গোলজার আহমদ হেলাল : হযরত উমর (রাঃ) এর রাজ্যশাসন ও জনহিতকর উন্নয়নমুলক কর্মকান্ড:০২(দুই)
উমরের সরকার এককেন্দ্রীক ব্যবস্থায় পরিচালিত হয়। এতে খলিফা ছিলেন সর্বোচ্চ রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ। পুরো সাম্রাজ্যকে কয়েকটি প্রদেশে বিভক্ত করা হয়। প্রদেশগুলো প্রাদেশিক গভর্নর বা ওয়ালি কর্তৃক শাসিত হত। উমর ব্যক্তিগতভাবে ওয়ালিদের নিযুক্ত করতেন। প্রদেশগুলোকে বিভিন্ন জেলায় বিভক্ত করা হত। পুরো সাম্রাজ্যে প্রায় ১০০ এর মতো জেলা ছিল। প্রতিটি জেলা বা প্রধান শহর একজন অধস্তন গভর্নর বা আমিলের দায়িত্বে থাকত। আমিলরা সাধারণত উমর কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হতেন তবে প্রাদেশিক গভর্নররাও তাদের নিয়োগ দিতে পারতেন। প্রাদেশিক স্তরে অন্যান্য অফিসাররা ছিলেন :
কাতিব, প্রধান সচিব
কাতিব উদ দিওয়ান, সামরিক সচিব
সাহিব উল খারাজ, রাজস্ব আদায়কারী
সাহিব উল আহদাস, পুলিশ প্রধান
সাহিব বাইতুল মাল, কোষাগার কর্মকর্তা
কাজি, প্রধান বিচারক
অধিকাংশ ক্ষেত্রে ওয়ালি প্রদেশের সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে কর্মরত থাকলেও কিছু প্রদেশে পৃথক সামরিক অফিসার থাকত। প্রতিটি নিয়োগ লিখিত আকারে দেওয়া হত। নিয়োগের সময় গভর্নরদের জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হত। দায়িত্বগ্রহণের পর গভর্নররা জনতাকে প্রধান মসজিদে জড়ো করে তাদের সামনে নির্দেশনা পড়ে শোনাতেন।
কর্মকর্তাদের প্রতি উমরের সাধারণ নির্দেশনা ছিল :স্মরণ রেখ, আমি তোমাকে জনগণের উপর নির্দেশদাতা ও স্বেচ্ছাচার হিসেবে নিয়োগ দিই নি। আমি তোমাকে একজন নেতা হিসেবে পাঠিয়েছি যাতে জনগণ তোমার উদাহরণ অনুসরণ করতে পারে। মুসলিমদেরকে তাদের অধিকার প্রদান কর যাতে তারা অন্যায়ে পতিত না হয়। তাদের মুখের উপর নিজেদের দরজা বন্ধ কর না যাতে ক্ষমতাশালীরা দুর্বলদের ধ্বংস করতে না পারে। এবং নিজেকে তাদের চেয়ে উচ্চ মনে হয় এমন কোনো আচরণ কর না যা তাদের প্রতি স্বৈরাচারী শাসকরা করে থাকে।
এছাড়াও আরো কিছু বিধিনিষেধ গভর্নর ও রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের উপর জারি করা হয়। প্রধান কর্মকর্তাদেরকে হজ্জের সময় মক্কায় আসতে হত এবং এসময় জনগণ তাদের বিরুদ্ধে যে কোনো অভিযোগ তুলতে পারত। দুর্নীতি রোধ করার জন্য উমর তার কর্মকর্তাদের উচ্চ বেতন দিতেন। নিজ অঞ্চলে সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ প্রধান থাকাবস্থায় গণিমতের সম্পদ ছাড়াও গভর্নররা বার্ষিক পাঁচ থেকে সাতহাজার দিরহাম করে পেতেন।
উমরের অধীনে সাম্রাজ্যকে নিম্নোক্ত প্রদেশে বিভক্ত করা হয় :আরবকে মক্কা ও মদিনা প্রদেশে বিভক্ত করা হয়,ইরাককে বসরা ও কুফা প্রদেশে বিভক্ত করা হয়,টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর উচ্চ অংশে আল-জাজিরা প্রদেশ ছিল,সিরিয়া ছিল একটি প্রদেশ,ফিলিস্তিনকে ইলিয়া ও রামলাহ প্রদেশে বিভক্ত করা হয়,মিশরকে উচ্চ মিশর ও নিম্ন মিশর প্রদেশে বিভক্ত করা হয়,পারস্যকে খোরাসান, আজারবাইজান ও ফারস প্রদেশে বিভক্ত করা হয়।রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের জন্য উমর সর্বপ্রথম বিশেষ বিভাগ গঠন করেন। এই বিভাগ প্রশাসনিক আদালত হিসেবে কাজ করত এবং এর আইনি কর্মকাণ্ড উমর ব্যক্তিগতভাবে তদারক করতেন।এই বিভাগ মুহাম্মদ ইবনে মাসলামার দায়িত্বে দেওয়া হয়। গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রে তিনি ঘটনাস্থল, অভিযোগ তদন্ত ও পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে উমরের সহায়তা করতেন। কিছু ক্ষেত্রে অনুসদ্ধান কমিটির সাথে তদন্তের বিষয়ে আলোচনা করা হত। ক্ষেত্রবিশেষে অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে মদিনায় তলব করে আদালতের সম্মুখীন করা হত। উমর তার গোয়েন্দা বিভাগের সহায়তায় কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনেন।
কিছু ক্ষেত্রে উমর পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেছেন :
উমর সর্বপ্রথম পাবলিক মিনিস্ট্রি প্রথা চালু করেন যেখানে সরকারি কর্মকর্তা ও সৈনিকদের রেকর্ড লিপিবদ্ধ করা থাকত। গভর্নর ও রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে পাঠানো চিঠির অনুলিপিও রেকর্ড হিসেবে রক্ষিত থাকত।আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য তিনি প্রথম পুলিশ বাহিনী নিয়োগ দেন।জনতা বিশৃংখল পরিস্থিতির সৃষ্টি করলে তিনি প্রথম তাদের শৃঙ্খলায় আনেন।
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.)-এর মহান চরিত্রের বিশ্লেষণ আমাদের শাসকবর্গের জন্য পথপ্রদর্শক। অধ্যাপক সুইর বলেন, ‘সরলতা ও কর্তব্যনিষ্ঠা ছিল তার মুখ্য নীতি।’ সরল জীবনযাপনে যে নজির তিনি সৃষ্টি করে গেছেন, তাকে আজও কেউ অতিক্রম করতে পারেনি। পরণে থাকতো অত্যন্ত কম দামি কাপড়।, শরীরে থাকতো তালিযুক্ত জামা। পারস্য যোদ্ধা হরমুজ বন্দিবেশে মদীনায় এসে মদীনার মসজিদে যেভাবে খলিফাকে দেখলেন, তাতে তার দিব্যজ্ঞান লাভ হয়েছিল। হরমুজ প্রকাশ করেছিলেন ‘জগৎ তোমার নিকট হার মানবে, যেহেতু জগতের সকল আশা-আকাঙ্ক্ষা, কামনা-বাসনা তোমার নিকট হার মেনেছে।’ অধ্যাপক থিট্ট বলেন, ‘হযরত ওমরের জীবনচরিত্র রচনার জন্য অতি অল্প কথার প্রয়োজন। তার জীবনের আদর্শ ছিল সরলতা ও কর্তব্যজ্ঞান, তাঁর শাসনের মূলনীতি ছিল ন্যায়পরায়ণতা ও একাগ্রতা।প্রজাবৎসল ওমর (রা.) সুখে ও দুঃখে রাত্রির অন্ধকারে ঘুরে বেড়াতেন প্রজাদের অবস্থা নিজ চোখে দেখার জন্য। একবার রাত্রিকালে নিজের গোলাম আসলামকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে মদীনার উপকণ্ঠে একটি তাঁবুর কাছে কয়েকটি শিশুর ক্রন্দন শুনতে পেয়ে তাঁবুর কাছে গেলেন এবং তাদের এখানে আসার কারণ জিজ্ঞাসা করলে জনৈক স্ত্রীলোক তাদের অভাবের কথা জানিয়ে খলিফার বিরুদ্ধে অভিযোগ করলো যখন ওমর (রা.) বললেন, খলিফা তোমাদের অভাবের কথা কিভাবে জানবেন। স্ত্রীলোকটি তখন বললো, ‘এ কেমন কথা! তিনি আমাদের খলিফা অথচ আমাদের খবর জানবেন না।’ তা শুনে শিশুদের কান্নার কারণ এবং পাশেই আগুনের ওপর রাখা হাঁড়িতে কি রান্না হচ্ছে জিজ্ঞাসা করাতে স্ত্রীলোকটি জবাব দিল, ‘বাচ্চারা ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাঁদছে এবং তাদের সান্ত্বনার জন্য হাঁড়িতে পানি গরম করা হচ্ছে।’ একথা শোনামাত্রই খলিফা দ্রুতগতিতে মদীনায় ফিরে বায়তুলমাল থেকে কিছু আটা, চর্বি ইত্যাদি একটি বস্তায় পুরে নিজের কাঁধে বহন করে দ্রুত গতিতে, তাঁবুর কাছে ছুটে এলেন। গোলাম আসলাম বস্তাটি বইতে চাইলে ওমর (রা.) বললেন, ‘আখেরাতে আমার হিসাব আমাকেই দিতে হবে। তাই বস্তাটা আমিই বহন করি।’ তাঁবুর কাছে গিয়ে স্বহস্তে আগুন জ্বালিয়ে খাবার তৈরি করে শিশুদের খাওয়ালেন। অবশিষ্ট খাদ্য স্ত্রীলোকটির হাতে তুলে দিলেন। শিশুরা খাওয়া সেরে খুশিতে খেলতে লাগলো। স্ত্রীলোকটি এই ব্যবহারে সন্তুষ্ট হয়ে বললো, ‘হযরত ওমরের পরিবর্তে তুমিই খলিফা হওয়ার অধিক উপযুক্ত, আল্লাহর দরবারে আমাদের ও খলিফার বিচার হবে।’ হযরত ওমর (রা.) সান্ত্বনা দিয়ে স্ত্রীলোকটিকে বললেন, ‘তুমি যখন খলিফার দরবারে যাবে তখন আমাকেও সেখানে পাবে।’ এই বলে খানিক দূরে গিয়ে কিছুক্ষণের জন্য অবস্থান করে গোলাম আসলামকে বললেন, ‘‘আমি শিশুগুলোকে ক্ষুধার জ্বালায় কাঁদতে দেখেছি, এখন হাঁসতে দেখার জন্য কিছুক্ষণ বসলাম।’
আরেকবার রাতের বেলা চলতে চলতে রাজধানীর বাইরে তাঁবুতে একটি লোক বিষণ্ণ অবস্থায় বসা এবং ভিতরে একটি মেয়েলোকের কাতরানোর শব্দ শুনতে পেয়ে কারণ জিজ্ঞাসা করলে লোকটি ধমকের সুরে বললো, ‘যাও যাও, নিজের কাজে যাও। আমাকে জ্বালাতন করো না।’ হযরত ওমর (রা.) পীড়াপীড়ি করাতে লোকটি বললো, তার স্ত্রী ব্যথায় কাতরাচ্ছে। ওমর (রা.) জিজ্ঞাসা করলেন, ‘সাথে কোন স্ত্রীলোক আছে কি?’ উত্তরে লোকটি বললো, ‘নেই।’ হযরত ওমর (রা.) দ্রুত নিজের ঘরে গিয়ে বিবিকে বললেন, আজ পূর্ণ অর্জনে এক বিরাট সুযোগ আল্লাহ দিয়েছেন। একটি অচেনা মেয়েলোক প্রসব বেদায় কাতরাচ্ছে, প্রয়োজনীয় কাপড়-চোপড় নাও এবং আমি কিছু খাবার নিচ্ছি।’ এই বলে উভয়ে খুব তাড়াতাড়ি সেই তাঁবুর কাছে পৌঁছে বিবিকে তাঁবুর ভিতর পাঠিয়ে দিলেন এবং নিজে খাবার তৈরি করতে বসে গেলেন। কিছুক্ষণ পর তাঁবুর ভিতর থেকে আওয়াজ এলো, ‘‘আমিরুল মোমেনিন, আপনার বন্ধুকে পুত্র সন্তান হওয়ার সুখবর দিন।’ আমিরুল মোমেনিন শব্দ শুনতেই লোকটি ঘাবড়ে গেল। হযরত ওমর (রা.) তাকে সান্ত্বনা দিলেন। প্রস্তুত খাবার প্রসূতিকে খাইয়ে বাকি খাবার তাদের হাতে দিয়ে বিবিকে নিয়ে চলে এলেন।
হযরত ওমর (রা.) খলিফার দায়িত্ব নেয়ার পর প্রায়ই রাতের অন্ধকারে জনগণের খবরাখবর নিতে বেরোতেন। এক ঘরে রাতে বাতির আলো দেখে ভাবলেন, এত রাতে বিশেষ কারণ ছাড়া বাতি জ্বলার কথা নয়। কাজেই তিনি কারণ জানতে সেদিকে রওয়ানা হলেন। কুঁড়ে ঘরের পাশে দাঁড়াতেই এক দাদি এবং নাতনির কথোপকথন শুনতে পেলেন। নাতনি বলছে ‘দাদি আজ ছাগল দুধ কম দিয়েছে, কিভাবে গ্রাহকদের দুধ দেবো।’ জবাবে দাদি বলছে, ‘এতে চিন্তার কারণ নেই, কিছু পানি মেশালেই চলবে।’ নাতনি বললো, ‘দুধে পানি মেশাতে আমিরুল মোনেনিন-এর নিষেধ আছে।’ দাদি বললো, ‘এত রাতে আমিরুল মোমেনিন কিভাবে জানবেন বা দেখবেন দুধে পানি মেশানো হয়েছে।’ সঙ্গে সঙ্গে নাতনির স্পষ্ট জবাব, আমিরুল মোমেনিন না দেখলেও আল্লাহ তো দেখছেন।’ ওই কথোপকথন শুনে হযরত ওমর (রা.) নিজ ঘরে ফিরে এলেন এবং পরদিন সকালে সেই ছাগল চরানেওয়ালী মেয়েটির কাছে নিজের ছেলের বিবাহের প্রস্তাব দিলেন এবং শুধু সততার জন্য সমগ্র ইসলাম জগতের খলিফা হয়েও সাধারণ ছাগল চরানেওয়ালী বেদুঈন মেয়ের সাথে নিজের ছেলের বিবাহ দিলেন।
একবার কোনো এক রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় শুনতে পেলেন এক বুড়ো লোক ঘরে শরাব পান করছে। যেহেতু শরাব পান করা হারাম এবং বুড়ো লোকটি পাপ কার্যে জড়িত, খলিফা দরজা ভেঙ্গে বুড়োলোকটির ঘরে ঢুকে তাকে শাসানির সুরে বললেন, ‘তুমি জানো না শরাব পান করা হারাম, এই বয়সে শরাব পান করে তুমি জঘন্য অপরাধে অপরাধী।’ বুড়ো লোকটি বললো, ‘হ্যা, আমিরুল মোমেনিন, আমি একটি অপরধে অপরাধী আর আপনি তিনটি অপরাধে অপরাধী, আপনি অপরের বাড়িতে জোরপূর্বক ঢুকেছেন, আপনি বিনা অনুমতিতে ঘরে ঢুকেছেন এবং গোপনীয় দোষ তালাশ করেছেন।’ বুড়ো লোকটির কথা শুনে হযরত ওমর (রা.) কাঁদতে কাঁদতে ঘর থেকে বের হলেন। অনেকদিন পর সেই বুড়ো লোকটি খলিফার দরবারে হাজির হলো। সভার লোক সকলে চলে যাওয়ার পর খলিফা বুড়ো লোকটির কানে কানে বললেন, আমি আপনার অভ্যাসের কথা কাউকে বলিনি।’ বুড়ো লোকটি তখন খলিফার কানে কানে বললো, ‘আমি সেদিন থেকে শরাব পান ত্যাগ করেছি।
লেখক:সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
