গোলজার আহমদ হেলাল : ১৯৯৮ সালে আমি ঢাকাস্থ জার্নালিজম রিসার্চ এন্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউট থেকে সাংবাদিকতার উপর বুনিয়াদী প্রশিণক্ষণ গ্রহণ করি। একই সালে ঢাকা সাংবাদিক ফোরামের অধীনে সাংবাদিকতার উপর আরেকটি কোর্স সম্পন্ন করি। মিডিয়ার প্রতি প্রবল ঝোঁক কিংবা সেই পাঠশালা থেকে লেখালেখির তীব্র আকর্ষণে আমাকে সেগুলো করতে অনুপ্রেরণা দেয়।
সংবাদ কিংবা সাংবাদিকতা পেশার মূল্যায়ন,গুরুত্ব কিংবা তাৎপর্য সম্পর্কে আমি লিখব,তবে আজকের পরিসরে নয়।আজকের লিখনীটা শুধু অতীত দিনের বিবরণী মাত্র।
আমার মনে পড়ছে ১৯৯২ সালে আমি যখন এস এস সি পাশ করে মহাবিদ্যালয়ে প্রবেশ করি।আমার মা বলেছেন আমার বয়স ছিল তেরো।মুরারীচাঁদ কলেজের রং রুপে আর নান্দনিকতায় যখন অভিভূত।
সে সময়ে একটি সংস্থার উদ্যোগে আয়োজিত প্রতিযোগিতায় প্রতিবেদন রচনায় আমি সিলেট অঞ্চলের মধ্যে প্রথম হয়েছিলাম।সিলেট অঞ্চলটা কুমিল্লা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।ঠিক একই ভাবে ১৯৯৮ সালে ঢাকার প্রশিক্ষণ কোর্সে ফিচার লিখনী ও স্পট রিপোর্টিংয়ে সারা দেশে প্রথম হয়েছিলাম।
ঐতিহাসিক রমনার বটমুল আর ঢাকার পিচ ঢালা কালো রাজপথকে সাক্ষী রেখে যে লেখনী লিখছিলাম তা আমাকে প্রায় দেড় যুগ শুধূ প্রেরণাই দিয়ে যাচ্ছে।সময়,বাস্তবতা আর সীমাহীন প্রতিবন্ধকতা জমে থাকা তথ্যগুলি প্রকাশিত হতে বিলম্বের অন্যতম কারণ।
রমনা পার্ক ঢাকা নগরীর রমনা এলাকায় অবস্থিত একটি উদ্যান। এই উদ্যানটি ১৬১০ সালে মোঘল আমলে প্রতিষ্ঠা করা হয়। সেই সময়ে রমনার পরিসীমা ছিল বিশাল এলাকা জুড়ে। মোঘলরাই রমনার নামকরণ করেন।মোগলদের শাসন পাকাপোক্ত হওয়ার পর বাগানের অনুরাগী মোগলেরা এ উদ্যান রচনা করেছিলেন। তখন এর নাম ছিল ‘বাগ-ই-বাদশাহী’। পুরানো হাইকোর্ট ভবন থেকে বর্তমান সড়ক ভবন পর্যন্ত মোঘলরা বাগান তৈরী করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে কোম্পানী আমলে এ এলাকা জঙ্গলে পরিণত হয়। ১৯ শতকে ব্রিটিশ শাসক এবং ঢাকার নবাবদের সহায়তায় এটির উন্নয়ন সাধন করা হয়। ঢাকা শহরের নিসর্গ পরিকল্পনার কাজ শুরু হয়েছিল ১৯০৮ সালে লন্ডনের কিউই গার্ডেনের অন্যতম কর্মী আর. এল প্রাউডলকের তত্ত্বাবধায়নে। শহরের সেই নিসর্গ পরিকল্পনার ফল ছির রমনা পার্কের উন্নয়ন। ২০ বছর লেগেছিল সে কাজ শেষ হতে।
ঢাকা শহরে বিনোদনের জন্য যে কয়েকটি পার্ক সবার কাছে সুপরিচিত রমনা পার্ক তার মধ্যে অন্যতম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় শিশু পার্ক, কাকরাইল মসজিদ ও শেরাটন হোটেলের পাশেই রমনা পার্ক অবস্থিত।এই পার্কের বর্তমান আয়তন ৬৮৫ একর। এর লেকের আয়তন ৮৭৬ একর। এখনকার ইস্কাটন থেকে নীলক্ষেত হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, সচিবালয় পুরো এলাকাই ছিল একসময় রমনা।
বর্তমানে পার্কে কুসুম বিথি, সোনালু, নাগেশ্বর বিথি, অশোক, শতবর্ষী মহুয়া, শতবর্ষী দেশী গাবগাছ, দেশী বাদাম, অঞ্জন, বট, অশ্বত্থসহ ২০ প্রকারের গাছ রয়েছে। জাতীয় ফুল শাপলাসহ বিভিন্ন জলজ ফুল শোভা পায় না রমনা লেকে।
প্রচুর ঘাস, লতাগুল্ম, ছোট ও মাঝারি গাছ, মওসুমি ফুলে সমৃদ্ধ রমনা একটি ঐতিহ্যবাহী পার্ক। এখানে অতি দুর্লভ প্রজাতির অচেনা পাখির কলকাকলিতে প্রশান্তি খুঁজে পায় অট্টালিকাবদ্ধ ঢাকা শহরবাসী।
আমাদের ফিল্ড সুপারভাইজার যখন সেই ইতিহাস তুলে ধরছিলেন আর ঐতিহাসিক ঢাকার কাহিনী বর্নণা করছিলেন তখন মনের অজান্তেই আমরা গেয়ে উঠি ‘কালো রাজপথ যেন মনে হয়
হাজার হাজার পলাশ হয়ে চেয়ে রয়।।
সে কোন যাদুকর পথের উপর ফূটিয়েছে রক্ত পলাশ__
বুকের রুধিরে পাষাণ ঘিরে রেখে গেছে ইতিহাস,
রেখে গেছে দুখিনী মায়ের পরিচয়।।
মায়ের দুচোখে সে কোন পলকে বয়ে গেছে অশ্রুনদী__
সে নদী এসে মিশেছে শেষে রক্ত পলাশ অবধি,
রেখে গেছে হারানো প্রাণের বিনিময়।।‘
আহ, ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৬৯’র গণ অভ্যুথান,৭১’র মহান মুক্তিযুদ্ধ,নববই এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনসহ দেশ মাতৃকার সকল স্বাধিকার আন্দোলনে ঢাকার পিচঢালা কালো রাজপথ কত শতবার রক্তে লাল হয়েছে তার কোন ইয়ত্তা নেই।এ নিয়ে কোন লেখকের লেখনীতে ও লেখা ফুরিয়ে যাবার নয়।ঠিক একইভাবে রমনার রক্তিম কৃষ্ণচুড়া আর লক্ষ লক্ষ পলাশ যেন ঐসকল ঘটনা -দূর্ঘটনার নীরব সাক্ষী।আর সে সাক্ষী যেন কোন জালিমের বেয়নটের আঘাতে মাথা নোয়াবার নয়।বুলেটের আঘাতে রক্ত লাল রাজপথও ফেটে যাওয়ার নয়।
লেখক:নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আলোকিত সিলেট।
সহ-সভাপতি, সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব।
