হরেক রঙের মাস আষাঢ়

by News Room

ত্বারিক নোমান :

বিরামহীন বৃষ্টি, কালো আকাশ, সবুজ প্রকৃতি এই তিনটি চিত্রের একটি ফ্রেম আষাঢ়।চৈত্র থেকেই বৃষ্টি শুর হয় তবে আষঢ়ে বর্ষা শুরু হয়,তৃপ্তি অনুভূত হয় প্রত্যেক বর্ষা প্রেমিকের তরুণ মনে,পূর্ণতা পায় নান্দনিক সবুজ প্রকৃতি,রূপ জৌলস ফুটে উঠে গ্রাম বাংলার অলিতে গলিতে মাটে প্রান্তরে। আষাঢ়ের জমাটবদ্ধ কালো মেঘের দক্ষিণা আকাশ আবার কখনও বৃষ্টিস্নাত প্রকৃতির প্রেমময় আবেদন।

আষাঢ় মাসের নাম এলেই কবি গুরুর বিখ্যাত কবিতার কথা মনে হয়। “নীল নবঘনে আষাঢ় গগণে তিল ঠাঁই আর নাহিরে,
ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে।”
আষাঢ় আসে ভারি বর্ষণ নিয়ে।ঘোমট আকাশ, রিমঝিম বাদল দিন, টিনের চালে বৃষ্টির টপ টপ শব্দ নিয়ে।আষাঢ় আসে বন্যার আগমনী বার্তা নিয়ে।অথৈ জলে ভরা প্রান্তর,পানি কেটে নৌকার প্রাণবন্ত বয়ে চলা,ঢেউয়ের উপর বিকেলের রাঙা সূর্যের ললাট আভার নাচন কি এক অদ্ভুত অনুভূতির সৃষ্টি করে। ভালবাসার পাঠ শেখাতে আষাঢ় আসে আমাদের মন মানসে।

আষাঢ় নিয়ে বাংলা সাহিত্যে যত মাতামাতি,যত কাব্য কিংবা সাহিত্য রচিত হয়েছে বাংলার আর কোন মাস নিয়ে এত শৈল্পিক আলোচনা হয় নি। চিরপ্রেমিক কবি নজরুল ছিলেন বর্ষা প্রেমের অনন্ত পূজারী। ‘শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে বাহিরে ঝঢ় বহে, নয়নে বারি ঝরে।’ প্রেমিক-প্রেমিকার কাছে এ গানটি প্রেমের বিখ্যাত গান হিসাবে বিবেচিত, একই সঙ্গে এটা বর্ষাগীতও বটে।

নজরুল যে বর্ষা প্রেমে মাতোয়ারা ছিলেন, ছাঁপ পাওয়া যায় এই গানটিতেও
‘রিম ঝিম, রিম ঝিম ঝিম ঘন দেয়া বরষে, কাজরী বাহিয়া চলে পুর-নারী হরষে।’ গানখানি নজরুলের বর্ষার বিখ্যাত গানগুলোর একটি।

রবীন্দ্রনাথ,নজরুল ছাড়াও বাংলার অসংখ্য কবি সাহিত্যিক আষাঢ় নিয়ে ছড়া,কবিতা,গান,প্রবন্ধ, উপন্যাস লিখে নিজের অনুভূতিকে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন।

হাল আমলে বাংলা সাহিত্যের বরপূত্র হুমায়ূন আহমেদ তার প্রেমের কয়েকটি উপন্যাসকে একত্রিত করে সংকলনের নামই দিলেন ‘বাদল দিনের প্রথম কদমফুল’। কবি-সাহিত্যিকগণ বর্ষার স্মারকফুল হিসেবে কদম ফুলকে চিহ্নিত করেন। 
কদম ফুলের রেনু গালে মাখতে চায়না এমন বালিকা একটিও পাওয়া যাবে না। বর্ষকালের রূপ মাধুরী আর নান্দনিকতা নিয়ে কদম ফুল ফুটে থাকে। নজরুলের গানেই তার প্রকাশ দেখি। ‘কদম-তমাল ডালে দোলনা দোলে, কুহু-পাপিয়া-ময়ূরও বোলে।’ এ গানের কলিতে বুঝা যায় নজরুলও কদমে মজেছেন। যেমন বর্ষা প্রেমের উপন্যাসে মজেছেন হুমায়ূন আহমেদ।

বর্ষার সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গিয়ে ফররুখ এভাবে লিখেছেন
“দুপাশে আবাদী গ্রামে, বৃষ্টি এলো পুবের হাওয়ায়,

বিদগ্ধ আকাশ, মাঠ ঢেকে গেল কাজল ছায়ায়;

প্রকৃতিতে বর্ষা আসে প্রাণস্পন্দন নিয়ে। আর বৃষ্টিই বর্ষার প্রাণ। এ সময় নদীর  দুকোলে প্লাবন দেখা দেয়, ফলে পলি মাটির গৌরবে ফসল ভালো হয়। বৃষ্টির সময় আকাশের সর্বত্র মেঘের খেলা দেখা যায়, বর্ষার কদমে সর্বত্র মোহিত হয়, রুক্ষ মাটি বৃষ্টিতে প্রাণ জুড়ায়। বৃষ্টিকালে সংবেদনশীল মানুষও রসসিক্ত হয়ে ওঠে। তার মনে পড়ে সুখময় অতীত, পুরোনো স্মৃতি, আর সে ভালোলাগার আলপনা আঁকে মনে ভুবনে।মনের আকুতিকে করে তুলে আরো প্রাণচ্ছুল,প্রেমময়,আবেদনময়ী।
এ বৃষ্টি কখনো মনকে করে বিষন্নও, একাকী জীবনে বাড়ায় বিরহ।

 বর্ষার আমনের খেত কৃষকের মুখে হাসি ফোটায়, নিয়ে আসে সুখ সমৃদ্ধি।ভাজা চিড়ের ধুম পড়ে গ্রামের কুটিরগুলিতে।বর্ষার আগমনে ঝিঝি পোকা গেয়ে উঠে,ব্যঙের রাজ্যে হাক ডাক ভীষণ বেড়ে যায়।বাবুই বাসা বাঁধে আপন মনে,পাখির ছানা ডানা মেলে উড়ু দেয়ে নীল আকাশে।

You may also like

Leave a Comment