গণমাধ্যমের হালচাল, সম্পাদক পরিষদের উদ্বেগ ও মাহমুদুর রহমানের সেই সতর্কবাণী

by News Room
এম আবদুল্লাহ

এম আবদুল্লাহ: সংবাদমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক সরকারি নানা পদক্ষেপে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সম্পাদক পরিষদ। সরকারের পক্ষ থেকে প্রচার মাধ্যমের অধিকারে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে অভিযোগ তুলে বলা হয়েছে, একাধিক টিভি মালিককে গ্রেফতার করে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। টিভি টকশো’তে নানাভাবে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। ২৪ ফেব্রুয়ারি সম্পাদক পরিষদের এক সভা  শেষে পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকার সম্পাদক মাহফুজ আনাম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব কথা বলা হয়। এছাড়া ওই সভায় বেশ কয়েকটি প্রস্তাবও গ্রহণ করা হয়েছে।  সম্পাদক পরিষদের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদপত্র ও জাতীয় প্রচার মাধ্যমের পক্ষে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। একদিকে রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে দায়িত্বরত সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে অন্যদিকে সংবাদপত্র ও প্রচার মাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করার চেষ্টা চলছে। সরকারের পক্ষ  থেকে প্রচার মাধ্যমের অধিকারে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। সরকার ও প্রশাসন স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনায় বাধা সৃষ্টি করছে। কখনো কখনো কোনো কোনো পত্রিকা বা  টেলিভিশনকে অন্যায়ভাবে বিশেষ দল বা গোষ্ঠীর মুখপাত্র হিসেবে তকমা দেওয়া হচ্ছে। বিশেষত সম্প্রতি দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকায় প্রকাশিত একটি ছবি ও ক্যাপশন ছাপানোকে কেন্দ্র করে সংসদে  দেওয়া প্রতিক্রিয়া প্রচার মাধ্যমের প্রতি বৈরী মনোভাবেরই প্রকাশ। যা কোনো সরকারের কাছ  থেকে কাম্য নয়।  সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, সংসদে সম্পাদক ও প্রকাশকদের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক বক্তব্য দেওয়া হয়েছে যা তাদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে হুমকিস্বরূপ। ইতিমধ্যে একাধিক সম্পাদক ও প্রকাশকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। ইংরেজি  দৈনিক নিউ এজ পত্রিকার অফিসে তল্লাশির নামে পুলিশি হয়রানির মতো ঘটনাও ঘটানো হয়েছে। আমরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। এছাড়াও একাধিক টিভি মালিককে গ্রেফতার করে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। টিভি টকশো’তে নানাভাবে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে কিছু টকশো বন্ধ করা হয়েছে। টকশো’র অতিথি তালিকা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে। লাইভ অনুষ্ঠান প্রচার নিয়ে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। কী প্রচার হবে আর হবে না তা নিয়ে টেলিফোনে নির্দেশনাও স্বাধীন মতপ্রকাশের ওপর হস্তক্ষেপ বলে আমরা মনে করি। গণমাধ্যমে কোনো কোনো সাংবাদিককে সরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ও দলীয় কার্যক্রমের খবর সংগ্রহের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। প্রচার মাধ্যমসহ অন্যান্য পক্ষকে বিরুদ্ধ শক্তি হিসেবে দাঁড় করিয়ে অযথা হয়রানি করাটা স্বাধীন গণমাধ্যমের সহায়ক হতে পারে না। সংবাদপত্রসহ সকল প্রচার মাধ্যমের স্বাধীনতা, বস্তুনিষ্ঠতা ও দলনিরপেক্ষতা সংরক্ষণে আমরা সরকারের পক্ষ থেকে অধিকতর দায়িত্বশীল ও সহযোগিতামূলক আচরণ আশা করি।  সম্পাদক পরিষদের এই বিবৃতি দেশে-বিদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে। সম্পাদক পরিষদের নেতৃত্বে রয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিশীল ও আদর্শের দিক থেকে বর্তমান সরকারের সঙ্গে সহমত পোষণকারি পত্রিকার সম্পাদকরা। ভিন্নমতের দু’একজন সম্পাদক থাকলেও তাদের অবস্থান খুবই দুর্বল। ফলে অপেক্ষাকৃত কড়া ভাষার বিবৃতিটি পড়ে সরকারও হোঁচট খায়। বিবৃতিটি সরকারকে কতটা ধাক্কা দিয়েছে তার প্রমাণ মিলেছে একটি টেলিভিশনে টকশোর আয়োজন করে সরকারের উচ্ছিষ্টভোগী একাধিক সম্পাদককে দিয়ে ওই বিবৃতির বিরোধিতা করানোর মধ্য দিয়ে। যদিও গণমাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে যে নজীরবিহীন হস্তক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রণমূলক ন্যাক্কারজনক কর্মকা- সরকার চালাচ্ছে তার যত কিঞ্চিতই উঠে এসেছে সম্পাদক পরিষদের বিবৃতিতে। প্রকৃত অবস্থা যে কতটা ভয়ানক উদ্বেগের তা প্রতিটি গণমাধ্যম কর্মীই ওয়াকিবহাল।    সম্পাদক পরিষদের এই উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশের পরদিন ২৫ ফেব্রুয়ারি সরকারের পক্ষ থেকে পাল্টা বক্তব্য আসে। তাতে সম্পাদক পরিষদের বক্তব্যকে বাস্তবতা বিবর্জিত, সত্যের অপলাপ, পক্ষপাতমূলক, উদ্দেশ্য প্রণোদিত ও দুর্ভাগ্যজনক বলে অভিহিত করা হয়েছে। সরকারি এক তথ্য বিবরণীতে ‘সম্পাদক পরিষদের নামে প্রকাশিত বিবৃতির বিষয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য’ শীর্ষক এই প্রতিক্রিয়া গণমাধ্যমে পাঠানো হয়।  বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ‘দেশ যখন গণমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতা ও সম্প্রসারমান যুগে প্রবেশ করেছে, তখন সম্পাদক পরিষদের নামে প্রদত্ত বিবৃতি দেশের সঠিক চিত্র প্রতিফলনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এটি অনাকাক্সিক্ষত ও অত্যন্ত দুঃখজনক’।  তথ্য মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য পড়ে দেশের সাংবাদিক সমাজের ভিমরি খাওয়ার উপক্রম। অকল্পনীয় হুমকি, নির্যাতন, নিপীড়ন, জেল-জুলুম আর খবরদারিতে সদা ভীতিকর অবস্থা যদি হয় সর্বকালের সর্বাধিক স্বাধীনতা তাহলে শৃঙ্খলিত ও সন্ত্রস্ত গণমাধ্যম কাকে বলা হবে। এ যদি হয় মুক্ত গণমাধ্যম, চাপে-ধমকে কিংবা দলীয় আনুগত্যের কারণে নতজানু এবং শাসকগোষ্ঠীর সেবাদাস-দলদাস গণমাধ্যমের চেহারা তাহলে কেমন হবে সে প্রশ্নই উঠা সংগত।  বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিস্থিতি নিয়ে সম্পাদক পরিষদ ও সরকারের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ছাড়াও গণমাধ্যমের বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে হুমকিমূলক বক্তব্য আসছে বিরামহীনভাবে।  এর মধ্যে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা শেখ ফজলুল করীম সেলিম বলেছেন, গণমাধ্যমের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। বার্ন ইউনিট পরিদর্শনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নিজে একরকম ধমকের সুরে বলেছেন, বিরোধী দলের সহিংস আন্দোলনের খবর আপনারা প্রচার করবেন না। প্রধানমন্ত্রী তনয় ও তার তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়- নাম উল্লেখ করে ডেইলি স্টার পত্রিকা ও এর  সম্পাদকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেছেন তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে।  এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও গণমাধ্যম বিষয়ক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ওপর সরকারি হস্তক্ষেপে উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ দাতা ও সহায়তা সংস্থাগুলো বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব হচ্ছে বলে মত প্রকাশ করেছে।  চলতি বছরের গোড়া থেকে দেশে রাজনৈতিক অশান্তি বিরাজ করছে। বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দাবিতে লাগাতার অবরোধ হরতাল পালন করে যাচ্ছে। এ অবরোধ হরতালে পেট্রোলবোমা হামলাসহ নানা কিছিমের সহিংসতায় মানুষ হতাহত হচ্ছে। বড় ধরণের কয়েকটি পেট্রোল বোমা হামলার ঘটনায় শতাধিক মানুষ দগ্ধ হয়েছেন। এর মধ্যে মৃত্যুও হয়েছে বহু সাধারণ মানুষের। অনেক নিরীহ মানুষ এখনো  পোড়া শরীরের অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে হাসপাতালে কাতরাচ্ছে।  সরকার গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগের মতই বার্ন ইউনিটের হৃদয়স্পর্শী চিত্রকে প্রোপাগান্ডার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বিরোধী দলের আন্দোলনকে একটি জঙ্গি সন্ত্রাসী ও নাশকতা হিসেবে চিত্রিত করতে মরিয়া প্রচেষ্টা নিয়েছে। আর সরকার চাইছে দেশের সকল মিডিয়া সরকারের সুরে সুর মিলিয়ে একই প্রোপাগান্ডায় শামিল হোক। ঘায়েল করুক বিরোধী দলকে। সরকারের সেই মিশন অনেকটা সফলও হয়েছে। দিনের পর দিন গণমাধ্যমগুলো বার্ন ইউনিট নিয়ে মানবিক প্রতিবেদন রচনা করে বিরোধী দলের প্রতি মানুষের ক্ষোভ ও ঘৃণা ছড়ানোর প্রয়াস পেয়েছে। বড় ধরণের প্রাণহানির ঘটনায় পেট্রোলবোমাগুলো কে বা কারা মেরেছে তা আজো উদঘাটন করতে পারেনি সরকারের নিয়োজিত বাহিনীগুলো। সরকার ওইসব ঘটনাকে পুঁজি করে যেভাবে বিরোধী দলকে হেয় করার সর্বব্যাপী চেষ্টা চালিয়েছে তাতে ওইসব ঘটনার পেছনে কাদের হাত রয়েছে সে প্রশ্ন উঠেছে যৌক্তিকভাবেই।  তাছাড়া সরকার বিরোধী দলের আন্দোলন-সংগ্রামের খবরগুলো প্রচারে গণমাধ্যমে সেন্সরশীপ আরোপ করেছে যা পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছে। টিভিগুলোকে বলে দেয়া হয়েছে- কতটুকু খবর দেয়া যাবে, কোন কোন শব্দ ব্যবহার করা যাবে, আর কোনটা যাবে না। ফলে সরকারবিরোধী আন্দোলনের খবর টেলিভিশন থেকে একরকম উধাও হয়ে গেছে। আর সাধারণ মানুষও তার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়ে টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখার পরিবর্তে অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের তথ্যক্ষুধা মেটানোর চেষ্টা করছে। টেলিভিশনের দর্শক এখন স্মরণকালের মধ্যে সর্বনিম্ন বলে এক জরিপে উঠে এসেছে। সংবাদপত্রগুলোও প্রচ- চাপে রয়েছে। তবে যেহেতু টেলিভিশনের সম্প্রচার সুইচ টিপেই বন্ধ করে দেয়া বা কেবল অপারেটরদের চাপ দিয়ে বন্ধ করার নয়া নজীর স্থাপন করেছে, সে কারণে আতঙ্কিত টিভিস্টেশনগুলো সরকারের হুকুম তামিল করে চলেছে। একে একে জনপ্রিয় টকশোগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। যে ক’টি চালু আছে, সেগুলো সরকারের পছন্দের লোক দিয়ে চলছে।  সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশনা বন্ধ করার আইনী ও প্রক্রিয়াগত সমস্যা থাকলেও আমার দেশ এর পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে। ফলে অধিকাংশ সংবাদপত্র এখন নিজেদের পাঠক ধরে রাখতে নামে মাত্র বিরোধী দলের খবর দিচ্ছে। অনেকটা আধা লিটার সরকারি ফরমায়েশি প্রতিবেদনে এক চিমটি বিরোধী দলীয় আন্দোলনের খবর আর এক মুঠো সরকারি দলের আন্দোলনবিরোধী সংবাদ দিয়ে সংবাদপত্র প্রকাশ করছে। ফলে সাধারণ মানুষ দেশের প্রকৃত চিত্র থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ক্রসফায়ারের নামে প্রতিদিন তরতাজা বিরোধী কর্মীদের বাড়িঘর থেকে তুলে নিয়ে হত্যা কিংবা গুলিতে ঝাঁঝরা করে চিরতরে পঙ্গু করে দেয়া নিয়ে খবর হচ্ছে দায়সারা গোছের। ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিট নিয়ে যত মাতামাতি তার ছিটেফোটাও নেই পঙ্গুসহ বিভিন্ন হাসপাতালে গুলিবিদ্ধদের যন্ত্রণাকাতর দুর্বিষহ জীবন নিয়ে।  সরকারের কৌশল হচ্ছে-একদিকে দমন-নিপীড়ন, অন্যদিকে প্রোপাগান্ডায় এগিয়ে থাকলে বিরোধী আন্দোলন ব্যর্থ হবে অচিরেই। প্রোপাগান্ডার কৌশলটা অনেকটাই হিটলারের প্রচারমন্ত্রী গোয়েবলস এর থিওরিতে। একটি মিথ্যাকে বার বার প্রচার করে তা সত্যে পরিণত করার থিওরি সরকার মোক্ষমভাবে কাজে লাগাচ্ছে। আর ভিন্নমতের সাহসী সংবাদপত্র ‘দৈনিক আমার দেশ’, সত্য প্রকাশে আপসহীন বেসরকারি দিগন্ত টেলিভিশন, চ্যানেল ওয়ান, ইসলামিক টেলিভিশন আগেই বন্ধ করে দেয়া হয় দীর্ঘ মেয়াদী নীলনকশার অংশ হিসেবে। কোন আইনী প্রক্রিয়া ছাড়াই জবরদস্তি আমার দেশ এর প্রেসে তালা লাগিয়ে রাখা হয়েছে দু’বছর ধরে। নির্ভীক সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে দ্বিতীয় দফায় বিনাবিচারে দু’বছর কারাগারে রেখে অন্য সম্পাদক, প্রকাশকদের বার্তা দেয়া হচ্ছে।  সম্পাদক পরিষদের নেতৃত্বে-কর্তৃত্বে যারা আছেন তারা এখন যে আহা-উহু করছেন তা বড্ড দেরিতে। দু’বছর কিংবা তারও আগে আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান গণমাধ্যমের এমন ভয়াবহ পরিণতির বিষয়ে আভাস দিয়ে সতর্ক করেছিলেন। বলেছিলেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তাদের ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে কাউকেই ছাড় দেবে না। ফ্যাসিবাদ যখন ফনা তুলে, গোড়াতে তার বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়তে না পারলে দিনকে দিন তা সর্বগ্রাসী রূপ নেয়। এক সময় ঘোর ভিন্ন মতাবলম্বীদের নিষ্ঠুর কায়দায় দমনে-দলনে সমর্থ হলে পরে সহমতাবলম্বীদের মৃদু সমালোচনাও সহ্য করতে পারে না। ধরা কে সরা জ্ঞান করতে শুরু করে। বাদ যায় না কেউই। গল্পের সেই আখ চোরদের শায়েস্তা করার মতই।  গল্পটি পুরনো। তিন ধর্মের তিন বন্ধু আখ ক্ষেতে চুরি করতে ঢুকেছে। খ্রীষ্টান, হিন্দু ও মুসলমান। ক্ষেতের মালিক হাতেনাতে তিনজনকে ধরে ফেলে। একা তিনজনকে একসঙ্গে শায়েস্তা করা সম্ভব নয় বিধায় কৌশল নেন আখচাষি। প্রথম খ্রীষ্টানকে বলেন, একজন আমার মুসলমান ভাই, অন্যজন আমাদের কাছাকাছি হিন্দু ধর্মাবল¤ী^, তারা না হয় চুরি করেছে, তুই বেটা খ্রীষ্টান কেন আমার আখ চুরি করতে আসলি। এই বলে আচ্ছামত ধোলাই দিল, কোন রকম জান নিয়ে পালালো সে। অন্য দু’জন নীরব থাকল এই বলে যে-যাক আমরা বাঁচলাম। পরক্ষণেই দ্বিতীয় টার্গেট হিন্দু চোরকে বলল- আমার মুসলমান ভাই আমারটা চুরি করতেই পারে, তুই বিধর্মী কেন এ অপকর্ম করলি। তাকেও ধোলাইপর্ব শেষ করলো। এবার মুসলমানের পালা। বলল-ওই দু’জন বিধর্মী, চুরি যে মহাপাপ তা বুঝে না সেজন্য না হয় করেছে, কিন্তু মুসলমান হয়ে কেন তুই মহাপাপের পথে পা বাড়ালি। এই বলে তৃতীয়জনকে উচিৎ শিক্ষা দিলেন আখচাষি।  বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও শাসকগোষ্ঠীর কৌশল হয়তো তেমনই। মাহমুদুর রহমান, আমার দেশকে যখন টুটি চেপে ধরেছে, তখন অনেকে মুচকি হেসে বলেছে, ‘ওই ব্যাটা সাংবাদিক না, পত্রিকাটিও দলবাজি করে, সরকার যা করছে উচিৎ করছে’। অনেকে সরকারকে সাধুবাদ জানিয়েছেন, উৎসাহিত করেছেন। মাহমুদুর রহমানকে সম্পাদক বা সাংবাদিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতেও তারা ছিলেন কুণ্ঠিত। আদালত অবমাননার অভিযোগে নজীরবিহীন কারাদ- দিলেও কেউ মাহমুদুর রহমানের পাশে দাঁড়ায়নি। সম্পাদক পরিষদ গঠনের সময়, কিংবা পত্রিকা মালিকদের সংগঠন ‘নোয়াব’ গঠনে ন্যায্য আমন্ত্রণ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন মাহমুদুর রহমান। তখন যদি মাহমুদুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে, সতর্ক বার্তা আমলে নিয়ে মুক্ত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা ও রক্ষার সংগ্রামে এক কাতারে থাকতেন সব গণমাধ্যম মালিক-সম্পাদক তা হলে এখন হয়তো মহাদুর্যোগ নেমে আসতো না। সম্পাদকদের এখন দফায় দফায় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে হয়তো ক্ষমা ভিক্ষা করতে হতো না। সুশীল শ্রেণীর সম্পাদকদের নাম ধরে গ্রেফতারের হুঙ্কার দেয়ার সাহস হতো না। অবশ্য মাহমুদুর রহমানের মতো জেল-জুলুমের মুখোমুখি তাদের হতে হবে না-এটা জোর দিয়েই বলা যায়। মাহমুদুর রহমানের মতো দুর্দান্ত সাহসী সম্পাদক আছেন ক’জন। শির উঁচু করে; জীবনের মায়া তুচ্ছ করে; দেশের পক্ষে, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, মৌলিক অধিকার রক্ষায় সত্যনিষ্ঠ সাহসী সাংবাদিকতার জন্য বুক পেতে দেয়ার মনোবল আছে এমন সম্পাদক-মালিক খুঁজে বের করতে অনুবীক্ষণ যন্ত্র লাগবে। ধমকে শাসকগোষ্ঠীর পায়ে লুটিয়ে পড়ার, করজোড়ে ক্ষমা চাওয়ার নজিরইতো ঢের।  চ্যানেল ওয়ান, দিগন্ত ও ইসলামিক টিভি ঠুনকো অজুহাতে সাময়িক বন্ধের সময় টিভি মালিকদের সংগঠন নির্বিকার ছিলেন। এখন একুশে টিভি এবং এনটিভির মালিকদের চোর-ডাকাতের মতো ধরে রিমান্ডে নিয়ে জেলে পুরেছে। অন্যরা মিউ মিউ করে একটি বিবৃতি দিয়ে দায় সারছেন। তাদের বেলায়ও অনুরূপ থেরাপি প্রয়োগ হবে না এমন ভেবে থাকলে আখচোরদের মতো হতে পারে।  জগতের সকল ফ্যাসিস্টই আদর্শ, দেশপ্রেম, জননিরাপত্তা ও জনলকল্যাণের নামেই গণতন্ত্রকে পদদলিত করে, মানবিক-মৌলিক অধিকারকে ভূলুন্ঠিত করে। অত্যাচার-নির্যাতনের স্টিমরোলার চালিয়ে বিরোধী দল-মতকে নিশ্চিহ্ন করতে চায়।  বাংলাদেশের বর্তমান সরকার দাবি করেন যে, তারাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একক ধারক-বাহক, তারাই একমাত্র দেশপ্রেমিক, তারা যতদিন ক্ষমতায় ছিলেন না ততদিন দেশে ছিল ঘৃণ্য স্বৈরাচার। তারা ক্ষমতায় এসেই গণতন্ত্র পুনঃকায়েম করেছেন, মুক্তিযুদ্ধের হৃত চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছেন। তারা যা করছেন সবই আইনের শাসন কায়েমে করছেন এবং উন্নয়নের প্রচ- প্লাবন বইয়ে দিয়েছেন।  গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম অপরিহার্য পূর্বশর্ত হচ্ছে স্বাধীন গণমাধ্যম এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। দেশের বিচার ব্যবস্থা এখন কতটা স্বাধীন আর কোন মাত্রায় পরাধীন তা অনুধাবনের জন্য গবেষণার প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন খালি চোখে যা দেখা যাচ্ছে তাতে বিচার ব্যবস্থা নিয়ে দেশের মানুষের হতাশাকে সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছে।  আর সংবাদপত্র বা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়ে নির্মোহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, আওয়ামী লীগ সরকার ও স্বাধীন গণমাধ্যম একসঙ্গে যায় না বলে যে কথা প্রচলিত আছে তাই বার বার চোখে আঙুল দিয়ে প্রমাণ করে দিচ্ছে। বর্তমান সরকারি দল গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় কতটা বিশ্বাস করে তা ১৯৭২ থেকে ’৭৫ পর্যন্ত, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত যেমনিভাবে উজ্জ্বল প্রমাণ রেখেছে , তেমনি এবারে ২০০৯ থেকে এই পর্যন্ত হাতে-কলমে দেখিয়ে দিচ্ছে।  সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ ভিত্তি বা ফোর্থ এস্টেট। বিশ্বের প্রতিটি সভ্য মানুষ সংবাদপত্র তথা মিডিয়ার স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। সংবাদপত্রই ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি ফাঁস করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিক্সন সরকারের পতন ঘটিয়েছিল। গণমাধ্যমই লর্ড প্রফুমোক্রিস্টিন কিলার কেলেঙ্কারি নিয়ে তোলপাড় তুলে কুপোকাত করেছিল ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী এন্থনী ইডেন সরকারের। মিডিয়াই ক্লিনটন-মনিকার অবৈধ সম্পর্ক নিয়ে হৈ চৈ ফেলে দিয়ে সাবেক ওই মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভাবমূর্তি ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিল। এসব উদাহরণ আছে বলেই সরকার মনে করছে গণমাধ্যমই সরকারের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার ক্ষেত্রে অন্যতম অন্তরায়।  কিন্তু প্রেসিডেন্ট নিক্সন, প্রধানমন্ত্রী এন্থনী ইডেন বা প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন কি কখনোই কোনো পত্রিকার বিরুদ্ধে মামলা বা হয়রানিমূলক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন? মামলা-হয়রানি দূরে থাক, একটা ধমক বা কটুক্তিও কি তারা মিডিয়া সম্পর্কে করেছিলেন? তাদের দলের লোকেরা কি ওইসব পত্রিকার সম্পাদক-প্রতিবেদকের ওপর হামলা, পত্রিকা পুড়ে দেয়া বা দেশজুড়ে হয়রানিমূলক ডজন ডজন মামলা করেছিলেন? তারা কখনোই এসব কিছু করেননি। কারণ তারা জানতেন এ ধরণের কা- বা প্রতিক্রিয়া অসভ্যতা-বর্বরতার শামিল, গণতান্ত্রিক চেতনা ও মূল্যবোধের পরিপন্থী।

লেখক: সিনিয়রসহ সভাপতি, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-বিএফইউজে

(প্রকাশিত মতামত একান্তই লেখকের নিজস্ব)

You may also like

Leave a Comment