গোলজার আহমদ হেলাল : আজ গভীরভাবে মনে পড়ছে আমার শ্রদ্ধেয় বড় ভাই মুহিবুর রহমান কে।মুহিব ভাই এম সি কলেজে রসায়নবিদ্যা বিভাগে পড়াশুনা করতেন।অসম্ভব মেধাবী ,বুদ্ধিমান এবং ব্যাক্তিত্ববান এক পুরুষ।অদম্য মনোবল ও প্রবল বাসনা শক্তি ছিল তাঁর।
টাঙ্গাইল জেলার সখীপুর উপজেলার এ নাগরিক লেখাপড়ার জন্য সিলেটে ছুটে এসেছিলেন।আমরা শহরের শিবগঞ্জ লামাপাড়া এলাকায় একসাথে মেসে থাকতাম।সে সময় আরেক বড় ভাই আনোয়ার হোসেন ও আমাদের সাথে থাকতেন।তিনি এম সি কলেজে গণিত বিভাগে পড়তেন।কর্মজীবনে সরকারী চাকুরীরত অবস্থায় কর্মস্থল থেকে বাসায় ফেরার পথে বছর তিনেক আগে এক মর্মান্তিক সড়ক দূর্ঘটনায় তিনি ইনতেকাল করেন।আল্লাহ তাঁকে জান্নাতবাসী করুন।
আমরা একসাথে প্রায় আটজন ঐ মেসে থাকতাম।বাথরুম ছিল একটিমাত্র।অপরদিকে নলকুপ থেকে পানি নিজেরাই চাপ দিয়ে সংগ্রহ করতাম।মোটরের কোন ব্যবস্থা ছিল না।এক্ষেত্রে সিনিয়র ভাইয়েরা আমাদেরকে (আমরা যারা জুনিয়র ছিলাম ) অনেক সহযোগিতা করতেন।
মুহিব ভাই এর উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় আমি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয় “রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় “এ ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছিলাম।যথারীতি “ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি” বিভাগে চান্সও পেয়েছিলাম।পরবর্তীতে বিভিন্ন কারণে সেখানে আর ভর্তি হইনি।
তখন ১৯৯৫ সাল। রাজশাহীসহ দেশের উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলা ভ্রমণের সৌভাগ্য ও আনন্দ এখনও হৃদয়ে দোলা দেয়।যাওয়ার সময় পদ্মা নদীতে বহমান ফেরী পারাপার আর আরিচা ঘাটের খাবার ভোলার মতো নয়।অনেক পথ অতিক্রম করে যখন রাজশাহী নগরীতে পৌঁছাই।তখন গভীর রাত।রাতের শহরের সাথেই পরিচিত হতে হল আমাকে।ভালই লাগল।
রাজশাহী বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের একটি প্রধান শহর |পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত রেশমনগরী (Silk City) খ্যাত এ শহরের নিকটে প্রাচীন বাংলার বেশ কয়েকটি রাজধানী শহর লক্ষণৌতি বা লক্ষনাবতি, পুন্ড্র ইত্যাদি অবস্থিত। ইহা রেশমীবস্ত্র (Silk), আম, লিচু এবং মিস্টান্নসামগ্রীর জন্য প্রসিদ্ধ। প্রাচীন হিন্দু, বৌদ্ধ এবং মুসলিম সভ্যতার নিদর্শন বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর এখানেই।শুধু তাই নয় ইহা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রাচীন ইতিহাস, সংস্কৃতি আর প্রত্নতত্ব নিয়ে গবেষণার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহশালা।
সকালে শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার পূর্বদিকে অবস্থিত মতিহারের সবুজ চত্বর নামে পরিচিত নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অধিকারী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পদার্পণ করলাম।সারি সারি আম বাগান আর সবুজ শ্যামলিমার মাধ্যমে প্রকৃতি অত্যন্ত্য নিঁখুতভাবে তা সাজিয়েছেন।বাংলাদেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে এই বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। সমগ্র ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে খুবই ভাল লাগলো ।
বিশ্ববিদ্যালয় এর প্রয়োজনীয় কাজ শেষে নাটোর,টাঈাইল,রংপুর,দিনাজপুর,বগুড়া,সিরাজগঞ্জ ইত্যাদি জেলার বিভিন্ন জায়গা ঘুরলাম।প্রায় ১৫ দিন ব্যাপী এ সফরের মজার বিষয় হলো সকল জেলাতেই আমাদের মুহিব ভাইয়ের আত্মীয়-স্বজন আছেন।সুতরাং এ দীর্ঘ সময়ে আমাদের থাকা-খাওয়ার কোনো ঝামেলা পোহাতে হয়নি।
সিরাজগঞ্জে আমরা ঈদুল ফিতর উদযাপন করেছিলাম।সেখানে ঈদের দিনে খাসীর মাংসের পোলাও খুবই সুস্বাদু।তবে রোযার দিনে ইফতারে এক প্লেট মুড়ি এক চামচ সরিষার তৈল ও তিন টুকরা পেঁয়াজ খেতে একটু কষ্ঠ লাগত।কিন্তু আনন্দের কমতি ছিল না।বগুড়ার কাঁচা মরিচ,টমেঠো,শসা ইত্যাদি সবজি ভাল ।টাঙ্গাইল শহরের বিশ্বাসবেতকায় একদিন অবসথান করি।সেখানকার বাঁশঝার আর কলাগাছের সারি সত্যিই চমৎকার।ভূয়াপুরের ফেরীঘাটের মাছ-ভাত এর কথা এখনও মনে পড়ে।তখনও যমুনা সেতু হয়নি।সেতু নির্মাণ কাজ চলছিল।সিরাজগঞ্জ ও ভূয়াপুরের (টাঙ্গাইল) মধ্যবর্তী স্থানেই এ সেতুর অবস্থান।আমরা কিছু জায়গা হেঁটে,কিছু জায়গা নৌকা দিয়ে,মাঝে মাঝে পানি কিংবা ধূ ধূ বালুচর দিয়ে নির্মাণাধীন যমুনা সে তুস্থল অতিক্রম করি।
লেখক:নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আলোকিত সিলেট।
সহ-সভাপতি, সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব।
