মাহে মুহাররম বা আশুরার ফজিলত, ঘটনা ও বেদাত সমূহ। শুরু হল আরবী হিজরী কেলেন্ডারের এক নতুন বছর, নতুন এক মাস। ইহা মুহাররম মাস। এখানে আছে এক বিশেষ দিন যাকে আমি আপনি সবাই জানি আশুরা হিসেবে।
আজ আপনাদের সঙ্গে এই আশুরায়ে মুহাররম সম্বন্ধেই কিছু কথা লিখব। কারণ ইহা মুসলিম ইতিহাসে একটি পবিত্র দিন। আশুরা কি, এর ফজিলত, এই দিনে ঘটে যাওয়া ঐতিহাসিক ঘটনা সমূহ, এই দিনের করনীয় ও বর্জনীয় এবং আমাদের দেশে প্রচলিত কিছু বেদ’আত। এ নিয়েই আজকের এই লিখা। আসুন এবার মূল আলোচনায় যাওয়া যাক।
আশুরায়ে মুহাররম হিজরি ৬১ সালের এ দিনে হজরত মুহাম্মদ (ছা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হোসেন (রা.) ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে যুদ্ধ করতে গিয়ে কারবালা প্রান্তরে ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে শহীদ হন। শান্তি ও সম্প্রীতির ধর্ম ইসলামের সুমহান আদর্শ সমুন্নত রাখতে তাঁদের
এ আত্মত্যাগ মানবতা তথা ইসলামের ইতিহাসে সমুজ্জ্বল হয়ে আছে। কারবালার এ শোকাবহ ঘটনা ও পবিত্র আশুরার শাশ্বত বাণী আমাদেরকে অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে আজও অনুপ্রেরণা জোগায়। প্রেরণা জোগায় সত্য ও সুন্দরের পথে চলার।
আশুরা শব্দটি আরবি শব্দ ’আশারা’ থেকে এসেছে যার অর্থ হল দশ। হিজরী সনের প্রথম মাস মুহাররম। যেহেতু ইহা মুহাররম মাস তাই এই দিনটির নামানুসারে একে বলা হয় আশুরায়ে মুহাররম বা দশই মুহাররম। বছরের অনেক দিনকে আল্লাহ রব্বুল আলামীন নির্ধারণ করেছেন ইবাদত-বন্দেগী বা নেক আমল করার জন্য। এমনি একটা দিবসের নাম আশুরায়ে মুহাররম ।
আল্লাহর নবী মুসা (আ:) ফিরআউন ও তার বাহিনীর উপর বিজয় লাভ করেছিল। তাই এই দিনটি হচ্ছে শিরকের উপর তাওহীদের বিজয়ের দিন, তাগুতের উপর রিসালাতের পতাকাবাহীদের বিজয়ের সময়।
আশুরায়ে মুহাররম এর ঐতিহাসিক ঘটনা সমূহ:
সৃষ্টির শুরু থেকে বিভিন্ন ঘটনা এ দিনটিকে করেছে চিরভাস্বর। আরবী মুহাররম মাসের দশ তারিখ যুগ পরম্পরায় যে ঐতিহাসিক ঘটনার জন্ম দিয়েছে তা বিস্মৃত হওয়ার নয়। সাহাবায়ে কিরাম একদা রাসূলে খোদা (ছা:) এর কাছে জিজ্ঞাসা করেন যে, আশুরার এত বেশি ফযিলত হওয়ার কারণ কি? উত্তরে নবী করীম (ছা:) অনেক গুলো কারণ বর্ণনা করেন। যা তালিকা আকারে নিম্নে দেয়া হল:
১. মুহাররম মাসের দশ তারিখে আল্লাহ পাক নভমন্ডলকে সৃষ্টি করেছেন এবং লওহ, কলম, নদ-নদীকেও এদিন সৃষ্টি করেছেন। ২. এদিনে হযরত আদম (আ.) কে সৃষ্টি করা হয়। ৩. ফিরিস্তাদের আদেশ দেয়া হয় আদমকে সিজদা করতে। ৪. আদম (আ.) কে বেহেস্তে প্রবেশ করিয়েছিলেন। ৫. বেহেস্ত থেকে আদম (আ:)- কে দুনিয়ায় প্রেরণ করা হয়। ৬. আরাফাতের ময়দানে আদম (আ:) ও তাঁর বিবি হাওয়া (আ:) এর সাক্ষাতও ঘটে এই দিনে। ৭. হযরত আইয়ুব (আ:) কঠিন রোগ থেকে রেহাই পেয়েছেন এ তারিখেই। ৮. এ দিনে হযরত মুসা (আ:) কে বিজয় দান করা হয়েছিল। ৯. হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আ:) এই দিন জন্ম লাভ করেন ১০. হযরত ঈসা (আ:) কে আল্লাহ তায়ালা আসমানে জীবিত তুলে নিয়েছেন এদিনেই। ১১. এদিনে নূহের প্লাবন হয়। ১২. এদিনেই আবার তিনি প্লাবনের পরে নৌকা থেকে নেমে আসেন। ১৩. ইব্রাহিম (আ:) কে সৃষ্টি করেছেন এ দিনে। ১৪. এ দিনই ইব্রাহিম (আ:) এর স্বীয় তনয় ইসমাঈল (আ:) কে আল্লাহর জন্যে উৎসর্গ করেছেন। ১৫. এদিনে হযরত ইবরাহিম (আ:) নমরুদের আগুন থেকে মুক্তি পান। ১৬. এদিনে হযরত ইউনুস (আ:) মাছের পেট থেকে বেরিয়ে আসেন। ১৭. এদিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে।
ফযীলত :
১) মু‘আবিয়া বিন আবু সুফিয়ান (রাঃ) মদীনার মসজিদে নববীতে খুৎবা দানকালে বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, ‘আজ আশুরার দিন। এদিনের ছিয়াম তোমাদের উপরে আল্লাহ ফরয করেননি। তবে আমি সিয়াম রেখেছি। এক্ষণে তোমাদের মধ্যে যে ইচ্ছা কর সিয়াম পালন কর, যে ইচ্ছা কর পরিত্যাগ কর’। [বুখারী, ফাৎহসহ হা/২০০৩; মুসলিম, হা/১১২৯ ‘সিয়াম’ অধ্যায়। ]
২) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন- নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা) যখন মক্কা হতে মদিনা শরীফে হিজরত করে মদিনা শরীফে তাশরীফ নিয়ে ছিলেন, তখন মদিনার ইহুদীদেরকে আশুরার রোযা রাখতে দেখে তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করলেন তোমরা আশুরার রোযা কেন রাখ? উত্তরে তারা বলল, এ দিনটা অত্যন্ত পবিত্র ও সম্মানিত, কেননা এই দিনে আল্লাহ তায়ালা বনী ইসরাইলদেরকে তাদের শত্রু ফেরাউন হতে পরিত্রান দিয়ে ছিলেন। এ কারণে আমরা রোজার মাধ্যমে ঈদ বা খুশি পালন করি, যেন তার স্মরণ সব সময় বিদ্যমান থাকে। হুজুর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা) বললেন, হযরত (আলাইহিস সালাম) এর বিজয়ের দিন পালনে আমরা তোমাদের থেকে বেশি অধিকারী। অতঃপর রাসূলে খোদা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা) নিজে রোজা রাখলেন এবং সাহাবায়ে কিরামকে রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন। [বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ শরীফ]
৩) আবু ক্বাতাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘আশুরা বা ১০ই মুহাররমের সিয়াম আমি আশা করি আল্লাহর নিকটে বান্দার বিগত এক বছরের (ছগীরা) গোনাহের কাফফারা হিসাবে গণ্য হবে’। [মুসলিম, মিশকাত হা/২০৪৪; ঐ, বঙ্গানুবাদ হা/১৯৪৬।]
৪) আয়েশা (রাঃ) বলেন, ‘জাহেলী যুগে কুরায়েশগণ আশুরার ছিয়াম পালন করত। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)ও তা পালন করতেন। মদীনায় হিজরতের পরেও তিনি পালন করেছেন এবং লোকদেরকে তা পালন করতে বলেছেন। কিন্তু (২য় হিজরী সনে) যখন রামাযান মাসের সিয়াম ফরয হ’ল, তখন তিনি বললেন, যে ব্যক্তি ইচ্ছা কর আশুরার সিয়াম পালন কর এবং যে ব্যক্তি ইচ্ছা কর তা পরিত্যাগ কর’। [বুখারী ফাৎহুল বারী সহ (কায়রোঃ ১৪০৭/১৯৮৭), হা/২০০২ ‘ছওম’ অধ্যায়।]
৫) আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘রামাযানের পরে সর্বোত্তম সিয়াম হল মুহাররম মাসের সিয়াম অর্থাৎ আশূরার সিয়াম এবং ফরয সালাতের পরে সর্বোত্তম সালাত হল রাতের নফল সালাত’ অর্থাৎ তাহাজ্জুদের সালাত। [মুসলিম, মিশকাত হা/২০৩৯ ‘নফল সিয়াম’ অনুচ্ছেদ; ঐ, বঙ্গানুবাদ হা/১৯৪১।]
৬) আব্দুল্লাহ বিন আববাস (রাঃ) হতে বর্ণিত অন্য এক হাদীছে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, ‘তোমরা আশুরার দিন সিয়াম রাখ এবং ইহুদীদের খেলাফ কর। তোমরা আশুরার সাথে তার পূর্বে একদিন বা পরে একদিন সিয়ামপালন কর’। [বায়হাক্বী ৪র্থ খন্ড ২৮৭ পৃঃ।
বর্ণিত অত্র রেওয়ায়াতটি ‘মরফূ’ হিসাবে ছহীহ নয়, তবে ‘মওকূফ’ হিসাবে ‘ছহীহ’।দ্রঃ হাশিয়া ছহীহ ইবনু খুযায়মা হা/২০৯৫, ২/২৯০ পৃঃ। অতএব ৯, ১০ বা ১০, ১১ দু’দিন সিয়াম রাখা উচিত। তবে ৯, ১০ দু’দিন রাখাই সর্বোত্তম।]
৭) আব্দুল্লাহ বিন আববাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মদীনায় হিজরত করে ইহুদীদেরকে আশুরার সিয়াম রাখতে দেখে কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা বলেন, ‘এটি একটি মহান দিন। এদিনে আল্লাহ পাক মূসা (আঃ) ও তাঁর কওমকে নাজাত দিয়েছিলেন এবং ফেরা‘আঊন ও তার লোকদের ডুবিয়ে মেরেছিলেন। তার শুকরিয়া হিসাবে মূসা (আঃ) এ দিন সিয়াম পালন করেছেন। অতএব আমরাও এ দিন সিয়াম পালন করি। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, তোমাদের চাইতে আমরাই মূসা (আঃ)-এর (আদর্শের) অধিক হকদার ও অধিক দাবীদার। অতঃপর তিনি সিয়াম রাখেন ও সকলকে রাখতে বলেন’ (যা পূর্ব থেকেই তাঁর রাখার অভ্যাস ছিল)। [মুসলিম হা/১১৩০।]
৮) আবু মূসা আশ‘আরী (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, আশুরার দিনকে ইহুদীরা ঈদের দিন হিসাবে মান্য করত। এ দিন তারা তাদের স্ত্রীদের অলংকার ও উত্তম পোষাকাদি পরিধান করাতো’। [মুসলিম হা/১১৩১; বুখারী ফাৎহ সহ হা/২০০৪। ]
৯) ইবনু আববাস (রাঃ) হতে অন্য বর্ণনায় এসেছে যে, লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! ইহুদী ও নাছারাগণ ১০ই মুহাররম আশুরার দিনটিকে সম্মান করে। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, ‘আগামী বছর বেঁচে থাকলে ইনশাল্লাহ আমরা ৯ই মুহাররম সহ সিয়াম রাখব’.রাবী বলেন, কিন্তু পরের বছর মুহাররম আসার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়ে যায়। [মুসলিম হা/১১৩৪। ]
উপরোক্ত হাদীছ সমূহ পর্যালোচনা করলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠে। যেমন-
(১) আশুরার সিয়াম ফের‘আঊনের কবল থেকে নাজাতে মূসার (আঃ) শুকরিয়া হিসাবে পালিত হয়। (২) এই সিয়াম মূসা, ঈসা ও মুহাম্মাদী শরী‘আতে চালু ছিল। আইয়ামেজাহেলিয়াতেও আশূরার সিয়াম পালিত হ’ত। (৩) ২য় হিজরীতে রামাযানের সিয়াম ফরয হওয়ার আগ পর্যন্ত এই সিয়াম সকল মুসলমানের জন্য পালিত নিয়মিত সিয়াম হিসাবে গণ্য হত। (৪) রামাযানের সিয়াম ফরয হওয়ার পরে এই সিয়াম ঐচ্ছিক সিয়ামে পরিণত হয়। তবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিয়মিত এই সিয়াম ঐচ্ছিক হিসাবেই পালন করতেন। এমনকি মৃত্যুর বছরেও পালন করতে চেয়েছিলেন। (৫) এই সিয়ামের ফযীলত হিসাবে বিগত এক বছরের গোনাহ মাফের কথা বলা হয়েছে। এত বেশী নেকী আরাফার দিনের নফল সিয়াম ব্যতীত অন্য কোন নফল সিয়ামে নেই। (৬) আশুরার সিয়ামের সাথে হুসায়েন বিন আলী (রাঃ)-এর জন্ম বা মৃত্যুর কোন সম্পর্ক নেই। হুসায়েন (রাঃ)- এর জন্ম মদীনায় ৪র্থ হিজরীতে এবং মৃত্যু ইরাকের কূফা নগরীর নিকটবর্তী কারবালায় ৬১ হিজরীতে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর মৃত্যুর ৫০ বছর পরে হয়।[ ইবনু হাজার, আল-ইছাবাহ আল-ইস্তী‘আব সহ (কায়রোঃ মাকতাবা ইবনে তায়মিয়াহ, ১ম সংস্করণ, ১৩৮৯/১৯৬৯), ২য় খন্ড, পৃঃ ২৪৮, ২৫৩।]
মোটকথা আশূরায়ে মুহাররমে এক বা দু’দিন স্রেফ নফল সিয়াম ব্যতীত আর কিছুই করার নেই। শাহাদতে হুসায়েনের নিয়তে সিয়াম পালন করলে ছওয়াব পাওয়া যাবে না। কারণ কারবালার ঘটনার ৫০ বছর পূর্বেই ইসলাম পরিপূর্ণতা লাভ করেছে এবং অহি-র আগমন বন্ধ হয়ে গেছে। আশুরার বিদ‘আত সমূহ এবং আমাদের করনীয় ও বর্জনীয়:
আশুরায়ে মুহাররম আমাদের দেশে শোকের মাস হিসাবে পালিত হয়।শী‘আ, সুন্নী সকলে মিলে অগণিত শিরক্ ও বিদ‘আতে লিপ্ত হয়। কোটি কোটি টাকার অপচয় হয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানের নামে। সরকারী ছুটি ঘোষিত হয় ও সরকারীভাবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদি পালিত হয়। হুসাইনের ভূয়া কবর তৈরী করে রাস্তায় তা‘যিয়া বা শোক মিছিল করা হয়। ঐ ভূয়া কবরে হুসাইনের রূহ হাযির হয় ধারণা করে তাকে সালাম করা হয়। তার সামনে মাথা ঝুকানো হয়। সেখানে সিজদা করা হয়, মনোবাঞ্ছা পূরণ করার জন্য প্রার্থনা করা হয়। মিথ্যা শোক প্রদর্শন করে বুক চাপড়ানো হয়, বুকের কাপড় ছিঁড়ে ফেলা হয়। ‘হায় হোসেন’ ‘হায় হোসেন’ বলে মাতম করা হয়। রক্তের নামে লাল রং ছিটানো হয়। রাস্তা-ঘাট রং-বেরং সাজে সাজানো হয়। লাঠি-তীর-বলম নিয়ে যুদ্ধের মহড়া দেওয়া হয়। হুসাইনেরনামে কেক ও পাউরুটি বানিয়ে ‘বরকতের পিঠা’ বলে বেশী দামে বিক্রি করা হয়। হুসাইনের নামে ‘মোরগ’ পুকুরে ছুঁড়ে ফেলে যুবক-যুবতীরা পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঐ ‘বরকতের মোরগ’ ধরার প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে।
সুসজ্জিত অশ্বারোহী দল মিছিল করে কারবালা যুদ্ধের মহড়া দেয়। কালো পোষাক পরিধান বা কালো ব্যাজ ধারণ করা হয় ইত্যাদি। এমনকি অনেকে শোকের মাস ভেবে এই মাসে বিবাহ-শাদী করা অন্যায় মনে করে থাকেন। ঐ দিন অনেকে পানি পান করা এমনকি শিশুর দুধ পান করানোকেও অন্যায় ভাবেন।
অপরদিকে উগ্র শী‘আরা কোন কোন ইমাম বাড়া‘তে আয়েশা (রাঃ)-এর নামে বেঁধে রাখা একটি বকরীকে লাঠিপেটা করে ও অস্ত্রাঘাতে রক্তাক্ত করে বদলা নেয় ও উল্লাসে ফেটে পড়ে।
তাদের ধারণা মতে আয়েশা (রাঃ)-এর পরামর্শক্রমেই আবুবকর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর অসুখের সময় জামা‘আতে ইমামতি করেছিলেন ও পরে খলীফা নির্বাচিত হয়েছিলেন। সে কারণ আলী (রাঃ) খলীফা হ’তে পারেননি (নাঊযুবিলাহ)। ওমর, ওছমান, মু‘আবিয়া, মুগীরা বিন শো‘বা (রাঃ) প্রমুখ জলীলুল ক্বদর ছাহাবীকে এ সময় বিভিন্নভাবে গালি দেওয়া হয়।
এ ছাড়াও রেডিও-টিভি, পত্র-পত্রিকা, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় সমূহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে একথা বুঝাতে চেষ্টা করে যে, আশুরায়ে মুহাররমের মূল বিষয় হ’ল শাহাদাতে হুসায়ইন (রাঃ) বা কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা। চেষ্টা করা হয় এটাকে ‘হক্ব ও বাতিলের’ লড়াই হিসাবে প্রমাণ করতে। চেষ্টা করা হয় হুসাইনকে ‘মা‘ছূম’ ও ইয়াযীদকে ‘মাল‘ঊন’ প্রমাণ করতে। অথচ প্রকৃত সত্য এসব থেকে অনেক দূরে।
আশুরা উপলক্ষ্যে প্রচলিত উপরোক্ত বিদ‘আতী অনুষ্ঠানাদির কোন অস্তিত্ব এবং অশুদ্ধ আক্বীদা সমূহের কোন প্রমাণ ছাহাবায়ে কেরামের যুগে পাওয়া যায় না। আল্লাহ ব্যতীত কাউকে সিজদা করা
যেমন হারাম, তা‘যিয়ার নামে ভূয়া কবর যেয়ারত করাও তেমনি মুর্তিপূজার শামিল। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি লাশ ছাড়াই ভূয়া কবর যেয়ারত করল, সে যেন মূর্তি
পূজা করল’। [বায়হাক্বী, ত্বাবারাণী; গৃহীতঃ আওলাদ হাসান কান্নৌজী ‘রিসালাতু তাম্বীহিয যা-লীন’ বরাতেঃ ছালাহুদ্দীন ইউসুফ ‘মাহে মুহাররম ও মউজূদাহ মুসলমান’ (লাহোরঃ ১৪০৬ হিঃ), পৃঃ ১৫।]
এতদ্ব্যতীত কোনরূপ শোকগাথা বা মর্সিয়া অনুষ্ঠান বা শোক মিছিল ইসলামী শরী‘আতের পরিপন্থী। কোন কবর বা সমাধিসৌধ, শহীদ মিনার বা স্মৃতি সৌধ, শিখা অনির্বাণ বা শিখা চিরন্তন ইত্যাদিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করাও একই পর্যায়ে পড়ে।
অনুরূপভাবে সবচেয়ে বড় কবীরা গোনাহ হল ছাহাবায়ে কেরামকে গালি দেওয়া। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন,
‘তোমরা আমার ছাহাবীগণকে গালি দিয়ো না। কেননা (তাঁরা এমন উচ্চ মর্যাদার অধিকারী যে) তোমাদের কেউ যদি ওহোদ পাহাড় পরিমাণ সোনাও আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে, তবুও তাঁদের এক মুদ বা অর্ধ মুদ অর্থাৎ সিকি ছা‘ বা তার অর্ধেক পরিমাণ (যব খরচ)- এর সমান ছওয়াব পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না’।[মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫৯৯৮ ‘ছাহাবীগণের মর্যাদা’ অনুচ্ছেদ; ঐ, বঙ্গানুবাদ হা/৫৭৫৪।]
শোকের নামে দিবস পালন করা, বুক চাপড়ানো ও মাতম করা ইসলামী রীতি নয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, “ঐ ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়, যে ব্যক্তি শোকে নিজ মুখে মারে, কাপড় ছিঁড়ে ও জাহেলী যুগের ন্যায় মাতম করে’। [বুখারী ও মুসলিম, মিশকাত হা/১৭২৫ ‘জানাযা’ অধ্যায়।]
অন্য হাদীছে এসেছে যে, ‘আমি ঐ ব্যক্তি হতে দায়িত্ব মুক্ত, যে ব্যক্তি শোকে মাথা মুন্ডন করে, উচ্চঃ স্বরে কাঁদে ও কাপড় ছিঁড়ে’। [বুখারী ও মুসলিম, মিশকাত হা/১৭২৬। ]
অধিকন্তু ঐসব শোক সভা বা শোক মিছিলে বাড়াবাড়ি করে সৃষ্টি ও সৃষ্টিকর্তার পার্থক্য মিটিয়ে দিয়ে হুসাইনের কবরে রূহের আগমন কল্পনা করা, সেখানে সিজদা করা, মাথা ঝুঁকানো, প্রার্থনা নিবেদন করা ইত্যাদি পরিষ্কারভাবে শিরক। আল্লাহ আমাদের হেফাযত করুন- আমীন!!
লেখক- কলামিষ্ট ও শিক্ষক।
আশুরার ফজিলত, ঘটনা ও বেদাত সমূহ: মাওলানা আব্দুর রহমান
163
