সেলিম মোঃ আলী আসগর
পাকিস্তানীরা ৪৭-এর পর প্রথমেই আঘাত হানে আমাদের ভাষা তথা বাক স্বাধীনতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার উপর। ইতিহাসের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় নানা শোষণ-বঞ্চনার পর ৭০-এ এসে পাকি হানাদার শোষকরা শেষ পেরেক মারে জনগণের ম্যান্ডেটের উপর। ফলস্বরূপ স্বাধীকার সংগ্রাম এবং আমাদের গৌরবের মহান স্বাধীনতা অর্জন। এ অর্জনের পিছনে লক্ষ লক্ষ মানুষের আত্মাহুতি ও ত্যাগ জড়িত। আমরা গভীর শ্রদ্ধার সাথে তাঁদের স্মরণ করি। কিন্তু স্বাধীনতার ৫২ বছর পরও আজ আমরা কোথায় আছি আর কেথায় যাওয়ার কথা ছিল? তারও একটি আত্ম পর্যালোচনা সময়ের অপরিহার্য দাবী।
স্বাধীনতার ঘোষনাপত্রে মৌলিক ৪ টি আদর্শ বাস্তবায়নের নিমিত্তে আমাদের প্রিয় এদেশের জন্ম (সংবিধানের ৭ম তপশীলে পরিষ্কার ভাবে ৩ টি এবং অন্তর্নিহিত ১ টি) যথাঃ সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্র; এ গুলো ছিল আমাদের স্বাধীনতার মৌলিক চেতনা। অথচ স্বাধীনতার চেতনার নাম নিয়ে যা কিছু করা হয় তা মূলতঃ উক্ত ৪ টি চেতনারই বিপরীত! একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবীরা ইসলাম ও ইসলামী রাজনীতিকে চেতনা বিরোধী মনে করেন!? অথচ যেদেশে আজানের ধ্বনিতে ভোর হয় আর আজানের ধ্বনিতে সূর্য অস্ত যায় সেদেশে এ অপপ্রচার মূল জাতিসত্তার চেতনা বিরোধী বৈকি!
বলতে গেলে সংবিধানে বর্ণিত মৌলিক চেতনা হতে আজও আমরা যোজন যোজন দূরে অবস্থান করছি! কি গণতন্ত্র কি বাকস্বাধীনতা কি সাম্য কি মানবিক মর্যাদা কি সামাজিক ন্যায় বিচারে! সব বাদ দিয়ে আসা যাক আমাদের নির্বাচন তথা ক্ষমতার পালাবদলে। বঙ্গবন্ধুকে ম্যান্ডেট অনুযায়ী ক্ষমতা না দেয়ায় যে স্বাধীনতা যুদ্ধ তুঙ্গে উঠেছিল সেই নির্বাচনী ব্যবস্থা আজ বঙ্গবন্ধুর গড়া দলের হাতে পুরোপুরি জিম্মি বললে অত্যুক্তি হবেনা! এটা প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী এ দলটির জন্য শুভ লক্ষণ নয়! প্রকৃত বিরোধী দল বিহীন একই জেটের গৃহপালিত বিরোধী দল ও নিজ দলের ঘেষিত ডামি ক্যান্ডিডেট নিয়ে ২০২৩ সালে ভাগবাটোয়ারার যে আজব নির্বাচন হচ্ছে তা পৃথিবীর গণতান্ত্রিক ব্যাবস্থায় ও ইতিহাসে শুধু আজব ও বিরলই নয় তা কলংকজনকও বটে। যুগ যুগ ধরে এ কলংক হয়তঃ আমরা ও আমাদের প্রজন্মরা বহন করতে হতে পারে! যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জনকারী একটি দেশে গণতন্ত্র ও নির্বাচনী ব্যবস্থার এ করুন হাল সত্যিই বেদনাদায়ক ও অনেক কষ্টের।
★লজ্জা ও সংকট
১. পৃথিবীর প্রায় সকল গণতান্ত্রিক দেশ (বিজেপি শাসিত ভারত ছাড়া!) ২০২৩ সালের আমাদের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ফলে একতরফা আজব ভাগবাটোয়ারার নির্বাচন অগ্রহণযেগ্য ও বিতর্কিত থেকেই যাবে যা গণতন্ত্রের জন্য যুদ্ধ করে অর্জিত একটি দেশের জন্য চরম লজ্জার বৈকি! জাতিকে এভাবে লজ্জিত করার কোন অধিকার জনগণ নিশ্চয়ই কাউকে দেয়নি।
২. চীন-রাশিয়া গণতান্ত্রিক দেশ নয় তা সর্বজন বিদিত। চীন-রাশিয়ায় বিশ্বের কোন জায়গা হতে কেউ এ্যাসাইলামের জন্য যায়না এবং তারাও এরূপ আশ্রয় কাউকে দেয়না। বাণিজ্যিক স্বার্থ ছাড়া তারা আর কিছুই বুঝেনা। বিপদে পাশে থাকার নজিরও কম। এছাড়া এ দুদেশের ভিতরের মুসলমানরা মারাত্মক নির্যাতনের শিকার। মুসলিম রক্তে এদের হাত রণ্জিত। তাই গণতন্ত্র বিরোধী এ দুদেশের সমর্থন আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে।
৩. ভারত আমাদের নিকট প্রতিবেশী দেশ। কিন্তু ভারত স্বাধীনতাযুদ্ধে অবদানের বাইরে আমাদের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় সবসময় জনগনের মতের বিপরীত ভূমিকা পালন করছে। সীমান্তে হত্যা সহ নানা ক্ষেত্রে ভারত বন্ধত্বের পরিচয় দিতে ব্যর্থ! আমরা সাবলম্বি হই এতে ভারত খুশী নয় তা নানা ক্ষেত্রে দেখা গেছে! তাই ভারতের সাথে সমমর্যাদা নিয়ে চলতে হবে তাদের প্রেসক্রীপশনে গণতন্ত্র ধ্বংস করা আমাদের উচিৎ হবেনা।
৪. আমাদের এক্সপোর্ট মূলতঃ ইউরোপ -আমেরিকা নির্ভর। এদেশগুলোর সাথে সম্পর্ক নির্বাচনের পর আরো খারাপ হওয়ার আশংকা। ডলার ভিত্তিক বিশ্ব অর্থনীতি ও বানিজ্যিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশ মারাত্মক সংকটে পড়ার আশংকা রয়েছে। তাছাড়া উচ্চ শিক্ষার জন্য ইউরোপ -আমেরিকা গামীদের জন্য ভিসানীতি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। শুধু ক্ষমতার জন্য ক্ষমতাসীনরা কেন এ ঝুঁকি নিচ্ছেন তা বোধগম্য নয়।
৫. দেশে রাজনৈতিক অস্থিশীলতা ও দমন-পীড়নের কারণে মেধাবী প্রজন্ম বিদেশমূখী এ প্রবণতা আরো বাড়বে। দেশে মেধাহীন চাটুকার শ্রেণীর দৌরাত্ব আরো বাড়বে। ঘোষ-দূর্নীতি বাড়বে। বিচার ব্যবস্থা আরো ভেঙ্গে পড়বে। সুশাসন জিরোতে চলে যেতে পারে। ভাল মানুষের মর্যাদা কমে যাবে এবং সামাজিক বিশৃংখলা সৃষ্টির আশংকা রয়েছে।
৬. বিরোধী পথ-মত নিগৃহিত হবে এমনকি সরকার দলীয় ভাল মানুষগুলো নিগৃহীত হবে। অন্তরদ্বন্ধ ও কলহে সরকারী দল ভাঙ্গন ও বিধ্বস্তের শিকার হতে পারে।
★সম্ভাবনা
গৃহপালিত বিরোধী দলগুলো বিশেষ করে জাতীয় পার্টি অস্থিত্ব সংকটে পড়বে এবং যে কিছুটা জনসমর্থন তাদের ছিল তাও হারাবে এবং সরকারী দলের এ্যাবসোলিউট পাওয়ার জন-অসন্তোষ তীব্র আকার ধারণ করার প্রেক্ষাপটে ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী দল এবং ইসলামী রাজনীতির ভবিষ্যৎ উজ্জল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে যে আঁধারে দেশ এগুচ্ছে তা কাটতে একটু সময়ও লাগতে পারে। কিন্তু আঁধার যত ঘনিভূত হয় সুবহে সাদেক তত এগিয়ে আসবে ইনশা আল্লাহ।
লেখক: এডভোকেট,বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্ট ও জজকোর্ট, সিলেট।
