিহ একজন মানুষকে এভাবে বিচারহীন পথে হত্যা করা ইসলাম কখনও সমর্থন করে না।

অনেকে বলছেনÑ অভিজিত রায় নাস্তিক ছিল। যারা এই অভিযোগ করছেন তারা মূলত নাস্তিকতার অর্থই বুঝেন না এবং নাস্তিকদের সম্পর্কে ইসলামের বিধান কি তা তারা জানেন না। নাস্তিক বা মুরতাদদের যে শাস্তির বিধান ইসলামে রয়েছে তা হবে আদালতের রায়ের মাধ্যমে। আপনি ব্যক্তিগতভাবে যাকে নাস্তিক মনে করছেন ইসলামি আদালতে সে নাস্তিক নাও হতে পারে। আমি আমার ‘দয়াদর্শন’ বইতে নাস্তিকতা সম্পর্কিত আলোচনায় বলেছিÑ বেশির ভাগ েেত্র নাস্তিকতার তহমত লাগানো হয় প্রতিপকে থামানোর জন্য। মানুষ যখন বিশাল পরিসরে দাঁড়িয়ে থাকতে ব্যর্থ হয় যোগ্যতার অভাবে তখন সে ুদ্র পরিসর তৈরি করে। নাস্তিকতার তহমত তেমনি একটি ুদ্র পরিসর। চার্বাকদেরকে বুদ্ধের অনুসারীরা নাস্তিক মনে করতো, আবার বুদ্ধের অনুসারীদেরকে আর্যরা নাস্তিক মনে করতো। অথচ বাস্তবে তারা কেউ নাস্তিক ছিলেন না। বাংলাদেশে অনেক বুদ্ধিজীবিকে অনেকে নাস্তিক বলেছেন, ওদের অনেকের সাথে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক থেকে আমি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি ওরা মোটেও নাস্তিক নয়। নাস্তিকতা এক জিনিষ আর কোন ইসলামী দলের বিরুদ্ধে কথা বলা অন্য জিনিষ। বাংলাদেশের রাজনীতিতে একাত্তরের পর এই বিষয়টি খুব বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে যখনই একাত্তরের রাজাকার, আল-বদর এবং মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গ আলোচনায় আসে তখন নাস্তিকÑআস্তিকের আলোচনা বেশি করে চর্চিত হয়। আমি আমার ‘দ্রাবিড় বাংলার রাজনীতি’ বইতে এ প্রসঙ্গেও কারনে বলেছিÑএখানে দুটি বিশেষ দল বিশেষভাবে কাজ করেন। ওদের একদল ঐ ইসলামপন্থী দল যারা একাত্তরে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে সরাসরি মাঠে কাজ করেছেন। তারা বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামীলীগকে নাস্তিক প্রমাণ করতে চেষ্টা করেন তাদের একাত্তরের অপকর্মকে সঠিক প্রমাণের জন্য। আরেকদল বামপন্থী, যারা কিছু ইসলামী দলের একাত্তরের ভূমিকাকে সামনে এনে এদেশ থেকে ইসলামকে চিরবিদায়ের স্বপ্ন দেখেন। ওরা উভয়ই দলান্ধ এবং ওদের চিন্তা চেতনার সাথে এদেশের মাটি ও মানুষের কোন সম্পর্ক নেই।
আমি যদি এখানে ড. আহমদ শরিফের কথা বলি অনেক হয়তো চমকে উঠেবেন। এদেশের অনেকে তাঁর লেখা পূর্ণাঙ্গ না পড়ে তাঁকে নাস্তিক ইত্যাদি বলে গালাগালি করেন। অথচ এই মানুষটা অজীবন বাঙালী মুসলমানদের জাগরণে আর অধিকার নিয়ে অত্যন্ত কঠিন পথে হেটেছেন। ড. আহমদ শরিফের ঋণ বাঙালী মুসলমানেরা জীবনেও পরিশোধ করতে পারবেন না। ড. হুময়ূন আজাদ, তাঁর সময়ের বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে অত্যন্ত দেশপ্রেমিক এবং সৎ একজন মানুষ ছিলেন। তাঁর গরম কথা এখানের বামÑডান বিড়ালের জন্য গরম ভাতের মতো ছিল। তাঁর বিরুদ্ধে ইসলামপন্থীরা যতটুকু ছিলেন, তা থেকে বেশি ছিলেন এদেশের সুবিধাভোগী বাম বুদ্ধিজীবীরা। ড. আজাদ কোনদিন কোন এম্ভেসিতে টাকার জন্য দালালি করতে যাননি, তিনি কোন এনজিও-এর টাকা খেয়ে দালালি করেননি। তিনি কোনদিন বিবেকÑবুদ্ধি বিক্রির চিন্তা পর্যন্ত করেন নি। তিনি এক্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে বই লিখেছেন, সে বইতে তিনি পাকিস্তানের সরকার ও দালালদের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। এটাই তার মূল অপরাধ। বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। বুঝতে হবে পাকিস্তান মানে ইসলাম নয়। পাকিস্তানেও মুফতি মাহমুদের মতো অনেক আলেম একাত্তরে শেখ মুজিব ও বাঙালীর পে ছিলেন।

শেষকথা, বাংলাদেশ হাজার হাজার বছর থেকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিপূর্ণ দয়াদর্শনের একটি দেশ। এদেশের মূল ঐতিহ্যকে রা করতে আমাদের সবাইকে জ্ঞান, বুদ্ধি, কর্ম এবং প্রেমের ভিত্তিতে জীবন ও সমাজ গড়তে হবে। আমরা  অভিজিত রায় হত্যার নিন্দা করি, আমি এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবী করি। আমরা চাই সরকার ও দেশের জনগণ অভিজিত রায়-এর স্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে তাঁকে মানসিক শান্তিদানের চেষ্টা করুক। আমরা চাই একটি দয়াময় সমৃদ্ধ শান্তির বাংলাদেশ।

You may also like

Leave a Comment