গোলজার আহমদ হেলাল : “জীবনটা বড় সংগ্রামের তাই না নাসের”-কথাগুলো আমার প্রিয় প্রতিষ্টান এম সি কলেজের প্রাক্তন ছাত্র বর্তমানে রাষ্ট্রের তথ্য ক্যাডারের একজন বড় কর্মকর্তা শ্রদ্ধেয় আফরাজুর রহমানের।ভাঠি অঞ্চলখ্যাত সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত এলাকায় তাঁর বাড়ী।তিনি এমসি কলেজে উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগে পড়াশুনা করতেন।সবসময় তিনি গাছ-গাছালি বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণায় ব্যাস্ত থাকতেন।কলেজের পশ্বিমাঞ্চলীয় তথা ৫ম ছাত্রাবাসের আবাসিক ছাত্র ছিলেন তিনি।আমিও ছিলাম সেখানে।অসম্ভব মেধাবী এ তরুণ অনার্স ডিগ্রী অর্জনের সাথে সাথেই চরম প্রতিযোগিতাপূর্ণ বি সি এস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সে সময়ই সরকারী চাকুরিতে যোগ দেন।নাসির ছিল আফরাজ ভাইয়ের রুমমেট।সে উচ্চ মাধ্যমিকে পড়াশুনা করত।তার বাড়ীও সুনামগঞ্জে।আমরা পাশের কক্ষের বাসিন্দা হওয়ায় তাদের সকল বিষয়ে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।আমি ও আমার স্নেহের ফয়সল আল কয়েছ(শমসেরনগর) ৫১৬নং কক্ষে থাকতাম।আর আফরাজ ভাই ও নাসির থাকতেন ৫১৫নং কক্ষে।একবার নববর্ষের খেতাবে আফরাজ ভাই কে “জীবনটা বড় সংগ্রামের তাই না নাসের” উপাধি দেয়া হয়েছিল।কারণ তিনি প্রায়শ: পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে নাসিরকে এ কথা বলতেন।আসলে সুনামগঞ্জের লোকজন খুব মেধাবী।এখানে হাছন রাজা,আব্দুল করিম,দেওয়ান আজরফ,হাসান শাহরিয়ার এর মতো গুণীজনের আবির্ভাব ঘটেছে।অসংখ্য কিংবদন্তী এবং ঐতিহাসিক ঘটনাবলী ও তথ্যাবলীতে সমৃদ্ধ এ জনপদ। প্রাচীন ইতিহাস থেকে অনুমান করা হয়, সুনামগঞ্জ জেলার সমগ্র অঞ্চল এককালে আসামের কামরূপ বা প্রাগজ্যোতিষপুর রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। সুনামগঞ্জের লাউড় পরগনায় এখনো প্রবাদ হিসেবে কথিত আছে লাউড় পাহাড়ের উপরই কামরূপের রাজা ‘ভগদত্তের’ রাজধানী ছিল। এ ভগদত্ত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৌরবদের পক্ষে যুদ্ধ করেছিলেন বলেও কিংবদন্তী রয়েছে। টাংগাইলের মধুপুর বনেও উক্ত রাজবাড়ীর চিহ্ন ছিল বলে জানা যায়। ঐতিহাসিকদের মতে, এ ভগদত্ত ও মহাভারতের ভগদত্ত এক ব্যক্তি নন, বরং কথিত ভগদত্ত মহাভারতের অনেক পরের কালের মানুষ। এটাই সত্য। কারণ কিংবদন্তী ও ইতিহাস যেখানে মিল হবে না সেখানে ইতিহাস ভিত্তি ধরাই বিধেয়।
বৃহত্তর সিলেট সুদূর অতীতে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন স্বাধীন রাজ্যে বিভক্ত ছিল। এ রাজ্যগুলো হচ্ছে লাউড়, গৌড় ও জয়ন্তিয়া। অনুমান করা হয়, এ লাউড় রাজ্যের সীমানা বর্তমান সমগ্র সুনামগঞ্জ জেলা ও ময়মনসিংহ জেলা এবং হবিগঞ্জ জেলার কিয়দংশ নিয়ে গঠিত ছিল। এ রাজ্যের রাজধানী ছিল লাউড়। সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর থানার উত্তর বড়দল ইউনিয়নের হলহলিয়া নামে পরিচিতি গ্রামে লাউড়ের রাজা বিজয় সিংহের বাসস্থানের ধ্বংসাবশেষের চিহ্ন এখনো বিদ্যমান। স্থানীয়ভাবে এটি হাবেলী (হাওলী) নামে পরিচিতি।
লাউড় রাজ্যের নৌঘাঁটি ছিল দিনারপুর নামক স্থানে। এটি বর্তমান হবিগঞ্জ জেলার অন্তর্গত। রাজধানী লাউড় থেকে নৌঘাঁটি পর্যন্ত সারা বছর চলাচল উপযোগী একটি ট্রাংক রোডের অস্তিত্ব সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের সমর্থন পাওয়া যায়। সুনামগঞ্জের তদানীন্তন ডেপুটি ইন্সপেক্টর অব স্কুলস জনাব মুহাম্মদ ওয়াসিল উক্ত ট্রাংক রোডের ধ্বংসাবশেষ থেকে এ তথ্য উদঘাটন করেছিলেন। মনে করা হয় লাউড় অধিপতি কর্তৃক এ ট্রাংক রোডটি নৌঘাঁটিতে সংযোগ স্থাপনের জন্যই নির্মিত হয়েছিল।
অনুমান করা হয়, সুনামগঞ্জ জেলার বেশীর ভাগ অঞ্চল এককালে একটি সাগরের বুকে নিমজ্জিত ছিল যা কালে কালে পলি ভরাট জনিত কারণে ও ভূ-প্রাকৃতিক পরিবর্তনের সূত্র ধরে ভূখণ্ডে পরিণত হয়েছে। সুনামগঞ্জের ভূগর্ভে চুনা পাথরের খনি ও কয়লা আবিষ্কারের ফলে এরূপ চিন্তার সক্রিয় সমর্থন পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া এখানকার শত শত হাওরের গঠন প্রকৃতি (basin type) বিশ্লেষণ করেও এ মতের সমর্থন দৃঢ় ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। সুনামগঞ্জের টেকেরঘাট প্রাপ্ত চুনাপাথর এক ধরণের ক্যালসিয়াম যা সামুদ্রিক প্রাচীন শামুক ও শৈবাল দ্বারা সৃষ্ট। এতেও পূর্বোক্ত ধারণার পেছনে বৈজ্ঞানিক যোগ সূত্র খুঁজে পাওয়া যায়।প্রায় সব ঐতিহাসিক সূত্র মতে, সুনামগঞ্জের বিশাল ভূখণ্ড যে সাগর বক্ষ থেকে জেগে উঠেছে সে সাগরকে ‘কালিদহ’ সাগর বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ কালিদহ সাগর সুনামগঞ্জ জেলার সমগ্র দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত ছিল। হাছন রাজার জ্যেষ্ঠ পুত্র খান বাহাদুর দেওয়ান গনিউর রাজা চৌধুরীর আত্মজীবনীমূলক রোজনামচাতেও এর উল্লেখ রয়েছে; রয়েছে বিভিন্ন আঞ্চলিক গান, পালা-পার্বণের অনুষ্ঠানগুলিতেও।
সিলেটের কালেক্টর মিঃ লিন্ডসের অষ্টাদশ শতাব্দীতে লিখিত বর্ণনা থেকেও এর সমর্থন পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন- “In the pre Historic days the southern part of Sadar Subdivision and the northern part of Moulivibazar and Habiganj Subdivision and nearly the entire Sunamganj Subdivision were a part of Bay of Bengal.”
হাওর শব্দটি সায়র (সাগর) থেকে এসেছে। বর্ষাকালে সুনামগঞ্জের হাওরগুলো এখনো সে রূপই ধারণ করে। সুদূর অতীতে এই কালিদহ সাগর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, যার উপর দিয়ে ১০১১ খ্রিষ্টাব্দে চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাং জাহাজে করে সরাসরি তাম্রলিপ্ত থেকে সিলেট পৌঁছেছিলেন বলে তাঁর লেখা থেকে জানা যায়। তাঁর মতে, নহরী আজরক নামে একটি নদী কামরূপের পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে হাবাং শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এ নদী দিয়ে বাংলা ও গৌড়ে যাওয়া যেত। এ নদীকে প্রাচীন সুরমা বলে ঐতিহাসিকরা মনে করে থাকেন।যাই হোক ইতিহাস স্বীকৃতি এ জনপদে মেধাবীরা পদস্পর্শ করেছে।বেশ কয়েকবার আমার সুনামগঞ্জ যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল।সুনামগঞ্জ সদর,বিশ্বম্ভরপূর,টেকেরঘাট,জামালগঞ্জ,দিরাই,ডাবর,সাচনাবাজার,দোয়ারা বাজার,পাগলা ইত্যাদি এলাকা ঘুরে প্রতীয়মান হয়েছে এখানকার প্রকৃতি সৃষ্টির অনুকূল।এলাকার লোকজন অতিথিপরায়ণ ও বন্ধুবাৎসল্য।তেঘরিয়ায় লিজুদের বাড়ীতে এত আদর-আপ্যায়ন সহজে ভূলার নয়।তাইতো আমরা দেখেছি ক্যাম্পাসে সুনামগঞ্জের ভাইদের ত্যাগ ও সহমর্মিতা।আমার রুমমেট জামালগঞ্জের সাইফুর পরবর্তীতে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রফেসনাল ডিগ্রী অর্জন করে। আবু ইসহাকের সহনশীল গুণাবলী ঈর্ষণীয়।মনে হচ্ছে, গুণীজনের গুণ- ই যেন সুনামগঞ্জের সুনাম বৃদ্ধিতে যুগ যুগ ধরে অকৃত্রিমভাবে অনুঘটকের কাজ করছে।
লেখক, নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আলোকিত সিলেট।
সহ-সভাপতি, সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব।
