ফাইজা রাফা :: চা আমাদের বাংলাদেশের মানুষের জন্য একটি জনপ্রিয় পানীয় চা না খেলে মনে হয় আজকের দিনটা চলবে না। চা খেলে শরীর ও মন উভয়ই চাঙ্গা থাকে। অতিথি আপ্যায়ন এর জুড়ি নেই৷ ছেলে-বুড়ো সকলেই এর ভক্ত। শুতে – বসতে – গল্প করতে – আড্ডা জমাতে – সময় কাটাতে — কফ – কাঁসি দূর করতে এই চায়ের বিকল্প নেই ।
চা বাংলাদেশের একটি অর্থকরী ফসল। বাংলাদেশের অন্যতম অর্থকরী ফসল। রপ্তানি আয়ের অন্যতম উৎসও হচ্ছে চা। বিশ্বের প্রায় ২৫ টি দেশে চা রপ্তানি হয় বাংলাদেশ থেকে।
১৮৫৪ সালে মালনীছড়া চা বাগান দিয়ে বাংলাদেশে চা শিল্পের গোড়াপত্তন হয়।
মালনীছড়া চা বাগান বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের বৃহত্তম এবং সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠিত চা বাগান যা সিলেট সদর উপজেলায় অবস্থিত। ইংরেজ সাহেব হার্ডসনের হাত ধরে ১৮৪৯ সালে ১৫০০ একর জায়গা জুড়ে প্রতিষ্ঠিত হয় । মালনীছড়ার পাশেই রয়েছে আলী বাহার চা বাগান। এই বাগানের চায়ের রঙ, স্বাদ এবং সুবাস অতুলনীয়।
চা গাছ মূলত জমিতে ভালো জন্মে এর জন্য প্রচুর রোদ ও বৃষ্টিপাত প্রয়োজন পাহাড়ি এলাকায় উর্বর জমি চা চাষের জন্য উপযোগী। সিলেট অঞ্চলে পাহাড়ি এলাকার পরিমাণ বেশি হওয়ার কারণে সিলেটে চা উৎপাদন বেশি হয়। বড় জায়গায় ভিসিত চা বাগান ভালো চাষাবাদ হয়। জমিতে শারে করে চারা গাছ লাগানো হয় গাছের নিয়মিত যত্ন নেওয়া হয় এক ধরনের কচি পাতা কে শুকিয়ে চা পাতা তৈরি করা হয়।
সিলেট জেলায় চা বাগানের মোট জমির পরিমাণ : ২৯,৭৪৪.৭৮ একর।
চা বাগানসমূহ হতে বার্ষিক গড় উৎপাদিত চা এর পরিমাণ : ১৮,২৪২ কেজি (প্রায়)।
চা শ্রমিকদের জীবন
গত দেড়শ’ বছরে অনেক কিছু পাল্টালেও, চা শ্রমিকদের এ দাসত্বের জীবন পাল্টায়নি।
আজ যখন ১ কেজি চালের দাম ৫০-৬০ টাকা, পেঁয়াজের দাম কিছুদিন পরপর ১০০ ছাড়ায়, তখন চা শ্রমিকের মজুরি মাত্র ১২০ টাকা। কিছুদিন আগেও যা ছিল ৮৫ টাকা।
আইএলও- এর প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যাচ্ছে,
৫৫% চা শ্রমিকের মাসিক আয় ১৫০০ টাকা; ৩৩% এর ১৫০০ টাকা এবং মাত্র ২ শতাংশ চা শ্রমিকের আয় ৩ হাজার টাকা।গত দশ বছরে চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরি বেড়েছে মাত্র ৭০ টাকা।
চা শ্রমিকরা যে মজুরি পান এতে তাদের পুষ্টির নূন্যতম চাহিদাও পূরণ হয় না। কর্মক্ষেত্রে বিশ্রাম, পানীয় জল ও স্বাস্থ্যকর সেনিটেশনের অভাবে শ্রমিকরা আছেন চূড়ান্ত স্বাস্থ্যঝুঁকিতে।
আইএলও বলছে, ৬৩ শতাংশ শ্রমিক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। শ্রমিকদের মধ্যে ৭২ শতাংশ পেটের ব্যাথা, ৮৪ শতাংশ মাথা ব্যাথা ও ৭৪ শতাংশ মাংসপেশির ব্যাথায় ভুগছেন। শ্রমিকদের বড় অংশই ভোগেন রক্তশূন্যতায়। চা শ্রমিকদের ৬৪ শতাংশই নারী শ্রমিক। তাদের অবস্থা আরো করুণ। প্রায় ৯১ ভাগ নারী শ্রমিক তাদের সর্দারদের দ্বারা নিগ্রহের শিকার হন। তারা আজো তাদের অধিকার বঞ্চিত। আজো সমাজ- সভ্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন তারা।
চা বাগানের সাফল্য:
২০০৭ সালের পর হতে চা বাগানের ইজারা কার্যক্রম বন্ধ ছিল। ভূমি মন্ত্রণালয়, বিভাগীয় প্রশাসন, জেলা প্রশাস, চা বোর্ড ও উপজেলা প্রশাসনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বাগানসমূহ ইজারার আওতায় আনার লক্ষ্যে কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন, সিলেট বিগত দুই বছরে চা বাগানের ইজারা বিষয়ে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। যার ফলে সরকারের রাজস্ব খাতে আয়ের এক অভূতপূর্ব সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। উল্লেখ্য যে, সিলেট জেলার ১৯ টি চা বাগানের মধ্যে ১৬ টি চা বাগানের ইজারা/ ইজারা নবায়নের আওতায় আনা হয়েছে। তাছাড়াও ইজারাবিহীন ০৭টি চা চা বাগানকে নুতনভাবে ইজারার আওতায় আনা হয়েছে এবং অবশিষ্ট ০৩টি চা বাগানকে ইজারার আওতায় আনার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
দুঃখজনক হলেও সত্য দীর্ঘদিন। সংস্কারের অভাবে অনেক চা বাগানে। উৎপাদন দিন দিন কমে যাচ্ছে৷
সিলেট ভ্যালী কার্যকরি পরিষদ বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন সভাপতি রাজু গোয়ালা
বলেন
বাংলাদেশ একটি মধ্যম আয়ের দেশ দেশের চলমান প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে চা শ্রমিকদের বর্তমান মজুরি অতি নগণ্য।
১20 টাকা মজুরি দিয়ে সংসার পরিচালনা করা জীবনযাপন করা অতীব কষ্টসাধ্য।
শিক্ষা ব্যবস্থার ও নিম্নমানের৷ তাছাড়া এখানকার স্যানেটারি ব্যবস্থা ও তেমন ভাল না। পুষ্টিহীনতা ,রক্তশূন্যতা, রাতকানা, যক্ষা ইত্যাদি রোগের লক্ষণ ও এখানে বেশি দেখা যায়৷
কিছু কিছু NGO চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে ।
সাংস্কৃতিক ব্যবস্থাও কোন উন্নতি নেই। বাগান গুলোর বেশির ভাগ মানুষের মাতৃভাষা। উড়িষ্যা , আসামী , বাংলা ।
দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা চিন্তা ভাবনা করে করোনাকালীন সময়ও চা-শ্রমিকরা দেশ ও চা শিল্পের উন্নয়নে কাজ করে গেছেন। দেশের অর্থনীতিতে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন কিন্তু তারপরও চা-শ্রমিকদের কোন ধরনের উন্নতি নেই। খুবই নিম্নআয়ের জীবনযাপন তারা করেন।
নাগরিক সুবিধা বঞ্চিত শোষণ বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার চা শ্রমিকরা।
বাগানের শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়। এত অল্প হয় তাদের জীবন পরিচালনা করতে খুবই কষ্ট হয়। যার এর কারণে তারা তাদের সন্তানকে সঠিকভাবে শিক্ষা দিতে পারেন না। আর যেখানে এত অল্প টাকায় দিন আনে দিন যায় সেখানে অন্যান্য বিলাসিতার কথা চিন্তাই করা যায় না। অর্থের অভাবে তারা তাদের পর্যাপ্ত চিকিৎসা করাতে পারেন না। তাছাড়া চা-পাতার কেজিতে সামান্য পরিমাণে কম বয়স হলেই। মহাজনেরা তাদের টাকা কেটে নেয়। তারা তাদের জীবনমানের উন্নতি চান।
লেখক: স্টাফ রিপোর্টার, সিলটিভি
