প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকারকে নতুন নির্বাচন দিতে হবে : ব্যারিস্টার মঈনুল

by News Room

নিউজ ডেস্ক:
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন বলেছেন, আজকের সঙ্কটের উৎস নির্বাচন। এই সমস্যার সমাধান তো প্রধানমন্ত্রীর হাতে। তিনি নতুন নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীকে সেই প্রতিশ্রুতি রাখতে হবে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকারকে নতুন নির্বাচন দিতে হবে। নির্বাচন দিলে সন্ত্রাসী তৎপরতা চালাবার সুযোগ কারো থাকবে না।
আজ শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে প্রখ্যাত সাংবাদিক এ বি এম মুসার স্মরণ সভা ও মুক্ত আলোচনা সভায় তিনি একথা বলেন।
এবিএম মূসা-সেতারা মূসা ফাউন্ডেশন এ সভার আয়োজন করে।
কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদের সভাপতিত্বে ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌসের পরিচালনায় মুক্ত আলোচনায় আরো বক্তব্য রাখেন, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, প্রবীণ সাংবাদিক আমানুল্লাহ কবীর, নিউজ টুডের সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ, মানব জমিনের সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, বিএফইউজের একাংশের সভাপতি ও বৈশাখী টিভির সিইও মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সহসভাপতি কাজী রওনাক হোসেন, সাংবাদিক আব্দুর রহীম, গোলাম মর্তুজ, এবিএম মূসার মেয়ে রুমা মূসা প্রমুখ।
আরো উপস্থিত ছিলেন- মরহুম সাংবাদিক এবিএম মূসার সহধর্মিণী সেতারা মূসা।
ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন আরো বলেন, এখন কথা বলতে গেলে ভয় পাই। মূসা ভাই নীরব থাকা সমর্থন করেননি। এজন্য বলছি, আজকের এই সঙ্কট ভয়াবহ রূপ নেয়ার আগেই সতর্ক করে গেছেন মূসা ভাই। এই সঙ্কটের রাজনৈতিক সমাধানের কথা বলেছিলেন। অস্ত্রের ভাষা যে রাজনীতির ভাষা হতে পারে না, এ কথাও জোর দিয়ে বলে গেছেন।
তিনি বলেন, নির্বাচন দিলেই সঙ্কট কেটে যাবে। সঙ্কট সমাধানে কার সাথে সংলাপ হবে, কে রাজাকার, কে সন্ত্রাসী, এটা দেখার বিষয় না। সমস্যা সমাধান করবেন আবার কান্নাকাটি করবেন এটা আমাদের দেখার বিষয় না।
ব্যারিস্টার মঈনুল আরো বলেন, ক্ষমতাসীনরা নির্বাচন বাদ দিয়ে পুলিশী কায়দায় সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ করছে। ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারে প্রাপ্ত সুবিধাবাদীদের কথা গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলছেন আবার সবার সাথে আলোচনা করে পুর্নাঙ্গ নির্বাচন দেয়া হবে। তাই ৫ জানুয়ারি নির্বাচন তার মতেই ছিল অপূর্ণাঙ্গ নির্বাচন।
তিনি এ সময় বলেন, সেই প্রতিশ্রুতির কথা তাকে স্বরণ করিয়ে দিতে আমাদের লজ্জা কেন।
তিনি বলেন, আজকে আমরা সাংবাদিক-আইনজীবীরা নিজেদের শক্তি হারিয়ে দলীয় শক্তিতে পরিণত হয়েছি। এতে আমরা নিজেরাই শক্তিহীন হইনি, পুরো জাতিকে শক্তিহীন করছি। গণতন্ত্র মাঠে মারা যাচ্ছে। গণতন্ত্র রক্ষার শক্তি রাজনীতিবিদরা নন। সাংবাদিক ও আইনজীবীদের এ কাজ করতে হবে।
ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, সাহসী ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা করেছেন মূসা ভাই। তিনি সত্যকে সত্য বলেছেন। বিরোধিতা করলে, সেটাও ছিল তথ্যনির্ভর। আমরা এখানে বিতর্ক সৃষ্টি করতে আসিনি। তাই, তার রাজনৈতিক জীবন নিয়ে আলোচনা করছি না।
আমানুল্লাহ কবীর বলেন, সাংবাদিকদের জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে রাজনীতি এড়িয়ে যাওয়া যায় না। কারণ, রাজনীতির ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়েই সাংবাদিকের কাজ। এখন তো সাংবাদিক নেই; সব দলীয় কর্মী।
চলমান সঙ্কট সমাধানে পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, একদল অপর দলকে অস্ত্র দিয়ে মোকাবেলা করছে। পার্থক্য একটাই, কারো অস্ত্রের লাইসেন্স আছে, কারো নেই। অস্ত্র দিয়ে অস্ত্রের মোকাবেলা করতে গেলে রক্তক্ষরণ হবে।
সঙ্কট সমাধানের উপায় সম্পর্কে তিনি বলেন, এই সঙ্কটের সমাধান করতে হবে টেবিলেই। টেবিলের বাইরে সমাধান করতে গেলে যে পরিণতি হবে, সেটা আমাদের সামনেই দেখতেই পাচ্ছি। অভিজিৎ রায় হত্যা উদাহরণ হতে পারে।
মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, দেশের সঙ্কট থেকে উত্তরণ রাজনীতিবিদরা করতে পারবেন না। এই সঙ্কট উত্তরণ করতে পারতো সাংবাদিকেরা। কিন্তু আজ কি কোনো এমন সাংবাদিক আছেন, যিনি দুই নেত্রীকে বলবেন- ‘এনাফ ইজ এনাফ’ (যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়)।
তিনি বলেন, অসুস্থ দলবাজি আমাদের গ্রাস করে ফেলেছে। আমিও সেই আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াবো। কারণ, আমি নিজেও সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলছি না।
মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল বলেন, মূসা ভাই ছিলেন আমাদের সাংবাদিকতার বাতিঘর। তার জন্মদিনের আলোচনা জাতীয় প্রেস ক্লাবের উদ্যোগেই করা উচিত ছিল।
অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, শুধু সাংবাদিক নয়, এখন আমরা সবাই একচোখা হয়ে গেছি। আমদের সব বিবেক, অনুভূতি, বিবেচনা রুদ্ধ হয়ে গেছে। অনেকে গোটা সুশীল সমাজকে আঘাত করে মাহমুদুর রহমান মান্না ভাইয়ের সমালোচনা করছেন।
তিনি মাহমুদুর রহমান মান্নার প্রশংসা করে বলেন, মান্না ভাইয়ের সমালোচনা করতে হলে ‘রাজনীতিবিদ মান্না’র সমালোচনা করতে হবে। তিনি সারাজীবনই রাজনীতি করেছেন। তার এই বক্তব্যের জন্য ‘রাজনীতিবিদরা’ দায়ী। কারণ, আজকের রাজনীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মাহমুদুর রহমান মান্নার মতো পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদকেও বলতে হয়েছে, ‘আন্দোলন করতে হবে। তাতে যদি দুয়েকটা লাশ পড়ে পড়ুক।’
তিনি মন্তব্য করেন, আমরা যারা সব সময়ই লাশের রাজনীতির বিরোধিতা করেছি, তাদের মুখে মান্না ভাইয়ের সমালোচনা মানায়। কিন্তু যারা হল দখল করে লাশ ফেলে ক্ষমতারোহণ করেছেন, তাদের মুখে মান্নার সমালোচনা মানায় না।

ব্যারিস্টার মঈনুল ও ইকবাল সোবহানের বাকযুদ্ধ : এদিকে স্মরণসভায় এসে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বাকযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন ও প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী।
স্মরণসভায় রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়াকে কেন্দ্র করে কথা কাটাকাটি হয়।
এ সময় দু’জনই তর্কে জড়িয়ে পড়লে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। পরে উপস্থিত সদস্যদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
পরে ইকবাল সোবহান চৌধুরী অনুষ্ঠানস্থলে বসলেও ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন অনুষ্ঠান ছেড়ে চলে যান।
সভায় ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেনের আগে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী। তার বক্তব্যে উপস্থিত আমন্ত্রিত অতিথিদের উদ্দেশে বলেন, এবিএম মূসার এ স্মরণ সভায় আমরা বর্তমান বিষয়কে এনে তাকে যেন বিতর্কিত ও বিভক্তির মধ্যে না ফেলি। তাকে আমরা বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখি।
তার এই বক্তব্যের আগে অনুষ্ঠানে কয়েকজন বক্তা বর্তমান রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে রাজনীতিক ও সাংবাদিকসহ সুশীল সমাজের কঠোর সমালোচনা করে বক্তব্য দেন। এর জবাবে ইকবাল সোবহান এই বক্তব্য রাখেন।
পরে ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি দেশের রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে তার বক্তব্য তুলে ধরেন। বর্তমান সঙ্কটের সমাধান প্রধানমন্ত্রীর হাতে বলে তিনি মন্তব্য করেন এবং দেশে চলমান রাজনৈতিক সহিংসতার বিষয় নিয়ে বক্তব্য দিতে থাকেন।
এ সময় অনুষ্ঠানের উপস্থাপক রোবায়েত ফেরদৌস বক্তব্য সংক্ষেপ করতে বললে তিনি উপস্থাপককে বলেন, আমি কোনো বাজে লোক না। আমাকে কথা বলতে দেন। কথা বলতে দেবেন না তাহলে ডেকেছেন কেন। বক্তব্য শেষ করে তিনি সামনের আসনে এসে বসেন।
এরপরই ইকবাল সোবহান চৌধুরী মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বলেন, এখানে আমরা রাজনীতি করার জন্য আসিনি। এ কথা বলার সাথে সাথে ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন প্রতিবাদ জানান।
এ সময় ইকবাল সোবহান ব্যারিস্টার মঈনুলকে প্লিজ প্লিজ বলে থামতে বললে ব্যারিস্টার মঈনুল টেবিলে চাপড়ে বলেন, আমাকে আমার কথা বলতে দেন। থামতে বলছেন কেন? আমাকে কেন কথা বলতে দেবেন না। কেন কথা বলতে গেলে আমাকে আটকানো হবে।
ইকবাল সোবহান তাকে উদ্দেশ করে বলেন, ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন সাহেব আপনারা সংবিধান স্থগিত করে দিয়ে, সেন্সরশিপ করে দেশ চালিয়েছেন। আর এখন আপনারা আমাদেরকে বড় বড় কথা বলে চলে যাবেন এটা তো হয় না। এ কথা শেষ না হতেই অনুষ্ঠানের মধ্যে হট্টগোল সৃষ্টি হয়।
সভায় সভাপতির বক্তব্যে বিশিষ্ট কলামিস্ট ও সাংবাদিক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, অনুষ্ঠানে কিছুটা সমস্যা হয়েছে এ জন্য আমরা দুঃখিত।

You may also like

Leave a Comment