খোলা কলাম ;মুক্তচিন্তার কোনো স্থান নেই বাংলায়

by News Room

তসলিমা নাসরিন:কলকাতা বইমেলায় নিষিদ্ধ হলো যশোধারা বাগচির নারীবাদী বই ‘পরাজয়ী নারী’র প্রকাশ অনুষ্ঠান। সকলে অবাক। এ কী কাণ্ড! ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য বৃন্দা কারাত তো ভীষণ রুষ্ট, বললেন, ‘এমন জঘন্য কাণ্ড পশ্চিমবঙ্গে এর আগে ঘটেনি কখনো’। তিনি কিন্তু মিথ্যে বলেছেন, দু’বছর আগেই ওই একই কলকাতা বইমেলায় এসি অডিটোরিয়ামে আমার ‘নির্বাসন’ বইটির প্রকাশনা উৎসব নিষিদ্ধ করেছিল মমতার সরকার। যশোধারা বাগচি বামফ্রন্ট সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মহিলা সংগঠনের প্রধান ছিলেন। সে কারণেই বৃন্দা কারাত যশোধারা বাগচির পাশে দাঁড়িয়েছেন। আজকাল, লক্ষ্য করেছি, রাজনীতিকরা আর বুদ্ধিজীবীরা খুব হিসেব করে বাক স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেন। যার পাশে দাঁড়ালে স্বার্থোদ্ধার হবে, বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সফল হবে, শুধু তার পাশেই দাঁড়ান। বৃন্দা কারাতের ভুলে যাওয়ার কথা নয় যে পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থী রাজ্য সরকার আমার বই নিষিদ্ধ করেছে, শুধু তাই নয় আমাকে রাজ্য থেকে তাড়িয়েছে শুধু হাতে গোনা কিছু মুসলিম মৌলবাদীকে খুশি করার জন্য, যেন ওই মৌলবাদীদের দয়ায় আখেরে মুসলিমদের ভোটটা জোটে। যশোধারা বাগচির বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠান বাতিল করে দেওয়ার বিরুদ্ধে বাংলার বুদ্ধিজীবীরাও দেখলাম বেশ কথা বলছেন। এরাই কিন্তু চুপ করে ছিলেন যখন আমার বই প্রকাশ অনুষ্ঠান বাতিল করে দেওয়া হয়। যশোধারা বাগচি নারীর অধিকার নিয়ে লিখেছেন, আমার বইও তো নারীর অধিকার নিয়েই। তাহলে আমার বই প্রকাশ অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ করলে অন্যায় নয়, যশোধারার বই প্রকাশ অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ করলে অন্যায় কেন? তবে কি এই কারণে, যে, যশোধারার বিরুদ্ধে মুসলিম মৌলবাদীরা সরব নয়, আমার বিরুদ্ধে সরব! মুসলিম মৌলবাদীরা বিরুদ্ধে থাকলে আমার পক্ষে দাঁড়ানো যাবে না, সে আমি যতই বঞ্চিত হই বা লাঞ্ছিত হই! অনেকবার বলেছিলাম, ‘আজ আমার ওপর আক্রমণ হলে তোমরা চুপ থাকছো, পরে কিন্তু তোমাদের ওপরও আক্রমণ হবে’। ঠিক ঠিক হলো। যখন প্রথম আমার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়, তখন মুখ বুজে না থেকে প্র

তিবাদ করলে সমাজটা নষ্টের দিকে যেতে থাকে না। যখন কলকাতায় বাস করতাম, তখন সালমান রুশদি দিব্যি কলকাতায় অনুষ্ঠান করতে গেছেন। আমাকে তাড়িয়ে দেওয়ার পর কিন্তু সালমান রুশদিকেও আর কলকাতায় ঢুকতে দেওয়া হয়নি। আমাকে যদি কলকাতা থেকে বের করে না দেওয়া হতো, রুশদির কলকাতায় প্রবেশে কোনও অসুবিধে হতো না। আমাকে রাজ্য থেকে বের করে দেওয়া মানে মুসলিম মৌলবাদীদের দাবির কাছে হার মানা অথবা ওদের সমস্ত অনৈতিক অযৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়ার অঙ্গীকার করা। এভাবেই বেশ অনেক বছর ধরে মৌলবাদী অপশক্তিকে আদর আহলাদ দিয়ে মাথায় তুলেছে পশ্চিমবঙ্গের শাসককুল। আমাকে তাড়ানো হয়েছে মৌলবাদীদের খুশি করতে, সুতরাং সালমান রশদিকে স্বাগতম মৌলবাদীরা নিশ্চিতই অখুশি হবে। ওদের জন্য একবার অন্যায় করলে সারাজীবন অন্যায় করেই যেতে হয়। সালমান রুশদিকে কলকাতায় যেতে বাধা দেওয়া হয়েছে বলে বুদ্ধিজীবীরা বেশ রাগ করেছেন। কিন্তু আমাকে যখন বের করে দেওয়া হলো কলকাতা থেকে এবং এরপর আর যখন ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না কলকাতায়, তখন কিন্তু অত বেশি বুদ্ধিজীবীর অত বেশি রাগ হয়নি। নারীবাদীদের যা ইচ্ছে তাই হোক, তাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা না থাকুক, পুরুষতান্ত্রিক লোকদের এতে অবশ্য খুব একটা কিছু যায় আসে না।

বাংলাদেশের লোকেরাও গত কুড়ি বছর আমাকে দেশে ঢুকতে না দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বা আমার বই একের পর এক নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে মুখ খোলেনি। কিন্তু কিছু দিন আগে হঠাৎ দেখলাম আগামী প্রকাশনী থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে প্রতিবাদের। আমন্ত্রণপত্রে দেখলাম লেখা, ‘আগামী ৩০ জানুয়ারি বিকেল সারে চারটায় জাতীয় প্রেসক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে উপমহাদেশের অন্যতম আপোষহীন নারীবাদী লেখক তসলিমা নাসরিনের ওপর থেকে যাবতীয় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করার দাবিতে সংবাদ সম্মেলন’। বিস্মিত হলাম। গত কুড়ি বছর ধরে আমাকে ‘বিতর্কিত লেখিকা’ বলেই সম্বোধন করে আসছে সবাই। এর চেয়ে বেশি দেশ থেকে আশাও কিছু করিনি। আমার বিরুদ্ধে একশ’ ভাগ মিথ্যাচার না করে যদি আশি ভাগ মিথ্যাচার করে দেশ বা দেশের মানুষ, তাহলেই আমার খুশির সীমা নেই। সেটাও তো করে না, বরং যা কিছু লেখে, যা কিছু বলে, সবই মিথ্যেয় টইটম্বুর। সেদিন কিন্তু আশাতীত ঘটনা ঘটলো। আগামী প্রকাশনীর প্রকাশক একরকম একাই সিদ্ধান্ত নিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার। তিনি লেখক কবি বুদ্ধিজীবী নন, কিন্তু নীরবতার নিস্তব্ধ গালে বড় একটি চড় কষালেন বটে। তিনি ওই সংবাদ সম্মেলনে যা বলেছেন, তা বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য সম্পূর্ণ নতুন বৈকি।

“তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে যেসব নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশ সরকার জারি করেছে, সেসব প্রত্যাহারের দাবিতে আজ আমরা জড়ো হয়েছি। আজকের যুবসমাজ তসলিমা নাসরিন সম্পর্কে জানে না, অথবা জানলেও খুব কম জানে। বেশির ভাগই তসলিমার বই পড়েনি। অনেকে যারা তসলিমার নিন্দা করে, তারা তসলিমার বিরুদ্ধে মিথ্যে অপপ্রচার দ্বারা প্রভাবিত। বাংলাদেশের মৌলবাদী এবং নারী-বিরোধী গোষ্ঠী বরাবরই বড় তৎপর তসলিমার অপপ্রচারে।

যারা তসলিমা সম্পর্কে জানে না, তাদের জানার জন্য বলছি, তসলিমার জন্ম বাংলাদেশের ময়মনসিংহে। তিনি শৈশব থেকেই কবিতা লিখতেন। সতেরো বছর বয়স থেকে কবি

তা পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। তার চিকিৎসক পিতার প্রেরণায় তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞানে পড়েন, চিকিৎসক হিসেবে তিনি বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে, ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালে এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চাকরি করেন। চাকরি করলে লেখালেখি ছাড়তে হবে, সরকারি এই নির্দেশ পেয়ে তিনি সরকারি চাকরিতে ইস্তফা দেন। লেখালেখির শুরু থেকেই তসলিমা নাসরিন জনপ্রিয়। তিনি আশি দশকের শেষদিকে বিভিন্ন পত্রিকায় কলাম লিখতেন এবং নারীর অধিকার বিষয়ে সেই সব লেখার কারণে তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তসলিমার প্রতিটি বই জায়গা পেতে থাকে বেস্ট সেলার লিস্টে। তসলিমা নাসরিন ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম আপোষহীন নারীবাদী লেখিকা। লেখালেখির জন্য অসাধারণ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন ঠিকই, আবার বিতর্কিতও হয়েছেন। ধর্মান্ধ লোকেরা তার লেখা নিয়ে বিতর্ক করেছে প্রচুর। লক্ষ লক্ষ লোক তার ফাঁসির দাবিতে মিছিল করেছে দেশময়।

নারীর অধিকারের কথা বলতে গিয়ে তিনি শুধু ধর্মীয় মৌলবাদীদের আক্রমণের শিকার হননি, গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। খালেদা জিয়ার সরকার শুধু তার বই নিষিদ্ধ করেই ক্ষান্ত হননি, তসলিমার বিরুদ্ধে মামলাও করেন, জারি করেন গ্রেফতারি পরোয়ানা। এর কিছু দিন পরই তাকে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। দীর্ঘ কুড়ি বছর যাবৎ তিনি নির্বাসিত জীবন যাপন করছেন।

মানবতার পক্ষে লেখা তার তথ্যভিত্তিক উপন্যাস ‘লজ্জা’, নিজের শৈশব স্মৃতি নিয়ে লেখা ‘আমার মেয়েবেলা’, কৈশোর ও প্রথম যৌবনের স্মৃতি নিয়ে লেখা ‘উতল হাওয়া’, আত্দজীবনীর তৃতীয় ও চতুর্থ খণ্ড ‘ক’ এবং ‘সেইসব অন্ধকার’ _ বই পাঁচটি বাংলাদেশ সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। আজও বইগুলো থেকে নিষেধাজ্ঞা যায়নি। ‘আমার মেয়েবেলা’র জন্য তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পুরস্কার আনন্দ পুরস্কার পেয়েছেন, ‘লজ্জা’ পৃথিবীর তিরিশটিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

দীর্ঘ নির্বাসিত জীবনে তসলিমা প্রচুর পুরস্কার এবং সম্মান অর্জন করেছেন। এর মধ্যে আছে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট থেকে মুক্তচিন্তার জন্য শাখারভ পুরস্কার, সহিষ্ণুতা এবং শান্তি প্রচারের জন্য ইউনেস্কো পুরস্কার, ফরাসি সরকারের মানবাধিকার পুরস্কার, ধর্মীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য ফ্রান্সের এডিট দ্য নাস্ত পুরস্কার, বেলজিয়ামের ‘রয়্যাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্স, আর্টস অ্যান্ড লিটারেচার’ থেকে অ্যাকাডেমি পুরস্কার, সুইডেনের লেখক সংস্থা পেন থেকে কুর্ট টুখোলস্কি পুরস্কার, জার্মানির মানববাদী সংস্থা থেকে আরউইন ফিশার পুরস্কার, নারীবাদ বিষয়ে লেখালেখির জন্য ফ্রান্সের সিমোন দ্য বুভোয়ার পুরস্কার, আমেরিকার ফেমিনিস্ট প্রেস পুরস্কার। বেলজিয়ামের গেন্ট ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব লোভেইন, আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব প্যারিস এবং প্যারিসডিডেরো ইউনিভার্সিটি থেকে পেয়েছেন সাম্মানিক ডক্টরেট। রিসার্চ ফেলো হিসেবে কাজ

করেছেন হারভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দুহাজার তিন-চারে, আর নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে দুহাজার নয়-দশে। ভারত থেকে ‘নির্বাচিত কলাম’ আর ‘আমার মেয়েবেলা’ বই দুটোর জন্য দুবার পেয়েছেন আনন্দ পুরস্কার। ইংরেজি, ফরাসি, ইতালীয়, জার্মানসহ মোট তিরিশটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে তসলিমার বই। মানববাদ, মানবাধিকার, নারী স্বাধীনতা বিষয়ে তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন মঞ্চে, হারভার্ড, ইয়েল, অঙ্ফোর্ড, এডিনবরা, সরবোনের মতো বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা করেছেন। মত প্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে সারা বিশ্বে তিনি একটি আন্দোলনের নাম।

কলকাতায স্থায়ীভাবে তিন বছর বসবাসের পর তার ওপর মৌলবাদী হামলার ফলস্বরূপ দুহাজার আটে তিনি ভারত ত্যাগ করতে বাধ্য হন। তবে ভারতে দুহাজার এগারো সালে তিনি বাস করার অনুমতি পেয়েছেন। এখনও তিনি যাযাবর জীবন যাপন করছেন। একজন বাঙালি হয়েও, বাংলা ভাষার লেখক হয়েও তার বাংলায় ঠাঁই নেই। কিছু কূপমণ্ডুপ, মূর্খ আর স্বার্থান্ধ ধর্মান্ধ আর চতুর রাজনীতিকদের কারণে আজ তসলিমা পৃথিবীর পথে পথে ঘুরছেন আশ্রয়হীন। আজ কুড়ি বছর হলো কোনও বাংলাদেশ সরকারই তাকে তার নিজের দেশে প্রবেশ করার অনুমতি দিচ্ছে না। তার পাসপোর্ট নবায়ন করছে না। তাকে ভিসা দিচ্ছে না।

তসলিমার মানবাধিকার লঙ্ঘন করায় ক্ষতি যত তসলিমার হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি হচ্ছে দেশের, সমাজের। বাংলাদেশ নামের দেশটিকে এখন বিদেশের অনেকেই জানে মৌলবাদী দেশ হিসেবে, যে দেশে তসলিমার মতো মানববাদী লেখকের কোনও স্থান নেই। মৌলবাদীরা তসলিমাকে চায় না, সুতরাং কোনও সরকারই তসলিমাকে গত বিশ বছর হলো দেশে প্রবেশাধিকার দেয়নি।

নারী যখন কেবল নারী হয়ে জন্মানোর কারণে বঞ্চিত হচ্ছে, পথে ঘাটে লাঞ্ছিত হচ্ছে, যখন স্বাধীনতা বা অধিকার বলতে কিছু নেই নারীর, যখন তসলিমার প্রয়োজন এ দেশে সবচেয়ে বেশি, তখন তসলিমা নেই দেশে। তসলিমাকে দেশে ফেরত আনার দাবি জানাচ্ছি আমরা এবং অবিলম্বে তার বাক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে যত মামলা করা হয়েছে দেশে, সব তুলে নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।”

দাবি জানিয়েছেন ওসমান গনি। সঙ্গে ছিলেন মারুফ রসুল আর রোবাইয়াৎ ফেরদৌস। তাদের কথা কারও কানে পেঁৗছোবে না। দেশের দরজা যেমন বন্ধ ছিল, তেমন বন্ধই থেকে যাবে আমার জন্য। কিন্তু মনে সুখ হয়েছে এইটুকু জেনে যে, অন্তত দু’একজন মানুষ এখনও আছেন, যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন! বাংলাদেশ নিয়ে গর্ব করার কিছু নেই, কিন্তু গর্ব যদি কখনও হয়, ওই তাদের নিয়ে, যারা অন্যায় আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন, স্বার্থের জন্য মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকেন না, তাদের নিয়ে গর্ব হয়।

লেখক: নির্বাসিতা লেখিকা।

You may also like

Leave a Comment