রাজনৈতিক কাজে র‌্যাবকে ব্যবহারেই এই গুম খুন: খালেদা

by News Room

ডেস্ক রিপোর্ট: বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন,  র‌্যাব বিলুপ্তি এখন সময়ের দাবি। র‌্যাব কলঙ্কিত হওয়ার কারণে সেনাবাহিনীর সুনাম ক্ষুণ্ণের আশঙ্কা রয়েছে। আর এসবের জন্য সরকার দায়ী।’

সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গুলশানে তার রাজনৈতিক কার্যালয়ে গুম, খুন হওয়া স্বজনদের সঙ্গে নিয়ে এ কথা বলেন বিএনপি চেয়ারপারসন। প্রায় ২০ মিনিট খালেদা জিয়া বক্তব্য রাখেন।

খালেদা জিয়া অভিযোগ করেছেন, ‘সরকার তরুণ প্রজন্মকে নির্মূলের প্রচেষ্টায় রয়েছে। যে কোনো মুহূর্তে যে কেউ গুম খুন অপহরণ হচ্ছে। খালে, বিলে, নদী-নালায় যেখানে সেখানে লাশ পাওয়া যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান একরামুল হককে পুড়িয়ে যে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে তার সঙ্গে আওয়ামী লীগের লোক জড়িত বলে তার স্বজনরা অভিযোগ করেছে।’

গুম, খুনের সঙ্গে র‌্যাবের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘কোথাও আজ নিরাপত্তা নেই। র‌্যাবের সদস্যরা উশৃঙ্খল ও বেপরোয়া হয়ে গেছে। রাজনৈতিক কাজে র‌্যাবকে ব্যবহার করার ফলেই এই অবস্থা।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের সরকারের সময়ে জঙ্গি এবং অপরাধ দমনে এই অ্যালিট ফোর্স গঠন করা হয়েছে। র‌্যাব এখন জনগণের কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক। তাই র‌্যাব বিলুপ্তির কথা বলেছি। র‌্যাব এখন বিপদজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।’

নাগরিকদের নিরাপত্তা ও প্রাণ রক্ষায় খালেদা জিয়া বলেন, ‘সাদা পোশাকে কাউকে গ্রেপ্তার করা যাবে না। প্রয়োজনে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে গ্রেপ্তার করতে হবে। গুম, খুনের ঘটনা তদন্তের জন্য সাবেক প্রধান বিচারপতি, বিজ্ঞ আইনজীবী এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, মানবাধিকার সংস্থার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানাচ্ছি।’

এসময় সাম্প্রতিক সময়ে যারা গুম, খুনের শিকার হয়েছেন তাদের স্বজনরা র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ান র‌্যাবের বিরুদ্ধে প্রচন্ড ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বিএনপি চেযারপারসনের গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে যারা বক্তব্য দিয়েছেন তারা সবাই র‌্যাবের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন। এই বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে তাদের স্বজনদের তুলে নিয়ে যাওয়ার পর তারা আর ফেরত আসেনি।

নিঁখোজ ছাত্রদল নেতা পিন্টুর বোন রেহানা পারভীন বলেন, চারমাস যাবত আমার ভাইয়ের কোনো খোঁজ পাচ্ছি না। আমরা বাসায় কেউ খেতে পারি না। খেতে গেলেই তার কথা মনে পড়ে। আমার মা দীর্ঘদিন যাবৎ ছেলেন শোকে মুখে ভাত তুলতে পারে না। ভাত খেতে গেলে চোখের পানিতে ভাত ভিজে যায়।

তিনি বলেন, আমরা থানা-পুলিশ, র‌্যাব-ডিবিসহ সমস্ত জায়গায় খোঁজ নিয়েছি তারা কেউ খোঁজ দিতে পারিনি। জিডি করতে গেলে জিডিও নেয়া হয়নি। বেসরকারি সংস্থা বেলার নির্বাহী পরিচালক রিজওয়ানা হাসানের স্বামী এবি সিদ্দিকির প্রসঙ্গ টেনে রেহেনা পারভীন বলেন, আমরা যদি তার মতো ক্ষমতাবান হতাম তাহলে আমার ভাইকে ৩৬ঘন্টার মধ্যে উদ্ধার করতে পারতাম। আমরা সাধারণ মানুষ বলে ফেরত পাইনি।

বংশাল থানা ছাত্রদল নেতা নিঁখোজ সোহেল এর বাবা শামসুর রহমান বলেন, আমার ছেলের নামে কোনো দিন কোনো মামাল বা জিডি ছিলো না। শুধু বিএনপি করার কারণে র‌্যাব তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছে। এসময় তার স্ত্রী কান্না জড়িত কন্ঠে স্বামীকে ফিরে পাবার আকুতি জানিয়ে বলেন, আমরা দুইটি ছেলে সব সময় বাবাকে পেতে চায়। কিন্তু আমি তাদের কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি না। আমি সরকারের কাছে অনুরোধ জানাই, আমার দুটি ছেলের দিকে তাকিয়ে আমার স্বামীকে ফিরিয়ে দিন।

নিখোঁজ বিএনপি নেতা জহির এর ভাই সিরাজুল ইসলাম অভিযোগ করেন, তার ভাইসহ ৬জনকে র‌্যাবের পরিচয়ে কিছু লোক তুলে নিয়ে গেছে। দুইজনকে ফেরত দেয়া হলেও এ পর্যন্ত ৪ জনের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। আমি সরকারের কাছে অনুরোধ জানাই, আমার ভাইসহ সবাইকে ফিরিয়ে দিন।

নিখোজ ঢাকা মহানগর বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনের বোন মারুফা ইসলাম বলেন, গত ৪ ডিসেম্বর র‌্যাব-১ এর সদস্যরা আমরা ভাইকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর থেকে আমার বাসার হাসি বন্ধ হয়ে গেছে। বাচ্চারা খেতে পারে না। হাসতে পারে না। আমরা মা র‌্যাবের বিভিন্ন অফিসে গিয়ে একাধিকবার আমার ভাইয়ের প্রাণ ভিক্ষা চেয়েছে। কিন্তু তারা কোনো সাহায্য করেনি।

নিঁখোজ ছাত্রদল নেতা আদনান চৌধুরীর বাবা রুহুল আমিন চৌধুরী বলেন, ৪ঠা ডিসেম্বর র‌্যাব সদস্যরা আদনানকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। তারপর থেকে আর কোনো খোঁজ নেই। আমি সবহারা হয়ে আল্লাহর কাছে এর বিচার চাই। পাশাপাশি দেশে যেভাবে তরুণরা খুন, গুমের শিকার হচ্ছে এটা নিয়ে সরকারের উদ্যোগ নেয়া উচিত। তদন্ত কমিটি করা উচিত। এরা কোথায় যাচ্ছে। এভাবে দেশ চলতে পারে না।

নিঁখোজ মুন্নার বাবা বলেন, আমার সামনে থেকে ছেলেকে তুলে নেয়া হয়েছে। আমি বাবা হয়ে কিছুই করতে পারিনি। এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কিছুই নেই। কষ্ট করে ছেলেকে লেখা পড়া শিখিয়ে মানুষ করেছিলাম। তার ফলাফল এই পেতে হলো।

নিঁখোজ তরিকুল ইসলাম মিন্টুর মা হাসিনা বেগম বলেন, আমার ছেলেকে র‌্যাবের সদস্যরা বাসা থেকে নিয়ে গেছে। তার পর আর কোনো খোঁজ নেই। কান্না জড়িত কন্ঠে তিনি বলেন, আমি পৃথিবীতে আর কিছু চাই না, শুধু আমার ছেলেকে ফিরে পেতে চাই।

প্রধানমন্ত্রীকে বলি আপনি একজন মা, আপনারও ছেলে মেয়ে আছে। সেই দিক তাকিয়ে আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দিন।
নিঁখোজ মাহাবুব হাসান সুজনের বাবা আব্দুল জলিল বলেন,  আমার ছেলে কোনো দিন কোনো অপরাধের সাথে জড়িত না। শুধু বিএনপি করার কারণে র‌্যাব তাকে তুলে নিয়ে গেছে। এসময় বিএনপি চেয়ারপারসনকে চোখ মুছতে দেখা যায়।

You may also like

Leave a Comment