কে হতে পারে সেই কাংখিত ‘তৃতীয় শক্তি’? : আব্দুল হাফিজ চৌধুরী

by News Room

দীর্ঘ দিন ধরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে যে তত্ত্ব ও তথ্যটি বারবার বেরিয়ে এসেছে এবং বারবার সকল মহলে আলোচিত হচ্ছে তা হচ্ছে এই যে, এদেশের গণমানুষ আর দু’নেত্রীকে ক্ষমতায় দেখতে চায় না। কেন এবং কী কারণে চায় না আমি এ মুহুর্তে সে আলোচনায় যেতে চাইনা। শুধু সংক্ষেপে বলতে চাই জনগণ উভয় দলকে বারবার ক্ষমতায় দেখেছে, মধ্যখানে দীর্ঘদিন এরশাদ সরকারকেও ক্ষমতায় দেখেছে, কিন্তু তাদের কেউই জনগণের আশা-আকাংখা পূরণ করতে পারেন নি, বরং তাদের কীর্তিকলাপে গণ মানুষ খুবই অতিষ্ঠ ও দিশেহারা। তাই বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তির মুখে বারবার তৃতীয় শক্তির আবির্ভাবের আকাংখা ব্যক্ত হচ্ছে। কিন্তু কে হতে পারে সেই ‘তৃতীয় শক্তি’ এর উত্তর কিন্তু কেউই দিতে পারছেন না।
সুশীল সমাজের চিন্তা চেতনার ধারক ও বাহক বলে খ্যাত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব ডঃ ইউনুস সাহেব এর রাজনীতিতে আসার ঘোষণা অনেককেই আশান্বিত করলেও নিমিষেই তিনি ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে সম্মানের সাথে নিজ আশ্রয়ে চলে গেলেন।
কেউ কেউ মনে করেন সেনাবাহিনী হতে পারে সেই ‘তৃতীয় শক্তি’। কিন্তু এ সম্ভাবনা আদৌ যুক্তিতে ও বাংলাদেশের বাস্তবতায় টিকে না। কারণ বিএনপি ও জাতীয় পার্টি মূলত সেনাবাহিনীর সরাসরি ফসল। আর সেনাবাহিনীর পূর্ণ সহযোগীতায় ফখরুদ্দীন-মঈনুদ্দীন সাহেবরা জরুরী অবস্থা জারী করে কয়েক বছর অকান্ত চেষ্টা-সাধনা করে চরম ভাবে ব্যর্থ হয়ে জনগণের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। আর তাদের সকল ব্যর্থতা ও অপকর্মের গ্লানি মাথায় নিয়ে তাদের সহায়তায় আওয়ামীলীগকে ক্ষমতায় আসতে হয়েছিল। যার কারণে নতুন করে সেনাভ্যুত্থানের আশংকা যুক্তিসংগত নয়।
ইদানিংকালে হেফাজতের উত্থানকে অনেকে ‘তৃতীয় শক্তি’ হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেছিলেন। এমনকি সরকার মহোদয় এটাকে প্রচ- মাথা ব্যথা হিসেবে মনে করে এ ব্যথা থেকে মুক্তির জন্যে বহির্বিশ্বের সহায়তা কামনার প্রচেষ্টা প্রকাশ্যেই করতে শুরু করে দিয়েছিলেন। কিন্তু শাপলা চত্বরের ঘটনা এটা প্রমাণ করে যে, হেফাজতীগণকে আরো অনেক প্রস্তুতি ও অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে রাজনৈতিক কর্মসূচী নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। আর এজন্য আরো অনেক দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে সন্দেহ নেই।
কেউ কেউ মনে করেন ‘দেশের বাইরের কোনো শক্তি হস্তক্ষেপের সুযোগ নিতে পারে।’ বস্তুত বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এবং ব্রিটীশ আমল থেকে শুরু করে বাংলাদেশের দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস এ মতকে সমর্থণ করে না। এদেশের জনগণ কোনো বহির্শক্তিকে বরদাশত করতে পারে না। এমনকি বাইরের কোনো শক্তির সাথে অতিরিক্ত গলাগলিও পছন্দ করে না। আওয়ামী লীগের প্রতি মানুষের অনাস্থা সৃষ্টির পেছনে এটাও অন্যতম কারণ।
তাহলে ‘তৃতীয় শক্তি’ কে বা কারা হতে পারে? এ প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। কোনো বুদ্ধিজীবি থেকে এর কোনো সদুত্তর আসছে না। আর এ উত্তর না আসার পেছনে দু’টি কারণের যে কোনো একটি কারণ অবশ্যই রয়েছে। এ কারণ দু’টো হলোঃ- (১) হয়তো তারা এর সঠিক উত্তর খুঁজে পাচ্ছেন না অথবা (২) খুঁজে পাচ্ছেন, কিন্তু সত্যকে সত্য বলার সৎ সাহসের অভাবে কিংবা নিজেদের মধ্যে হিংসার তীব্রতার কারণে ইচ্ছে করেই বলছেন না।
নিরপেক্ষ মন নিয়ে চিন্তা করলে এ অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিস্থিতিতেও দেশ এখনো একেবারে হতাশ ও নিরাশ হবার পর্যায়ে পৌঁছে নি। বরং এখনো আশার আলো দেবার মতো দল ও গোষ্ঠি বিদ্যমান রয়েছে-যারা  ‘তৃতীয় শক্তি’ হবার মতো যোগ্যতা রাখে। এক্ষেত্রে প্রথমে দেখতে হবে গণমানুষ ঐ কাংখিত তৃতীয় শক্তির মধ্যে কোন্ সব গুণাবলি দেখতে চায়। সেসব গুণাবলী ঐ শক্তি বা দলের মধ্যে আছে কি না যাচাই করলে ‘তৃতীয় শক্তি’ নির্ণয় করা সহজ হয়ে যাবে।
কাংখিত তৃতীয় শক্তির গুণাবলি যথাঃ- (১) দলটির সুনির্দিষ্ট আদর্শ ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থাকবে। (২) একটি গঠনতন্ত্রের আলোকে দলটি পরিচালিত হবে। (৩) দলটির মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা থাকবে। পরামর্শ, গঠনমূলক সমালোচনা সহ্য করার ক্ষমতা থাকবে। (৪) জীবিত বা মৃত কোনো ব্যক্তি বা পরিবারকে কেন্দ্র করে দলটি পরিচালিত হবে না, বরং আদর্শের ভিত্তিতে দলটি চলবে এবং নেতৃত্ব নির্বাচিত হবে। (৫) সর্বস্তরের নেতা-কমর্েিদর মধ্যে চিন্তা-চেতনার ঐক্য থাকবে এবং কোনো প্রকার শ্রুপিং থাকবে না। (৬) নির্দিষ্ট লক্ষ্য উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য কর্মসূচী বাস্তবায়নে জান-মাল উৎসর্গ করার মন-মানসিকতা সকল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মধ্যে থাকতে হবে। (৭) কঠিন পরিস্থিতিতেও ভেঙ্গে না পড়ে সাহসিকতার পরিচয় দিতে হবে। (৮) লক্ষ্য হাসিলের জন্য তাড়াহুড়ো না করে দীর্ঘপথ অতিক্রম করার ধৈর্য্য , দৃঢ়তা থাকতে হবে। (৯) সত্য, ন্যায়-নিষ্ঠতা ও যোগ্যতা, পারদর্শিতায় নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে হবে। (১০) চলমান পরিবেশ-পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা থাকতে হবে। (১১) নারীদেরকে যথাযথ মর্যাদা দিতে হবে। (১২) ছাত্র-ছাত্রীদের, শ্রমিক শ্রেণী ও বিভিন্ন পেশার লোকদের মধ্যে কাজ থাকতে হবে। (১৩) নির্দিষ্ট আদর্শের আলোকে সমাজ-রাষ্ট্র, শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতিসহ গোটা সমাজ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর যোগ্যতা থাকতে হবে। (১৪) সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি, রাহাজানি, ছিনতাই, হাইজ্যাক ও সমাজ বিরোধী লোভ এবং অন্যায় কাজ থেকে নেতা-কর্মীদেরকে মুক্ত থাকতে হবে। (১৫) সততা ও যোগ্যতায় জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে। (১৬) দলীয় আদর্শের মধ্যে বিশ্ব রাজনীতিতে ভূমিকা রাখার মতো উপাদান থাকতে হবে। (১৭) পরমত সহিষ্ণুতা, উদারতা সকল ক্ষেত্রে ভদ্রতা, সৌজন্যতা, শালীণতা ও শিষ্টাচারিতা থাকতে হবে। (১৮) সকল ধর্মের অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট থাকতে হবে। (১৯) নিজেদের অভিপ্রায়কে অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়ার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। (২০) মানুষকে ঘৃণা না করে ক্ষমা করার উদারতা থাকতে হবে। (২১) চরম উত্তেজনার মুহুর্তেও নিজেদেরকে সংযত রাখা এবং আইনকে নিজের হাতে তুলে না নেয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে এবং আক্রমণাত্মক নীতি পরিহার করে আত্মরক্ষামূলক নীতি অবলম্বন করতে হবে। (২২) প্রতিবেশী রাষ্ট্র সমূহের সাথে স্বীয়-রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করে প্রতিবেশী সূলভ আচরণের ঘোষণা দিতে হবে। (২৩) বিকল্প নেতৃত্ব থাকতে হবে।
বাংলাদেশের বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলোর সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে নিরপেক্ষ পর্যালোচনা করলে দেখা যায় উপরোক্ত গুনগুলোর প্রায় সবগুলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে পাওয়া যায়। সুতরাং এদলটিই কাংখিত সেই তৃতীয় শক্তি হবার যোগ্যতা রাখে।

এবার এক এক করে উক্ত সব গুনাবলী এ দলটির মধ্যে আছে কি না তা যাচাই করে দেখি। (১) দলটির সুনির্দিষ্ট আদর্শ, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, কর্মসূচী, কর্মপদ্ধতি ও কর্মনীতি রয়েছে যার আলোকে দলটি পরিচালিত হয় এবং এর ভিত্তিতে তাদের প্রতিটি কর্মীকে গঠন করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। যার কারণে তাদের প্রতিজন কর্মীকে এ সংক্রান্ত প্রশ্ন করলে উত্তর পাওয়া যায়। অথচ অন্যান্য দলের অনেক বড় বড় নেতাকে পর্যন্ত প্রশ্ন করলে এর সঠিক উত্তর পাওয়া যায় না। (২) দলটি তাদের নির্দিষ্ট ও লিখিত গঠনতন্ত্রের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। এতে সাধারণত ব্যত্যয় হয় না। (৩) দলের মধ্যে রয়েছে গণতন্ত্রের পূর্ণ অনুশীলন। সর্ব পর্যায়ে পরামর্শের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। যে কোনো নেতাকর্মীর সামনা-সামনি সমালোচনার ব্যবস্থা রয়েছে। যা তাদের পরিভাষায় মুহাসাবা বলা হয়। (৪) কোনো ব্যক্তি বা পরিবার বা গোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে দলটি পরিচালিত হয় না। সর্ব পর্যায়ে নেতৃত্ব নির্বাচনে যোগ্যতা ও আদর্শের অনুসরণকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়ে থাকে। ইতোমধ্যে দলের কেন্দ্রীয় আমীর তিনবার বদল হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার চরম মুহুর্তেও তাদের দলীয় নির্বাচন যথাসময়ে হয়ে থাকে।
প্রতিবছর উপজেলা ও ইউনিয়ন/ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রতি দুই বছর অন্তর জেলা পর্যায়ের এবং প্রতি তিন বছর পর পর কেন্দ্রীয় নির্বাচন হয়ে থাকে। (৫) সকল পর্যায়ে পরামর্শের আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অবাধ গঠনমূলক সমালোচনা এবং নিয়মিত নির্বাচন হবার কারণে দলটি সম্পূর্ণ গ্রুপিং ও দলীয় কোন্দল মুক্ত। আদর্শের চর্চা থাকায় সকল স্তরের নেতাকর্মীদের মধ্যে চিন্তা-চেতনার ঐক্য লক্ষ্য করা যায়। (৬) কর্মসূচী বাস্তবায়নের মাধ্যমে অভিষ্ট লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য জান মাল উৎসর্গ করার প্রবণতা প্রত্যেক নেতা-কর্মীর মাঝে দেখতে পাওয়া যায়। প্রত্যেক কর্মীকে স্বীয় আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দলীয় ফা-ে প্রতিমাসে প্রদান করতে হয়। তাছাড়া আপদকালীণ সময়েও এককালীন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ দলীয় তহবিলে জমা দিয়ে থাকে। (৭) চরম কঠিন পরিস্থিতিতেও ভেঙ্গে পড়ে সাহসহারা না হয়ে কর্মসূচী বাস্তবায়ন ও দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা করতে দেখা যায়। বর্তমানে কেন্দ্র থেকে শুরু করে অধিকাংশ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বেশিরভাগ নেতা কর্মী জেলে এবং অধিকাংশ নেতাকর্মীদের উপর  বিপুল সংখ্যক মামলা-হামলা থাকা সত্বেও এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ সারির নেতৃত্ব সত্বেও  হিম্মতহারা এবং আবেগের বশবর্তী না হয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় আন্তরিকতার সাথে কর্মসূচী বাস্তবায়ন করতে দেখা যায়। (৮)  লক্ষ্য হাসিলের জন্য দলটির মধ্যে তাড়াহুড়ো করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় না। ১৯৮৬ সালের সংসদে তাদের ১০জন এমপি ছিলেন। দলের সিদ্ধান্তের সাথে সাথে দশ জন এমপি পদত্যাগ করলে তৎকালীণ সরকারের পতন নিশ্চিত হয়ে যায়। ১৯৯২ সালে তাদের ১৮ জন এমপি ছিলেন। বিএনপির পক্ষ থেকে কোয়ালিশন সরকারে অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো সত্ত্বেও এ প্রস্তাব তাদের লক্ষ্য হাসিলের অনুকূল নয় মনে করে সরকার গঠনে সাহায্য করে, কিন্তু সরকারের অঙশ নেয়নি। ১৯৯৬ সালের সংসদে জামায়াতের এমপি ছিলেন মাত্র তিনজন। তথাপি তাদের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তিনজনের একজন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে মন্ত্রী হবার জন্য আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেয়া হলেও জামায়াত তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের অনুকূলে মনে না করায় এ প্রস্তাব গ্রহণ করে নি। (৯) রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রচারের বিষয়টি বাদ দিলে দলটির সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের মাঝে সততা, ন্যায় নিষ্টতা, ধার্মিকতা ও যোগ্যতা পারদর্শীতায় সম-সাময়িক পারিপার্শ্বিক পরিবেশ পরিস্থিতিতে অনেক উন্নত মানের বলে প্রমাণিত হয়। সরকারে অংশগ্রহণ না করা সত্বেও তাদের লোকদের দ্বারা পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বীমা সহ বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান সমূহ নানাদিক থেকে শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়েছে। তারা সরকারে না থেকেও বিপুল পরিমাণ দেশীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগ সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে। (১০) আবেগের বশবর্তী হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে দলটিকে দেখা যায় না। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়- প্রতিটি বাজেট ঘোষণার পর অন্যান্য দলের মত সাথে সাথেই প্রতিবাদী ব্যানার নিয়ে তাদেরকে মাঠে নামতে দেখা যায় না। বরং ধীরে সুস্থে দলীয় ফোরামে ভালোভাবে পর্যালোচনা করে দু’একদিন পরে মন্তব্য করতে দেখা যায়। এভাবেই চলমান পরিস্থিতি ভালোভাবে পর্যালোচনা তারা করে সময়োপযোগি সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। (১১) নারীদেরকে নারীদের মর্যাদায় রেখে নারী নেতৃত্বের প্রতি তাদের মনোযোগ রয়েছে। ১৯৯০ ও ২০০১ সালের পার্লামেন্টে তারা মহিলা সদস্য দিয়েছিলেন। কেন্দ্র থেকে শুরু করে সর্বস্তরে তাদের মহিলা নেতৃত্ব রয়েছে। তাছাড়া তাদের লোকদের দ্বারা পরিচালিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পদে মহিলা নিয়োগ করতে দেখা যায়। কেন্দ্রীয় নেতাদের ফাঁসীর রায়ের প্রতিবাদে মহিলা মিছিল করতে এমনকি পুলিশের গুলিতে শহীদ হতে দেখা যায়। (১২) ছাত্র, ছাত্রী, শিক্ষক, শ্রমিক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কৃষিবিদ, চাষী, সাংবাদিক সহ বিভিন্ন পেশাজীবিদের মধ্যে তাদের কাজ রয়েছে। (১৩) সম্পূর্ণ প্রতিকূল পরিবেশেও এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই তাদের নিজ আদর্শের আলোকে একটি সমাজ ও রাষ্ট্র, শিক্ষা-সংস্কৃতি, ব্যাংক-বীমা ইত্যাদি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রূপরেখা প্রণয়ন অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাস্তব নমুনা পেশ করতে তারা সক্ষম হয়েছে। অনুকূল পরিবেশ পেলে তারা দেশ ও জাতিকে আরো অনেক কিছু দিতে পারবে বলে প্রতীয়মান হয়। (১৪) অবৈধভাবে অন্যের জমি দখল, চাঁদাবাজী, টে-ারবাজি, ছিনতাই, হাইজ্যাক, সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি সহ বিভিন্ন সমাজ বিরোধী কার্যক্রমে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা কর্মীদের জড়িত থাকার খবর প্রায়ই বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়ে থাকে। কিন্তু কিন হার্ট অপারেশন, জরুরী অবস্থার সরকার থেকে শুরু করে বর্তমান সরকারের কয়েক বছর ধরে চিরুনী অভিযান পরিচালনা করেও জামায়াত-শিবিরের কোনো নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে এ ধরণের কোনো অপরাধ প্রমাণ করতে পারেনি। (১৫) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিচালনা এবং বিভিন্ন সময়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে সততা, যোগ্যতা ও দক্ষতার পরিচয় দিয়ে জনগণের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে দলটি। (১৬) জামায়াতের দলীয় আদর্শ হচ্ছে ইসলাম। আর ইসলামে ব্যক্তি জীবন, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক সকল বিষয়ে রয়েছে সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা। আর তাই দেশে দেশে ইসলামী আদর্শবাদী দলসমূহ উদীয়মান শক্তি হিসাবে প্রকাশ পাচ্ছে। সুতরাং জামায়াতের স্বীয় আদর্শ বলে একটি আন্তর্জাতিক বলয় সৃষ্টির সুযোগ রয়েছে। (১৭) রাজনৈতিক ক্ষেত্রে উদারতা, শালীনতা, ভদ্রতা, সৌজন্যতা, পরমত সহিষ্ণুতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বর্তমানে দারুন অভাব। এক্ষেত্রে জামায়াতের দলীয় এবং নেতাকর্মীদের বক্তব্য, বিবৃতি, আচরণ, ভাষা, চরিত্র, কর্মপন্থা একেবারেই ব্যতিক্রম বলা চলে। ইদানিং কয়েক মাসের কিছু কার্যকলাপ তাদের দীর্ঘ দিনের লালিত স্বচ্ছ ঐতিহ্যে কিছুটা কালিমা লেপন করেছে বলে মনে হয়। অবশ্য সরকারি বাহিনীর মাত্রাতিরিক্ত দলন নীতি ও নির্মূল করার নীতিকে এজন্য দায়ী বলে জামায়াত মনে করে। তথাপি জামায়াত এ ব্যাপারে আরো সচেতন হবে বলে সুধীজনের আশা। প্রতিপক্ষ দলের ভালো কাজের স্বীকৃতি দেয়ার উদারতা জামায়াতের রয়েছে। দৃষ্টান্ত হিসাবে বলা যায় ১৯৯৬ এর সংসদের বাজেটে বৃদ্ধ ভাতা প্রদানের প্রস্তাবকে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ধন্যবাদ দিয়েছিলেন। অথচ ঐ সংসদেই জনাব সাঈদীকে শারীরিক ভাবে লাঞ্চিত করার জন্য আওয়ামী লীগের এমপিরা উদ্যত হয়েছিলেন। (১৮) জামায়াত একই সাথে রাজনৈতিক দল এবং ধর্মীয় ও সংস্কারবাদী দল। তাই সকল ধর্মের প্রতি রয়েছে তাদের উদারতা। জামায়াতের সচেতনতা ও বিচক্ষণতার ফলে কুচক্রি মহল জামায়াতকে ফাঁসানোর জন্য বহুবার গীর্জা, মন্দিরে ও সংখ্যালঘুদের উপর হামলা করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। সারাদেশের কোথাও কোনো সংখ্যালঘুর জমি বা সম্পদ অবৈধ ভাবে জামায়াতের কোনো নেতাকর্মী দখল করেছে-এমন একটি উদাহরণও নেই। সংখ্যালঘুদের মধ্যে রয়েছে জামায়াতের প্রচুর ভোটার। যুদ্ধাপরাধ মামলায় জামায়াতের কোনো কোনো নেতার পক্ষে সাক্ষী দেয়ার মতো দুঃসাহস দেখাতেও অনেক হিন্দুকে দেখতে পাওয়া যায়। সুখরঞ্জন বালী এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। কোনো কোনো মুসলিম দেশে ইসলামী দলের পক্ষ থেকে অমুসলিমকেও নির্বাচনে প্রার্থী দিতে দেখা যায়। এক্ষেত্রে ভবিষ্যতে জামায়াত নজির স্থাপন করবে কিনা তা দলের নীতি নির্ধারকেরাই ঠিক করবেন। জামায়াতের গঠনতন্ত্রে অমুসলিমদের ব্যাপারে সুস্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে। (১৯) জামায়াতে ইসলামী গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী। যেনতেন প্রকারে জামায়াত ক্ষমতা দখল করতে চায় না। ব্যাপকহারে জনমত সৃষ্টি করে জামায়াত ক্ষমতায় যেতে চায়। এতে করে আরো দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হলেও জামায়াত তাতে রাজি আছে। কিন্তু জোর করে তাদের আদর্শ জনগণের উপর চাপিয়ে দিতে জামায়াত চায় না। ইসলাম মানুষকে শাস্তি দেয়ার জন্য দুনিয়ায় আসেনি বলে জামায়াত বিশ্বাস করে। তাই মানুষের চিন্তা ও কর্মকে সংশোধন করার যত উত্তম প্রক্রিয়া রয়েছে তার সবগুলো প্রয়োগ করার পরও যদি প্রয়োজন দেখা দেয়, কেবল তখনই প্রয়োগ করার জন্য ইসলাম শাস্তির বিধান রেখেছে। (২০) মানুষের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ ও ঘৃণা-শত্রুতা জামায়াত পোষন করে না। বরং ক্ষমা, উদারতা ও ভালোবাসা দিয়ে জামায়াত মানুষের মনকে জয় করতে চায়। রাজনীতিতে বিভিন্ন মত থাকবেই। একদল জয়ী হবে এবং অন্য দল হবে পরাজিত। পরাজিত দলকে নির্মূল করার মানসিকতা পরিহার করে ক্ষমা, ভালোবাসা ও উদারতার দৃষ্টিতে তাকিয়ে সংশোধন নীতি অবলম্বন করতে চায় জামায়াত। বর্তমান সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার সাথে যাদের অন্যায় স্বার্থ জড়িত, ক্ষমতাসীন হলে জামায়াত তাদেরকে হুট করে শাস্তি না দিয়ে বরং দীর্ঘ দিন পর্যন্ত সংশোধন (তাওবা) করার প্রচেষ্টা চালিয়ে অবশেষে যৌক্তিক সময়ে শাস্তি বিধান চালু করবে। জামায়াতের সমালোচকদের প্রতি তাদের আচরণ এটাই প্রমাণ করে। কোনো কোনো ইসলামী দল ও ব্যক্তিত্ব থেকে জামায়াতের বিরুদ্ধে ফতোয়া ও কট্টর সমালোচনা প্রচুর পরিমাণে করা হলেও জামায়াতের দীর্ঘ ইতিহাসে আজ পর্যন্ত তাদের কারো বিরুদ্ধে কোনো টু শব্দ পর্যন্ত করা হয়নি। শুধুমাত্র ভুল বোঝাবোঝি দূর করার জন্য জামায়াতের পক্ষ থেকে কেউ কেউ দালিলিক প্রমাণাদি দিয়ে উত্তর দিয়েছেন মাত্র। উপরন্ত জামায়াতের লোকজনদ্বারা পরিচালিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উক্ত সমালোচকদের অনেককে নিয়োগ দিয়ে জামায়াত তার উদারতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে। (২১) আত্মরক্ষামূলক নীতি অবলম্বন করা প্রত্যেক সমাজেই বৈধ ও উচিত। জামায়াত-শিবিরের ইতিহাসের প্রতিটি ঘটনার উপলক্ষ ও পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় প্রতিটি ঘটনায়ই তারা আক্রমণাত্মক নীতি পরিহার করে আত্মরক্ষামূলক নীতি গ্রহণ করেছে। চরম উত্তেজনার মুহুর্তেও নিজেদেরকে যথেষ্ট সংযমী পরিচয় দিয়েছে। উপমা হিসাবে বলা যায় কয়েক বছর আগে চট্টগ্রামে শিবিরের মিছিলে বহুতল ভবন থেকে বোমা মেরে হাফিজ আব্দুর রহীমসহ কয়েকজনকে শহীদ ও বহু হতাহত করার ঘটনায় মিছিল থামিয়ে প্রতিপক্ষকে হাতে ধরে আইন নিজ হাতে তুলে না নিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেছিল। এ ধরণের অনেক উদাহরণই দেয়া যায়। (২২) জামায়াতের নির্বাচনী ইশতিহারে প্রতিবেশি রাষ্ট্রসমূহের সাথে বৈরীমূলক আচরণের পরিবর্তে স্বীয় দেশের স্বার্থ রক্ষা করে সৌহার্দ্যমূলক আচরণের ঘোষণা রয়েছে। কেননা, ইসলাম প্রতিবেশির সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার তাগিদ দিয়েছে। (২৩) জামায়াত তার সভ্যদেরকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উন্নত চরিত্র ও যোগ্যতা সৃষ্টির নিয়মিত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে জন্মলগ্ন থেকে। যার ফলে সর্ব পর্যায়ে ইতোমধ্যে তৈরী হয়েছে কয়েক ঝাঁক নেতৃত্ব। জামায়াতের কিছু সংখ্যক লোককে যদি ফাঁসি দিয়ে দেয়াও হয়, তথাপি বিকল্প নেতৃত্বের মাধ্যমে সংগঠন এগিয়ে যাবে-সন্দেহ নাই।
উপরোক্ত নিরপেক্ষ পর্যালোচনা শেষে আবেগ তাড়িত না হয়ে অত্যন্ত ঠা-া মাথায় নির্ধিদ্বায় বলা যায় “একমাত্র বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীই হতে পারে আগামী দিনের কাংখিত সেই তৃতীয় শক্তি।”
যারা জামায়াত বিদ্বেষী তারা প্রকাশ্যে এ মতটির ব্যাপারে একমত হয়ে স্বীকার না করলেও তাদের যাবতীয় কার্যক্রম উক্ত মতের সাথে একমত হবার প্রমাণ পেশ করে। এ প্রমাণের কয়েকটি যুক্তি রয়েছে। প্রথম যুক্তি: তারা জামায়াতের চূড়ান্ত বিরোধীতা করাকে প্রধান ইস্যু মনে করেন। জামায়াত যদি ‘তৃতীয় শক্তি’ হবার যোগ্যতা না রাখত, তাহলে তারা এরূপ করতেন না। কেননা, স্বাধীনতা যুদ্ধে জামায়াতের যে ভূমিকা ছিল মুসলিম লীগ, নিজামে ইসলাম প্রভৃতি দলের একই ভূমিকা ছিল। ঐ সময়ে জামায়াত একেবারে ছোট দল ছিল এবং ঐসব দল অনেক বড় ছিল। বর্তমানে ঐসব দল দুর্বল হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ বা অন্য ইস্যু তোলা হচ্ছে না। অথচ আওয়ামী লীগ সহ অন্যান্য দলে রয়েছে বিপুল সংখ্যক তাদের সংজ্ঞায় যুদ্ধাপরাধী বা মানবতা বিরোধী ব্যক্তি। অথচ তাদের ব্যাপারে তারা নীরব। দ্বিতীয় যুক্তি: জামায়াতের বক্তব্য বিবৃতিকে ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় সব সময়ই বিকৃত আকারে উপস্থাপন করা হয়। তৃতীয় যুক্তি: জামায়াতের বিরুদ্ধে অহরহ মানবতা বিরোধী আচরণ করা সত্ত্বেও রাজনৈতিক হীন স্বার্থে তারা এটাকে যুক্তিসংগত বলে তোলে ধরার চেষ্টা করছেন। চতুর্থ যুক্তিঃ জামায়াতের মহিলা সদস্যাদের উপর যখন নির্যাতন চালানো হয়, তখন তারা নারী অধিকারের কথা বলেন না। পঞ্চম যুক্তি: যেসব সংবাদপত্র ও গণমাধ্যম অন্ধভাবে জামায়াতের বিরোধীতা করে না সেগুলো বন্ধ করা হলেও সহকর্মী হিসাবেও সমবেদনা প্রকাশ করার যোগ্যতাটুকু তাদের নেই। এক্ষেত্রে সাংবাদিকদের স্বাধীনতার শ্লোগান তাদের মুখে শোভা পায় না। ষষ্ট যুক্তি: যারা জামায়াতের আদর্শকে ভালো চোখে দেখেন না, তারা মূলত এ আদর্শের বিরুদ্ধে সরাসরি কথা বলার সৎসাহস রাখেন না। তাই এ আদর্শের ধারক ও বাহকদের মধ্যে জামায়াতকে অগ্রসর ও বিজয়ী হবার সম্ভাব্য শক্তি মনে করেই এর বিরোধীতা করে থাকেন। সপ্তম যুক্তিঃ শুধু অপপ্রচার চালিয়েই জামায়াতকে আটকিয়ে রাখা যাবে না হিসেব করেই রাষ্ট্রীয় অস্ত্র শক্তি দিয়ে তাদেরকে নিঃশেষ করার হীন প্রচেষ্টা চলছে এবং পোড়ামাটি নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। অষ্টম যুক্তি: জামায়াতের উপর যুলম-যন্ত্রণা ও অপপ্রচার যতই বাড়ানো হচ্ছে, ততই জনমত তাদের পক্ষে যাচ্ছে। এজন্য নিরপেক্ষ ও অবাধ নির্বাচন যাতে হতে না পারে সেজন্যে জোর প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
উপরোক্ত যুক্তিসমূহের আলোকে নি:সন্দেহে বলা যায়, জামায়াত বিদ্বেষীদের দৃষ্টিতেও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কাংখিত সেই ‘তৃতীয় শক্তি’ হবার পূর্ণ যোগ্যতা রাখে।
বস্তুতপক্ষে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সামনে অনেকগুলো সমস্যার মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো গণমাধ্যমের অভাব। ব্যাপকহারে গণ যোগাযোগের মাধ্যমেই এ অভাব দূর করতে হবে। এক্ষেত্রে যে গতি নির্ণয় করা হবে বিজয়ও সে গতিতেই হবে ধরে নেয়া যায়।

লেখকঃ শিক্ষাবিদ

You may also like

Leave a Comment