শাহরিন:পঁচিশ বছর বয়সী মিতি বুঝতে শেখার পর থেকেই
দেখে আসছে মায়ের উপার্জনে চলছে সংসার।
ছোটবেলাতেই বাবাকে হারিয়েছে মিতি আর তার বড়
দুই বোন। তাদের মা-ই সংসারের হাল ধরেন স্বামীর মৃ
ত্যুর পর। ছোট্ট একটা কাপড়ের ব্যবসার আয় থেকে
তিন মেয়ের লালনপালন এবং পড়াশোনার সমস্ত ব্যবস্থা
করেন তিনি।
৩৬ বছর বয়সী মিতু অনেকগুলো ভাই-বোনের মধ্যে
সবার ছোট, সবচেয়ে আদরের। মা মারা যাওয়ার পরে
বাবার সঙ্গে লন্ডন চলে যান ১৯ বছর বয়সে। চার-পাঁচ
বছর পর সেখানেই এক প্রবাসী বাঙালির সঙ্গে বিয়ে হয়
তার। বিয়ের প্রায় ছয় বছর পরে অনেক চেষ্টায় একটি
ছেলে হয়। ছেলেটির বয়স এখন ১৩ বছর। বছর দুয়েক
আগে স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় মিতুর। স্বামীর
তৈরি করা অনেক আইনি জটিলতা পার করে ছেলের
ভরণপোষণের ভার পুরোটাই মিতুর উপর এসে পড়ে।
ছেলের খরচ, সংসার খরচ মেটাতে মিতু এখন সপ্তাহজুড়েকাজ করছেন দু’টি ভিনড়ব কর্মস্থলে।
পশ্চিমা দেশগুলোতে ‘সিঙ্গেল মাদার’ বা ‘সিঙ্গেল ফাদার’
পরিবারের ধারণাটা খুবই স্বাভাবিক হলেও আমাদের দেশে
তা খুব সহজে নিতে পারে না সমাজ। বিশেষ করে একটা
মেয়ে একা পুরো সংসারের সব চাহিদা পূরণ করছে, এ
বিষয়টি মেনে নিতে পারাটা সমাজের জন্য এখনও বেশ
আমি মা, আমিই বাবা
কঠিন যেন। তবে মা অথবা বাবা, যে কারো জন্যই একা
দু’জনের দায়িত্ব পালন করাটা বেশ কঠিন কাজই বটে।
তবে বাস্তবতা হলো জীবনের তাগিদে এই কঠিন কাজটি
করতে হয় অনেক অভিভাবককেই। আমাদের সমাজেও
এই ধরনের পরিবারের সংখ্যা খুব কম নয়।
পশ্চিমা দেশগুলোতে ‘সিঙ্গেল মাদার’ বা ‘সিঙ্গেল ফাদার’
পরিবারগুলো গড়ে ওঠার পিছনে অনেক সময় সামাজিক
অবক্ষয়ের ভূমিকা থাকে। তবে সেসব দেশে শুধু মা,
অথবা শুধু বাবার পরিচয়ে সন্তানের বেড়ে ওঠার সুযোগ
রয়েছে। একা অভিভাবকদের দুইজনের ভূমিকা পালন
করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে সুযোগ-সুবিধা দেয়া
হয় সেসব দেশে। ফলে বাবাহীন পরিবারের মায়েদেরকে,
অথবা মা-বিহীন পরিবারের বাবাদেরকে সমাজের অযাচিত
প্রশেড়বর মুখোমুখি হতে হয় না। বাংলাদেশে দুর্ভাগ্যবশতকোনো অভিভাবক যদি একা হয়ে পড়েন তবে পরিস্থিতি
দাঁড়ায় উল্টো। সমাজের অযাচিত প্রশড়ব তো রয়েছেই, তার
উপর সেই একা অভিভাবককে প্রতিবেশী হিসেবে সাহায্য
করার চেয়ে তার ‘কঠিন জীবনযাপন’ নিয়ে আকারে-
ইঙ্গিতে সমালোচনা করার ক্ষেত্রেই বেশি মনোযোগ দেখা
যায় আমাদের দেশের লোকজনের।
মেয়েদের জন্য এ বাস্তবতাটি আরো বেশি কঠিন, তাতে
কোনো সন্দেহ নেই। সংসারের দায়িত্বের পাশাপাশি
সমাজের কোটি কোটি প্রশেড়বর উত্তর তো দিতে হয়ই প্রতি
পদে পদে, আর মেয়েটি যদি হয় বয়সে তরুণ তাহলে
তো কথাই নেই! সন্তানদের বাবা ছাড়া বড় হওয়ার
অপকারিতা থেকে শুরু করে একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়ে
নানাজনের নানা পরামর্শ আর উপদেশ শুনেই দিনের
সিংহভাগ সময় কাটে সেই মেয়েটির। আর তার ‘ভবিষ্যত’
নিয়ে ‘শুভাকাংখী’দের নানা উপদেশ-উদ্যোগ-আয়োজনের
বাড়তি ঝক্কি তো রয়েছেই।
বাংলাদেশে এখনও সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করার সময়
বাবার পরিচয়টাকে প্রাধান্য দেয়া হয়। ফলে সন্তানদেরও
জীবনের শুরুতেই অযাচিত প্রশেড়বর মুখোমুখি হতে হয়
সামজিকভাবে। একা মায়ের সন্তানেরা বাবার অভাবপরিবারের ভেতরে থেকে যতো না অনুভব করে, বাইরের
পরিবেশে নানা জনের এসব অযাচিত প্রশড়ব তাকে বিধ্বস্ত
করে তোলে অনেক বেশি।
ত্রিশের কোঠায় থাকা সেতুর স্বামী মারা যান বিয়ের
মাত্র পাঁচ বছরের মাথায়। সেতু তখন দুই ছেলের মা,
ছোটটি তখনও মায়ের দুধ ছাড়েনি। বড় ছেলেটির এখন
বয়ঃসন্ধির বয়স। এ বয়সে ছেলেদের বাবাকে প্রয়োজন হয়
বিভিনড়ব ব্যক্তিগত কৌতূহল ও উদ্ভূত পরিস্থিতি সামলাতে।
তবে দুই ছেলের সঙ্গে খুব সহজ সম্পর্ক তৈরি করেছেন
সেতু, যেন ছেলেরা কোনোভাবেই বাবার অভাব বোধ
না করে। মায়ের কাছেই তাদের সব জিজ্ঞাসা নিয়ে তাই
হাজির হয় সেতুর ছেলেরা। এজন্য নিজেকে শুরু থেকেই
প্রস্তুত করে নিয়েছিলেন বলে জানান সেতু।
কিন্তু একজন মা যতোই দশভূজা দূর্গা হয়ে একাই
সন্তানদের পুরো পৃথিবী হয়ে থাকুন না কেন, এদেশের
সমাজ তাকে সবসময় ‘স্বামী’র পরিচয়েই দেখতে চায়।
মিতি নিজে এখন সাংবাদিকতা করছেন। বিভিনড়ব জায়গায়
যান, নানা জনের সঙ্গে অনেক বিষয়েই কথা হয় তার।
ইদানীং মিতি লক্ষ্য করছেন, তার মায়ের একনিষ্ঠ
অবদান সম্পর্কে জানার চেয়ে তার পরলোকগত বাবার
অদৃশ্য অবস্থান নিয়েই যেন সবার মাথাব্যথাটা বেশি।পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মায়েদের অনন্য ভূমিকাকে ছোট
করার দুঃখজনক প্রবণতাই একা মায়েদের দুর্ভোগ
চরমভাবে বাড়িয়ে দেয় তা বলাই বাহুল্য।
আমি মা, আমিই বাবা
378
previous post
