আমার লাশের খবর বন্ধু শুনবে একদিন জানি,কাঁদবে সবাই ফেলবে শুধু দু’নয়নের পানি (২৯)

by News Room

গোলজার আহমদ হেলাল : ৯০ পরবর্তী সময়ে ছাত্র আন্দোলন ও ছাত্র রাজনীতিতে নতুন ধারার সৃষ্টি হয়।দীর্ঘদিনের এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের বড় প্রাপ্তি হচ্ছে দেশের শাসন ব্যবস্থা সেনা বাহিনীর হাত হতে নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের হাতে ন্যস্ত হওয়া ।

এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সাফল্য বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গৌরবময় অধ্যায় রচনা করেছে ।রাজনৈতিক কর্মকান্ড নিষিদ্ধ থাকলেও ১৯৮২ সালে শিক্ষা দিবসকে কেন্দ্র করে এরশাদের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম আন্দোলন দানা বাঁধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ।

ইসলামি ছাত্র শিবিরকে বাদ দিয়ে গড়ে উঠে সর্বদলিয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ । আবারো এই দেশের ছাত্ররা দেশের রাজনীতিতে একটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে কারণ তখন পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলি জোরালো ভাবে মাঠে ছিল না । সেই সময়ের ছাত্র সংগঠনগুলি বর্তমানের মতো সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি নির্ভর ছিল না যদিও কতিপয় ছাত্রনেতা ক্ষুদ্র স্বার্থে নিজেদের এরশাদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিল । তবে আন্দোলনরত তিন জোট ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র শাসনের জন্য একটি রূপ রেখা ঘোষণা করেছিল যাতে অঙ্গিকার করা হয়েছিল আগামীতে যখনই নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠা হবে দেশে একটি সংসদীয় পদ্ধতির শাসন ব্যবস্থা চালু করা হবে ।

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ বাংলাদেশে সামরিক শাসন প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশে স্বৈরশাসনের বীজ বপিত হয়েছিল যার সমাপ্তি হয়েছিল ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর যখন এরশাদ তার উপ-রাষ্ট্রপতি ব্যারিস্টার মওদুদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন । ব্যরিস্টার মওদুদ বাংলাদেশের সুপ্রীম কোর্টের তৎকালিন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদকে তার উপরাষ্ট্রপতি নিয়োগ করেন এবং তাঁর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন ।

এরশাদ ভাবছিলেন সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ক্ষমতা আরো কিছু দিন উপভোগ করতে।কিন্তু দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী রাজী হয় নি।সুতরাং এটি স্বীকার করতে হবে দেশের ক্রান্তিকালে বাংলাদেশে সেনাবাহিনী অত্যন্ত দায়িত্বশীল ভ’মিকা পালন করে ।

যথারীতি দেশে সধারণ নির্বাচন অনুষ্টিত হয়।১৯৯১ সালে বেগম জিয়া ক্ষমতায় এলে সকল দলের সমর্থনে দেশে দীর্ঘদিন পর সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা চালু হয় ।দেশ কোয়ালিশন সরকার পরিচালনা করতে থাকে।বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করছে।এমতাবস্থায় শিক্ষাঙ্গনগুলোতে সরকার দলীয় ছাত্রসংগঠন “ছাত্রদল” এবং সরকারের নীরব অংশীদার জামায়াতের ছাত্র সংগঠন “ছাত্রশিবির” রীতিমত যুদ্ধ করতে থাকে।অস্থিতিশীল পরিবেশে অনেক হতাহতের ঘটনা ঘটে।বন্ধ হয়ে যায় ছাত্র সংসদ সমুহের নির্বাচন।মুখ থুবড়ে পড়ে ছাত্র রাজনীতি।খেই হারায় বাংলাদেশের চির ঐতিহ্যের ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্রনেতৃত্ব।

যে ছাত্ররা ৫২’র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৯০’র স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন সহ দেশমাতৃকার সকল স্বাধিকার -ন্যায্য আন্দোলনে গৌরবজনক ভূমিকা পালন করেছে তার হৃত ঐতিহ্য এখন আর নেই।বড় দলগুলোর লেজুরবৃত্তিতার কারণে নিজেদের স্বকীয়তা লোপ পেয়েছে।কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ নির্বাচন বন্ধ থাকায় টেকসই নেতৃত্ব আজ আর নেই।এই অবস্থা বিরাজ থাকলে দেশের বিবদমান সকল ছাত্রসংগঠন কালক্রমে দূর্বৃত্তায়নের দিকে নিপতিত হবে।

ইলিয়াস আলী।বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সিলেট জেলা সভাপতি।একসময়ের তুখোড় ছাত্রনেতা।জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারন সম্পাদক ছিলেন।কেন্দ্রে ছিল দাপুটে অবস্থান। ১৯৯১ সালে বি এন পি ক্ষমতায় এলে বিভিন্ন অভিযোগে তিনি গ্রেফতার হন।তাঁর গ্রেফতারের প্রতিবাদে ও মুক্তির দাবীতে সিলেটসহ সারাদেশে আন্দোলন দানা বেঁধে উঠে।গঠিত হয় “ইলিয়াস মুক্তি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ”।এতে নেতৃত্বের মূখ্য ভূমিকা পালন করেন চাকসু’র আপ্যায়ন সম্পাদক কানাইঘাটের কৃতি সন্তান মামুনুর রশীদ মামুন ও যুবদল নেতা আব্দুল মান্নান।

আমি তখন মিরাবাজারে কাদির খান চাচার বাসায় থাকতাম।সেখানে প্রায়ই “ইলিয়াস মুক্তি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ”এর মিটিং হত।আমি নীরবে তা অবলোকন করতাম।মাঝে-মধ্যে ঝেরঝেরী পাড়ায় মিসবাহ চৌ.’র বাসায়ও সভা হত।মামুন ভাই’রা সদলবলে সেখানে যেতেন।

আমার মনে পড়ছে,ইলিয়াস সাহেবের মুক্তির পরে সিলেটে বিশাল সমাবেশ করে সংবর্ধনা দেয় “ইলিয়াস মুক্তি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ”।নগরীর কোর্ট পয়েন্টে অনুষ্ঠিত সেই সমাবেশে এত মানুষের সমাগম হয়েছিল যা ইতোপূর্বে আমি দেখিনি। দুর দূরান্ত থেকে লোকজন এসেছিল শুধুমাত্র ‘ইলিয়াস’ মানুষটাকে দেখার জন্য।আমার গ্রামের ষাটোর্ধ এক সিনিয়র সিটিজেন তিনি সে সময় বলেছিলেন,”আজ আইছি বা ওউ নেতারে দেখতাম করি।”অথচ তিনি বি এন পি’র রাজনীতি করতেন না।

সভা শেষে রাতের খাবারের আয়োজন হয় কাদির মৌলভীর বাসায়।আমি ,খাঁন চাচার একমাত্র পুত্র নাসিম এবং গৃহপরিচারক ধলা মিয়া,ইলিয়াস,বাবুল-১ ও বাবুল-২ অতিথিদের আপ্যায়নে ভুমিকা পালন করি।পাশাপাশি চাচী আম্মা অনেক মজার মজার আইটেম তৈরী করেন।তাঁকে সহযোগিতা করেন শবনম আপা,মুর্শিদা আপা এবং গৃহপরিচারিকা ঝানু দি’,মায়া,হাজিরা ও ঝানউ দি’র কন্যা শিল্পী।রাতের খাবার টেবিলে ইলিয়াস সাহেবের বক্তব্যে তাঁর দলের কিছু নেতার বিরুদ্ধে তির্যক মন্তব্য ফুটে উঠে।বিএনপির শীর্ষ নীতিনির্ধারকেরা তার প্রতি বিভিন্ন কারণে বিরাগভাজন হয়ে ওঠেন।ফলে বিএনপি সরকারই তাকে দুই বছর জেলে রেখেছিল।

দোষ বা গুণ যাই হোক না কেন কথোপকথনে মনে হলো তিনি আপাদমস্তক একজন দুঃসাহসী। জানা যায়, ইলিয়াস আলীর রাজনীতিতে প্রবেশ এরশাদের নতুন বাংলা ছাত্রসমাজের মধ্য দিয়ে।এবং ক্যাম্পাসে অভি নীরুদের রাজত্বের পর ইলিয়াস ‘ই আধিপত্য বিস্তার করেন।

লেখক:নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আলোকিত সিলেট।
সহ সভাপতি, সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব।

You may also like

Leave a Comment