গোলজার আহমদ হেলাল : হযরত উমর (রাঃ) এর রাজ্যশাসন ও জনহিতকর উন্নয়নমুলক কর্মকান্ড:০৪(চার)
মহানবী (সাঃ) মদীনায় যে রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করেন তা কালক্রমেই বিস্তৃতি লাভ করতে থাকে।মদীনায় মদীনা সনদের মাধ্যমে যে নাগরিক অধিকারভিত্তিক জনকল্যাণমুলক রাষ্ট্র প্রতিষ্টা করেছিলেন তা ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্র।এ রাষ্ট্র ছিল গণঅধিকার সম্পন্ন ও জনমতভিত্তিক জনসেবকধর্মী রাষ্ট্র ব্যবস্থা।এ ধরনের রাষ্ট্রের সহিত দুনিয়াবাসী একাধিক কিংবা বহুবার পরিচিত হতে পারে নি।
মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে রাসুলে করীম (সাঃ) এ বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করেছিলেন।বিদায় হজ্জ্বের ভাষণে তিনি জীবন ব্যবস্থার পুর্ণাঙ্গ রুপ ও এর নির্দেশনার বিভিন্ন দিক সমুহ সবিস্তারে তুলে ধরেছেন।মহানবী(সাঃ) এর উত্তরসূরী খলিফাগণ এর ধারাবাহিকতা বজায় রেখে জনসমাজের উপযোগী রাষ্ট ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা ও বিস্তৃতির জন্য প্রাণপণ সংগ্রাম করে গেছেন।
আদর্শভিত্তিক এ ধরনের রাষ্ট্রের প্রাথমিক উদ্বোধন থেকে শুরু করে এর বিকাশ পর্যন্ত সবকিছু মানবেতিহাসের বিস্ময়কর ব্যক্তিত্ব হযরত মুহাম্মদ(সাঃ)বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে গেছেন।আল কুরআনে আর কোনো নবীর জীবনেতিহাসে এ রকম রাষ্ট্র ব্যবস্থার পুর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না।তবে ওল্ড টেস্টামেন্টে হযরত ঈসা(আঃ)এর তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার কিঞ্চিৎ রুপ পাওয়া যায়।
নবুয়তের ক্রম ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্র ব্যবস্থা অর্থাৎ খেলাফত বা হুকুমতের বুনিয়াদ শুরু হয় হযরত আবু বকর সিদ্দীক(রাঃ)এর যুগ হতে।কিন্তু সুশৃংখল রাজ্য শাসনের যুগ শুরু হয় প্রকৃতপক্ষে হযরত উমর(রাঃ)এর যামানা হতেই।আবু বকর (রাঃ)এর সময় ধর্মত্যাগীদের দমনসহ বিরাট বিরাট কাজ সমাধা হয়ে চারিদিকে বিজয়ের পালা শুরু হয়।কিন্তু রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিশেষ কোন সুশৃংখল নিয়ম-পদ্ধতি ছিল না।পরন্তু আবু বকর(রাঃ)এর সীমিত ও সীমাবদ্ধ সময়ের শাসনকাল এই বিরাট কাজের জন্য যথেষ্ঠ ছিল না।
হযরত ওমর(রাঃ) রাজ্য জয়ে এমন সাফল্য অর্জন করেন যে,পারস্য ও রোম সম্রাটের বিস্তৃত সাম্রাজ্য তাঁর খেলাফতের অন্তর্ভুক্ত করে নেন।অপরদিকে তিনি খেলাফত বা রাষ্ট্র ব্যবস্থায় পূর্ণ শৃংখলা বিধানও করেন এবং আধুনিক রাষ্ট্রের সকল দিক ও বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন।
হযরত ওমর(রাঃ)এর রাষ্ট্র ব্যবস্থা কি রুপ ছিল তা পূর্বের কিস্তিতে আলোচনা করা হয়েছে।অর্থাৎ ওমরের খেলাফত কি গণতান্ত্রিক ছিল না একনায়কতান্ত্রিক ছিল?তখনকার আরবের তমদ্দুন ও সভ্যতা যে স্তরে ছিল তাতে এ খেলাফতকে পুর্ণ গণতান্ত্রিক বা রাজতান্ত্রিক কোনটাই বলা চলে না।মুলত তখনকার শাসনতন্ত্র ,গণতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্র এতদুভয়ের মধ্যে কোনটা নিকটতম ছিল ,শুধু এটুকুই বিচার করা যথেষ্ঠ হবে।অর্থাৎ ওমর ফারুকের খেলাফতে জনগণের মতামত বেশী স্বীকৃত হত না ব্যক্তি বিশেষের?শাসনব্যবস্থায় জনগণের ক্ষমতা যত বেশী হবে ,তার মধ্যে গণতন্ত্রের বিকাশলাভ ততই বেশী হবে।ক্ষমতাসীন ব্যক্তিবর্গের সমস্ত ব্যক্তিগত অধিকার খর্ব হলে তাদের নির্বাহী ক্ষমতাবান একজন,সাধারণ সদস্যের স্তরে নেমে আসাই হলো গণতন্ত্রের বিকাশ ও চরম উৎকর্ষতা।একনায়কত্ব শাসন ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের সকল অধিকার থাকে ব্যক্তিবিশেষের হাতে।ফলে গুটি কয়েক রাজকর্মচারী সকল ক্ষমতার মালিক হয়ে যায়।তারা ব্যতীত অন্য কারো কাছে রাষ্ট্র বা জাতীয় কাজে কোনো হাত থাকে না।ক্ষমতাসীনদের মধ্যে কোন ব্যক্তিগত স্বার্থ ব্যতীত বৃহত্তর কোনো জাতীয় স্বার্থের চিন্তা বিকাশ লাভ করতে পারে না।এটা ছিল রাজতন্ত্রের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি।
কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এর বিপরীত।তদ্রুপ কোনো রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা মধ্যে যদি রাজতন্ত্র বা গণতন্ত্রের বিচার করতে হয়,তবে তা ঐ শাসনব্যবস্থার ফলাফল দ্বারাও নির্ধারণ করা যেতে পারে।আরবগণ মোটেই গণতান্ত্রিক মনোবৃত্তি ছিল না।সুতরাং আরব ভুখণ্ডে প্রতিষ্ঠিত যে কোন রাষ্ট্রই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হবে এমন মনে করার কোনো কারণ নেই।
আরবে দীর্ঘদিন থেকে কতিপয় রাষ্ট্রে রাজতন্ত্র প্রচলিত ছিল।আবার সেখানে গোত্রপতি নির্বাচিত হতেন গণতান্ত্রিক কায়দায়।কিন্তু তাদের হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দেয়া হত না।বড়জোর বিচারক বা সেনাপতি পদ দেয়া হত।আবু বকরের খেলাফতেও এই সমস্যার কোনো সুষঠু সমাধান আমরা খুঁজে পাই না।কেননা তাঁর নির্বাচন প্রত্যক্ষ জনমত নির্ভর হলেও তা নেহায়েত সামষ্ঠিক ও তাড়াহুড়ার ব্যাপার ছিল।তবে হযরত ওমর বলেছেন ,কেউ যেন মনে না করে আবু বকরের খেলাফতের দীক্ষাগ্রহণ আকস্মিক ভাবে হয়েছে।প্রাথমিক অবস্থায় কিছু সমস্যা হলেও উত্তরকালে আল্লাহপাক সব বাঁধা বিপত্তি দুর করে দেন।
হযরত ওমর ফারুক(রাঃ)এর সময় চারিপাশে যে সকল সাম্রাজ্য ছিল সেগুলোকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলা চলে না।তদনান্তীন ইরানে তো কোন দিন গণতান্ত্রিক রুচির উদ্ভবই হয়নি।অবশ্য রোমান সাম্রাজ্যে কোনোকালে একবার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল।কিন্তু ওমরের শাসনামলের বহু আগেই সে প্রথা লোপ পেয়ে যায়।সেখানে প্রতিষ্ঠা লাভ করে রাজতন্ত্র।ওমরের শাসনামলে সেখানে স্বেচ্ছারিতা বিরাজ করত।
মোটকথা হযরত ওমর(রাঃ)কোনোরুপ নমুনা বা নজির ব্যতিরেকেই পুর্ণ গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করেন।প্রতিষ্ঠা করেন গণ অধিকারভিত্তিক জনকল্যাণমুলক রাষ্ট্র ব্যবস্থা।তাঁর আমলেই বর্তমান যুগের চাহিদা অনুযায়ী গণতন্ত্রের যাবতীয় কায়দা-কানুন,গণতন্ত্রের মৌলিকত্ব এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সকল সেক্টরের বিকাশ লাভ করেছে ,এতে সন্দেহের অবকাশ নেই।
লেখক:সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
