নিউজ ডেস্ক: যে রাঁধতে জানে সে চুলও বাঁধতে জানে। এটি এখন শুধু প্রবাদবাক্য নয়। বাংলার অনেক কৃতিমান নারী এই প্রবাদবাক্যের যথার্থতা প্রমাণ করেছেন। স্বাধীনতার ৪৪ বছরে পাল্টেছে অনেক কিছুই। নারীরা এখন আর অন্দরে নয়, অন্তরে স্থান করে নিয়েছেন। এ বিষয়টিই যুক্তি দিয়ে জয় করে নিয়েছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তিন শিক্ষার্থী। জয়ীতা সাবাহ মাহজাবিন সারোয়ার পুষ্পা, কাজী খায়রুন নাহার মিতু এবং অনন্যা সরকার শাহজালাল ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটির সদস্য। তারা ‘জাতীয় নারী বিতর্ক’ উৎসবের চ্যাম্পিয়ন দলের ‘সাস্ট শহীদ জননী’ এর বিতার্কিক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত বিতর্কের ফাইনাল রাউন্ডে ‘আজকে নারী অন্দরে নয় অন্তরে’ শীর্ষক বিতর্কে তারা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌবর অর্জন করেন। সারাদেশে নারী-পুরুষের সমধিকার আদায়ের লক্ষ্যে নিরন্তর কর্মসূচি চলছে। লক্ষ্য একটাই নেতৃত্বের দিক থেকে নারী-পুরুষের দূরত্ব কমিয়ে এনে নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। আর এই লক্ষ্যে সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটি ডিবেট অরগানাইজেশন (জুডো) এ বিতর্কের আয়োজন করেছিল। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত বিতর্কের ফাইনাল রাউন্ডে ‘আজকে নারী অন্দরে নয় অন্তরে’ শীর্ষক বিতর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হল ডিবেটিং টিমকে ৭-০ ব্যালটে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয় শাহজালাল ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটির ‘সাস্ট শহীদ জননী দল’। এ প্রতিযোগিতায় দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বমোট ৩২টি দল অংশগ্রহন করে। সাম্যবাদের কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার নারী কবিতায় নারীদের জয় নিয়ে যে ভবিষৎবাণী করে গিয়েছিলেন তা যেন আজ অদূরে নয়। যদিও বর্তমানে দেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী, উপনেতা ও স্পীকারসহ গুরুত্বপূর্ন পদে নারীরা থাকলেও নির্যাতনের হাত থেকে তাদের মুক্তি মিলছে না। এজন্য বিতর্কে ধর্মীয় গোড়ামী, পুরুষতান্ত্রিকতা, সংকীর্ণ মনোভাবসহ সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানোর আহবান জানিয়েছেন ওই প্রমীলা তিন শিক্ষার্থী। নারী সম্পর্কে নেতিবাচকতা ঝেড়ে ফেলে সমাজ গঠনে নারীকে পুরুষের সমকক্ষ ভাবারো আহবান জানান তারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হল ডিবেটিং টিম বিতর্কের বিরোধীদলে অংশ নিয়ে নারীরা এখনো অন্দর মহল থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি, এখনো তারা সেই অন্দর মহলেই আছেন বলে মনে করেন। তবে সরকারি দল ‘সাস্ট শহীদ জননী’ এর মন্ত্রী কাজী খায়রুন নাহার মিতু একটি পরিসংখ্যানের মাধ্যমে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, ২০০৪-১৪ সাল পর্যন্ত নারীদের শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহনের হার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ফলে নারীর প্রতি সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি কমে যাওয়ার কথা থাকলেও তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাড়ছে গৃহে সহিংসতা, রাস্তাঘাট এবং কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির সংখ্যাও। তাছাড়া বর্তমান সময়ে যারা নারীদের যৌন হয়রানি করছে তাদের অপরাধের কথা বিবেচনা না করে দায়ভার উল্টো মেয়েদের উপর চাপানো হচ্ছে। প্রশ্ন তোলা হচ্ছে নারীর পোষাক ও চলাফেরা নিয়েও। বিতর্কে অংশ নেয়া সরকারি দলের সাংসদ অনন্যা সরকার জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির সূত্র টেনে বলেন, ২৭ শতাংশ নারী জীবনের কোন কোন অংশে পুরুষের দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছে। তাই সমাজে সিদ্ধান্ত গ্রহনে নারী-পুরুষ উভয়ের সমতার দরকার বলে বিতর্কে যুক্তি তুলে ধরেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী সাবাহ মাহজাবিন সারোয়ার পুষ্পা ‘আজকে নারী অন্দরে নয় অন্তরে’ বিষয়টিকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে আজকের নারী বলতে এই সময়কার নারী, অন্দরে নয় বলতে পূর্বে নারীদের যে গৃহে বন্ধি করে রাখা হতো, সেখান থেকে বের হয়ে আসা এবং অন্তরে বলতে বর্তমান সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিকে বুঝিয়েছেন। তিনি যুক্তিখন্ডন শেষে প্রমান করেছেন নারীরা অন্দর মহল থেকে বের হয়ে আসলেও অন্তরে এসে বাধাগ্রস্থ হচ্ছেন। এভাবে বিতর্কের আঙ্গিনায় আলো ছড়িয়ে দেশের ৩১টি দলকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়নশিপের মুকুট ছিনিয়ে নিয়েছে ‘সাস্ট শহীদ জননী’ দল। সাবাহ মাহজাবিন সারোয়ার পুষ্পার মায়ের স্বপ্ন ছিল মেয়ে বড় হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হবে। আর বাবার ইচ্ছে ছিল পড়াশুনার পাশাপাশি ভালো বিতার্কিক হবে। বাবা-মার উভয়ের স্বপ্ন পূরণ করছেন তিনি। পুষ্পা শাবিপ্রবির ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। পুষ্পা বলেন, বাবার বদলির কারণে এসবের কোনটিই ভালো করে ধরে রাখতে পারিনি। শাবিপ্রবিতে ভর্তি হওয়ার তিন মাস পর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্ক সংগঠন শাহজালাল ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটির (এসইউডিএস) সঙ্গে যুক্ত হই। জাতীয় নারী বিতর্কের চ্যাম্পিয়ন ও সেরা বিতার্কিত হওয়ার অনুভূতি জানাতে গিয়ে পুষ্পা বলেন, কোন কিছু অর্জন হওয়ার পর অনুভূতি শূন্য হয়ে যায়। সেমিফাইনালে উঠার পর খুব ভালো লেগেছিল কিন্তু চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর অনুভুতি শূন্য গেয়ে গেছে। সব মিলিয়ে অনেক বেশি ভালো লেগেছে, সামনে আরো বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চাই। যুক্তি দিয়ে নিজের মতামত প্রতিষ্ঠিত করা তার অভ্যাস। অবসর সময় পেলে আর্ট পেপার ও বিভিন্ন কালারের পেন্সিল দিয়ে ছবি আঁকা ও গল্পের বই পড়া তার শখ। বলছিলাম বিতর্কের সরকার দলের মন্ত্রী ও তিন কন্যার কনিষ্ঠ সদস্য কাজী খায়রুন নাহার মিতুর কথা। মিতু শাবিপ্রবির অর্থনীতি বিভাগের প্রথম বর্ষ প্রথম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকে মিতুর বিতর্কের চর্চা শুরু। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে জাতীয় পর্যায়ে তার সফলতা দেখে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার বাবা কাজী আবুল খায়ের ও গৃহিনী মা ফয়জুন্নহার তার প্রতি অনেক খুশি। মিতু জানান, ছোট বেলা থেকে নিয়মিত বাংলাদেশ টেলিভিশনে জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতা দেখতেন। স্কুল বিতর্ক তার অনেক লাগত। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে মিতু বলেন, সংগঠনে যুক্ত হওয়ার মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে জাতীয় পর্যায়ে বিতর্ক প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়া গৌরব অর্জন করায় আমি অনেক আনন্দিত। চ্যাম্পিয়ন দলের অপর সদস্য ও বিতর্কের সরকার দলের সাংসদ অনন্যা সরকার শাবির সমাজকর্ম বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। যুক্তির লড়াইয়ের মাধ্যমে মানুষের মাঝে নিজের মতামত প্রতিষ্ঠা করতে তার বিতর্ক চর্চা শুরু। তার মতে, শিল্পাঙ্গনে অন্য কোন শাখায় যুক্তি নিয়ে লড়াই হয় না, কেবল বিতর্কেই সেটা সম্ভব। সে কারনে কলেজ পর্যায় থেকে বিতর্কের প্রতি প্রবল আগ্রহ ও ভালোবাসা জন্মায়। শাবিপ্রবিতে ভর্তির কয়েক মাস পর বিতর্ক সংগঠন এসইউডিএস এর সাথে যুক্ত হয় অনন্যা। বিতর্ক ছাড়াও ছোট বেলা থেকেই তিনি বিভিন্ন ধরনের সংগিত চর্চার পাশপাশি স্বেচ্ছাসেবী মূলক কাজ করতে তার ভালো লাগত। নিজ বিভাগের বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী কাজেও নিয়মিত অংশ নেন তিনি। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অনুভুতি জানাতে গিয়ে অনন্যা বলেন, জাতীয় পর্যায়ে এটাই তার প্রথম চ্যাম্পিয়নশিপ অর্জন তাই অনেক ভালো লাগছে। বিতর্ক সংগঠনের সাথে যুক্ত হওয়ার পর, বিতর্ক করে আর কি হবে, এরকম অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছি। ফলে এই চ্যাম্পিয়নশিপ অর্জন বিতর্ক চর্চা ও বিতর্কের সাথে সম্পৃক্ত থাকার প্রতিজ্ঞাবদ্ধতার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। চ্যাম্পিয়ন এই তিন শিক্ষার্থী যে সংগঠনের কারনে ‘জাতীয় নারী বিতর্ক’ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার সুযোগ পেয়েছে সেটি হচ্ছে ‘শাহজালাল ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটি’। ‘যুক্তির স্পন্দনে ভাঙুক অথবা গড়–ক’ এই শে¬াগানকে ধারন করে ১৯৯২ সালে সংগঠনটির যাত্রা শুরু। জাতীয় নারী বিতর্কে চ্যাম্পিয়নশিপ ছাড়াও গেল বছরের অর্জনের মধ্যে ছিল এনাম মেডিকেল কলেজ জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় রানার আপ হওয়ার গৌরব অর্জন। সংগঠনটির সভাপতি এমদাদুল হক শরীফ জানান, শাবিপ্রবির বিতার্কিক ও বিতর্ক অনুরাগী শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করার পাশাপাশি বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে উৎসাহিত করাই সংগঠনের লক্ষ। গতবছর জুড়ে আমাদের সংগঠনের কার্যক্রমের মধ্যে ছিল সাংগঠনিক সপ্তাহ, বিভিন্ন জাতীয় দিবসে প্রতীকী বিতর্ক, রম্যবিতর্ক। এছাড়া বিশেষ আয়োজনের মধ্যে ছিল ৩৫তম বিসিএস প্রিলিমিনারিকে সামনে রেখে ‘জার্নি টু বিসিএস’ আন্ত:বিভাগ বিতর্ক উৎসব, আন্ত:এসইউডিএস ডিবেট লীগ, সিলেট বিভাগীয় বারোয়ারি বিতর্ক এবং পাবলিক স্পিকিং প্রতিযোগিতা।
সিলেট শাবির তিন ‘যুক্তিকন্যা’: যে রাঁধতে জানে সে চুলও বাঁধতে জানে
318
