গোলজার আহমদ হেলাল : সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার ।সাজাপ্রাপ্ত ও হাজতী বন্দীদের আবাস স্থল।সে সময় কারাগারের অবকাঠামোগত উন্নয়ন আজকের মতো ছিলনা । আজকে তো অনেক উন্নয়ন ঘটেছে । পি সি”র ব্যবস্থা ছিলনা । ফাইল, ডাইল আর গাইলের মধ্যেই কারাজীবন নিয়ন্ত্রিত থাকতো । থালা ,বাটি আর কম্বলই ছিল প্রকৃতপক্ষে জেল খানার সম্বল ।
গোসল খানায় একসাথে অনেক বন্দীকে গোসল করতে হতো । অর্ধহাত গভীর হাউজে বাটি দিয়ে মাথায় পানি ঢাললে শরীর ভিজাতে আরেক বাটি পানি পাওয়া যেত না । হাউজের জল শেষ হয়ে যেতো । সাবান তো দুরের কথা । স্নান হত অপূর্ণাঙ্গ।
তবে মজার ঘটনা হলো কামাল সাবান মনে করে খেজুরের গুড়ের গোল্লা দিয়ে একজন বন্দীকে শরীর ঘষাতে দেখে দারুন ভাবে দৃশ্য অবলোকন ভুলার মতো নয়। তবে সেখানে পয়সা থাকলে সব কিছুই সহজ হয়ে যায়।
আমার মনে পড়ছে ,আমরা যখন দাগী আসামী ও বিভিন্ন প্রজাতির হাজতীর সাথে প্রতিযোগিতা করতে(গোসলে) পারতাম না।তখন আকিজ বিড়ি চার প্যাকেটের বিনিময়ে কয়েদীর কাছ থেকে চার বালতি পানি ক্রয় করে মনের সুখে স্ন্যান করেছিলাম। কবির ভাষায়:ঐ চাঁদের আলোয় স্ন্যান করি আমরা সেই একই হৃদয় নিয়ে,
শিহরিত হই দুইজনে একই ভাবে।জোনাকী রাত্রে কারাগার থেকে চাদঁও দেখা যায়।তবে মনে হয় যেন সীমানার বাইরের আকাশে চাদঁ।
খুব বেশী মশা ছিল। রাত্রে মশার কামড়ে ঘুম হারাম হয়ে যেতো । মশারী নেই ,কয়েল ও নেই , মশক নিধনে কোনো ব্যবস্থাও নেই।
সবচেয় বড় সমস্যা ছিল টয়লেট সমস্যা। টয়লেটের অবস্থা খুবই খারাপ। দুর্গন্ধযুক্ত, স্যাঁতস্যাঁতে জায়গা। ঘৃণা লাগত ।এর মধ্যে ৩টি টয়লেটের ১টি যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত।সবসময় তালাবদ্ধ। এ যেন মড়ার উপর খড়ার ঘাঁ।
তারপরও ওয়ার্ড ইনচার্জ ( সাজাপ্রাপ্ত কয়েদী ) ও চেয়ারম্যান (অভিযুক্ত আসামীদের মধ্য থেকে ১ জন চেয়ারম্যান থাকত যে খাবার সরবরাহ করত) তাদের সহযোগীতায় আমাদের মোটামুটি ভালই দিন কাটছিল।
ইনচার্জ ভদ্রলোকটির ১৪বছরের কারাদন্ড হয়েছে।বৃদ্ধ লোক।বাড়ী সুনামগন্জে।আমাদেরকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেছেন।তাঁর ঋণ শোধ করার মতো নয়।
৫ওয়াক্ত নামাজ ও যার যার মতো গান ও আনন্দ – ফুর্তি করে সময় অতিবাহিত করতাম। ইকবাল আযান দিতো ,আমি নামাজ পড়াতাম আর রিপন নামায শেষে আলোচনা করত। দিন দিন আমরা মুসল্লী বৃদ্ধিরও চেষ্টা চালাতাম। এ কাজে আমাদের কে অনেকেই সহযোগিতা করত ।
ফজরের নামাজের সময় একদা জনৈক মেয়াসাব ফাইল প্রস্তুতের পূর্বে ঘুমন্ত বন্দীদের উদ্দেশ্যে বলল “ আল্লাহ রে ডাক বা, বিপদে পড়েছো । আল্লাহ ছাড়া সাহায্য করার কোন শক্তি নেই । তারার লাগে নামাজ পড়। ”
লেখক:নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আলোকিত সিলেট।
সহ-সভাপতি, সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব।
