আমার লাশের খবর বন্ধু শুনবে একদিন জানি,কাঁদবে সবাই ফেলবে শুধু দু’নয়নের পানি (১৫)

by News Room

গোলজার আহমদ হেলাল :  এম সি কলেজ ।নাম উচচারণ করতেই মনে পড়ে কত শত স্মৃতি।ঠিক তেমনি আমার প্রাণপ্রিয় হাই স্কুল ও প্রাইমারী স্কুল ,কত যে কথকতা ;লিখে শেষ করা যাবে না।সেই ছোটকালে ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ কিংবা মীর মোশাররফের ‘বিষাদ-সিন্ধু’ অথবা নজরুলের ‘ব্যাথার দান-রিক্তের বেদন’ রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’ পাঠে আমাকে শুধু উজ্জীবিত করত না ভাবিয়েই তুলত রীতিমত।

আমার মনে পড়ছে আমার শ্রদ্ধেয় স্যার প্রফেসর মনোহর আলী কে।তিনি এমসি কলেজে বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করতেন।একদিন বিকালের ক্লাসে তিনি এমন এক হৃদয়বিদারক কাহিনী বর্ণনা করলেন।ঘটনার মর্মস্পর্শীতায় তিনিও কাঁদলেন,আমাদেরকেও কাঁদালেন।মুলত তিনি আমাদের উপন্যাস পড়াতেন।আসলে এমসি কলেজ ,তার ক্যাম্পাস-আঙ্গিনা,শিক্ষক-শিক্ষিকা,কর্মকর্তা-কর্মচারী সহ এর ভৌত-অবকাঠামোগত ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সবকিছুই যুগ যুগ থেকে জ্ঞান বিতরণ করছে।এ যেন জ্ঞানের আধাঁর।

আমি যখন কলেজের ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হই,তখন প্রিন্সিপাল ছিলেন প্রফেসর হাসান ওয়ায়েজ।উপমহাদেশের প্রখ্যাত দার্শনিক।পরবর্তীতে স্যার যশোর শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান হন।স্যারের বাবাও ছিলেন কলেজের প্রখ্যাত প্রিন্সিপাল।এ কলেজেরই এক বিখ্যাত অধ্যক্ষ ছিলেন প্রফেসর আজিজুর রহমান।সিলেটের কৃতি সন্তান।দীর্ঘ দিন ভাইস-প্রিন্সিপাল ছিলেন।পরে প্রিন্সিপাল ও কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান হন।

সম্ভবত ২০০০ সাল।স্যার তখন অবসরে।আমরা কয়েকজন তরুণ মিলে সিলেটে আন্ত:স্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করি।আমি এবং আমার গণিত বিভাগের আরেক কৃতি ছাত্র আবু সাঈদ মো:সাফিউল ইসলাম আমরা দুজন ছিলাম এর চীফ অর্গানাইজার।

সিলেটের প্রায় সবকটি হাই স্কুল এতে অংশ নেয়।সিলেট সরকারী পাইলট বালক স্কুল,ব্লু-বার্ড স্কুল,এইডেড স্কুল,মিরাবাজার জামেয়া,মডেল স্কুল,রসময় মেমোরিয়াল,পুলিশ লাইন,বি ডি আর সকুল,পাঠানটুলা স্কুল,হাতিম আলী,খাজাঞ্চীবাড়ী ইন্টা:স্কুলসহ নামী দামী স্কুলের শিক্ষার্থীরা অংশ গ্রহণ করে।

একেক পর্ব একেক ভেন্যু অর্থাৎ বিভিন্ন স্কুলে প্রতিযোগিতার বিভিন্ন পর্ব অনুষ্টিত হয়।এইডেড হাই স্কুলে ওপেনিং সেশন হয়।তৎকালীন এইডেড স্কুলের প্রধান শিক্ষক বিরাজ মাধব চক্রবর্তী মানস ইহা উদ্বোধন করেন।বিতর্ক প্রতিযোগিতার বিভিন্ন পর্বে সিলেটের স্বনামধন্য ব্যক্তিবর্গ ও গুণীজন ছাড়াও জাতিসংঘের সিরডাপের সদস্য হুমায়ুন কবীরও উপস্থিত ছিলেন।

সমাপনী পর্ব পাইলট স্কুলে হয়।স্কুলের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক এতে সভাপতিত্ব করেন।প্রধান অতিথি ছিলেন এম সি কলেজের প্রাক্তন প্রিন্সিপাল আজিজুর রহমান মিঠু স্যার।আরো ছিলেন সিলেটের প্রাচীনতম দৈনিক যুগভেরী পত্রিকার সাংবাদিক বড় ভাই নজরুল ইসলাম বকসী,দৈনিক সিলেটের ডাক এর এডভোকেট তাজ উদ্দিন,দৈনিক জালালাবাদের মুহিব আলী ভাই প্রমুখ।

মিঠু স্যার সেদিন চমৎকার ভাষণ দিয়েছিলেন।সম্ভবত ‘লেজুড়ভিত্তিক ছাত্ররাজনীতি শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসের মুল কারণ’ টপিকসে প্রতিদ্বন্ধিতা করে সরকারী বালক স্কুল চ্যাম্পীয়নশীপ অর্জন করে।

স্যার বলেছিলেন ছাত্ররাজনীতি আজ দুর্বৃত্তদের দখলে।এ থেকে মুক্ত করতে পারলে জাতিগঠনে ছাত্ররা সঠিক ভূমিকা রাখতে পারবে।তিনি শিক্ষকদের আদর্শ ও ব্যাক্তিত্ববান হওয়ার গুরুত্বারোপ করেন।

জীবনে বড় হওয়ার কাহিনী শুনেছিলাম এমসি কলেজেরই আরেক প্রিন্সিপাল প্রফেসর আব্দুল মান্নান স্যারের কাছ থেকে।তিনি কলেজের গণিত বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন।সেখান থেকে সরাসরি অধ্যক্ষ হন।অসম্ভব মেধাবী ও ধী শক্তিসম্পন্ন।স্যার ছিলেন প্রতিবন্ধী।এক পা ছিল না।তারপরও ক্লাস চলাকালীন এমসি কলেজের উঁচু-নিচু আঁকাবাকাঁ বিশাল ক্যাম্পাস চষে বেড়াতেন।স্যার উত্তরবঙ্গের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে সর্বোচ্চ ডিগ্রী নেন।পরবর্তীতে সিলেটের এ সু-সন্তান দেশের বাইরে থেকেও গণিতের উপর আরো উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন করেন।এরকম সবনামধন্য ও জ্ঞানী ব্যাক্তিদের সাহচর্য লাভ পরম সৌভাগ্যের বিষয়।তবে এ ভিত্তিমূল রচনা করতে যাদের অবদান সবচেয়ে বেশী তারা হলেন আমার স্কুল জীবনের সিনিয়র ভাইসব।যাদের উৎসাহ-অনুপ্রেরণা এবং সহযোগিতা আমাকে আজকে এ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে।এদেরই একজন আমার পরম শ্রদ্ধেয় মাস্টার আব্দুল জলিল।জৈন্তাপুর বাউরভাগ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক তিনি।সেদিন এক অনুষ্টানে তিনি প্রকাশ্যেই আমার ভূঁয়সী প্রশংসা করলেন।তিনি আবেগ আপ্লুত হয়ে নতুন প্রজন্মের সামনে আমার ঈর্ষণীয় মেধার কথা তুলে ধরেন। শৈশব-কৈশোরের সেই তারকাখচিত একাডেমিক গোল্ডেন ফলাফল ও প্রতিভার স্বীকৃতি দিতে কোন কার্পণ্যতা করেননি তিনি।প্রধান অতিথির আসনে থেকেও যিনি আমাকে প্রধান অতিথি দেয়ার আকাংখ ব্যক্ত করেন ,সত্যিই তুমি মহান।সত্যিই তুমি উদার।

লেখক:নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আলোকিত সিলেট।
সহ-সভাপতি, সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব।

You may also like

Leave a Comment