বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে আলেম উলামাদের অবদান

by News Room

সৈয়দ মবনু:ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে যে আলেম-পীর-আউলিয়া সমাজ মজলুম দ্রাবিড় জাতিকে আর্য হানাদারদের ক্রমাগত আক্রমণ থেকে মুক্তির জন্য আরববিশ্ব থেকে এসেছেন, যারা ব্রিটিশ আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এদেশ ও জাতির স্বাধীনতার জন্য ক্রমাগত দু’শ বছর জিহাদে নেতৃত্ব দিয়েছেন, হাজারো শহিদ হয়েছেন, যারা ব্রাহ্মণদের শোষণ-নির্যাতন থেকে মুক্তির জন্য পাকিস্তান আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। সাধারণ মানুষের মুক্তির জন্য আয়ূব শাহীর মতো জালেমের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সূচনা করলেন, যাদের সামনে জালেম আর মজলুমের অবস্থান স্পষ্ট। জালেমের বিরুদ্ধে জিহাদের ফাজিলত যারা জানেন, তারা একাত্তরে কেন জালেম পাকিস্তানিদের প নিবেন? এই প্রশ্নটি আমাকে প্রায়ই নাড়া দিত। মুক্তিযুদ্ধের নবম-সেক্টরের কমান্ডার মেজর জলিল যখন মাওলানা মোহাম্মদউল্লা হাফেজ্জীহুজুরের নেতৃত্বাধীন ইসলামি আন্দোলনে অংশ নিলেন, তখন ঢাকা কেল্লামোড়স্থ হাফিজ্জী হুজুরের খেলাফত আন্দোলনের অফিসে তাঁর সাথে দীর্ঘ আলোচনায় আমার কাছে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠে। তাছাড়া আমি ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশের শীর্ষ আলেমদের অনেকের সাথে এ বিষয়ে পর্যালোচনা করেছি। পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে যারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচারে লিপ্ত নয়, তাদের অনেকের সাথে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আমরা যারা মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের প্রজন্ম এবং পাশাপাশি আলেম-উলামাদের সাথে সম্পর্ক রাখি, তাদের জন্য বিষয়টি পরিস্কার হওয়া প্রয়োজন আছে বলেই তা নিয়ে আমি একটু তথ্য সংগ্রহ করি। আমার সংগৃহীত তথ্যানুসারে একাত্তরে আলেম সমাজ প্রকৃত অর্থে পাকিস্তানের জালেমদের পে ছিলেন না। বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলেম এবং মাওলানা আশরাফ আলী থানবি (র.)-এর খলিফা হযরত মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর সেই সময়ে স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা দিয়েছিলেন-‘এ যুদ্ধ ইসলাম আর কুফুরের যুদ্ধ নয়, এটা জালেম আর মজলুমের যুদ্ধ-পাকিস্তানিরা জালেম’। শায়খুল হাদিস মাওলানা আজিজুল হক নিজে আমায় বলেছেন-‘শেখ সাহেবকর্তৃক ছয়দফা ঘোষিত হওয়ার পর ৩২ নাম্বার ধানমন্ডি (শেখ সাহেবের বাড়িতে) শেখ সাহেবের সাথে তাঁর দীর্ঘ বৈঠক হয়েছে এবং পরে মাওলানা আজিজুল হকের প্রশংসা করে শেখ সাহেব পত্রিকায় একটি বিবৃতিও দিয়েছেন, যা তৎকালীন পত্র-পত্রিকা ঘাটলে এখনও পাওয়া যাবে। যাত্রাবাড়ি মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা মাহমুদুল হাসান সাহেবের সাথে শেখ সাহেবের খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক একাত্তরের পরেও যে ছিলো তার বাস্তব প্রমাণ আজকের যাত্রাবাড়ি মাদ্রাসা। স্বাধীনতার পর এই মাদ্রাসার ভূমি দিয়েছেন স্বয়ং শেখ সাহেব’। মাওলানা এমদাদুল হক আড়াই হাজারি যিনি সরাসরি মুক্তিযোদ্ধা, তিনি আমায় বললেন-‘আমি তখন হাফেজ্জী হুজুর এবং শায়খুল হাদিস মাওলানা আজিজুল হকের ছাত্র, লালবাগে পড়ি, যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার পর মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে গেলে আমরা বড় ছাত্ররা হাফেজ্জী হুজুরকে জিজ্ঞেস করলাম-আমাদের ভূমিকা কী হতে পারে এই যুদ্ধে? হুজুর বললেন-‘অবশ্যই জালেমদের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান। আমি হুজুরকে জিজ্ঞেস করলাম-আমি কি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পারবো? হুজুর বললেন-‘অবশ্যই যেতে পার’। অতঃপর আমি গেরিলা প্রশিণে ভর্তি হয়ে যাই এবং যুদ্ধে অংশ নিলাম। সিলেটের জকিগঞ্জ এলাকার মাওলানা আব্দুস সালাম আমাকে জানালেন-‘১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে আমি করাচি ইউসুফ বিন্নুরী মাদ্রাসার ছাত্র। বাংলাদেশে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে কিছু পাঞ্জাবি ছাত্র আমাদের সাথে উৎপাত শুরু করে দিলো। এই সময় একদিন মুফতি মাহমুদ সাহেব মাদ্রাসায় আসলে আমি তাঁর কাছে ব্যাপারটি উপস্থাপন করলাম। তিনি আমায় সান্ত্বনা দিয়ে বললেন-‘ডরাও মত, আল্লাহ হে’। মুফতি সাহেবের আগমন সংবাদে আছরের নামাজের পর পর প্রচুর রাজনৈতিক নেতা-কর্মী এবং সাংবাদিক এসে উপস্থিত হলেন মাদ্রাসায়। এই সময় একজন নেতা মুফতি সাহেবকে প্রশ্ন করলেন-‘হযরত গাদ্দার কো গ্রেফতার কর লে আয়া, লেকিন আবি তক কতল বী নেহি কিয়া?’ প্রশ্ন শোনেই মুফতি সাহেব খুব ুব্ধ হয়ে জিজ্ঞেস করলেনÑ‘গাদ্দার কৌনÑগাদ্দার কৌন?’ অতঃপর নিজেই বললেনÑ‘শেখ মুজিব গাদ্দার নেহি, অহ সুন্নি মুসলমান হে, ইয়াহিয়া আওর ভূট্টো শিয়া হে। হর সুন্নি মুসলমানে কি জান আওর মাল কি হেফাজত কর না হর সুন্নি মুসলমানকে লিয়ে ওয়াজীব হে’। পরের দিন এই কথা করাচির পত্রিকাগুলোতে আসার পর থেকে মাদ্রাসার ছাত্ররা আর উৎপাত করেনি।’ মুফতি মাহমুদ ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা মাওলানা সৈয়দ হোসেন আহমদ মাদানীর শিষ্য ছিলেন। মাওলানা হোসেন আহমদ মাদানী ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী ঐতিহাসিক রেশমি রুমাল আন্দোলনের নেতা শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান (র.)-এর ছাত্র এবং রাজনৈতিক শিষ্য। তৎকালীন সময় ‘জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম’ পাকিস্তানের আমীর ছিলেন মুফতি মাহমুদ, সেই সময়ে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের পূর্ব-পাকিস্তানের আমীর ছিলেন মাওলানা আজিজুল হক (পরবর্তীতে শায়খুল হাদিস হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন)। বর্তমান পাকিস্তানের শীর্ষ নেতা মাওলানা ফজলুর রহমান হলেন মুফতি মাহমুদের ছেলে। তৎকালীন সময়ে জায়ামাতে ইসলামি এবং পিপলস পার্র্র্র্টি মিলে মুফতি মাহমুদের পেশওয়ারস্থ অফিসে আক্রমণের ঘটনা উল্লেখ করেছেন পিপলস পার্র্র্র্র্টির নেতা, লেখক তারেক ওয়াহিদ বাট তাঁর ‘নিউ ওয়ার্ল্ডওয়াডার-ইসলাম আওর পাকিস্তান’ গ্রন্থে। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে আমি পাকিস্তান সফরে গেলে সেখানে অবস্থানকারী অনেক বাঙালি এবং ইসলামাবাদ কায়দে আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর মোহাম্মদ এহসান মাওলানা আব্দুস সালামের বক্তব্যের সত্যতা স্বীকার করে বলেন-‘মুফতি মাহমুদের বক্তব্য সর্বদাই বাঙালি মুসলমানদের পে ছিল’। প্রফেসর এহসান আমাকে বলেছিলেন-‘তৎকালীন পত্রিকাগুলো খুঁজলে মুফতি মাহমুদের বক্তব্য পাওয়া যাবে।’ চাইলে তিনি আমাকে সহযোগিতা করবেন। কিন্তু সময়ের অভাবে আমি আর সে পথে যাইনি। তবে এই সব পত্রপত্রিকা থেকে সংগ্রহকৃত বিভিন্ন তথ্য আমরা মুফতি মাহমুদের জীবনী গ্রন্থসমূহে দেখতে পাই। সেইসব গ্রন্থের তথ্যানুসারে কিছু কথা এখানে উল্লেখ করছি। ৭০-এর নির্বাচনে পিপলস পার্র্র্র্টির পরাজয় এবং আওয়ামীলীগের বিজয় হলে পিপলস পার্র্র্র্টির নেতা জুলফিকার আলী ভূট্টো বাঙালিদের হাতে মতা হস্তান্তরে অসম্মতি প্রকাশ করে বলেছিলেন-‘যারা জাতীয় পরিষদের বৈঠকে ঢাকায় যাবে তাদের পা ভেঙে দেওয়া হবে’। তখন মুফতি মাহমুদ জোর প্রতিবাদ করে বলেছিলেন-‘বর্তমান সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকট সমাধানের একমাত্র উপায় জাতীয় পরিষদের বৈঠক আহ্বান এবং সংবিধান ও আইন বিষয়ক সকল বিষয়ই জাতীয় পরিষদে মীমাংসা করা’-(ক্বাইদে জমিয়ত মুফতি মাহমুদ, আশফাক হাশেমী)। ৭০-এর নির্বাচনের মাস-দিন পর অর্থাৎ ১৩ জানুয়ারি ১৯৭১-এ জেনারেল ইয়াহিয়া খান ঢাকায় এসে শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে আলোচনার পর যখন নিশ্চয়তা পেলেন যে, শেখ মুজিবুর রহমানকর্তৃক সরকার গঠিত হলেও তিনি নির্ধারিত মেয়াদ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট পদে বহাল থাকবেন, তখন ঘোষণা করেছিলেন-‘শেখ মুজিবুর রহমান দেশের নির্বাচিত দলের প্রধান হিসেবে আগামী দিনের প্রধানমন্ত্রী। এতএব, রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে তার সিদ্ধন্তটাই চূড়ান্ত।’ কিন্তু ঢাকা  থেকে ফেরার পথে দু-জন উর্ধ্বতন সেনা অফিসারসহ জেনারেল ইয়াহিয়া খান ভূট্টোর সাথে ‘লারকানা’ এলাকাতে গিয়ে গোপন বৈঠকের পর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ঘোষণা দিলেন-‘শান্তিপূর্ণ উপায়ে মতা হস্তান্তর ও সংবিধান রচনার জন্য পূর্ব ও পশ্চিম-পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ উভয় দলের সমঝোতা পূর্বশর্ত।’ এই ফর্মূলা মূলত ছিলো পিপলস পার্র্র্র্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভূট্টোর, পাকিস্তান ভাঙ্গার জন্য যা ছিলো যথেষ্ট। এক দেশে দুই সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হয় কীভাবে? এই প্রশ্ন উঠিয়ে তখন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতা মুফতি মাহমুদ, ন্যাপ নেতা ওয়ালী খান এবং শেখ মুজিবুর রহমান কড়া ভাষায় প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে বলেছিলেন-‘এমন উক্তি দেশকে দু-ভাগে বিভক্ত করার সমতুল্য।’-(প্রাগুক্ত)। ২৭ জানুয়ারি ১৯৭১-এ ভূট্টো সাহেব ঢাকা এসে গেলেন। ফিরে গিয়ে পেশওয়ারে জমিয়ত নেতা মুফতি মাহমুদ, ন্যাপ নেতা ওয়ালী খান এবং মুসলিমলীগ নেতা কাইয়ূম খানের সাথে দেখা করে চেষ্টা করেন ৩ মার্চ আহূত জাতীয় পরিষদ অধিবেশন বর্জন ঘোষণা করাতে। আব্দুল কাইয়ূম খান ব্যতীত বাকি দু-জন অসম্মতি জানালেন ভূট্টো সাহেবের প্রস্তাবে। ভূট্টো সাহেব তখনই ঘোষণা করেছিলেন-‘পিপল্স পার্র্র্র্টির কোনো সদস্য ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে গেলে তার পা ভেঙে ফেলা হবে এবং অন্যকোনো দলের সদস্য যদি ঢাকায় যান তা হলে তিনি যেনো পশ্চিম-পাকিস্তানে ফিরার টিকেট না করেন।’ পিপলস পার্র্র্র্টির নেতাকর্তৃক এই ঘোষণার প্রতিবাদে  জমিয়ত নেতা মুফতি মাহমুদ, ন্যাপ নেতা ওয়ালী খান ঘোষণা করেন তারা ৪২ জন জাতীয় পরিষদ সদস্য নিয়ে জাতীয় পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশনে যোগ দিবেন।  উল্লেখ্য যে, এই ৪২ জনের মধ্যে ভূট্টো সাহেবের দল পিপলস পার্র্র্র্টির নেতা আহমদ রেজা কাসূরীও ছিলেন। ১৩ মার্চ ১৯৭১-এ মুফতি মাহমুদ পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকট সমাধানের জন্য লাহোরে সর্বদলীয় একটি বৈঠক ডাকেন। পিপলস পার্র্র্র্টি আর মুসলিমলীগের কাইয়ূম গ্র“প (যা কাইয়ূমলীগ বলে পরিচিতি ছিলো) ছাড়া বাকি সকল দলের প্রতিনিধিরা এতে উপস্থিত হয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের পেশকৃত চার দফা দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে পর্যালোচনা করে শেষ পর্যন্ত এই দাবিগুলোর সমর্থনে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেন। দাবিসমূহ ছিলো যথাক্রমে-১. অবিলম্বে সামরিক শাসন প্রত্যাহার, ২. সেনাবাহিনীকে ক্যান্টনম্যান্টে ফেরৎ নেওয়া, ৩. সেনা অভিযানে ঘটিত প্রাণহানীর বিচার বিভাগীয় তদন্ত, ৪. জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসার আগে মতা হস্তান্তর। মুফতি মাহমুদ ১৩ মার্চের বক্তব্যে স্পষ্ট ভাষায় ইয়াহিয়া-ভূট্টোর নীতিকে ভুল আখ্যায়িত করে অবিলম্বে জনপ্রতিনিধিদের কাছে মতা হস্তান্তরের দাবি জানান। জুলফিকার আলী ভূট্টো সাহেবের প থেকে সত্তরের নির্বাচনের পর যখন ঘোষণা করা হলো-‘ওখানে তুমি, এখানে আমি।’ তখন মুফতি মাহমুদ প্রতিবাদ করে বলেছিলেন-‘পাকিস্তানের ঐক্য ভেঙে গেলে রাজনৈতিকভাবে পশ্চিম-পাকিস্তানের পরিভাষা অর্থহীন হয়ে যাবে। তখন কোনো দলের পে পশ্চিম-পাকিস্তানের মতা একা হাতে তোলে নেওয়া যুক্তিহীন হয়ে যাবে। কেনো না পিপলস পার্র্র্র্টি সারা পশ্চিম-পাকিস্তানের একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল নয়, তারা কেবল সিন্ধু ও পাঞ্জাবের প্রতিনিধি মাত্র। সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করার কোনো অধিকার তাদের নেই। তা ছাড়া জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল একটাই থাকে, আর সে দল হলো আওয়ামীলীগ। সুতরাং প্রেসিডেন্টের উচিত তাৎকনিকভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রধান হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানকে সরকার গঠনের জন্য আহ্বান করা’-(ক্বাইদে জমিয়ত মুফতি মাহমুদ, আশফাক হাশেমী/ সাপ্তাহিক কৌমী ডাইজেষ্ট, মুফতি মাহমুদ নম্বার, পাকিস্তান)। উল্লেখ্য যে, মুফতি মাহমুদ পাকিস্তানের জাতীয় রাজনীতিতে একজন জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ১৯৭০-এর জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে ‘ডের ইসমাইল খা’ আসনে স্বয়ং পিপলস পার্র্র্র্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভূট্টোকে তিনি বিপুল ভোটে পরাজিত করেছিলেন। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তান সফরে না গেলে এসব অনেক তথ্যই আমার অজানা থেকে যেতো। আমার ‘লাহোর থেকে কান্দাহার’ গ্রন্থে আমি তৎকালীন পাকিস্তানের জেনারেল রাও ফরমান আলী, ওল-পাকিস্তানের আলোচিত রাজনৈতিক নেতা মাহমুদ আলী, ডা. ইসরার আহমদ প্রমুখদের সাাৎকার’সহ পাকিস্তান সফরের উপর দীর্ঘ আলোচনা করায় এখানে অপ্রাসঙ্গিক কিছু উল্লেখ করছি না। উল্লেখ্য যে, মুফতি মাহমুদ ছিলেন ওল-পাকিস্তান জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের আমীর এবং সেই সময়ে বাংলাদেশের প্রায় সকল ক্বওমী মাদ্রাসার ছাত্র-শিক ছিলেন জমিয়তের সাথে সম্পৃক্ত। আজকে শায়খুল হাদিস বলে খ্যাত মাওলানা আজিজুল হক তখন ছিলেন পূর্ব-পাকিস্তান জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের আমীর। বাংলাদেশ জাতীয় মসজিদের খতীব মাওলানা উবায়দুল হক, হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রা.)-এর খলিফা। তিনি একদিন একান্ত আলোচনার ফাঁকে বলে গেলেন পাকিস্তানী কর্তৃক বাঙালি মুসলমানদের সাথে বৈষম্যের কিছু চিত্র, এমনকি সেখানের শিতিজনেরা বাঙালিদের সম্পর্কে কতটুকু ছোট ধারণা রাখতো, বাংলাদেশে কোনো যোগ্য আলেম আছেন বলেও সেখানের অনেক আলেমের ধারণা নেই ইত্যাদি অনেক কথা। তাঁর আলোচনার ফাঁকে আমি জানতে চাইলাম-তাহলে আপনারা পাকিস্তানিদের পে গেলেন কেনো? তিনি রাগ করে বললেন-‘তোমাকে কে বলেছে আমরা পাকিস্তানিদের পে ছিলাম? মুষ্টিমেয় কয়েকজন আলেম ছিলেন বলে সবাইকে অপবাদ দিতে যাও কেনো? আমরা নীরব থেকেছি কিংবা আমরা কথা বললেও তা প্রচার পায়নি, ফলে যে যার মতো করে আমাদেরকে ব্যাখ্যা করেছেন।’ মেজর জলিলের কাছে আমি জানতে চেয়েছিলাম-আপনি একজন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার, দীর্ঘদিন বাম রাজনীতি করেছেন, হঠাৎ হাফেজ্জী হুজুরের দলে আসলেন কেনো?
তিনি উত্তরে আমায় বলেছিলেন-‘দেখো আমি জাসদের রাজনীতি শুরু করেছিলাম এ দেশের মানুষের মুক্তির জন্য, একাত্তরে আমাদের যুদ্ধটাও ছিলো একই উদ্দেশ্যে। এক সময় আমার বিশ্বাস ছিলো কার্লমার্ক্সের দর্শনে মানুষের মুক্তি আসবে, দীর্ঘ অধ্যয়ন এবং অভিজ্ঞতার আলোকে বুঝতে পেরেছি, ইসলামই দিতে পারে মানুষের মুক্তি। নিজে তো ইসলামের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো যোগ্যতা রাখি না, তাই হাফেজ্জী হুজুরের দরবারে এসে তাওবা করে তাঁর নেতৃত্ব গ্রহণ করে নিলাম।’
Ñ মুক্তিযোদ্ধা হয়ে হাফিজ্জী হুজুরের মতো রাজাকারের সঙ্গ নিলেন?
Ñ ‘হাফেজ্জী হুজুর রাজাকার ছিলেন না। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ আমরা জালেমদের বিরুদ্ধে করেছি, ইসলামের বিরুদ্ধে নয়। আমাদের বাম রাজনীতিকরা বিশেষ একটি ইসলামি দলের চরিত্র দিয়ে ইসলাম আর উলামাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার এজন্যই করেছেন যাতে সাধারণ মানুষ ইসলামপন্থী না হয়ে স্যাকুলার হয়ে যায়। একাত্তরে এ দেশের উলামায়ে কেরাম ব্যাপকহারে রাজাকার ছিলেন না, বিভিন্ন অঞ্চলে দু-চারজন পাওয়া যাবে। আর আল-বদর, আল-শামসে শুধু জামাতে ইসলামির বড় নেতারা ছিলেন।’ দ্বিতীয় শাহ জালাল বলে খ্যাত সিলেট হযরত শাহ জালাল (র.)-এর মাজার সংলগ্ন মসজিদের দীর্ঘকালীন ইমাম এবং মাদ্রাসা ‘জামেয়া ক্বাসিমূল উলূম দরগা-এ-হযরত শাহ জালাল (র.)-এর প্রতিষ্ঠাতা হযরত হাফেজ মাওলানা আকবর আলী (র.) একদিন মাদ্রাসার ছাত্রদেরকে হেদায়তী বক্তব্য দিতে গিয়ে একাত্তরের স্মৃতিচারণ করে  বলেন-‘যুদ্ধ চলাকালীন সময় আমি এক দিন আছরের নামাজ শেষে দরগা মসজিদ থেকে বেরিয়ে হাটতে হাটতে চৌহাট্টা পয়েন্ট পৌঁছলে একদল মানুষ দৌঁড়ে আসে আমার দিকে এবং বলে হুজুর দেশের অবস্থা খুব খারাপ। পাকিস্তানিরা আমাদের উপর খুব জুলুম করছে, দোয়া করবেন যাতে আল্লাহ আমাদেরকে সহযোগিতা করেন। আমি বললাম-আল্লাহ সর্বদাই মজলুমদের পে থাকেন। তবে ফলাফল আসে সর্বদাই পরীার পর। ধর্য্য ধরে পরীা দিতে হয়। মোটকথা হলো মেহনত করে পরীা না দিলে ভালো ফলাফল আসে না। আমি সেই দিনের সেই মাহফিলে উপস্থিত ছিলাম। হাফেজ মাওলানা আকবর আলী (র.) সম্পর্কে যাদের সামান্যও ধারণা আছে তারা জানেন তিনির সামান্য কথার ভেতর অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লুকিয়ে থাকতো। এই বক্তব্য থেকে প্রমাণিত হয় যে, ইমাম সাহেব পাক বাহিনীর পে ছিলেন না।
মোটকথা, একাত্তরে পাকিস্তান সরকারসহ তাদের সহযোগী রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসের নেতা-কর্মীরা অত্যন্ত সুকৌশলে দেশের কিছু আলেমকে তাদের সাথে জড়িয়ে একটা হ-য-ব-র-ল অবস্থার সৃষ্টি করেছিল। তারা এটা করেছিলেন সমাজে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের জন্য। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বাহিনীতে যে ক-জন আলেমের নাম পাওয়া যায় তাদের অধিকাংশই জামাতে ইসলামি কিংবা তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্র সংঘের (বর্তমানে নাম পরিবর্তন করে ইসলামি ছাত্র শিবির) সাথে সম্পর্কিত। আল-শামস, আল-বদর বাহিনীতে জামাতে ইসলামি ছাড়া যাওয়া সম্ভব ছিলো না। শর্ষিণা আলিয়া মাদ্রাসা এবং শর্ষিণার পির মাওলানা আবু যাফর সালেহ কেন্দ্রীক আলেমদের অধিকাংশই পাকিস্তানের পে রাজাকার বাহিনীতে সক্রিয় ভূমিকা রাখার তথ্য বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া যায়। পির সাহেবের সাথে পাকিস্তান সরকারের খুব ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের একটা তথ্য মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী (র.)-এর জীবন-চরিত সম্পর্কিত স্মারকে অনেকে স্মৃতিচারণ করেছেন-‘১৯৬৫ সনের নির্বাচনে পূর্ব-পাকিস্তানে আয়ূব খান কম ভোট পাইয়াছিলো। তাহার কারণ জানার জন্য পূর্ব-পাকিস্তানে আসিয়া সেই জামানার বড় বড় আলেম ও পির মাশায়েখকে প্রেসিডেন্ট হাউসে ডাকাইলেন। মাওলানা শামছুল হক সাহেব দাওয়াত পেয়ে বললেনÑ‘এত বড় জালেম যে, কুরআনের উপর হস্তপে করিয়াছে, তাহার চেহারা আমি দেখিতে রাজী নই।’ কিন্তু মাওলানা নূর মোহাম্মদ আযমী সাহেবের অনুরোধে তিনি শেষ পর্যন্ত গেলেন। সেখানে পৌঁছে দেখা গেলো আয়ুব খানের সাথে শর্ষিণার পির সাহেবের খুশ গল্প চলছে। সঙ্গে সঙ্গে কিছু টিপ্পনিও কাটিতেছিলেন। প্রেসিডেন্ট আয়ূব শর্ষিণার পির মাওলানা আবু যাফর সালেহ সাহেবকে বললেন-দেখেন পির সাহেব আপনি অনেক মোটা হইয়া যাইতেছেন, খাবার কিছু কম খাইবেন। পির সাহেব হাসতে হাসতে বললেন-আল্লাহ খাওয়ান তাই খাই। আইয়ুব খান বললেন-মানুষ পির হয় তো খাওয়ার জন্যই। এই বাক্য শোনার সাথে সাথেই শামছুল হক সাহেব গোস্বাভরে কর্কশ স্বরে বলিয়া উঠিলেন-‘দেখুন প্রেসিডেন্ট সাহেব, আপনি মনে করিবেন না যে আমি একা আপনার নিকট আসিয়াছি। বরং পাকিস্তানের দশ কোটি মুসলমানের প হইতে আসিয়াছি। তাই আমিও দায়িত্ব ও মর্যাদায় প্রেসিডেন্ট সমতুল্য। দুই’শ বছরের ব্রিটিশ শাসন মুসলমানদের যে তি করিয়াছে, আপনি তাহার চাইতেও বেশি করিয়াছেন।’ (মাওলানা ফজলুর রহমান, মাওলানা আজিজুল হক প্রমুখ অনেকেই এ কথার স্মৃতিচারণ করেছেন স্মারক গ্রন্থে)। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ‘জননী ও জোৎস্না’-তে হুমায়ুন আহমদ নিজের ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণে শর্ষিণার পির সাহেব এবং শর্ষিণা আলীয়া মাদ্রাসার কথা উল্লেখ করেছেন। আরও কিছু তথ্য এভাবে পাওয়া যায়। শর্ষিণার অনেক আলেম-ছাত্র একাত্তরে ছিলেন রাজাকার বাহিনীতে। জামাতে ইসলামি এবং শর্ষিণা ব্যতীত দলবদ্ধভাবে আলেমরা একাত্তরে স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিলেন না। ইসলামপন্থীদের মধ্যে যারা রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস ছিলেন তারা নিজেদের গ্র“প বড় করতে আরো অনেক ইসলামী ব্যক্তিত্বের নাম ব্যবহার করেছেন, অথচ যাদের নাম ব্যবহার করা হয়েছে তারা অনেকেই এ সম্পর্কে কিছু জানতেন না। জানলেও পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে ছিলো যে কিছু করার নেই। আওয়ামীলীগের যে সব নেতারা ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে ১৫ আগস্টের পর নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মোশতাক সরকারে যোগ দিয়েছিলেন তাদের যেমন কিছু করার ছিলো না, তেমনি পরিস্থিতিতে আটকে গিয়েছিলেন এ দেশের উলামায়ে কেরাম ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে। সেই সময়ের প্রচার মাধ্যমগুলো ছিলো হয়তো পাক সরকার, পাক সরকারের সমর্থক কিংবা সরাসরি বামদের নিয়ন্ত্রণে। ফলে মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী আলেমদের কণ্ঠ সাধারণ মানুষ পর্যন্ত পৌঁছেনি। পাকিস্তান সরকারের সমর্থক পত্রিকাগুলো সর্বদা প্রচার করেছে এ দেশের আলেম-উলামা এবং সাধারণ মানুষ পাকিস্তানের প।ে মুক্তিবাহিনীর নাম দিয়ে যারা যুদ্ধ করছে ওরা মূলত হিন্দু এবং ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর লোক। একাত্তর নিয়ে উর্দু ভাষায় লেখা প্রায় সকল বই’তে এরকমের কথা লিখা হয়েছে। তারেক ওয়াহিদ বাট নামক পিপলস পার্র্র্র্র্টির নেতা তাঁর বইতে লিখেছেন-‘বাস্তবে বাঙালিরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ছিলো না। শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখরা হিন্দুদের চক্রান্তের শিকার। ‘র’-এর লোকেরা মুক্তিবাহিনীর পোশাক পরিধান করে পাকিস্তানিদের উপর আক্রমণ করতো। আবার পাকিস্তানি সৈন্যরাও বাঙালিদের উপর কোনো নির্যাতন করেনি, মূলত ‘র’-এর লোকেরা পাক সৈন্যদের পোশাক লাগিয়ে বাঙালিদের উপর আক্রমণ করতো, বাঙালি নারীদেরকে ধর্ষণ করতো ইত্যাদি’-(নিউ ওয়ার্ল্ডওয়াডার, ইসলাম আওর পাকিস্তান)। তারেক ওয়াহিদ বাটরা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য যেমন কেচ্ছা তৈরি করেছেন, তেমনি অনেক কেচ্ছা আলেমদের নিয়েও তৈরি করা হয়েছে, যেগুলোর কোনো ভিত্তি ছিলো না। উর্দু ভাষায় আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে বেশ কিছু বই পড়ে মনে হয়েছে ওরা ইতিহাস এবং ঘটনাকে বিকৃত করে উপস্থাপন করছেন। এসব বিকৃতির উত্তর হিসেবে ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে ‘সুকুতে মাশরিকি পাকিস্তান’ নামকরণে উর্দুতে আমার একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। আমি পাকিস্তানের বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে তা পাঠিয়েছি। এই গ্রন্থকে বলা যেতে পারে আত্মপ সমর্থনের ুদ্র প্রয়াশ মাত্র। আমি পাকিস্তান সফর করেছি, বিভিন্ন ব্যক্তিদের সাথে আলোচনা করেছি, এ সম্পর্কিত বিভিন্নজনের লেখা উর্দু বই পড়েছি। এর আলোকে আমি বলবো-পাকিস্তানিদের সবাই যে একাত্তরে ইয়াহিয়া-ভূট্টোর নির্যাতনকে সমর্থন করতেন তা কিন্তু নয়। মুফতি মাহমুদ, ডা. ইসরার আহমদ, কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজ, খান আব্দুল গাফফার খান, সাংবাদিক বদর মুনির, খান ওয়ালী খান প্রমুখরা সেই সময়ে প্রতিবাদ করলেও তা প্রচার পায়নি। বাংলাদেশের আলেমদের অবস্থাও  তাই। রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস যেমন নিজেদের পাল্লা ভারি দেখাতে আলেমদেরকে নিজেদের পে অপপ্রচার করেছেন, তেমনি বাম’রা এসব জেনেও আলেমদেরকে স্বাধীনতা বিরোধীদের সাথে জড়িয়ে অপপ্রচার করেছেন মানুষের ভেতর থেকে ইসলামের প্রভাব হ্রাস করার চিন্তায়। বিশেষ করে তারা স্বাধীনতার পরপর রাজাকার নিধনের নামে বাংলাদেশের বড় বড় আলেমদেরকে বন্দী করতে শুরু করেন। তারা ভেবেছিলেন স্বাধীনতা যুদ্ধে যখন মস্কো এবং ভারত সহযোগিতা করেছে, তা হলে এখন মার্ক্সবাদ প্রতিষ্ঠিত হতে বাধ্য। তবে সমস্যা হলো আলেম সমাজ, ইসলামি আম-জনতা। লেনিন এবং স্টালিং যা করেছেন তাসখন্দ, বোখারা, উজবেকিস্তান, চেচনিয়া ইত্যাদি মুসলিম দেশগুলোতে এখানেও তাই করতে হবে অর্থাৎ উলামাদেরকে স্তব্ধ করে দেওয়া। সুযোগ হলো, কিছু সংখ্যককে রাজাকারদের তালিকায় নাম পাওয়া গেছে, এই সুবর্ণ সুযোগ হেলায় হারানো যাবে না। তারা হিসাবে ভুল করে বসলেন। লেলিন-স্টালিং আর শেখ মুজিবুর রহমান এক জিনিস নয়, এই হিসাব তারা বোঝেননি। তারপরও রাশিয়ায় সত্তর বছরের কমিউনিস্ট ইতিহাস স্বাী-এত জুলুম-নির্যাতনের পরও সেখানে ইসলাম এবং আলেম সমাজকে মিটিয়ে দেওয়া যায়নি। পাকিস্তান সফরকালে সাবেক সোভিয়েত সাম্রাজ্যের একজন আলেম মুল্লা তাহেরজান-এর সাথে আমার ঘটনাচক্রে দেখা হয়ে যায়।  তিনি আমাকে বললেন-‘আমরা তো সত্তর বছর পাহাড়েÑজঙ্গলে মাদ্রাসা চালিয়েছি ইসলামের মক্কী জীবনের মতো। আজকে যারা চেচনিয়া, উজবেকিস্তান ইত্যাদি এলাকায় রাশিয়া এবং তার পুতুল সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন তারা তো সেই পাহাড়Ñজঙ্গলেরই ছাত্র।’ (বিস্তারিত দেখুন-লাহোর থেকে কান্দাহার, সৈয়দ মবনু)
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে দারুল উলূম দেওবন্দের ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের বাম এবং স্যাকুলারগণ যদি জ্ঞান রাখতেন তাহলে মাদ্রাসা শিা বন্ধ এবং আলেমদেরকে নিধনের চিন্তা ছেড়ে দিতেন। তাছাড়া আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে লেনিন বিপ্লবের কোনো যোগসূত্র ছিলো না। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং মুক্তিবাহিনীতে দু’একজন ছাড়া কেউ হয়তো স্যাকুলার ছিলো না। মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী’তো ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সরাসরি দারুল উলূম দেওবন্দের আলেমদের শিষ্য ছিলেন। এখনো টাঙ্গাইলে গেলে কাগমারীর মাওলানা শওকত আলী, মাওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজ-স্কুল এবং সন্তোষ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দ হোসেন আহমদ মাদানী (রা.) পাঠাগার ইত্যাদি এ কথার স্বাী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলো মাওলানা ভাসানীকর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। সন্তোষে মাওলানা যে মাদ্রাসা করেছিলেন তাও দারুল উলূম দেওবন্দ ধারার মাদ্রাসা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজনৈতিক ময়দানে মূলত মাওলানা ভাসানীর শিষ্য। তাছাড়া তিনি মাওলানা আতাহার আলী এবং মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরীর সংস্পর্শ পেয়েছেন। এই দুই নেতাকে ব্লাক-মেইল করে বামরা যা করতে চেয়েছিলেন, বঙ্গবন্ধু জেল থেকে ফিরে সাধারণ মা ঘোষণা দিয়ে সে পথ বন্ধ করে দিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যদি স্বাধীনতার পর মতায় না আসতেন হয়তো তিনির এমনভাবে জীবন দিতে হতো না, হয়তো বাকশালের মতো ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে জনপ্রিয়তা হ্রাসের পথে নিজেকে নিয়ে যেতেন না। কিন্তু বাংলাদেশের সামনে উপস্থিত তিনটি ষড়যন্ত্রের মোকাবেলা বঙ্গবন্ধুর মতো সাহসী দেশপ্রেমিক ছাড়া অন্য কারো পে হয়তো সম্ভব হতো না। যে তিনটি ষড়যন্ত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় জীবন দিয়ে মোকাবেলা করেছেন তা হলো-
এক. একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে ইসলামি পোশাক লাগিয়ে স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসদের ষড়যন্ত্র। এই ষড়যন্ত্রের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো দেশের জনগণ এবং মুসলিম দেশগুলোতে শেখ মুজিব এবং মুক্তিবাহিনীকে ইসলামদ্রোহী হিসেবে প্রচার করা। শেখ মুজিবুর রহমান অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে এই ষড়যন্ত্রের মোকাবেলা করে ঘোষণা করেছেন-‘আমরা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ।’ আলেমদের সম্মানার্থে স্বাধীনতা বিরোধীদের প্রতি সাধারণ মা, মাদ্রাসাগুলো খুলে দেওয়া, মদের লাইসেন্স বাতিল করা, ঘোড়দৌড় নিষিদ্ধ করা, ইসলামি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করা, ভারতের নিষেধাজ্ঞা উপো করে ইসলামি সম্মেলনে যোগ দেওয়া ইত্যাদি ছিলো তাঁর ষড়যন্ত্র মোকাবেলার অংশ।
দুই. নিজ দলের ভেতর ঢুকে যাওয়া বাম এবং বাইরের বাম-স্যাকুলারদের ষড়যন্ত্র। তাদের ষড়যন্ত্রের মধ্যে প্রধান ছিলো বঙ্গবন্ধুর আকাশস্পর্শী জনপ্রিয়তার ছত্রছায়ায় মার্ক্সবাদ, লেলিনবাদ প্রতিষ্ঠা করা। সেই পথের যাত্রা শুভ করতে ইসলাম এবং উলামাদেরকে ধ্বংস করে দেওয়া। বঙ্গবন্ধুকে এই ষড়যন্ত্রের মোকাবেলা করতে গিয়ে একটু হিমশিম খেতে হয়েছে। প্রথমত আলেমদের একটা অংশ রাজাকারীর অভিযোগে অভিযুক্ত, দ্বিতীয়ত কমিউনিস্ট পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পুঁজিবাদী মোড়ল আমেরিকার চাপাচাপির পাশাপাশি দলের ভেতরে-বাইরে এবং পত্রপত্রিকায় ছিলো বামদের বেশ প্রভাব। তারপরও আমরা স্বীকার করি তিনি সাধ্যমত মোকাবেলা করেছেন।
তিন. পুঁজিবাদী বিশ্বের ষড়যন্ত্রের সামনে অর্থনৈতিক মোকাবেলা। আধিপত্যবাদী ভারতের শকুনী ব্যবহারটা ছিলো অত্যন্ত মারাত্মক। একটি সদ্য স্বাধীন দেশে এমনি কত কিছুর প্রয়োজন, এর মধ্যে যদি চোর পিছনে লেগে যায়, তাহলে অবস্থাটা কি দাঁড়ায়?
বঙ্গবন্ধু এই সব ষড়যন্ত্রের সফল মোকাবেলা করেছেন সত্যি, কিন্তু তাঁর পা আটকে ফেলে বাম’দের ষড়যন্ত্রে-বাকশাল প্রতিষ্ঠা। বাকশাল নীতি ছিলো বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের আত্মহত্যা। এখানে বঙ্গবন্ধু চিন্তায় ভুল করে ফেলেছেন। তবু তা সত্য, তাঁর এ ভুলেও লুকিয়ে ছিলো দেশপ্রেম এবং বাঙালি জাতির মুক্তি। ষড়যন্ত্রকারীরা দীর্ঘদিনে তাকে বুঝিয়েছে-‘বাকশাল প্রতিষ্ঠা ছাড়া আপনি দেশের উন্নতি করতে পারবেন না।’ দেশ এবং জাতির প্রেমে আবেগি নেতা যখন উন্নয়নের হিসাব পেয়ে গেলেন তখন আর পিছনে থাকেন কীভাবে? বঙ্গবন্ধু গণনেতা ছিলেন কিন্তু অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি ইত্যাদি সম্পর্কে লেখাপড়ার পরিধি কম ছিলো বলে তাঁর সহকর্মীদের যারা মতামত প্রকাশ করেছেন তাদের সাথে আমরা দ্বি-মত করতে যাবো না, কিন্তু আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকাটা সকল যোগ্যতাকে অতিক্রম করে ফেলেছে। মাহমুদ আলী সাহেব (একাত্তর পূর্ব ওল-পাকিস্তানের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, ন্যাপের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, তৎকালীন নও বেলাল পত্রিকার সম্পাদক, আজীবন পাকিস্তানের সাংবিধানিক স্থায়ী মন্ত্রী ছিলেন) তাঁর ইসলামাবাদস্থ বাসায় ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে একাত্তর প্রসঙ্গে বিতর্কের মধ্যে আমাকে জিজ্ঞাস করেছিলেন-তোমরা শেখের মাঝে এমন কি যোগ্যতা দেখেছো যার জন্য সে যতটুকু যোগ্য নয় তা থেকে বেশি উপরে আসন দিয়ে বসালে?
আমি উত্তরে বলেছিলামÑসবচাইতে বড় যোগ্যতা আমাদের স্বাধীনতা। তিনি চিন্তা-চেতনায়, ভুলে-শুদ্ধে একজন বাঙালি, দেশপ্রেমিক, সাহসী নেতা ছিলেন। আমরা শুধু স্বাধীনতার জন্য তাঁর বাকি সব ত্র“টি মা করে দিলাম। তিনি ধর্মীয় নেতা ছিলেন না, তবে স্যাকুলারও ছিলেন না। শেখ মুজিব ছিলেন একজন বাঙালি দেশপ্রেমিক মুসলমান। আপনি এবং আপনাদের ভূট্টো-জিন্না-ইয়াহিয়া স্যাকুলার ছিলেন। জাতি আপনাদেরকে গ্রহণ করেনি।
মাহমুদ আলী সাহেব আমার কথায় রেগে গেলেও স্বস্নেহে বললেন-শেখ তো আমাদের হাতেই রাজনীতিতে আসলো, তাছাড়া ধানমন্ডিতে আমরা পাশাপাশি দীর্ঘ দিন ছিলাম। আমার থেকে বেশি তাকে তোমরা চিনার কথা নয়।
আমি বললাম-হয়তো, কিন্তু আপনাকে আমরা এখন আর চিনতে রাজী নই, যেহেতু আপনি দেশ ছেড়ে আছেন। মাহমুদ আলী সাহেবের সাথে আমার দীর্ঘ চার ঘণ্টা আলাপ হয়, যা বিস্তারিত উপস্থাপন করেছি আমার ‘লাহোর থেকে কান্দাহার’ গ্রন্থে।
শেখ মুজিবের সবচাইতে বড় যোগ্যতা-স্বাধীনতা ছাড়াও একাত্তরের রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসদেরকে মা করে দেওয়া। ব্যক্তিগতভাবে আমি এই সাধারণ মার পপাতি নই। প্রকৃত দোষীদের একটা শাস্তি হওয়া উচিত ছিলো। কিন্তু বাম-স্যাকুলারগণ এই ইস্যুকে সামনে রেখে গোটা ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে দিলে আসল-নকলের পার্থক্য করা অসম্ভব হয়ে গিয়েছিলো। ফলে প্রকৃত দোষীদের আর বিচার করা সম্ভব হলো না। এখনো বাংলাদেশে এই কাজটা হয়। কোনো ঘটনা ঘটলে রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিপরে উপর তথ্য ছাড়াই দোষারূপ শুরু করে দেয়। বিরোধী দল যখন সরকারি দলের উপর দোষ চাপিয়ে দিতে চায়, তখন সরকারি দল চেষ্টা করে বিরোধী দলের উপর দোষ চাপাতে এবং এই চাপাচাপির ফাঁক দিয়ে প্রকৃত দোষী বেঁচে যায়। একাত্তরের সময় যদি বঙ্গবন্ধু জেলে বন্দী না হতেন, তবে হয়তো উলামায়ে কেরাম স্বাধীনতা বিরোধীদের খপ্পরে আটকা পড়তেন না। ১৯৪৭ থেকে ১৯৮০ পর্যন্ত বাংলাদেশের আলেম সমাজ রাজনীতি থেকে বেশ দূরে ছিলেন। ফলে রাজনৈতিক সচেতনতার অভাবে তারা অনেকেই তথ্য বিভ্রান্তির শিকার হয়েছেন। স্বাধীনতা বিরোধীরা তাদের কাছে উপস্থাপন করেছে যে, ভারত, রাশিয়া বাংলাকে গ্রাস করার জন্য ইসলামি দেশ পাকিস্তান থেকে পৃথক করার ষড়যন্ত্রে মুক্তিবাহিনী গঠন করেছে। তারা অনেকে ভাবলেন তাহলে তো মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়। দাঁড়াতে গিয়ে যখন দেখলেন সবই মিথ্যা, তখন নীরব হয়ে বসে থাকলেন। কিন্তু অসৎ লোকেরা তাদের নাম ভাঙ্গিয়ে চলতে থাকে। আবার যারা রাজনৈতিক সচেতন ছিলেন; যেমন-মাওলানা মাহমুদুল হাসান, মাওলানা আজিজুল হক প্রমুখরা তখনও খপ্পরে পা দেননি। দেওবন্দী আলেমদেরকে শর্ষিণা এবং জামাতে ইসলামি ধারার লোকেরা যে কংগ্রেস, ভারতের দালাল ইত্যাদি বলে গালি দেন, তার প্রধান কারণ এই ধারার আলেমরা একাত্তরে পাকিস্তানের পে ময়দানে আসেননি। তৎকালীন সময় এই ধারার গোটা পাকিস্তানের নেতা মুফতি মাহমুদের বক্তব্য ইতোমধ্যে উল্লেখ করেছি। শেখ মুজিব নিজে এই ধারার আলেমদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখতেন। মাওলানা আতাউর রহমান খান (কিশোরগঞ্জের সাবেক এমপি) তাঁর এক স্মৃতিচারণে লিখেছেন-‘গাড়ি ইত্তেফাক অফিসের সামনে দাঁড় করিয়ে ড্রাইভার বাদে আমরা সবাই শায়েখদ্বয়ের (মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী এবং মাওলানা আতাহার আলী) পেছনে পেছনে গেলাম। তাঁরা খোঁজছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান সাহেবকে। মুজিবুর রহমান সাহেব তখন বড় কোনো নেতা ছিলেন না। তবে ছাত্র নেতা হিসেবে এবং জাতীয় নেতাদের নিকট যাতায়াত করতেন বলে অনেক কিছুই করতে পারতেন। আমরা অফিসের অনেক পিছনের এক রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখতে পেলাম, কয়েকজন লোক গল্পগুজবে মত্ত। আমরা গিয়ে দাঁড়াতেই শেখ মুজিব সাহেব চেয়ার ছেড়ে হন্তদন্ত অবস্থায় এগিয়ে এলেন। আর বিস্মিত কণ্ঠে বলতে লাগলেন-আরে, দাদা এখানে! হুযুর আপনি? দাদা এখানে কোনো খবর না দিয়েই সরাসরি উপস্থিত। কোনো দরকার হলে আমাকে একটু খবর দিলেই তো আমি উপস্থিত হতাম। আতাহার আলী সাহেব বললেন-আরে না না, খবর দেয়ার হলে তোমাকে খবরই দিতাম। এখানেই প্রয়োজন। এরপর শেখ সাহেব তাঁর অন্যান্য বন্ধু-বান্ধবদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে, সদর সাহেব এবং আতাহার আলী সাহেবকে বসালেন। উল্লেখ্য যে, শেখ মুজিবুর রহমান আতাহার আলী সাহেবকে দাদা এবং সদর সাহেবকে হুজুর বলে সম্বোধন করতেন’। (হযরত ফরিদপুরী (র.)-এর সান্নিধ্যে কিছুণ, মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী (র.) স্মারক গ্রন্থ, প্রকাশ ১৯৯৯ ইংরেজি)। আলেম সমাজদের মধ্যে দেশ ভাঙার বিরোধিতা ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে যেমন ছিলো তেমনি ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দেও দেখা গেছে। ভারতবর্ষ ভেঙে পাকিস্তানের জন্ম হোক, তা মাওলানা সৈয়দ হোসেন আহমদ মাদানী (র.)-সহ অনেক আলেমই মেনে নিতে পারেননি। আবার তাঁরই সহপাঠী বন্ধু মাওলানা শব্বির আহমদ উসমানী (র.) ১৯৪৭-এ পাকিস্তানের পে সক্রিয় ময়দানে ছিলেন। তারা দু-জনই ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা এবং ঐতিহাসিক রেশমি রুমাল আন্দোলনের প্রাণপুরুষ শায়খুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান (র.)-এর শিষ্য। ভারত ভাঙা-না ভাঙার প্রশ্নে এই দু-জনের নেতৃত্বে তখন ভারতবর্ষের আলেমরা দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। তেমনিভাবে পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার সময় পাকিস্তানের আলেমরা মেনে নিতে পারেননি। প্রকৃত অর্থে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানেরও ইচ্ছে ছিলো না পাকিস্তান ভেঙে যাক। তিনি পাকিস্তান ভাঙার কথা কোনোদিন বলেননি। পাকিস্তান ভাঙার কথা সর্বপ্রথম উচ্চারণ করেছেন সত্তরের নির্বাচনে পরাজিত পিপলস পার্র্র্র্র্টির নেতা জুলফিকার আলী ভূট্টো। বাংলার মানুষ পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে হলেও পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ২৫ মার্চের পূর্ব পর্যন্ত ছিলো না। ২৫ মার্চের রাত ইয়াহিয়া-ভূট্টোর নির্দেশে যখন ঢাকায় গণহত্যা শুরু হলো, তখন বাংলার সর্বস্তরের মানুষ পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে উঠাতে বাধ্য হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তখন চট্টগ্রামের কালুঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা করলেন মেজর জিয়াউর রহমান। শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হকের পর সর্বপ্রথম বাঙালি জাতির স্বাধীনতার কথা প্রকাশ্যে বলেছিলেন মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। মাওলানা ভাসানী সত্তরের নির্বাচনের সময় শ্লোগান দিয়েছিলেন-‘ভোটের বাক্সে লাথি মারো / বাংলাকে স্বাধীন করো’, ‘আসসালামুআলাইকুম পাকিস্তান’ ইত্যাদি। মাওলানা ভাসানী পল্টন ময়দানে এক বক্তব্যে বলেন-‘তের বছর আগে কাগমারী সম্মেলনে আমি আস্সালামু আলাইকুম বলেছিলাম। মরহুম শহিদ সোহরাওয়ার্দী তীè বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি হয়েও সেদিন আমার কথা অনুধাবন করতে পারেন নাই। কারণ আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে দুই অংশ যদি একত্রে থাকে তাহলে কালব্যাধি যèার জীবাণু যেমন দেহের হৃৎপিন্ডের দুই অংশকে নিঃশেষ করে দেয়, তেমনি পাকিস্তানের দুই অংশই বিনষ্ট হবে। তাই বলছিলাম যে, তোমরা তোমাদের শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করো এবং আমরা আমাদের শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করি। শেখ মুজিবুর রহমান আজ ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এসেছেন। আমি সাত কোটি বাঙালিকে আজ মোবারকবাদ জানাই এজন্য যে তারা এই বৃদ্ধের তের বছর আগের কথা এতদিন পর অনুধাবন করতে পেরেছে।’ (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র-দ্বিতীয় খণ্ড, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, তথ্য মন্ত্রণালয়)। বাংলাদেশে প্রচুর এমন আলেম রাজাকার ছিলেন যারা প্রকৃত পে জালেমদের হাত থেকে এলাকার জনসাধারণকে রার্থে এই কৌশল নিয়েছিলেন। উদাহরণস্বরূপ বলতে পারি হাফেজ মাওলানা নূর উদ্দিন শায়খে গহরপুরী (র.)-এর কথা। তিনি প্রচুর মুক্তিযোদ্ধাদেরকে পাকিস্তানি সৈন্যদের গুলির নিচ থেকে বাঁচিয়ে এনেছেন, যার মধ্যে আমার বড় চাচা ন্যাপের সুনামগঞ্জ জেলার দীর্ঘ সময়ের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আব্দুল হান্নানও। রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস যে কাজের জন্য গঠন করা হয়েছিলো প্রকৃত অর্থে এই সব আলেম সেই কাজে ছিলেন না। এই সব আলেমদের পাকিস্তানের সাথে কোনো সম্পর্কই ছিলো না। নেতা পর্যায়ের আলেমদের সাথে পাকিস্তান সরকারের দ্বন্দ্ব আইয়ূব খানের শাসনামল থেকেই শুরু হয়ে যায়। আলেম সমাজ পাকিস্তানের প্রতি আশাহত হয়ে গিয়েছিলেন অনেক পূর্বে। মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী তখন পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখেছিলেন-‘পাকিস্তান কোন দিকে যাচ্ছে?’ আয়ূব খানের ইসলাম বিরোধী পারিবারিক আইন, পাকিস্তানে ইসলামের পরিবর্তে ক্রমাগত সামরিক শাসন ইত্যাদিতে আশাহত হওয়ারই কথা। প্রকৃত অর্থে বাম-স্যাকুলারেরা এবং জামায়াতে ইসলামি-মুসলিমলীগ ইচ্ছেকৃত শেখ মুজিবুর রহমানকে বাম, স্যাকুলার এবং ইসলামদ্রোহী হিসেবে যেমন চিহ্নিত করেছে, তেমনি উলামায়ে কেরামদেরকে স্বাধীনতা বিরোধীদের অন্তর্ভূক্ত করে দেখাতে চেষ্টা করেছে। এসবই ছিলো সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। যা হওয়ার হয়ে গেছে, তবে এসবকে রাজনৈতিক উত্তেজনা মুক্ত হয়ে পর্যালোচনা করে আগামীকে সংশোধন করতে হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রীয়ভাবে সবাইকে সাধারণ মা করে দিয়েছেন। এখন আমরা সবাই স্বাধীন বাংলাদেশের সমপর্যায়ের নাগরিক। এসব নিয়ে নতুন করে সংঘাত সৃষ্টি করে লাভ নেই, শুধু ইতিহাস থেকে শিা নিয়ে সংশোধন প্রয়োজন। ইসলামপন্থী যারা স্বজাতি সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে জালেমদের প নিয়েছিলেন, তাদের উচিত মহান আল্লাহ পাকের দরবারে মা ভিা করা। শেখ মুজিব হয়তো রাজনৈতিক কারণে সাধারণ মা ঘোষণা করেছিলেন কিন্তু মহান আল্লাহ পাক কোনো প্রকার রাজনীতির কাছে দায়বদ্ধ নয়। যারা আল্লাহ-রাসুল (সা.) বা স্র্রষ্টা কিছুই মানেন না ‘স্যাকুলার’ তাদের কাছে বলার কিছু নেই, কিন্তু যারা বাম রাজনীতি করলেও স্যাকুলার নয়, তাদেরকেও বলবো যদি একাত্তর পরবর্তী সময়ে কিংবা একাত্তরে কোনো নিরীহ মানুষের উপর হিংসাবশত জুলুম করে থাকেন, তাহলে আল্লাহর কাছে মা প্রার্থনা করুন। ইচ্ছাকৃত-অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য আমাদের সবার তাওবা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশকে রার জন্য আমাদেরকে সংঘবদ্ধ হতে হবে। মানসিকভাবে প্রতিটি নাগরিককে প্রস্তুত থাকতে হবে, প্রয়োজনে দেশের জন্য আমরা সবাই একসাথে প্রাণ দেবো, তবু দেশের সামান্যও তি হতে দেবো না।

You may also like

Leave a Comment