The Challenge of Leadership(নেতৃত্বের চ্যালেন্জ) Episode 2-পর্ব ২(৩)

by News Room

গোলজার আহমদ হেলাল : হযরত উমর (রাঃ) এর রাজ্যশাসন ও জনহিতকর উন্নয়নমুলক কর্মকান্ড:০৩(তিন)

প্রকৃত অর্থে খলিফা উমর(রাঃ) তাঁর শাসনামলে বিশ্ববাসীকে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র উপহার দিয়েছিলেন।এটি ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে সেরা জনকল্যাণমুলক রাষ্ট্র।দরিদ্রদের কাছাকাছি থাকার জন্য উমর নিজে সাধারণ জীবনযাপন করতেন। তাঁর বাড়ি ছিল মাটির তৈরি এবং তিনি প্রতি সন্ধ্যায় জনগণের অবস্থা পরিদর্শনের জন্য রাস্তায় বের হতেন।হযরত উমর(রাঃ)জনগণকে সমালোচনার অবাধ অধিকার প্রদান করেছিলেন।ফলে একজন সাধারণ নাগরিকও খলিফার সমালোচনা করতে বিন্দুমাত্র পরোয়া করত না।নারী-পুরুষের অধিকার ও সমতা প্রতিষ্ঠায় তিনি অগ্রণী ভুমিকা রেখেছেন।স্ত্রীর মোহরানা নির্ধারণের বিষয়ে খলিফার মতের প্রতিবাদ করে একজন স্ত্রীলোক বিশ্বজয়ী খলিফাকে আল্লাহকে ভয় করার পরামর্শ দেন।খলিফা তাঁর ভূল বুঝতে পেরে তা পরিহার করেন এবং কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক মহিলাটির মত অকুন্ঠচিত্তে মেনে নেন।হযরত উমরের খিলাফতের অভূতপূর্ব সাফল্যের মুলে এ ধরনের ইনসাফ ও ন্যায়নীতি কার্যকর রয়েছে।

হযরত ওমর শাসক নিয়োগের সময় তিনি তাদের সম্পদ তালিকা তৈরী করিয়া লইতেন।উত্তরকালে কারো ধন-সম্পদে অস্বাভাবিকতা পাইলে পুর্বের হিসাবের সাথে মিলাতেন।এবং সম্পত্তি ক্রোক করিতেন।শাসকদের দরজা জনগণের জন্য উন্মুক্ত রাখার বিশেষ তাকীদ দিতেন।জনগণের ফরিয়াদ শাসকের কর্ণকুহরে প্রবেশের পথে কোথাও বিন্দুমাত্র বাঁধার সৃষ্ঠি হলে তা খলিফা দুর করতেন।সরকারী কর্মচারীদের দৈনন্দিন কর্মপালনে সব সময় নির্দেশ দিতেন।খলিফাতুল মুসলিমীন এক পর্যায়ে আবু মুশা আশয়ারী (রাঃ)কে যে উপদেশ লিখিয়া পাঠিয়েছিলেন তা সর্বকালের সর্বদেশের সরকারী কর্মচারীদের জন্য মহামূল্য দিক-নির্দেশনারুপে গণ্য হবে।তিনি লিখেছিলেন-‘অতঃপর জানিবে, সুষ্ঠু কর্মপন্থা এই যে,অদ্যকার কাজ আগামীকালের জন্য ফেলিয়া রাখিবে না।এইরুপ করিলে তোমাদের নিকট অনেক কাজ জমিয়া যাইবে।ফলে কাজের চাপে তুমি দিশাহারা হইয়া পড়িবে।কি করিবে,কোনটা করিবে,কোনটা করিবে না ,তাহার দিশা পাইবে না।পরিণামে সব কাজই তোমার বিনষ্ঠ করিয়া ফেলিবে।’

আমরা এখন যে জামায়াতের সাথে তারাবীহ নামাজ আদায় করি এটা খলিফা ওমর প্রচলন করেন।হিজরী সন তাঁর আমলেই গণণা শুরু হয়।তিনিই সেনাবাহিনীর ভেতর বিভিন্ন ব্যাটালিয়ানে স্তরভেদ নির্দিষ্ঠ করেন।দেশের নাগরিক তালিকা তৈরী করেন।কাজী নিয়োগ দেন।রাষ্ট্রের শাসনকাজে সুবিধার জন্য বিভিন্ন অঞ্চলকে প্রদেশে তিনিই বিভক্ত করেন।বহুরাজ্য জয় করেন।তাঁর আমলেই ইসলামের অভূতপূর্ব বিজয়সাধিত হয়।মিশর,সিরিয়া,ইরাক,আর্মেনিয়া,ইরান,ফিলিস্তিন,আজারবাইজান,আলজিরিয়া ও ত্রিপোলিতে এ সময়ে ইসলামের পতাকা উড্ডীন হয়।এর পূর্বে এ রকম দেশজয়ের কোন দৃষ্ঠান্ত নাই।পরেও নয়।
মুসলমানদের জীবন ছিল তাঁর নিকট সর্বাধিক প্রিয় বস্তু।তিনি সেনাপতি নিযুক্ত করতেন,সমসাময়িক সমাজে জ্ঞান ও বিচক্ষণতায় যে অগ্রসর ও মর্যাদাবান।তিনি অনেক নগর নির্মাণ করেন।জনশাসনের জন্য ছড়ি ব্যবহার করেন।আভ্যন্তরীণ জন শৃংখলার জন্য পুলিশ বিভাগ গড়ে তোলেন। বায়তুলমাল প্রতিষ্ঠা করেন।কারাগার নির্মাণ করেন।তিনি জরিপকার্য ,রাজস্ব ব্যবস্থাপনা,কৃষিব্যবস্থার আধুনিকীকরণ,সেচকার্য,খাল খনন,ব্যবসায় শুল্ক আদায়,বাজার নিয়ন্ত্রণ ও মনিটরিং,রাজপথে বাড়ী-ঘর না নির্মাণে প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার গোড়াপত্তন করেন।এছাড়া তিনি গৃহ নির্মাণ ওপূর্তবিভাগীয় কাজের সুচনা করে ব্যাপক কাজ করেন,সামরিক ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজান,গোয়েন্দা বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন।জনগণের স্বাস্থ্যসেবা,শিশু ও বয়স্ক ভাতা চালু,গরীবদের জীবিকার সংস্থান,দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সাধারণ জনকল্যাণমুলক কাজের দৃষ্ঠান্ত স্থাপন করেন।বাইতুল মাল থেকে মুসলিম ও অমুসলিম দরিদ্র, অসহায়, বৃদ্ধ, এতিম, বিধবা ও অক্ষমদেরকে সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা করেন।তিনি ধনীদের খাদ্য আংগুর ফলে বেশী ‘কর’ এবং সাধারণ ও গরীবদের খাদ্য খেজুরে কম ‘কর ‘ধার্য্য করতেন।তিনি সমগ্র এলাকায় মসজিদ নির্মাণ করেন এবং তাতে ইমাম-মুয়াজ্জিন নিযুক্ত করেন।
আমিরুল মুমেনীন হযরত ওমরের আমলে ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে।কবিতা ও সাহিত্যের উন্নতি লাভ করে।তিনি রাষ্ট্রীয় ফরমান দ্বারা অশ্লীল কবিতা রচনা বন্ধ করেন।তিনি জনগণের নৈতিক মান সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় কর্মপন্থা ও নিরপেক্ষ,সুবিচার ও পক্ষপাতহীন ইনসাফমুলক বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন।
হযরত ওমর লোকদিগকে ইসলামে দীক্ষিত করতে তরবারী কিংবা রাষ্ট্রশক্তি প্রয়োগ করেন নাই।তিনি ইসলামী জীবনাদর্শের অতুলনীয় সৌন্দর্য এবং অন্তর্নিহিত মর্মস্পর্শী ভাবধারায় মুগ্ধ ও আকৃষ্ঠ করিয়া লোকদিগকে মুসলিম বানাবার চেষ্ঠা করতেন।যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়াইয়াও শেষবারের মতো ইসলাম কবুলের আহবান জানাইতেন।তিনি ইসলাম প্রচারের জন্য মুসলমানদের শিক্ষিত করিয়া তুলিতেন।কুরআন কে গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে তাঁর প্রচেষ্ঠা সর্বজনবিদিত।তিনি ব্যাপক শিক্ষাদানের ব্যবস্থা,শিক্ষক নিয়োগ ও তাদের সম্মানজনক বেতনের ব্যবস্থা করেন।তিনি কুরআন-হাদিসের চর্চা ও তা প্রচারের কার্যকর ব্যবস্থা নেন।হাদীসের ব্যাপারে সতর্কতার সহিত কাজ করেন।তিনি ফিকাহ শাস্ত্রের ব্যাপক উন্নতি করেন।জিলার পদস্থ কর্মচারী নিয়োগে এ ব্যাপারে লক্ষ রাখিতেন।ইসলামী আইনের ব্যাপক প্রচারের জন্য ফিকাহবিদগণকে উচ্চমানের বেতনে নিযুক্ত করতেন।তাঁর আমলে জ্ঞান-বিজ্ঞানের ব্যাপক শিক্ষা ও প্রচারের ব্যবস্থা হয়।
জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা ও প্রচারের ক্ষেতে হযরত উমরের যথেষ্ঠ অবদান রয়েছে।তিনি আরবী কবিতা পঠন-পাঠন ও সংরক্ষণে গুরুত্ব দিতেন।বিশুদ্ধভাবে আরবী ভাষা শিক্ষাকে তিনি দ্বীনের অঙ্গ বলে বিশ্বাস করতেন।ওমর একজন শ্রেষ্ঠ কুস্তিগীর।তিনি যুদ্ধবিদ্ধায় সুপন্ডিত ও বংশতালিকা বিদ্যাও জানতেন।তিনি ঘোড়সওয়ার ছিলেন।তিনি একজন কাব্যপ্রেমিক।তিনি বলতেন,’তোমরা শিশুদের কবিতা শেখাও।কেননা, কবিতা উন্নত ভাষা,সুষ্ঠু মতামত প্রকাশ ও আত্মপরিচয় জাগ্রত করে তোলে।’তাঁর স্মরণশক্তি ছিল প্রবল ।তিনি ছিলেন শিক্ষিত।নবুয়তের সময় কুরাইশ বংশে ১৭জন লোক লেখাপড়া জানত।তাদের মধ্যে ওমর একজন।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

You may also like

Leave a Comment