গোলজার আহমদ হেলাল : আমি যখন এমসি কলেজে পড়ি,ইন্টার সেকশনের কথা।বাংলার ক্লাস হতো কলা ভবনের নিচতলায় লেকচার গ্যালারীতে।বেশিরভাগ ক্লাস থাকতো বিকেলের দিকে।আমাদের কিছু বন্ধুরা class ফাঁকি দিত।ঐ সময়ে lecture শুনত না।বিশেষ করে পাইলট ও ব্লু -বার্ডের বন্ধুরা তা প্রায়ই করত।অথচ অধ্যাপক ফরমান আলী স্যার ক্লাসে প্রবেশ করেই উপস্থিতি কম দেখে ঐ দুটো স্কুলের ছাত্ররা ফাঁকি দেয় না বলে মন্তব্য করতেন।এটা স্যারের ভূল পর্যবেক্ষণ নয়,আমি বলব ওদের ব্যাপারে তাঁর সুধারণা মাত্র।তবে আমরা স্যারের কথা শুনে হাসতাম।
ফরমান আলী স্যারের সাথে পরিচয় ১৯৮৭ কিংবা ১৯৮৮ সালে।যতদুর মনে পড়ে আমাদের হাই স্কুলে জৈন্তিয়া কেন্দ্রীয় ছাত্র পরিষদের এক সভায় তাঁকে আমি প্রথম দেখেছি।জৈন্তিয়া কলেজ প্রতিষ্টার দাবিতে সেদিন সেখানে এমসি কলেজের বাংলা বিভাগের তৎকালীন চেয়ারম্যান প্রফেসর ড.সফিউদ্দিন আহমদ,বাংলার আরেক খ্যাতিমান অধ্যাপক বীরেশ চক্রবর্ত্তী ও গিয়েছিলেন।আজ এ কথা আমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে সেদিন যারা স্যারের ক্লাস মিস করেছে তারা আসলে জীবন থেকে অনেক কিছুই হারিয়েছে।
“শৈবাল দীঘিরে বলে উচ্চ করি শির,লিখে রেখো এক ফোঁটা দিলেম শিশির”। -কিংবা “মানুষ বাঁচে তার কর্মে ,বয়সে নয়”-এ ধরনের ভাববোধক বাক্যগুলোর সম্প্রসারণ করতে তিনি ৩/৪ টি লেকচার দিতেন।আহ,স্যারের লেকচার কত না চমৎকার,সুমধুর,আবেগপূর্ণ,সাহিত্যের ষোলকলা সমৃদ্ধ।
পড়ন্ত বিকেলে লেকচার গ্যালারীর জানালা দিয়ে অস্তগামী সূর্যের আলোক বিচ্ছুরণ আর কলাভবনের উত্তর-দক্ষিণ পার্শ্বের বৃক্ষগুলোর মর্মর শব্দ যেন বাংলা সাহিত্যর রসদ যোগাতে অনুঘটকের কাজ করতো।
আমি সারী নদীর ছেলে।সারী গাঙের কূলঘেঁষে গড়ে উঠা গাঁয়ে আমার বসতি।গাছের মর্মর শব্দ আর উদয়-অস্তগামী সূর্যরশ্মির পিরিতি আমার অজানা নয়।
কলেজ আঙিনায় ঐগুলোর নতুন কোন পরিচিতি নয়,বরঞ্চ পুরনো দিনের স্মৃতির অভিষেক মাত্র।ছোটবেলা এক সময় আমরা নদীর চরে বালুর বাঁধ তৈরী করে খেলতাম।এজন্য মায়ের কত যে বকুনী খেয়েছি।তার ইয়ত্তা নেই।
বাড়ীর পাশে বিশাল এক বাঁধ,যা লোকজনের নিকট ওয়াপদার রাস্তা বলেই পরিচিত। মুলত সারী নদীর উপচে পড়া জল কিংবা নদীর যৌবনের বাঁধভাঙা জোয়ারের কবল থেকে গ্রামীণ জনপদ রক্ষায় ইহা নির্মিত হয়।
জানা যায় ১৯৯৫ সালের বন্যায় বাঁধ ভেঙ্গে গিয়েছিল।মানুষ পাহাড়ের চূড়ায় আশ্রয় নিয়েছিল।আমাদের গ্রামের মধ্যেখানে পাহাড় আর পাহাড়ের উভয় নিম্নভূমিতে সারিসারি ঘরবাড়ী।গ্রাম আর সারি নদীর মধ্যস্থলেই ওয়াপদা রাস্তা।রাস্তার ধারে বসেই নদীর ছলছল ধ্বনি উপভোগ করা যায়।
বর্ষাকালে নদী যখন পানিতে ভরপুর থাকে সেই সময় ঘাটে ঘাটে প্রত্যেকেই মাছ ধরার “হগড়া”ফেলতো।আর শীতকাল অবধি তা চলত।শরৎকালের জোৎস্ন্যা রাত্রিতে নদীর তীরে বসে গ্রামের নওজোয়ানদের ভাটিয়ালী গান আমাদেরকে প্রেরণা দিত। পরবর্তীতে একসাথে হগড়া টেনে মাছ ধরে বাড়ী ফিরতাম।
লেখক:নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আলোকিত সিলেট।
সহ-সভাপতি, সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব।
