পৃথিবীর বড় গ্রামটায় একদিন

by News Room

মাহমুদ পারভেজ;..পাখির কিচিরমিচিরে ঘুম ভাঙ্গলো। কথাটা আদৌ সত্যিনা। চলুন বিশ্লেষণ করি। আমার বেডরুমে পাখি আসার কথা নয়। এমনকি মুরগা মুরগিও আসার কথা নয়। মোবাইলের রিংটোন বাজছে। পাখিরা কিচিরমিচির করে যাচ্ছে। পাখিদের ডাক ঠিকমত শুনিনা বলে রিংটোন ব্যবহার করলাম। ইচ্ছেমতো রিংটোন দেয়া যায় বলেই এই ব্যবস্থা। কয়েক দিন আগে ছিল বিড়ালের ডাক। ম্যাও ম্যাও করলেই সবাই এদিক ওদিক তাকাতো। চেয়ার টেবিলের নিচ পর্যন্ত খোঁজা শুরু করতো। যেন বিড়াল এসেছে তাদের খেতে। অথচ বিড়াল একটা নিরীহ প্রাণী। বাঘের গর্জন দিলে তো আর রক্ষা ছিলনা। শেষমেশ পাখির কন্ঠস্বর সেট করলাম। মানুষ এতে স্বস্থি বোধ করছে বোঝা গেল। যাইহোক, মোবাইলে সেভ করা একটি নাম ভাসছে। সেই সাথে হৃদয়ের আয়নায় প্রতিচ্ছবি ভাসছে। তিনি হলেন গল্পকার সেলিম আউয়াল। প্রিয় নামের মধ্যে প্রিয় ব্যাক্তিত্ব তিনি। যিনি শুধু ভাই নন আমার গুরুও বটে। যার প্রতি পোষণ করি সবচে বেশি শ্রদ্ধা।আজ পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গ্রাম বানিয়াচং বেড়াতে যাবো। সেখানে বিথঙ্গলের আখড়ায় রামকৃষ্ণের মন্দিরে যাবো। সেলিম ভাইয়ের মাধ্যমে জানতে পারি, খৃস্টিয় পঞ্চদশ শতাব্দীতে রামকৃষ্ণ গোস্বামী সমগ্র উপমহাদেশ সফর করে বিথঙ্গলে এসে এ আখড়া প্রতিষ্ঠা করেন। বিথঙ্গলের আখড়ার মতো এমন আখড়া বাংলাদেশে খুব সম্ভব নাকি দ্বিতীয়টি নেই। ২৪ হাত লম্বা ১২০ টি কোঠা, ত্রিখিলান প্রবেশ পথ সম্বলিত আখড়ার কাছে ৮০ ফুট উচু একটি মঠ রয়েছে। দর্শনীয় বস্তুর মধ্যে ২৫ মন ওজনের শ্বেত পাথরের চৌকি, পিতলের সিংহাসন, রৌপ্য নির্মিত পাখি, মুকুট, কষ্টি পাথরের মূর্তি ইত্যাদি আছে । আমার উৎসাহের সীমা নেই। খুব আনন্দ হচ্ছে ঐতিহাসিক গ্রাম দেখব বলে। সেই সাথে রামকৃষ্ণের মন্দির। ভাবতেই আনন্দে লাফাচ্ছি।আমার লাফানো বন্ধ হয়ে গেল। জলদি রেডি হতে তাগিদ দিচ্ছেন ফোনে। আমাকে বারবার তাগিদ দিতে হয়। নয়তো শুধু ভুলে যাই। ক্যামেরা নিয়ে যেতে হবে রাতে একবার বলেছেন। তারপরও কখন যে ভুলে গেলাম টেরই পেলামনা। অবশ্য কেউই টের পায়না স্মৃতি কখন বিস্মৃতি হয়। মাত্র কুড়ি বছর বয়সে এই অবস্থা! বাকি দিন কিভাবে কাটবে ভাবনায় পড়ে গেলাম।
তিনি আর ভাবতে দিলেননা। বললেন জলদি আমার বাসায় এসো। সাড়ে আটটায় আমরা রওনা দেবো। কথামত দেয়াল ঘড়িতে খেয়াল করলাম। আটটা বাজতে তখন দশ মিনিট বাকি। কীভাবে আর ঘরে থাকি বলুন? ঝটপট গোসল সেরে নাস্তা করে উনার বাসায় উপস্থিত হলাম।
উনার বাসা হাউজিং এস্টেট এলাকায়। বড় বড় অক্ষরে গেইটে লেখা ফরিদবাগ শুভেচ্ছা ১৩। এখানে আসলেই বুঝি বাসাটা শুভেচ্ছা জানাচ্ছে কাউকে। সেই কাউকেটা হয়তো আমি নয়তো অন্য কেউ। বাড়িটা বিশাল ধরনের। এই জাতীয় প্রোপার্টিকে আলিশানই বলতে হয়। বাড়িতে থাকা ও গাড়ি রাখারও সুব্যবস্থা। বড় বড় হোটেলে যেমন লেখা থাকে সবকিছুরই সুব্যবস্থা আছে, ঠিক তেমনি। আমার মত অনেকের এখানে থাকতে কোন সমস্যা হয়নি। একটানা ২মাস এখানে থেকে ইন্টার পরীক্ষা দিয়েছি। মনে হয় যেন স্বর্গপুরে ছিলাম। তাই রেজাল্টও পূর্বের তুলনায় ভালো হয়েছে। মাঝে মাঝে ভাবি বিশাল মনের মানুষের সাথে বিশাল বাড়ি মানিয়েছে। বাড়ি যত বিশাল মন তারচে আরো বিশাল। আলিশানে এসে বুঝলাম বিপদে পড়েছি। নাস্তা করতে হবে। ভাবি এসে নাস্তা খেতে বললেন। খেয়ে আসছি বলেও রেহাই পাইনি। কেক, চা-বিস্কুট খাইয়ে ছাড়লেন। এমন বিপদে পড়তে অনেকের ভালো লাগে। আমারও খারাপ লাগার কথা নয়। এমনিতেই ভাল্লাগছে ভ্রমনে যাবো বলে।

গাড়ি ছাড়ার সময় হয়ে গেছে। আমাদের মধ্যমনি সদ্য এসে উপস্থিত। কবি তাবেদার রসুল বকুল। সদা হাস্যোজ্জ্বল চেহারার আরেক বিশাল মনের মানুষ। বিশাল আকারের পাজারো হাকিয়ে শুভেচ্ছাতে ঢুকলেন। সেলিম ভাইসহ অন্যরা শুভেচ্ছা জানালো। মধ্যমনির সবচে বড় পরিচয় তিনি একজন কবি। অন্যসব পরিচয় তার সাথে বেমানান। কবির সাথে ব্যবসায়ীটা যেন খাপ খায়না। আপনাদের কাছে খাপ খেলে আমাকে বলবেন। যাইহোক, একটি স্কুলের বৃত্তি বিতরণ অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে যাচ্ছি। আমি নই কিন্তু, আমি ছাড়া অপর দুজন। ক্যামেরা নিয়ে যাচ্ছি নিউজ করতে। প্রধান অতিথি হিসেবে সেলিম ভাই ও সভাপতি হিসেবে যাচ্ছেন বকুল ভাই। মাঝখানে আমাকে লাগছে বেমানান। আমাকেও যেন খাপ খায়না তাদের সাথে। বিশাল মনের মানুষ তারা, ছোট মনের ছোট মানুষ আমি। তারপরও তাদের সাথে যাওয়াটাই সবচে দামি। বকুল ভাই অনেক উপহার নিয়ে যাচ্ছেন। স্বরচিত বই আর নকশা করা ব্রান্ডের গেঞ্জি।গাড়িতে আমাকে গেঞ্জি পরিয়ে ছোটখাটো উদ্ভোধন হল। এম এ রসুল ট্রাস্টের সুন্দর একটি কলার ওয়ালা গেঞ্জি। শিক্ষার্থীদের জন্য অন্যসব কলার ছাড়া গেঞ্জি। কলারসহ গেঞ্জি পরলে নাকি তাদেরকে শিক্ষার্থী বলে মনে হবেনা। এটা বকুল ভাইয়ের থিউরী।

গাড়ি চলছে ১০০ গতিতে। বানিয়াচঙ্গের দিকে না গিয়ে ড্রাইভার যাচ্ছে অন্যদিকে। একটা ফিলিং স্টেশনে গাড়ি থামতেই সন্দেহ দূর হলো। ড্রাইভার বেশি করে গ্যাস ভরিয়ে নিতে চাচ্ছে। যাত্রাপথে বিগ্ন যাতে না ঘটে এইজন্য। সবাই গাড়ি থেকে নামলো কিন্তু রয়ে গেলাম একা। দেখতে চাচ্ছি গ্যাস ভরলে গাড়ির ভেতরকার অবস্থা কেমন হয়।
গাড়িতে গ্যাস ভরা হচ্ছে। শা শা করছে গাড়ির ভেতর। মনে হচ্ছে আকাশে উড়তে রেডি হচ্ছে গাড়ি। শক্ত করে সিট বেল্ট বেধে নিলাম। এখনি ফ্লাইট হবে আকাশপথে। চলে যাবো গন্তব্যহীন পথে। স্বপ্নটা আর বেশি দূর এগোয়নি। ড্রাইভার চেঁচাচেছ গ্যাস তো গাড়িতে ঢুকছেনা। গ্যাসের লাইন ফিউজ হয়ে আছে। উল্টো মিটারের বিল বাড়ছে। আমাদেরও টেনশন বাড়ছে। প্রায় আধঘন্টা পর এ ঝামেলা থেকে মুক্ত হলাম।আমাদের সাথে যোগ দিচ্ছেন আরেকজন রম্য লেখক। ভ্রমণ পিপাসু হারান কান্তি সেন। তার লেখার সাথে পরিচিত ছিলাম। এখন লেখকের সাথে পরিচিত হতে অপেক্ষায় আছি। তিনিও ৫ কিলোমিটার দূরে অপেক্ষা করছেন।

হারান কান্তি সেন আমাদেরকে বরণ করলেন। কোন ফুল দিয়ে নয় বরং পাটিশাপটা পিঠা আর কোয়ান্টাম মেথড এর কিছু বই দিয়ে। আমরাও তাকে কলার ওয়ালা গেঞ্জি দিয়ে বরণ করে নিলাম। সেলিম ভাই আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন লেখকের সাথে। মাহমুদ পারভেজ এই মাহমুদ পারভেজ সেই বলে। এর মাঝে বুঝতে পারলাম আমি যেন নেই। কারণ তখনতো আমি যেন আমি নই। আমি আমাকে অন্য একজন কল্পনা করছি। সেলিম ভাই যখন আমার পরিচয় কাউকে দেন তখন খুবই লজ্জা লাগে। মনে হয় আমি তো এর কিছুই নই। যেন বাড়িয়ে বাড়িয়ে তিনি বলছেন এসব। এর মধ্যে হাত বাড়িয়ে দিলেন হারান দা হ্যান্ডশেক করতে। আমিও বাড়ালাম। হয়ে গেল হ্যান্ডশেক।
পুরোটা রাস্তা গুণীদের খোশ গল্প শুনে যাচ্ছি। তাদের লেখালেখির অতীত ইতিহাস থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত সব আলোচনা ঠাই পাচ্ছে খোশ গল্পে। হঠাৎ খোশ গল্পে জোশ উঠলো চা খেতে হবে। বকুল ভাই প্রথম বললেন একবার চা খেয়ে নিলে কেমন হয়। আমরা কথায় সায় দিলাম। চা খেতে একটি রেস্টুরেন্টের সামনে নামলাম।বয়কে শুধু চা আর মিনারেল পানি দেয়ার জন্য বলা হল। কেননা আমাদের সাথে পাটিসাপটা আছে। ডজন কয়েক পাটিসাপটা এনেছেন হারান দা। আমাদের মধ্যে কেউ দুটোর বেশি খেতে পারছেননা। একজনের ডাইবেটিস হওয়ায় অন্যরা সাবধান। আমি সাবধান হলামনা। একমাত্র তরুণ বলেই আদেশ হলো আমাকেই সব খেতে হবে। চোখ বন্ধ করে ৪টা খাওয়ার পর বাকি আর খেতে পারছিনা। প্যাকেটটা সাথে নিয়ে নিলাম।

চলন্ত গাড়িতে বসে আছি। জানালা খোলা থাকলে ভালো হত। এসি গাড়ি বলে জানালা খোলা যাচ্ছেনা। সব সুবিধারই একেকটা অসুবিধা থাকে। এসির বাতাসে প্রকৃতির বাতাসকে ভীষন মিস করছি। রাস্তার পাশের গাছ গুলোকে দেখে লাগছে মেরাথন দৌড় দিচ্ছে। বিচারক হয়ে যেন সেই প্রতিযোগিতা দেখছি। গাড়িতে আমরা চারজন বিচারক। অন্য বিচারকরা মেরাথন দেখছেনা। শুধু আমি দেখছি। সামনের দিকে তাকাতেই ভাবছি উল্টো যেন রেইস খেলছি। কার আগে কে যেতে পারে বানিয়াচং। অনেকগুলো গাড়িকে ওভারটেক করে সামনে যাচ্ছি দ্রুত। শহরতলীও যে অনেক সুন্দর হতে পারে জানা ছিলনা। ক্যামেরা দিয়ে দু একটা স্ন্যাপ তুলতে ইচ্ছে হল। অনেক সুন্দর দৃশ্য ক্যামেরাবন্ধী গেল। গাড়ির চাকার সাথে হঠাৎ আমাদের চোখ আটকে গেল। তীব্র আকর্ষণে সবাই গাড়ি থেকে নামলাম। হুমায়ুন আহমেদের গেটুপুত্র কমলার দল যেন চোখের সামনে। তার গল্পের চরিত্ররা জীবন্ত চলাফেরা করছে। একটি বড় নৈাকা ভর্তি গায়ক দল। তারই সাথে ১০ বছরের একটি কিশোরী মেয়ে নেচে নেচে গান করছে। তাকে ছেলে না মেয়ে বলবো ভাবনায় পড়তে হল। ঢোল বাঁশি, বেহালার সাথে নানান জাতের বাদ্য যন্ত্র নিয়ে সুর মেলাচ্ছে অন্যরা। একজন বয়াতি বললো, নৌকায় ঘুরে ঘুরে সবাইকে গান শুনাবে তারা। এখানকার কিছু অসাধারণ দৃশ্য ছবি হয়ে গেল।

গন্তব্যে এসে পৌঁছলাম ঠিক বারোটায়। স্কুলের নাম ইকরাম নন্দ পাড়া হাইস্কুল। স্কুলের শিক্ষকরা এসে আমাদেরকে অভ্যার্থনা জানালো। শুধু শিক্ষার্থীরা বাকি রইলো। তারাও অভ্যার্থনা জানাতে অপেক্ষা করছে। সামনেই দেখি স্কুলের শিক্ষার্থীরা সারি বেঁধে ফুলের ডালা নিয়ে অপেক্ষা করছে। সামনে যাবো আর ফুল ছিটাবে গায়ে এমন প্রস্তুতি। ছবি তুলবো বলে ক্যামেরা নিয়ে সবার আগে গেলাম। জীবনের প্রথম এমন ফুলের বৃষ্টি গায়ে মাখলাম। তাও মেয়েদের হাতের ফুলের ছিটা। তাযে মধুর বড়ই মিটা। যাইহোক, অতিথিরা ফুলেল শুভেচ্ছায় শিক্ত হলেন।অনুষ্ঠান শুরু হল। স্টেইজে আসন অলংকরণ করলেন সম্মানিত অতিথিরা। আমি শুধু ছবি তুলে যাচ্ছি। ছবি তোলার জন্য আমার আসা। যা সুন্দর লাগছে তাই তুলে নিচ্ছি। অনুষ্ঠান যেমন সুন্দর, অতিথিরাও তেমন সুন্দর। চারিদিকে ফুলের মতো শিক্ষার্থীরা আরো সুন্দর। আমি সুন্দর ও সুন্দরীদের ছবি তুলে যাচ্ছি।
আমার ক্যামেরায় ভালো ভিডিও হয়। বিশেষ মুহুর্তের টুকটাক ভিডিও করে ফেলি। শিক্ষার্থীদের গেঞ্জি এবং মহামূল্যবান বই দেয়া হচ্ছে। এক জাতের গেঞ্জি সবার পরনে দেখে নিজেকে ওদের কেউ একজন মনে হল।

সভাপতির বক্তব্যের শেষে সবার গ্র“প ছবি তুললাম। গ্র“প ছবিতে আমি বাদ পড়ে গেলাম। মনে হলো আমি এই গ্র“পের কেউ নই। যারা ছবি তুলে তাদেরটা কেউ তুলেনা। একটি সাহসী মেয়ে এগিয়ে এল। আপনারা কী ভাবছেন জানিনা। সে আমার ছবি তুলতে নয়, অতিথিদের সাথে হ্যান্ডশেক করবে বলে। সাহসী এজন্য বললাম মেয়েটি এই গ্রামে লজিং থাকে। প্রথম কোন মেয়েকে দেখলাম গ্রামে লজিং থাকতে।
অনুষ্ঠান শেষ হতে লাগলো দুপুর দুটা। পেটের ঘড়িতে বাজছে পুরো বারোটা। সিদ্ধান্ত হলো খেয়ে বিথালঙ্গের আখড়ায় যাবো। খাবার আইটেম দেখে আমার আধা পেট ভরে গেল। বকুল ভাইয়ের মামার নিজস্ব পুকুরের বড় কাৎলা, রুই মাছ ছাড়াও মোরগ, দুধসহ অনেক নাম এখন মনে আসছেনা। তাদের বংশের ঐতিহ্যবাহী ভর্তা খেলাম। তার স্বাদ না খেলে বলে বুঝানো যাবেনা।আগে থেকেই ইঞ্জিন নৌকা ভাড়া করা ছিল। হাওর দেখে আমার মুখ হা হয়ে গেল। এত বিশাল হাওর। মনে পড়লো যেদিকে তাকাই যেন অথই পাথার। লাগছে আকাশ যেন মিশে আছে হাওরের কোলে। দুরে অস্পস্ট গ্রামের ছবি।
আমাদের সাথে গ্রামের মুরুব্বীগন যাচ্ছেন। চারিপাশে উৎসব উৎসব ভাব। আমরা নৌকার ছাদের উপর বসলাম। কিন্তু আমার মাথার ছাদে ছড়া কবিতা আসতে লাগলো। ছড়াগুলো এ রকম- আমরা বসলাম ঠেলেটুলে/নৌকা যাচ্ছে হেলেদুলে। সাদা বক উড়ে যাচ্ছে/ কিছু বক দুরে খাচ্ছে। আমরা যাচ্ছি মন্দিরে/সব ক্যামেরা বন্ধীরে।

কোন মিস্তরী নাও বানাইছে রে.. গুনগুন করতে লাগলাম। কী আশ্চর্য? আমি গান গাচ্ছি? তাও আবার ভাটিয়ালী। আমার নিজেরও তো বিশ্বাস হচ্ছেনা। সম্ববত সেলিম ভাইদেরও বিশ্বাস হচেছনা। হিন্দী গান হলে বিশ্বাস হতো। এমনিতেই এসব গান কম শুনা হয়। যত গান আসছে মাথায় তার বেশির ভাগই বাউল করিমের। স্মৃতিতে সব গান ফিরে আসতে লাগলো। কিন্তু ইঞ্জিন নৌকার বট বট শব্দে গান আবার চলে যেতে লাগলো। গায়ের মহিলাদেরকে গোসল করতে দেখে মনে পড়লো ঘেটুপুত্র কমলার সেই অসম্ভব সুন্দর গান ‘আমার যমুনার জল দেখতে কালো ছান করিতে লাগে ভালো যৌবনো মিশিয়া গেল জয়লে’। আবার হাওরের মাঝখানে এসে মাথায় আসলো মাঝি বাইয়া যাওরে’ ইদানিং নৌকা আর বাইতে হয়না। ইঞ্জিনের ঠেলায় নৌকা চলে।প্রায় একঘন্টা হাওর যাত্রা শেষে মন্দিরে উপস্থিত হলাম। মন্দির দেখে মন দেহ জুড়িয়ে গেল। দেহ বললাম এতক্ষণ রোদে ছিলাম। ছায়ায় এসে দেহ জুড়িয়ে গেল। এত সুন্দর মন্দির হতে পারে ধারণা ছিলনা। তাও আবার জনমানবহীন ভুতুড়ে জায়গায়। আমার ক্লিক করা শুরু হয়ে গেল। যা দেখছি তাই ক্যামেরাবন্ধী। আমারও ক্যামেরায় বন্ধী হতে ইচ্ছে হচ্ছে। কিন্তু কেউতো আমাকে বন্ধী করতে পারেনা। অর্থাৎ ছবি তুলতে জানেনা। হারানদা মনে হয় তুলতে পারে। জিজ্ঞাস করতে হবে।
গুলি করার মত তাক লাগিয়ে ছবি তুলছি। ২৪ হাত লম্বা ১২০ টি কোঠা ঘুরে ঘুরে দেখলাম। আখড়ার কাছে ৮০ ফুট উচু মঠের ছবি তুললাম। ২৫ মন ওজনের শ্বেত পাথরের চৌকির ছবি তুলতে পারলামনা। আমাকে নিষেধ করা হলো। অর্থাৎ সকল মুসলমানদের জন্য ঢোকা নিষেধ। শেষমেশ হারানদা ঢুকে ছবি তুলে আনলেন। বুঝলাম হারান কান্তি সেন সুন্দর আলোচকচিত্রী। আমি অপেক্ষায় আছি হারানদা আমার ছবি তুলবে বলে। নয়নাভিরাম এমন আশ্চর্য সুন্দর জায়গায় ছবি তুলতে কার না মন চায়। ছড়ায় ছড়ায় হারানদাকে বললাম
ছবি তুলি হারানদা
সামনে এসে দাড়ান দা
পিছে সুন্দর বারান্দা।বারান্দার সামনে উনার ছবি তুলে নিলাম। তিনিও আমার তুলে নিলেন। তা দেখে সেলিম ভাই বললেন সবার গ্র“প ছবি তোলার জন্য। এইবার তুললাম কিন্তু বাদ পড়িনি। হারানদা বাদে সবার সাথে আমার ছবি হয়ে গেল। চমৎকার ছবি তুললেন হারানদা। এছাড়াও ছবি তুলতে যে যার মতো পোজ দিয়ে দাড়ান ক্যামেরার সামনে। আমি ক্লিক ক্লিক ছবি তুলে যাই। ক্যামেরা দেখে বড় ধরনের ঝটলা বেঁধে গেল। মানুষ আগ্রহে আমাদেরকে দেখছে। আমরাও তাদেরকে দেখছি। যেন তারা ক্যামেরার দৃশ্য কোনদিন দেখেনি। এমন ঝটলার দৃশ্য আমরাও দেখিনি। তাদের চোখে কৌতুহল বিরাজ করছে। কেউ কেউ কাছে এসে প্রশ্ন করছে, ভাই আপনারা কী সাংবাদিক? কোন পত্রিকার সাংবাদিক? আমরার ছবি কী পত্রিকায় আইবো? এইসব হাবিজাবি প্রশ্নে জবাব দেয়ার মোড চলে যায়। আমাদেরও চলে আসার সময় হয়ে যায়। মন্দির কর্তৃপক্ষ আমদেরকে চা খাইয়ে আপ্যায়ন করলেন। চায়ের স্বাদটা চোখে মুখে লেগে আছে। চোখে বলার কারণ গাভির দুধের সর সাদা হয়ে কাপের উপর ভাসছিল। সেই দৃশ্য এখনও চোখে ভাসছে। আমরাও বিদায় নিয়ে হাওরে ভাসতে থাকি। তারপর সিলেটের দিকে আসতে থাকি।

You may also like

Leave a Comment