প্রত্যাশার চেয়ে প্রাপ্তি বেশী

by News Room

জান্নাতুল শুভ্রা মনি:অনেক ছোটবেলা থেকে লিখি আমি। বাবা-মা, বড় বোন লেখালেখির সাথে জড়িত ছিলেন, বাবা একজন গ্রন্থাগারিক ছিলেন, সেই সুবাদে সাহিত্য পরিবেশ সবসময়ই বিরাজ করত আমাদের পরিবারে। আর মা, সেই আশির দশকের বেগম পত্রিকার নিয়মিত লেখিকা ছিলেন। বড় বোন, বর্তমানে মেডিকেলের ছাত্রী, পড়াশোনায় অসম্ভব মেধাবী। পড়াশোনার পাশাপাশি লেখা-লেখি করত। আমি তখন ছোট, কিন্তু নিজেকে কেন জানি অবসরে ঢেকী ভাবতে শুরু করি তখন থেকেই। কারণ- আমি খেলাধুলা বন্ধুদের সাথে নদীতে ঝাপিয়ে পড়া, হই চই, ছুটাছুটি ছাড়া কিচ্ছু পারি না! বাবা, মা, বড় বোনের এসব প্রতিভা দেখে আমারও ভীষণ ইচ্ছে করত, আমিও লেখালেখি করি। তখন ক্লাস ফোর ফাইভে পড়ি মাত্র! কতো চেষ্টা আমার, ছড়ায় ছন্দের মিল ঘটাব। কিন্তু না। তা আর হয়ে ওঠে না। কিছুতেই পারি না আপুর মতো লিখতে। মায়ের একটা ‘মৃত্যু’ নামক কবিতা পড়ে কেঁদেছিলাম সেই ছোট বেলাতেই। কিন্তু কবিতা- ছড়া কিভাবে লিখতে হয় মোটেও তা জানতাম না। তাই মনের ক্ষোভে একা একা চোখ টিপে টিপে কাঁদতাম। ঐ বয়সে আমি আমার আববাকে অনুকরণ করতাম খু-উ-উ-ব আর অনুসরণ করতাম আপুকে। যেন আপুর মতো হতে পারি। আববা কীভাবে কথা বলেন, কীভাবে গাম্ভীর্য নিয়ে বই পড়েন যার কারণে তার ব্যক্তিত্ব বাড়িয়ে দিতে দ্বিগুণ। কিভাবে হাসেন। প্রাণখুলা উচ্চসিত হাসি, কিভাবে অন্যকে হাসান সব। সব অনুকরণ করতাম নীরবে একা একা। সবসময় আববাকে দেখতাম মোটা মোটা বই পড়তেন।
আমি লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতাম, আর অপেক্ষা করতাম, কখন বই রেখে ঘর থেকে বের হবেন, আর আমি ঐ মোটা বইটি পড়তে পারব? আববা যখনই ঘর থেকে বের হয়ে অফিসে যেতেন, অমনি আমি পা গুটিয়ে গুটিয়ে হাজির হতাম বইয়ের কাছে। তখন আমি ক্লাস ফাইভে পড়ি ঐ সময়-ই আমি সুনীলগঙ্গোপাধ্যায়ের ‘পূর্ব পশ্চিম’ এবং জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’ ফ্র্যাকেনস্টাইন মেক্সিম গোর্কির মা এবং ডেল কার্নেগীর বইটি শেষ করি। পূর্ব পশ্চিম এবং একাত্তরের দিনগুলো পড়ে কান্না এসেছিল অনেক। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আর জীবনেও বই পড়ব না। কারণ ঐ বইগুলো আমার শিশু মনেও আঘাত করে প্রচন্ডভাবে।
ছোটবেলা থেকে আমি কখনও শান্ত, কখনও চঞ্চল। রাগ টাগ মোটেও করতাম না। চিনতামই না ঐ জিনিসগুলো কি। তবে, অভিমান ছিল প্রচন্ড। জেদিও ছিলাম না খুব একটা। তবে- যখন আত্মসম্মানে আঘাত লাগত কোনো কারণে তখন প্রচন্ড জেদী হয়ে উঠতাম! আর সেই জেদটাও ছিল নীরবে। সেই জেদটা এখনও রয়ে গেছে। তবে, যুক্ত হয়েছে আরও কিছু। আর তা হচ্ছে স্বার্থপর, বিশ্বাসঘাতক, মিথ্যাবাদী আত্মঅহংকারী, এই টাইপের ব্যক্তিদের আমি সব সময়ই এভয়েড করে চলি। যদিও সে আমার পরম বন্ধু হোক। ছোটবেলায় কবিতা ছড়া লিখতাম বলে আমাদের এলাকার ছোট বড় অনেকেই মজা মেরে ডাকত বাধা কবি, পাতা কবি। তাদের ওপর তখন আমার প্রচন্ড রাগ হতো, সেই সাথে বেড়ে যেতো জেদও। তখন থেকেই মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, প্রচন্ড জেদী হয়ে, আমি লিখব! কবিতা, গল্প, উপন্যাস সব। সব। আমি লিখব। সবাইকেই দেখিয়ে দেব আমি পেরেছি দেখো। তবে- সত্যিকার অর্থে, লেখালেখিটা হচ্ছে ‘গড গিফটেড’ বিষয়। এটা যেমন গুলি দিলেও বের হয় না,তেমনি জেদী হয়ে উঠলেও কাজ হয় না। এটা সম্পূর্ণই আধ্যাত্মিক ব্যাপার। মনের ভেতরের জিনিস। এরপর থেকে চেয়ার, টেবিলে বসে থাকতাম কবিতা, ছড়া লেখার আশায়। কিন্তু- ছন্দ মেলাতে বার বারই হিমশিম খেতাম। কোনো ছন্দ খুঁজেই পেতাম না। কোনো সাবজেক্টও খুঁজে পেতাম না।
এরকম গেল অনেক দিন। হঠাৎ একদিন নীরব মনে শুয়ে আছি, কী ভাবছি জানি না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় একটা একটা করে কবিতার লাইন ভেতর থেকে অটোমেটিক বের হয়ে আসছে। এক লাইন দু-লাইন করে করে। আমি তো লাফ দিয়ে বিছানা থেকে ওঠে, সাথে সাথে ডায়েরিতে লিখে রাখি। গভীর রাতে যখন ঘুমাচ্ছি, হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেলে দুই একটা কবিতার লাইন বের হয়ে আসতো এবং সাথে সাথে উঠে লিখে রাখতাম ডায়েরিতে। এভাবে করতে করতে দশ বারোটা কবিতা হয়ে গেলো। একদিন আববাকে শুনালাম। আববা আমার কবিতা শুনে ঐ দিন হুঃ! হুঃ! করে কেঁদে ফেলেছিলেন আমি তা দেখে একটু অপ্রস্ত্তত হয়ে যাই, নিজেকে অপরাধীও ভাবতে থাকি! মাঝে মধ্যে ছড়া লিখে, ছড়ায়-ছড়ায় টাকা চাইতাম আববার কাছে। আববাতো হাসতে হাসতে পকেট থেকে তখন টাকা বের করে দিতেন। এভাবে লিখতে থাকি প্রতিদিন। পড়াশোনা স্কুল। ওদিকে মনোযোগ নেই। বন্ধুদের সাথে খেলা করতাম আর বাসায় আসলেই ছড়া লিখতাম। লিখতে লিখতে খাতাার পাতা ভরিয়ে দিতাম। এমন করি বলে আম্মা রাগ হতেন, বেশি রাগ হতো আপু। সেতো সারা দিন পড়াশোনা নিয়ে পড়ে থাকত। খুব ভালো ছাত্রী ছিল তো তাই! আববা কিছুই বলতেন না। এর অনেক দিন পর ২০০৫ এর দিকে, আমার নানা সুজাত আহমেদ চৌধুরীর বই বের হলো অনেকগুলো। ঐ দিন কিছু বই নিয়ে নানা বাসায় এলেন।
আমি তখন নানা ভাইকে আমার একটা কবিতা শুনালাম। নানা ভাই তা শুনার পর বললেন আরেকটা শোনাও। আমি শুনালাম। এভাবে শুনতে শুনতে মোট ১০টা কবিতা শুনলেন। সবগুলো শোনার পর কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন? তাকালেন আমার দিকে গভীরভাবে। আমি তো ভয়ে আর লজ্জায় আধমরা। ভাবলাম মনে মনে হায় আল্লাহ। কেন যে শোনাতে গেলাম।স্কুলে, কলেজে স্যারদের মুখ থেকে কবি ডাকটি শুনতে পেতাম। ভার্সিটিতে এসেও তাই শুনতে হয়। সেই সাথে জার্নালিস্টও। স্যারদের বিদায় অনুষ্ঠানে আমাকে উপস্থিত সময়ে কবিতা লিখে আবৃত্তি করতে হয়। লেখালেকি করি বলেই অনেকগুলো সংগঠনের সাথে আমাকে জড়িত করা হয়েছে। অনেকের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সেই সাথে ইর্ষাও পেয়েছি প্রচন্ড। তারপরেও নিজেকে নিয়ে অতৃপ্তই থেকে গেছে সবসময়। এ কোনো আবেগী কাব্যময়ী কথা নয়। এ আমার মনের ভেতরের কথা যদি অসম্ভব সম্মানিত বিশেষ ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে না পারি, তবে যেন মৃত্যুই হয় আমার কাম্য। নিজেকে নিয়ে গর্ব করার মতো, অহংকার করার মতো কোনো কৃতিত্ব করতে পেরেছি বলে মনে হয়নি একটিবারও। গত ২৩ মার্চ কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের সাহিত্য প্রাঙ্গণে বই মেলার ভিড় দেখে রিক্সা থেকে নেমে পড়ি ভার্সিটি থেকে যাবার পথে। ভেতরে অনেকগুলো স্টল ছিল, কিন্তু কেন জানি না, একেবারে ভেতরের একদম কর্নারের স্টলটি আমাকে প্রচন্ডভাবে টানছিল। আমি একমনে হেঁটে হেঁটে এ কর্নারের স্টলের সামনে দাঁড়াই। ভেতরে দেখতে পেলাম রিমা বেগম পপি আপাকে। তিনি যে লেখেন তা আমি জানতাম না। আমি যখন থেকেলেখা প্রকাশ করি তখনও তাকে লিখতে দেখিনি। যাই হোক ভালো লাগলো দেখে বইমেলায়। বামে ঘাড় ফেরাতেই, যাকে বসে থাকতে দেখলাম, তাঁকে দেখেই আমি খুশীতে চমকে ওঠি। আপা আপনি? উনি হাসি হাসি মুখে তাকালেন আমার দিকে। আমি প্রশ্ন করলাম, এবার কার কার বই বের হয়েছে বই মেলায়? পপি আপা উত্তর দিলেন একমাত্র আমার বই ছাড়া বাকি সবার বই বের হয়েছে বই মেলায়। আমি আমেনা আপার দিকে তাকালাম। পপি আপা বললেন-উনি আমেনা আপা। আমি বললাম, আমি আপনাকে চিনতে পেরেছি, দুই বছর আগে আপনি আমাকে অটোগ্রাফ দিয়েছিলেন। উনি তো বসা অবস্থা থেকে ওঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন। প্রাণখোলা হাসি দিয়ে প্রচন্ড মমতাময়ী মায়ের মতো এতো অমায়িকভাবে জিজ্ঞেস করলেন হ্যাঁ। তোমার মনে আছে? আমি বললাম কি যে বলেন আপা। আমার মনে থাকবে না? আপনি ‘আমেনা আফতাব না?’ আমাকে চিনতে পেরেছেন? উনি চেহারা চিনতে পারছেন আবার পারছেনও না। আমি বললাম-আমি বুঝতে পারছি না আমাকে চিনতে পারছেন কী-না। আমি জান্নাতুল শুভ্রা মনি। বলতেই তিনি আবারও সেই প্রাণখোলা স্নিগ্ধ হাসি দিয়ে স্নেহমাখা স্বরে বললেন-ওমা! চিনব না! চিনব না কেন? তোমার অনেক লেখা আমাদের সাথে প্রকাশ হয়েছে তুমি তো খুব ভালো লিখো ইত্যাদি! ইত্যাদি। আমেনা আপা তারপর আমাকে বসতে বললেন অনেক সম্মান দেখিয়ে। আমি তো হতবাক হয়ে পড়েছি। কীভাবে তার সামনে বসব। তারপরেও বসলাম। তিনি সেই সহজ-সরল নির্মল হাসি হেসে কথা বলছেন আমার সাথে। মনে হচ্ছে কত দিনের পরিচয়। বয়সের এতো ব্যবধান মনেই হচ্ছিল না। কত আপনজনের মতো কথা বলছিলেন। আমি ভার্সিটির ক্লাস করে ক্লামত্ম ছিলাম যদিও কিন্তু আমেনা আপার অসাধারণ ব্যবহারের জন্য আমার সব ক্লামিত্ম নিমিষেই চলে যায়। আমার একটুও আর উঠে আসতে ইচ্ছে করেনি। অধীর আগ্রহে শুনছি তার কথাগুলো। তাকে সামনাসামনি যতোই দেখছি ততই অবাক লাগছে। আমেনা আপাকে দেখলে মনে হয় না হিংসা বিদ্বেষ, রাগ, ÿÿাভ এই জিনিসগুলো তাঁর মধ্যে আছে। শুধু আছে ভালোবাসা আর পবিত্রতা। একটু পর হঠাৎ ঝড়ো হাওয়ায় মতো চঞ্চল পদÿÿপে আরেকজন আপা এসে ঢুকলেন। আমেনা আপা তাকে বললেন-একে চিনতে পেরেছো? উনি প্রশ্নবোধক দৃষ্টি নিয়ে তাকালেন আমার দিকে। আমেনা আপা বললেন-এ হলো ‘জান্নাতুল শুভ্রা মনি।’ লÿ্য করলাম, আমার নামটা শোনার পর তার মুগ্ধ করা দৃষ্টি আমার ওপর পড়ল। মিষ্টি একটি হাসি উপহার দিলেন। তারপর বললেন আমি ইসমত হানিফা চৌধুরী। নামটি শোনার সাথে সাথেই আমার মন নেচে ওঠলো। আমি আমার এই অনুভূতি প্রকাশ করতেই ইছমত আপা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। আমি তখন কেন জানি না, আবেগাপস্নুত হয়ে কেঁদে ফেলেছিলাম একটুর জন্য। অনেক কষ্টে চোখের পানি আড়াল করলাম। আমার একটাই বদ অভ্যাস আমি মিথ্যে প্রশংসায় কারও মন জয় করতে চাই না এবং পারিওনা। প্রশংসা আড়ালেই করতে পছন্দ করি, তবে দোষটুকু সামনা-সামনিই প্রকাশ করি আর তাই অনেকেই আমাকে অন্য দৃষ্টিতে দেখে। আমি যদি কোনো বই মেলাতে গিয়ে দেখতে পেতাম, সেখানে কাজী নজরম্নল/রবীন্দ্রনাথ এসেছেন তাদের দেখে আমার যে অনুভূতি হতো, আপাদের দেখে এক বিন্দুও কম হয়নি। আমি তাদের সাথে সিলেটের ডাকে লিখেছি অনেকবার। অনেকেই বলত তারা আমার সমবয়সী। কিন্তু আজ যখন দেখলাম এবং জানলাম তাদের সম্পর্কে তখন নিজের দুঃসাহসের জন্য অবাক হই। সেই সাথে গর্বে বুকটা ভরে ওঠে। ইছমত আপা বললেন-তোমাকে দুই বছর পর্যমত্ম খুঁজছি। কিন্তু তোমাকে পাইনি। তুমি খুব ভালো লিখো। আমিতো লজ্জায়শেষ। তিনি জানতে চাইলেন আমি এর মধ্যে কী পড়ছি। কিছুÿণের মধ্যেই হঠাৎ আমার স্কুলের ম্যাডাম এসে হাজির। আমাকে দেখেই বললেন তুমি এখানে। তারপর ইছমত আপাকে বললেন-এতো আমার ছাত্রী। ওর কথাই তো তোমাকে বলতাম শুভ্রা লেখালেখি করে ম্যাডাম আবার ইছমত আপার বান্ধবী। ইছমত আপা হেসে বললেন আমি তো একেই খুঁজেছি অনেক। ইছমত আপা অনেক চটপটে ধরনের। চঞ্চল। অসম্ভব স্মার্ট। চোখগুলো সুন্দর। স্নেহশীল তো বটেই। আমেনা আপার কাছ থেকে পেয়েছি ভলোবাসার গভীরতা। মনে হয় কোনো দুঃখী হতাশাগ্রসত্ম মানুষ তার কাছে গেলে তিনি তাদের হতাশা দূর করে শামিত্মর পরশ বুলিয়ে দেবেন। আর ইছমত আপার কাছে যদি কোনো ক্লামত্ম পথিক এগিয়ে যায় তবে তিনি নিমিষেই তার চঞ্চলতা দিয়ে ক্লামিত্ম সারিয়ে উচ্ছ্বল করে তুলবেন। ইছমত আপা যখন বলছিলেন আমাকে খুঁজছেন কারণ আমি লেখি ভালো, এটা শুনে আমার মনে পড়ে গেল, যে আমি লেখা প্রকাশ করতে ভয়ে ভড়কে যেতাম। সেই আমাকে খুঁজছিলেন। সেই আমি কী-না আজ এতো ভালো লেখকদের পাশে। ইছমত আপা খুব ব্যসত্ম বইমেলা নিয়ে। আমাকে বললেন-শুভ্রা তুমি বসো, আমি একটু আসছি। এর মধ্যে একজন মহিলা আসেন। সাথে একজন লোক। তারা আমেনা আপার সাথে ছবি তুলেন। আমি সরে দাঁড়ালাম। আমেনা আপা তখন ডাক দিলেন তুমিও এসো। পরিচয় করিয়ে দিলেন নাঈমা চৌধুরী। আমি চিনতে পারলাম তার নাম। তারপর আমার পরিচয় দিলেন-এ হলো জান্নাতুল শুভ্রা মনি। এটা শুনেই নাঈমা আপা বললেন-ও। আপনি জান্নাতুল শুভ্রা? আপনি তো দারম্নণ লিখেন। আমি লজ্জাবনত হয়ে মাথা নিচু করলাম। ছবি তুললেন আমার সাথেও। পরদিন … আমি ভার্সিটি শেষে আবারও গিয়ে হাজির হই বই মেলায়। আমেনা আপার কাছে। তিনি আমাকে দেখেই স্বচ্ছ একটা হাসি দিলেন। বললেন-তুমি এসেছো শুভ্রা? আমি মনে মনে তোমার জন্য অপেÿা করছিলাম। তাই তোমার জন্যে একটা বনলতা নিয়ে এলাম। তুমি এতে লেখা পাঠিয়ো। অবাক লাগছে খুব। তারা এতো উদার মনের প্রাণখোলা হন কীভাবে। যতোÿণ বসলাম, অনেক কিছু শিখলাম। তাদের কাছ থেকে। হয়ত তারা বুঝতেই পারবেন না। ২৬ মার্চ বইমেলা শেষের দিন। আমি আবারও গেলাম তাদের স্নেহের টানে। উদ্দেশ্য আবারও একবার দেখা। এদিন গিয়ে দেখি আমেনা আপা এবং ইছমত আপায় মাঝখানে বসে আছেন আরও দুইজন মহিলা। ইছমত আপা ও আমেনা আপা পরিচয় করিয়ে দিলেন। তিনি হচ্ছে লাভলী আপা। লাভলী আপাকে সালাম দিলাম। আমি নিজের পরিচয় দিতে লজ্জা পাই। কারণ আমি এখনও পরিচয় দেবার মতো তেমন কেউ হয়ে উঠিনি। লাভলী আপাকে ইছমত আপা বললেন-এ হলো জান্নাতুল শুভ্রা মনি, এও লেখালেখি করে। তিনি মাথা নাড়লেন। আমি নিজেকে আবারও শাসাচ্ছিলাম কেন যে তাদের মতো এতো বড় বড় লেখকদের সাথে আমার মতো ক্ষুদ্র লেখকদের লেখা প্রকাশ হয়। লাভলী আপা একটু গম্ভীর প্রকৃতির। কথা হয়তো কম বলেন। ধারণা মিথ্যেও হতে পারে। হয়তো আমি অনেক জুনিয়র বলে ঐভাবে কথা বলেননি। তাদের সাথে কথা হলো দেখা হলো। ইছমত আপাকে খুব সুন্দর লাগছিল লাল সবুজের একটা শাড়ি পরেছিলেন। বই মেলা শেষ হবে। আর দেখা হবে না। আমার খুব ইচ্ছে ছিল তাদেরকে বিশেষ সুন্দর কিছু উপহার দেব স্মৃতি স্বরূপ। তারা হয়ত জানেন না, কতোটা রেসপেক্টেবল পার্সন তারা আমার কাছে। আমি কতোটা তৃপ্ত। কতোটা ধন্য। কতটা সফল তাদের সাথে পরিচিত হয়ে। পারলাম না তাদেরকে প্রাণ খুলে কিছু উপহার দিতে। কিন্তু তারা আমাকে উপহার দিয়েছেন। আমেনা আপা আমাকে তার লেখা গল্পের বই ডোরাকাটা লাল শাড়ি উপহার দেন। চমৎকার বইটি। এতো সুন্দর লেখার স্টাইল। ইছমত আপা আমাকে দিলেন ছোটদের মাথা কাটা ভূত। ছোটবেলায় ঐ সব বইয়ের জন্য কী পরিমাণ পাগল যে ছিলাম। আমার এক ভাইয়ের ছেলে বয়স পাঁচ-ছয় হবে। প্রতিদিন বইটি নিয়ে যেতে চায়। কাড়া-কাড়ি করে নিয়ে যাবার জন্য। কিন্তু বইটি আমি দেইনা তাকে কারণ-এটা যে আমাকে ইছমত আপা দিয়েছেন উপহার স্বরূপ। লাভলী আপা আকাশ প্রদীপ বইটি দিলেন। প্রতিদানে কীভাবে ধন্যবাদ দেব ভুলেই গেলাম। অটোগ্রাফ চাইলাম তার কাছে। তিনি বললেন-তোমাকেও আবার অটোগ্রাফ দিতে হবে নাকি? মনে মনে লজ্জা পেলাম, কারণ আমি তো নিজেকে লেখক পরিচয় দিতে দ্বিধাবোধ করি। আমি তো তাদের কাছে ক্ষুদ্র এখনও। তাই অটোগ্রাফ তো আমার চাই। এরপর জামিল আহমেদও তার এককপি বই উপহার দিলেন। এগুলো আমার সারা জীবনের সম্বল। আমি তাদের সম্মান, ভক্তি, শ্রদ্ধা মন থেকে করি। কৃত্রিমতা আমার মধ্যে নেই। যারা আত্ম অহংকার নিয়ে বড়াই করে, বড়াই করে সামান্য গুণাবলী নিয়ে যারা নিজেকে নিজেই শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করে, আমি তাদের থেকে দূরে অবস্থান করি। আমার মুখ থেকে তাদের প্রতি প্রশংসার একটি বাক্যও উচ্চারিত হয় না। আমি যদি কাউকে সম্মান করি, সত্যিকার অর্থে, তাহলে আমাকেও অন্যজন সম্মান করবে, এটাই সত্য। আর গুণীজনদের সম্মান করা তো অবশ্যই কর্তব্য। আমি জানি না কতোটুকু ভক্তি দেখাতে পেরেছি। তবে-যাই দেখিয়েছি তা ছিল আমার মনের ভেতরের অকৃত্রিম ভালোবাসা। তাদের মতো এতো বড়-বড় লেখকরা আমার মতো ক্ষুদ্র লেখিকাকে যে স্নেহ সম্মান দিয়েছেন, দেখিয়েছেন, তা মনে করি আমি প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বড় প্রাপ্তি আমার জীবনে।

You may also like

Leave a Comment