আমার লাশের খবর বন্ধু শুনবে একদিন জানি,কাঁদবে সবাই ফেলবে শুধু দু’নয়নের পানি (৪৯)

by News Room

গোলজার আহমদ হেলাল : ভোরে ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামাজ জামায়াতে পড়ে নিলাম।কেউ কেউ সমুদ্র তীরে সূর্যোদয় প্রত্যক্ষ করল।পরে পাউরুটি দিয়ে নাস্তা সেরে টেকনাফের দিকে রওয়ানা হলাম আমরা।
টেকনাফ বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার অন্তর্গত একটি উপজেলা। এটি বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের উপজেলা। কক্সবাজার জেলা সদর থেকে এ উপজেলার দূরত্ব প্রায় ৮২ কিলোমিটার। এ উপজেলার উত্তরে উখিয়া উপজেলা, পূর্বে মায়ানমারের আরাকান প্রদেশ এবং দক্ষিণে ও পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর অবস্থিত।টেকনাফ উপজেলায় যোগাযোগের প্রধান সড়ক কক্সবাজার-টেকনাফ সড়ক। সব ধরনের যানবাহনে যোগাযোগ করা যায়।
টেকনাফ পর্যটন এলাকা হওয়ায় দেশ-বিদেশ থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম-টেকনাফ রুটে এই উপজেলার সীমান্তে সেন্টমার্টিন দ্বীপে প্রতি বছর প্রচুর পর্যটকের আগমন ঘটে। এছাড়া টেকনাফ বন্দর, নাফ নদী-বঙ্গোপসাগর থেকে মূল্যবান মাছ আহরণ, খনিজ লবণ, পান সুপারী ইত্যাদি অর্থ উপার্জনের প্রধান মাধ্যম। পাহাড় ও নদী-সাগর ঘেরা টেকনাফে সুন্দর লবণ মাঠ এবং বড় বড় মৎস্য খামার আছে। এই স্থান কৃষি কাজ, লবণ চাষ ও মাছ চাষ করার জন্য বেশ উপযোগী।টেকনাফ উপজেলায় ১৮৩টি মসজিদ, ৭টি মন্দির ও ১১টি বিহার রয়েছে।উপজেলার পূর্বে মায়ানমার সীমান্ত দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে নাফ নদী।এখানে অনেক হাট-বাজার রয়েছে। এর মধ্যে টেকনাফ বাজার,হ্নীলা বাজার, শাহপরীরদ্বীপ বাজার, শামলাপুর বাজার,টেকনাফ সদর বট্টলী বাজার,উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন দ্বীপ এখানে অবস্থিত।এছাড়া ছেঁড়া দ্বীপ,শাহপরীর দ্বীপ,তৈঙ্গা চূড়া,টেকনাফ বন্যপ্রাণ অভয়ারন্য,সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক,টেকনাফ সমুদ্র সৈকত,মাথিনের কূপ,বাংলাদেশ-মায়ানমার ট্রানজিট জেটিঘাটশীলখালী চিরহরিৎ গর্জন বাগান মারিশবনিয়া সৈকত প্রমুখ দর্শনীয় স্থান রয়েছে।
প্রায় ৩ঘন্টা জার্নি করে টেকনাফ পৌঁছলাম।আমাদের আজকের গন্তব্যস্থল সেন্টমার্টিন দ্বীপ।কেয়ারে সিন্দাবাদ নামক জাহাজের টিকেট পেলাম না।বিকল্প হিসেবে নৌকা ,ইন্জিনচালিত নৌকা ভাড়া করে সমুদ্র জয়ের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম।নাফ নদী পেরিয়ে যখন সাগরে প্রবেশ করলাম বিশাল আর উত্তাল ঢেউ হতচকিত করে তোলে।নাফ নদী পেরিয়ে যাওয়ার সময় সুমন সিদ্দিকীর মজার মজার গান আমাদেরকে বিমোহিত করে তুলছিল।কিন্তু সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার সময় আল্লাহর মহান নাম ধরে ধরে আমাদেরকে এগুতে হল।
সমুদ্র জয় কিংবা সমুদ্র ভ্রমণ সত্যিই আন্ন্দের।অনেক ঝুঁকি ছিল আমাদের।মনে হয়েছিল এই ডুবে যাচ্ছে নাও।পানি ছুইঁ ছুইঁ করছে।সুতা পরিমান জায়গাও মাঝে মাঝে ভাসমান থাকে না।আর ঢেউ যখন প্রবলতর ভাবে প্রচন্ড গর্জন করে আসে।তখন মনে হয় এই বুঝি মরে গেলাম।সবচেয়ে আতংকে ছিলম সালেহ আর আশিক কে নিয়ে।কারণ তারা ছিল এ অভিযাত্রী দলের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য।
যাই হোক আমরা পৌছলাম নারিকেল জিন্জিরার দ্বীপখ্যাত সেন্টমার্টিনে।আল্লাহর কি অপার মহিমা চারিদিক সাগরের অথৈ জলরাশি আর মাঝখানে স্থল ভাগ।সাগরের প্রবল জোয়ার তর্জন গর্জন করে কিনারায় এসেই স্থিমিত হয়ে যায়।
ঘুরে ঘুরে দেখলাম।সেখানকার মানুষের জীবন বৈচিত্রময়।ঘর বাড়ী ,রাস্তাঘাট,কৃষ্টি কালচার দেখে আমরা অভিভুত।এখানকার অধিবাসী কেউ মাছ ধরে,কেউ প্রবাল সংগ্রহ করে,কেউ ব্যবসা করে,কেউ অতিথিদের খাবার ও আবাসনের ব্যবস্থা করে প্রচুর টাকা রোজগার করে।সাগর টা আল্লাহর দান।আর ঐ জনপদের জনগণের জীবিকা নির্বাহের মোক্ষম উপায়।
আমরা হেঁটে -গাড়ীতে এলাকা ঘুরলাম।ঐ এলাকার সহজ সরল মানুষের জীবনাচার প্রত্যক্ষ করলাম।
আমরা সেখানে প্রাচীন কালের কুপ গুলো থেকে সুপেয় পানি পান করলাম।কি আশ্চর্য চারিদাকে সমুদ্রের লোনা পানি আর মধ্যখানে স্থল ভুমিতে মিষ্ঠি পানি অর্থাৎ সুপেয় পানি।এটা আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ।সেন্ট মার্টিন্‌স দ্বীপ বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্বাংশে অবস্থিত একটি প্রবাল দ্বীপ। এটি কক্সবাজার জেলার টেকনাফ হতে প্রায় ৯ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং মায়ানমার-এর উপকূল হতে ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে নাফ নদীর মোহনায় অবস্থিত। প্রচুর নারিকেল পাওয়া যায় বলে স্থানীয়ভাবে একে নারিকেল জিঞ্জিরাও বলা হয়ে থাকে। বাংলাদেশের সমুদ্রপ্রেমিদের কাছে এটি ব্যাপক পরিচিত একটি নাম। বিখ্যাত লেখক, কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের দারুচিনি দ্বীপ নামের পূর্ণদৈর্ঘ্য ছায়াছবি দ্বারা এই দ্বীপটির পরিচিতি আরো বেড়ে যায়।
কবে প্রথম এই দ্বীপটিকে মানুষ শনাক্ত করেছিল তা জানা যায় না। প্রথম কিছু আরব বণিক এই দ্বীপটির নামকরণ করেছিল জিঞ্জিরা। উল্লেখ্য এরা চট্টগ্রাম থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যাতায়াতের সময় এই দ্বীপটিতে বিশ্রামের জন্য ব্যবহার করতো। কালক্রমে চট্টগ্রাম এবং তৎসংলগ্ন মানুষ এই দ্বীপটিকে জিঞ্জিরা নামেই চিনতো। ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে কিছু বাঙালি এবং রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষ এই দ্বীপে বসতি স্থাপনের জন্য আসে। এরা ছিল মূলত মৎস্যজীবি। যতটুকু জানা যায়, প্রথম অধিবাসী হিসাবে বসতি স্থাপন করেছিল ১৩টি পরিবার। এরা বেছে নিয়েছিল এই দ্বীপের উত্তরাংশ। কালক্রমে এই দ্বীপটি বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় পরিণত হয়। আগে থেকেই এই দ্বীপে কেয়া এবং ঝাউগাছ ছিল। সম্ভবত বাঙালি জেলেরা জলকষ্ট এবং ক্লান্তি দূরীকরণের অবলম্বন হিসাবে প্রচুর পরিমাণ নারকেল গাছ এই দ্বীপে রোপণ করেছিল। কালক্রমে পুরো দ্বীপটি একসময় ‘নারকেল গাছ প্রধান’ দ্বীপে পরিণত হয়। এই সূত্রে স্থানীয় অধিবাসীরা এই দ্বীপের উত্তরাংশকে নারিকেল জিঞ্জিরা নামে অভিহিত করা শুরু করে। ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে ব্রিটিশ ভূ-জরীপ দল এই দ্বীপকে ব্রিটিশ-ভারতের অংশ হিসাবে গ্রহণ করে।
সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপের আয়তন প্রায় ৮ বর্গ কিলোমিটার ও উত্তর-দক্ষিণে লম্বা। এ দ্বীপের তিন দিকের ভিত শিলা যা জোয়ারের সময় তলিয়ে যায় এবং ভাটার সময় জেগে ওঠে। এগুলোকে ধরলে এর আয়তন হবে প্রায় ১০-১৫ বর্গ কিলোমিটার। এ দ্বীপটি উত্তর ও দক্ষিণে প্রায় ৫.৬৩ কিলোমিটার লম্বা। দ্বীপের প্রস্থ কোথাও ৭০০ মিটার আবার কোথাও ২০০ মিটার। দ্বীপটির পূর্ব, দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে সাগরের অনেক দূর পর্যন্ত অগণিত শিলাস্তূপ আছে।সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপের গড় উচ্চতা ৩.৬ মিটার। সেন্ট মার্টিন্সের পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিক জুড়ে রয়েছে প্রায় ১০-১৫ কিলোমিটার প্রবাল প্রাচীর।
ভৌগোলিকভাবে এটি তিনটি অংশে বিভক্ত। উত্তর অংশকে বলা হয় নারিকেল জিনজিরা বা উত্তর পাড়া। দক্ষিণাঞ্চলীয় অংশকে বলা হয় দক্ষিণ পাড়া এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে দক্ষিণ-পূর্বদিকে বিস্তৃত একটি সঙ্কীর্ণ লেজের মতো এলাকা। এবং সঙ্কীর্ণতম অংশটি গলাচিপা নামে পরিচিত। দ্বীপের দক্ষিণে ১০০ থেকে ৫০০ বর্গমিটার আয়তনের ছোট দ্বীপ আছে যা স্থানীয়ভাবে ছেড়াদিয়া বা সিরাদিয়া/ ছেঁড়া দ্বীপ নামে পরিচিত। এটি একটি জনশূন্য দ্বীপ। ভাটার সময় এই দ্বীপে হেটে যাওয়া যায়। তবে জোয়ারের সময় নৌকা প্রয়োজন হয়।
সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপটির ভূপ্রকৃতি প্রধানত সমতল। তবে কিছু কিছু বালিয়াড়ি দেখা যায়। এ দ্বীপটির প্রধান গঠন উপাদান হলো চুনাপাথর। দ্বীপটির উত্তর পাড়া এবং দক্ষিণ পাড়া দু’জায়গারই প্রায় মাঝখানে জলাভূমি আছে। এগুলো মিঠা পানি সমৃদ্ধ এবং ফসল উৎপাদনে সহায়ক। দ্বীপটিতে কিছু কৃষি উৎপাদন হয়ে থাকে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগন্য।
সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপে প্রায় ৬৬ প্রজাতির প্রবাল, ১শ ৮৭ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, ১শ ৫৩ প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল, ১শ ৫৭ প্রজাতির গুপ্তজীবী উদ্ভিদ, ২শ ৪০ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, চার প্রজাতির উভচর ও ১শ ২০ প্রজাতির পাখি পাওয়া যায়। স্থানীয়ভাবে পেজালা নামে পরিচিত Sea weeds বা অ্যালগি (Algae) এক ধরনের সামুদ্রিক শৈবাল সেন্ট মার্টিন্সে প্রচুর পাওয়া যায়। এগুলো বিভিন্ন প্রজাতির হয়ে থাকে তবে লাল অ্যালগি (Red Algae) বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে জনপ্রিয়। এছাড়াও রয়েছে ১৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী,অমেরুদন্ডী প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে স্পঞ্জ, শিল কাঁকড়া, সন্যাসী শিল কাঁকড়া, লবস্টার ইত্যাদি। মাছের মধ্যে রয়েছে পরী মাছ, প্রজাপতি মাছ, বোল করাল,রাঙ্গা কই, সুঁই মাছ, লাল মাছ,উড়ুক্কু মাছ ইত্যাদি।
দ্বীপে কেওড়া বন ছাড়া প্রাকৃতিক বন বলতে যা বোঝায় তা নেই। তবে দ্বীপের দক্ষিণ দিকে প্রচুর পরিমাণে কেওড়ার ঝোপ-ঝাড় আছে। দক্ষিণ দিকে কিছু ম্যানগ্রোভ গাছ আছে।
১০০ থেকে ১২৫ বছর আগে এখানে লোক বসতি শুরু হয়। বর্তমানে এখানে সাত হাজারেরও বেশি লোক বসবাস করে।এখানকার বাসিন্দাদের প্রধান পেশা মাছ ধরা। পর্যটক ও হোটেল ব্যবসায়ীরাই প্রধানত তাদের কাছ থেকে মাছ কেনেন। ছোট মাছ পাটিতে বিছিয়ে, পিটকালা মাছ বালুতে বিছিয়ে এবং বড় জাতের মাছ পেট বরাবর ফেড়ে মাচায় শুকানো হয়। এ ছাড়াও দ্বীপবাসী অনেকে মাছ, নারিকেল, পেজালা এবং ঝিনুক ব্যবসা করে। এছাড়াও কিছু মানুষ দোকানের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। ছোট ছোট শিশুরা দ্বীপ থেকে সংগৃহীত শৈবাল পর্যটকদের কাছে বিক্রি করে থাকে। সম্পূর্ণ সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপেই প্রচুর নারিকেল এবং ডাব বিক্রি হয়। মায়ানমারের আরাকন থেকে বাংলা ভাষি রোহিঙ্গাদের দ্বীপ অঞ্চলে প্রায়শই দেখা যায়।
দ্বীপটি একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। পর্যটন মৌসুমে এখানে প্রতিদিন ৫টি লঞ্চ বাংলাদেশের মূল ভূখন্ড হতে আসা যাওয়া করে। সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপে বর্তমানে বেশ কয়েকটি ভালো আবাসিক হোটেল রয়েছে। একটি সরকারি ডাকবাংলো আছে।
বিকেলে সেন্টমার্টিন দ্বীপ থেকে ফিরলাম।টেকনাফ পৌঁছতে সন্ধ্যা হয়ে যায়।অত্যন্ত ঝুকিপুর্ণ সফর হওয়তে
যাতে সূর্যাস্তের আগেই টেকনাফ পৌঁঁছা যায় সেই চিন্তা শুরু থেকেই ছিল।আমরা সমুদ্র পাড়ি দিয়ে সন্ধ্যায়ই টেকনাফে ফিরে আসি।সেখান থেকে বাসে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই।

লেখক:নির্বাহী সম্পাদক,দৈনিক আলোকিত সিলেট।
সহ-সভাপতি,সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব।

You may also like

Leave a Comment