জেমস এম. ডরসি
সৌদি আরব ছিল ইসরাইল তথা ইহুদি বিরোধী। সৌদি আরবই ছিল একমাত্র দেশ যেটি ভিসার নিয়মকানুন এমন করেছিল যে যাতে ইহুদিরা এদেশটিতে প্রবেশ করতে না পারে। সৌদি আরব এখনো পর্যন্ত ইসরাইলের সাথে সকল ধরনের আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক অস্বীকার করে আসছে, যেমনিভাবে দেশটি ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে দখলকৃত ইসরাইলি ভূখণ্ড ফিরিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। তবে অভিন্ন কিছু হুমকির কারণে দেশ দুটির সম্পর্ক বর্তমানে এমন অবস্থায় এসেছে যে তারা এখন তাদের সম্পর্কের কথা স্বীকার করতে রাখঢাক করছে না। তাদের মধ্যে বিভেদের দেয়াল ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
রাষ্ট্র হিসেবে সৌদি আরব এবং ইসরাইলি মূল্যবোধের মধ্যে খুব কমই সাদৃশ্য রয়েছে। তবে হ্যা, সৌদি আরব যেমন ইসলামের কঠোর রূপ ওয়াহাবি মতবাদে বিশ্বাস করে তেমনি ইসরাইলও উগ্র-ইহুদিবাদে বিশ্বাসী। তা সত্ত্বেও তাদের কিছু অভিন্ন স্বার্থও রয়েছে। উভয় রাষ্ট্রই ইরানকে, বিশেষ করে পরমাণু ক্ষমতাধর ইরানকে তাদের জন্য হুমকি মনে করে। আবার তারা মুসলিম ব্রাদারহুড ও আল-কায়েদা উদ্ভুত আইএসআইসকে পরাজিত করতেও দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। কেননা মুসলিম ব্রাদারহুড এবং আইএসআইএস রাজতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র উচ্ছেদ করে এই এলাকায় ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আর এটা তাদের উভয়ের জন্য একটা বড় ধরনের হুমকি।
ইসরাইলের সাথে সৌদি আরবের অভিন্ন স্বার্থ মূলত সৌদি আরবের তেল সম্পদ, আর্থিক শক্তি এবং দু-দুটো পবিত্র শহর মক্কা ও মদিনার উপর ভিত্তি করে যা সৌদি আরবকে আরব বিশ্বে নেতার মর্যাদা দিয়েছে। ইসরাইল বোঝে যে সৌদি আরবের সাথে তার সম্পর্কের কথাটা গোপন রাখ সৌদি রাজতন্ত্রের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তবে ইসরাইল এখন সৌদি আরবের সাথে তাদের সম্পর্ক প্রকাশ্যে স্বীকার করতে আর দ্বিধা করছে না। আর তার স্বার্থেই সৌদি আরব ফিলিস্তিন সমস্যার ব্যাপারে কথা বলবে না।
ইসরাইলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং রাজনৈতিক- সামরিক সম্পর্ক বিভাগের পরিচালক জেনারেল আমোস গিলাদ বলেন, ‘সবকিছুই গোপন, কোনো কিছুই প্রকাশ্য নয়। তবে নিরাপত্তার ব্যাপারে মিশর ও আরব রাষ্ট্রগুলোর সাথে আমাদের সহযোগিতার সম্পর্ক অনন্য। সৌদি আরবের সাথে নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখনই সবচেয়ে ভাল যাচ্ছে। সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মিশরের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুরসির ক্ষমতাচ্যুতির পর মিশরের সাথে ইসরাইলের সম্পর্ক নাটকীয়ভাবে উন্নত হয়েছে।’
ইসরাইল ও মিশর ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর ক্যাম্প ডেভিড নামে শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। মিশরের পাশে একমাত্র আরব দেশ জর্ডানের অবস্থান । আবার ইরাকের সাথে জর্ডানেরও সীমানা রয়েছে। জর্ডানের সাথে ইসরাইলের নিরাপত্তা সীমানার বর্ণনা দিয়ে গিলাদ বলেন, ‘জর্ডান এবং আরব দেশগুলো বেশ খুশি কারণ আমাদের সাথে তাদের একটা অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক রয়েছে। আর তারা এ সম্পর্ক কখনোই মুখে স্বীকার করবে না। গোপনে গোপনে সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তারা বেশ চালাক।’
ইসরাইলের সাথে কোনো ধরনের সম্পর্ক রাখার কথা সৌদি আরব বারবার অস্বীকার করলেও গত সপ্তাহে ব্রাসেলসে এই দুটো দেশের দুই গোয়েন্দা প্রধানের মধ্যে বৈঠকের খবর তাদের মধ্যে সম্পর্কের ব্যাপারটা স্পষ্ট করেছে। তাছাড়া প্রথমবারের জন্য কোনো সৌদি প্রকাশক কোনো ইসরাইলি লেখকের বই আরবি ভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশ করেছেন।
গত মে মাসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুবরাজ সৌদের আপন ভাই তুর্কি বিন ফয়সাল আল সৌদ এবং ইসরাইলের সামরিক গোয়েন্দ সাবেক প্রধান আমোস ইয়ালদিনের মধ্যে সাক্ষাৎ সৌদি আর ইসরাইলের মধ্যকার উন্নত সম্পর্কের ইঙ্গিত বহন করে। সম্প্রতি তুরস্কের একটি আদালত আমোস ইয়ালদিনকে ২০১০ সালে গাজা উপত্যকায় অন্যায়ভাবে বোমা হামলায় জড়িত থাকার অপরাধে সাজা দিয়েছে।
সৌদি এবং ইসরাইলি কর্মকর্তারা এর আগেও প্রকাশ্যে সাক্ষাৎ করেছে। কিন্তু এবার যুবরাজ সৌদ সৌদির পৃষ্ঠপোষকতায় ২০০২ সালের একটি শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে আমেসের সাথে দেখা করলেন। এই শান্তি পরিকল্পনার উদ্দেশ্য হচ্ছে ফিলিস্তিন সমস্যা সমাধান কল্পে দখলকৃত ভূখণ্ড থেকে ইসরাইলের সরে আসার বিনিময়ে ইসরাইলি ইহুদি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি।
বার আইলান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জসুয়া তিতালবামের লেখা বই ‘সৌদি আরাবিয়া অ্যান্ড দ্য নিউ স্ট্রাটেজিক ল্যান্ডস্কেপ’ আরবি ভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশ করার পর একটা বিতর্ক তৈরি হয়। এই বিতর্কিত প্রকাশনার পরপরই এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়।
যুবরাজ তুর্কি আল ফয়সাল ব্রাসেলসে এক বক্তব্যে ইঙ্গিত করেছেন যে তিনি নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে উভয় দেশের সহযোগিতাকে আরব- ইসরাইল দ্বন্দ্বের সমাধানের ক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
আমোস গিলাদ রক্ষণশীল সৌদি আরবের সাথে ইসরাইলের সম্পর্ককে ‘গুড ওয়েদারে’র সাথে তুলনা করেছেন। তবে এটা এত সহজ নয়। তিনি সতর্ক করে বলেন ভুলে গেলে চলবে না যে এমন একটি অঞ্চলে মেঘ আবার জমতে পারে যেখানে রাষ্ট্রগুলোর ভেঙে পড়ার অবস্থা। আর এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে ইসরাইলের সামরিক শক্তিই হবে ইসরাইলের একমাত্র ভরসা।
(জেমস এম ডরসি এস. রাজারত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ এবং সিঙ্গাপুরের নানিয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির একজন সিনিয়র ফেলো এবং ইউনিভার্সিটি অব ওয়ারবার্গের ইনস্টিটিউট অব ফ্যান কালচারের সহপরিচালক। তিনি ‘দ্য টারবুলেন্ট ওয়ার্ল্ড অব মিডল ইস্ট সকার’ নামে ব্লগও লিখেছেন। হাফিংটন পোস্টে Israel and Saudi Arabia: Forging Ties on Quicksand প্রকাশিত তার লেখাটির অনুবাদ করেছেন জামির হোসেন।)
