‘যাক অবসাদ বিস্বাদ কালো / দীপালিকায় জ্বালাও আলো / জ্বালাও আলো – আপন আলো / শোনাও আলোর জয়বাণীরে’ এমন জয়বাণী আর সুরে সুরে কবিগুরু আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন শীতকে। জীবনের ঘোর অমানিশা আর রিক্ততা-জীর্ণতা ও বেদনার মাঝেও এই হিম যেন একচিলতে আনন্দধারা। অঘ্রাণের শেষ বিকেলের নরম হলদে রোদ আর দখিনা হিমবাহ জানান দেয় পৌষের আগমনী বার্তা – পরদিন শুরু হয় বাংলা বর্ষপঞ্জিকার সপ্তম মাস পৌষ। নানা উৎসব ও আচার অনুষ্ঠানে পৌষ আর শীতকে আবাহন জানায় বাংলার মানুষ। শীতবরণ ও পিঠাপুলির আয়োজনে ব্যস্ততা বাড়ে বাঙলার ঘরে ঘরে। বিভিন্ন স্থানে পৌষমেলা ও পিঠা উৎসব হয়। শীতের শুরু পৌষের হাত ধরে হলেও শীত অঘ্রাণের সাথে সাথেই আমাদের হাত ধরেন। সবুজ দুর্ব্বাঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরের মুক্তো বিন্দুতে রোদের ঝলকানিতে জীবনে যেন পূর্ণতা পায়। সাধারণত পৌষেই হিমের আঁচলে ঢাকতে শুরু হয় আমাদের দেশ। শীত যখন ঝাঁকিয়ে বসে শীতার্তদের জন্য অনেকটা অভিশাপ হয়ে যায় পৌষ। তবুও আবহমান বাংলা সংস্কৃতির রং রূপে মিশে আছে হিমবুড়ি পৌষ। তাই বাংলা শিল্পসংস্কৃতির সব শাখায় বার বার ঘুরে ফিরে এসেছে এই নাম। বাংলা সাহিত্যেও পৌষবন্দনা হয়েছে গদ্যে-পদ্যে-গানে-কবিতায়।
শীতের শুরু মাস পৌষের প্রতি বিশেষ টান রয়েছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। পৌষ মাসেই কবিগুরু শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এখনো প্রতিবছর সেখানে পৌষমেলা বসে। ‘পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে’ ‘ পৌষ এলো গো’ সহ অনেক গানে কবিতায় কবিগুরু পৌষের বন্দনা করেছেন।
আমাদের জাতীয় কবি নজরুল পৌষে মুগ্ধ হয়ে লিখেছেন
‘ওই যে এল গো
কুজ্ঝটিকার ঘোমটা-পরা দিগন্ত দাঁড়ায়ে।
সে এল আর পাতায় পাতায় হায়
বিদায়ব্যথা যায় গো কেঁদে যায়,
পথ-চাওয়া দীপ সন্ধ্যাতারায় হারায়।’
দেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক শীতের প্রকৃত মর্মার্থ খুঁজতে চেয়েছেন ‘পরবাসী’তে। ‘মধ্যরাতের এই সমতল চ্যাপটা দেশে ঠান্ডা যেন আকাশ থেকে উপচে উপচে পড়েছে। অঘ্রাণের শুরুতেই উত্তুরে এলোমেলো ঝড়ো বাতাস সারাদিনে দেশটির শরীরে হিমের কালো পরদা ফেলেছে এবং সন্ধ্যার পর সেই বাতাস চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে মাটি বরফকুন্ড হয়ে গেছে। ধবধবে শাদা মাটির দেশ এ বছরে শীতে কালো, পাৎলা পিছল কালচে কালচে যে একটা আবরণ পড়েছে মাটির ওপর, সেটাকে কোনমতেই শরতে ধানের জমিতে জমা ঘন শ্যাওলার আস্তর বলা চলে না।
…সবুজের চিহ্ন বিলুপ্ত হয়েছে, খালগুলোতে মিশমিশে কালো রঙের কাদা ছাড়া আর কিছু সেই। কাদাখোঁচার লম্বা ঠোঁট খচখচ করে ক্ষতবিক্ষত করেছে কাঁচা কাঁদাকে, এক ঠ্যাঙের ওপর ভর দিয়ে কালোয় শাদায় মেশানো বিরাট সারসের দল লম্বা সারি দিয়ে বসতে শুরু করেছে। উত্তুরে বাতাস দিন দিন সঙ্কুচিত করতে শুরু করল দেশটাকে, গাছগুলো সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে গেল এবং ঘাসপাতার রঙের সঙ্গে রং মিলিয়ে দিয়ে গাঢ় সবুজবর্ণের ফড়িং মেটে হয়ে গেল’।
তাঁর ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ নামক গ্রন্থে শীতের রাতের বর্ণালী বর্ণনা পাই। ‘এখন নির্দয় শীতকাল, ঠান্ডা নামছে হিম, চাঁদ ফুটে আছে নারকেল গাছের মাথায়। অল্প বাতাসে একটা বড় কলার পাতা একবার বুক দেখায় একবার পিঠ দেখায়। ওদিকে বড় গঞ্জের রাস্তার মোড়ে রাহাত খানের বাড়ির টিনের চাল হিম ঝক ঝক করে। এক সময় কানুর মায়ের কুঁড়েঘরের পৈঠায় সামনের পা তুলে দিয়ে শিয়াল ডেকে ওঠে। হঠাৎ তখন স্কুলের খোয়াড় রাস্তার দুপাশের বনবাদাড় আর ভাঙ্গা বাড়ির ইটের স্তূপ থেকে হু-উ-উ চিৎকার ওঠে। ঈশেন কোণ থেকে ধর ধর লে লে শব্দ আসে, অন্ধকার ভূত অন্ধকার কেঁপে কেঁপে ওঠে, চাঁদের আলো আবার ঝিলিক দেয় টিনের চালে’।
চারিদিকে যুবাদের হৃদয়ের জীবনের কথা
মৃত্যুর উপর দিকে সাঁকোর মতন
চেয়ে দেখে মরণের অপ্রমেয়তা
সেতুর ছবির মতো মিলে গিয়ে জলের ভিতরে
জীবনের জয়
আর মরণের স্তব্ধতাকে অনুভব করে।
…
এই সব শীতের রাতে আমার হৃদয়ে মৃত্যু আসে;
বাইরে হয়তো শিশির ঝরছে, কিংবা পাতা,
কিংবা পেঁচার গান; সেও শিশিরের মতো, হলুদ পাতার মতো।
এদিকে কোকিল ডাকছে পউষের মধ্য রাতে;
বেদনা একদিন বসন্ত ফিরবে ব’লে?
কোনো একদিন বসন্ত ছিল, তারই পিপাসিত প্রচার?’
প্রেম-ভালবাসা-প্রিয়জনের বন্দনার কাছে নত হয়েছে শীতের হিম দিনরাত্রিগুলো। বিরহে মিলনের সুখ পেতে চায় উথলা মানব হৃদয়। স্মৃতির অলিন্দে বেজে উঠে করুন সুরে বেদনার গান। পৃথিবীজুড়ে নিঃসঙ্গতার দায় যেন সব প্রেমিকের…
“কুহেলি উত্তরী তলে মাঘের সন্ন্যাসী
গিয়াছে চলিয়া ধীরে পুষ্পশূন্য দিগন্তের পথে
রিক্ত হস্তে! তাহারেই পড়ে মনে,
ভুলিতে পারে না কোন মতে।” -তাহারেই পড়ে মনে, সুফিয়া কামাল
রাত আজও অস্তিত্বের গির্জের চুড়োয়
ঝরায় শিশিরকণা : মনে পড়ে সেই ছোট ঘরে
প্রথম প্রহরে তুমি পড়ছিলে ডাক্তার জিভাগো
একা, গায়ে পাতলা কোট, নামহীন দূরত্বে আসীনা’ -শীত রাত্রির সংলাপ, শামসুর রাহমান
‘কনক আমরা এবার শীতে নদীর তীরে হোহো হাসবো,
সন্ধেবেলা তোমার চুলে শিশির ভরে রাখবো লক্ষ্মী
তোমার অনামিকায় কামড় দিযে আমি হঠাৎ আবার
‘যাহ-কী-দুষ্টু’ ওষ্ঠে তোমার ওষ্ঠ ছোঁবো সকাল বেলায়’ -শীতে ভালোবাসার পদ্ধতি, আবুল হাসান।
প্রাচীন কবি কালিদাস ভিন্নভাবে শীতের রাত খুঁজেন। ‘শীতকালে কামাতুরা নারীরা অপরাধী স্বামীদের দিকে তাকিয়ে তাদের পূর্বকৃত তর্জন গর্জন, লাঞ্ছনা গঞ্জনা ভুলে গিয়ে কেমন বতিসুখাভিলাসিনী হয়ে ওঠে। কামোষ্মত্ত যুবকরা সুদীর্ঘ রাত্রি ধ’রে উদ্বিন্নযৌবনা পতœীদের এমন নিষ্ঠুরভাবে ভোগ করে থাকে যে রতিশ্রমে কামিনীরা বড়ই পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ে’।
উৎসবপ্রিয় বাঙালী শীতকালে মেতে উঠেন বিভিন্ন উৎসবে। পৌষে হিন্দু সম্প্রদায় পালন করেন পৌষসংক্রান্তি। যাকে পৌষপার্বণ বা মকরসংক্রান্তিও বলা হয়। পৌষ মাসে আদিবাসীরা ফসল ঘরে তোলার উৎসব হিসেবে নতুন ধানের তুষ নিয়ে পালন করেন টুসু উৎসব। একে তুষু উৎসবও বলা হয়, প্রচলিত মিথ ও শস্য সংগ্রহ আনন্দোৎসবের সমন্বিত রূপ এটি।
হিন্দুধর্মীয় মতে মাঘ মাসের শুল্কা পঞ্চমী তিথিতে আনুষ্ঠানিকভাবে শিশুর বিদ্যাচর্চা শুরুর অনুষ্ঠান হাতেখড়ি পালন করা হয়। মাঘ মাসেই হিন্দুদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব সরস্বতী পূজাও পালন করা হয়। খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ক্রিস্টমাস ডে শীতেই পালিত হয়। মাঘ মাসের পূর্ণিমায় বৌদ্ধরা পালন করে মাঘী পূর্ণিমা।
জীবন, লোকাচার, সংস্কৃতিতে শীত এভাবেই উৎসবের ঋতু বাংলার কৃষকের ঘরে পিঠা আর পার্বণের কাল হয়ে আসুক। রুক্ষতা, জীর্ণতা, বিবর্ণতা ছাপিয়ে হাজার বছরের বাঙলা সংস্কৃতি এভাবেই বেঁচে থাকুক।
