268
অরণি সেমন্তি খান:আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ইলেকশন নিয়ে বিরাট উত্তেজনাকর কটা দিন পার হল। বাকি বিশ্বের পাশাপাশি বাংলাদেশেরও বহু মানুষের চোখ ছিল এই ইলেকশনের দিকে। ট্রাম্পের পরাজয় বা বাইডেনের জয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশও করেছেন অনেকে যে যাক! দুনিয়াটা বেঁচে গেল এইবারের মত। আসলেই কি তাই? বাংলাদেশের জন্য কি ভাল হল বাইডেন-হ্যারিস-ডেমোক্র্যাটদের এই জয়?
প্রথমেই মনে রাখা প্রয়োজন ট্রাম্পের ৪ বছর ফ্যাসিজমের উত্থান এবং একরোখা নীতির জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ইসলামোফোবিয়া এবং রেসিজমের যে চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত ট্রাম্প স্থাপন করেছেন, তাও মনে রাখার মত। আমরা অবশ্যই ভুলে যাই নি মেক্সিকান সীমান্তে অবুঝ বাচ্চাদের খাচায় পুরে রাখার কথা বা বিশ্ব জলবায়ুকে কাঁচকলা দেখিয়ে প্যারিস চুক্তি থেকে বেরিয়ে এসে পৃথিবীর ভবিষ্যৎকে, এর পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলে দেওয়ার কথা। অনেকে ট্রাম্পের প্রশংসা করছেন এস্ট্যাবলিশমেন্টের বিরোধি হিসেবে কিন্তু তাতে সরাসরি বাংলাদেশিদের লাভ হচ্ছে না ক্ষতি হচ্ছে নাকি নিউট্রাল সেটাও আলোচনাসাপেক্ষ। আরো মনে রাখার দরকার, বাংলাদেশের এখনকার সরকারের লাভ আর বাংলাদেশিদের লাভ এক কথা না।
অন্যদিকে বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নিয়ে যদি কথা বলি, সেটা খুব ভাল অবস্থায় নেই। করোনা মোকাবিলায় ব্যর্থতা আর দুর্নীতি কেচ্ছা সারা পৃথিবীতে জানাজানি তো হয়েছেই, উলটো জালিয়াতির করোনা সার্টিফিকেট নিয়ে বাংলাদেশিরা বিদেশে যাচ্ছে এমন ঘটনা প্রচার হয়ে ভাবমূর্তি আরো তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। করোনা ছাড়াও, বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি বা একদলীয় শাসন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করছে বিশ্বের নানান দেশ। সম্প্রতি বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম আর নির্যাতনের অভিযোগে র্যাবের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিতে প্রশাসনকে চিঠি দিয়েছেন মার্কিন সিনেটের বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক কমিটির ১০ সদস্য। সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যপার হচ্ছে, এই চিঠিটি একটি বাইপার্টিসান উদ্যোগ ছিল, অর্থাৎ আমেরিকার দুইটি প্রধান রাজনৈতিক দল থেকেই তারা এ ব্যপারে সম্মত হয়েছেন। আমরা ব্যপারটাকে এভাবে ভাবতে পারি, যে রিপাব্লিকান ক্ষমতায় আসুক কি ডেমোক্র্যাট, আমেরিকার খবরদারি বাংলাদেশ নিয়ে কমবে না। এবং খুব বেশি ছাড়ও কোন দিক থেকেই বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠী পাবে না। এটার ফল কি হবে, তা সময়ই বলে দিবে।
তাহলে আমেরিকার ইলেকশন থেকে আমাদের প্রাপ্তি কি? বলা যেতে পারে এতে অনেক নিদর্শন রয়েছে যার খারাপের থেকে ভাল টা বেছে আমরা শিক্ষা নিতে পারি।
আমেরিকাতে ইলেকশনের প্রেক্ষাপটে বিরাট কর্মযজ্ঞ চলে। সেখানে হ্যাচ এক্ট বলে এক ধরণের আইন বলবত আছে। যে সরকারি বেতনভুক্ত কর্মচারীরা রাজনৈতিক প্রচারণায় কতটুক শামিল হতে পারবে। বাংলাদেশে আমরা যেমন খোদ দেশের গোটা প্রশাসনকেই দেখি একটি দলকে ক্ষমতায় আনতে নগ্ন হয়ে ঝাপিয়ে পড়তে, সেখানে বিদেশি এসব আইন আমাদের দীর্ঘশ্বাসই তৈরি করে, যে গণতন্ত্র থেকে কতই না দূরে আমরা! এমন একটি গণতন্ত্র যেখানে এমনকি চিঠিতে ভোট দেওয়া যায় নির্ভয়ে, মৃত মানুষ এসে ভোট দিয়ে যায় না এবং রাতের বেলা পুলিশ শান্তিতে ঘুমাতে পারে। যখন আমেরিকা চেয়েছে, সে ট্রাম্পের মত গোঁয়ার একরোখা লোককে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় এনেছে। তার কাজ যখন ভাল লাগে নি, সেই আমেরিকাই ভোটের মাধ্যমে ট্রাম্পকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। এটাই গণতন্ত্রের শক্তি। যেখানে জনসমর্থন আদায় করা লাগে, জনগণের পালস বোঝা লাগে কোন পদক্ষেপ গ্রহণের আগে। আবার অন্যদিকে, আমেরিকা নিজ স্বার্থে যেই বাইডেন বা হ্যারিসকে ক্ষমতার মসনদে বসিয়েছে, তারা যে বিশ্বের জন্য ভাল হবে, এমন কোন গ্যারান্টি নাই। বাংলাতে একটা প্রবাদ আছে, ‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ, উলুখাগড়ার প্রাণান্ত’! এখানে আমরা সেই উলুখাগড়া, যারা মুদ্রার যেই পিঠই পড়ুক না কেন, দিনশেষে নিজের জীবনের লড়াই করতে করতেই দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাচ্ছে। তার দিন বদলের গান অন্য কেউ গেয়ে দিবে না। সে নিজেও গাইতে পারছে না, কারণ গলা টিপে ধরা হচ্ছে। বাক স্বাধীনতা তো মরে গেছে সেই কবেই, ধীরে ধীরে চিন্তা স্বাধীনতাও লোপ পাচ্ছে। কর্পূরের মত উবে যাচ্ছে গণতন্ত্র আর হিউম্যান রাইটস।
লেখক: যুগ্ম আহ্বায়ক, স্বতন্ত্র জোট।
ভিপি পদপ্রার্থী, কেন্দ্রীয় সংসদ, ডাকসু নির্বাচন -২০১৯
ঢাবি’র জীন প্রকৌশল ও জীব প্রযুক্তি বিভাগের ডীনস এওয়ার্ড প্রাপ্ত প্রাক্তন শিক্ষার্থী।
ভিপি পদপ্রার্থী, কেন্দ্রীয় সংসদ, ডাকসু নির্বাচন -২০১৯
ঢাবি’র জীন প্রকৌশল ও জীব প্রযুক্তি বিভাগের ডীনস এওয়ার্ড প্রাপ্ত প্রাক্তন শিক্ষার্থী।
