গোলজার আহমদ হেলাল : ছেলেটির নাম বাদল।তাজ উদ্দিন বাদল।সদালাপী,প্রেমময়ী,বন্ধুবাৎসল্য,পরোপকাারী হালকা পাতলা গড়নের মানুষ।দেখতে ফর্সা,মিষ্টী কথার স্বভাবের সেই বালকটি স্বল্পতম সময়ে সবার নজর কেড়েছিল।অদম্য মেধাবী ও দক্ষ খেলোয়াড়ও বটে।
আমার সেই প্রিয় বন্ধুটি স্কুলের পাঠ শেষ না করতেই পরপারে আরোহণ করে।মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাকে বেহেশত নসীব করুন।
আমরা যখন হাই স্কুলে পড়তাম,তখন টিফিনের সময় বিদ্যালয়ের পাশে অবস্থিত সহপাঠী মাহবুবের বাসায় প্রায়ই দুপুরের খাবার খেতাম।মাহবুবের আম্মা খুব স্নেহ ও আদর যত্ন করে আমাদের খাওয়াতেন।সিদ্ধ চালের ভাতের সাথে খালার নিজ হাতে পাকানো পুঁইশাকের তরকারী,শিমবর্তা ও সাধের লাউর সু-স্বাদু কারী আজোও মনে পড়ছে।
মাহবুবের আব্বা ছিলেন একজন সরকারী কর্মকর্তা।বড় ভাই, মাসুদ ভাই ভাল অভিনয় করতেন।পরবর্তীতে প্রকৌশলী হন।সবাই আমাদেরকে খুবই স্নেহ করতেন।
আমার মনে পড়ছে আমি এস এস সি পাশ করার পর আমার শ্রদ্ধেয় বড় চাচা মরহুম বড় মিয়া আমাকে সিলেট মিরাবাজার খান চাচার(মৌলভী আব্দুল কাদির খাঁন) বাসায় নিয়ে আসলেন।কাদির খান সাহেব আমাকে তাঁর বাসায় থাকতে বললেন। এবং আমি যথারীতি এখানে থেকেই এম সি কলেজে পড়াশুনা চালিয়ে যাই।
কাদির খান উপমহাদেশের প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব মৌলভী আলহাজ্ব আব্দুল করিম খান বাহাদুর সাহেবের সুযোগ্য ছেলে।বৃহত্তর জৈন্তিয়া তথা সিলেটের একজন প্রভাবশালী,সজ্জন,এলিট শ্রেণীর লোক হিসেবে সর্বমহলে স্বীকৃতি রয়েছে তাঁর।সমাজসেবক ও পরোপকারী ব্যক্তি হিসেবে জৈন্তা-গোয়াইনঘাটের সর্বস্তরের মানুষের মনিকোঠায় স্বীয় কর্মে স্বল্প সময়ে তিনি স্থান করে নিয়েছেেন।আমি তাঁর বাসায় থাকার সুবাদে অনেক জ্ঞানী-গুণী মানুষের সাহচর্য পাওয়ার সৌভাগ্য হয়।সমাজের উচ্চ স্তরের লোক থেকে শুরু করে সাধারণ ভিক্ষুক ও অসহায় গরীব লোকদের পদভারে সবসময় মগ্ন থাকত বাসভবন।তিনি কারও সাথে রূঢ় অচরণ করেছেন,আমার চোখে পড়েনি।
সিলেটের নবাগত উচ্চ পর্যায়ের সরকারী কর্মকর্তা ও জৈন্তা-গোয়াইনঘাটের অফিসাররা প্রায়ই নিমন্ত্রণে আসতেন।আমাদের শ্রদ্ধেয় চাচী(খান চাচার সুযোগ্য সহধর্মীণী) আমাকে নিজ পুত্রের মতো স্নেহ করতেন।
আমরা প্রায়ই ফজরের নামাজের পর প্রাতভ্রমণে যেতাম।আমি এবং নাসিম(খান সাহেবের ছেলে) ছন্দানীটুলা জামে মসজিদে নামাজ পড়ে সোবহানীঘাট হয়ে নতুন ব্রীজ পর্যন্ত চলে যেতাম।সেখানে বাংলাদেশের অনিন্দ্য সুন্দর নদীগুলোর মধ্যে অন্যতম সুরমা নদীর সকাল বেলার জলরাশি ও নদী পারের লোকগুলোর জীবনাচার উপভোগ করতাম।
মাছিমপুরের লোকজন পানি পান থেকে শুরু করে ঘর-গৃহস্থালীর সব কাজই সুরমায় সম্পন্ন করেন।
সিলেট নগরী গড়ে উঠেছে সুরমা নদীর কোল ঘেঁষেই। সুরমা নদীর মূল উৎপত্তি হয়েছে ভারতের মনিপুর পাহাড়ে। স্থানীয়দের কাছে এ নদীর পূর্ব নাম ছিল বড়-বকরো নদী। অনেকের কাছেই অজানা যে, বাংলাদেশের দীর্ঘতম নদী সুরমা। মনিপুর পাহাড় হতে উৎপত্তি হয়ে সুরমা নদী এদেশে ঢুকে মোট ৬৬৯ কিলোমিটার ভ্রমন করেছে। ভারতে এ নদীর নাম বরাক নদী। উত্তর-পূর্ব ভারতের মণিপুর পাহাড়ের মাও সংসাং হতে বরাক নদীর উৎপত্তি হয়। বাংলাদেশ সীমান্তে নদীটি দুই শাখায় বিভক্ত হয়, এর উত্তরের শাখাটি সুরমা নদী, আর দক্ষিণের শাখার নাম কুশিয়ারা নদী।
একদিন মর্নিং ওয়ার্ক শেষে বাসায় এসে ঘুমিয়ে পড়ি।আমি দু’তলা বিল্ডিংয়ের ২য় তলায় একাই থাকতাম।হঠাৎ শুনি কলিং বেলের শব্দ।প্রচুর বেল বাজছে।কিন্তু কেউ সাড়া দিচ্ছে না।গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির কারণে সবাই ঘুুমাচ্ছেন।গৃহ-পরিচারিকা ধলা মিয়া এবং ইলিয়াসও ঘুমে।আমি নিচে গিয়ে দরজা খুলতেই একজন ভদ্রলোক পেলাম।তিনি আমাকে বললেন ,তুমি কি আমাকে চিনেছ?আমি ইতস্তত করে উত্তর দেয়ার আগেই তিনি তাঁর পরিচয় দিয়ে দিলেন।আমি নিজেকে কিঞ্চিৎ লজ্জিতবোধ করলাম।আমার ক্লাসমেট মরহুম বাদলের গ্রামের (জৈন্তার রামপ্রসাদ)বাসিন্দা মরহুম হাবিবুর রহমান চৌ.হবই চেয়ারম্যান যিনি কাকডাকা ভোরে সে দিন এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে সেখানে এসেছিলেন।অবিভক্ত নিজপাঠ ইউনিয়নের সেই নির্বাচিত চেয়ারম্যান প্রাকৃতিক দুর্যোগ উপেক্ষা করে জনগণের পক্ষে কাজ করতে কোন কুন্ঠাবোধ করেননি।
আসলে জীবন নদীর প্রতিটি বাঁকে কেউ না কাউকে অভিভাবক পেয়েছি।আমি সেই সকল কীর্তিমানদের স্মরণ করি শ্রদ্ধার সাথে, তাদের অবদান ভূলার নয়।
লেখক:নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আলোকিত সিলেট।
সহ-সভাপতি, সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব।
