The Challenge Of Leadership (নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ) Episode 03-পর্ব ০৩

by News Room

গোলজার আহমদ হেলাল
#আধুনিক সমাজকর্ম, সমাজবিজ্ঞান কিংবা এনজিওবিদ্যা নির্ভর রূপকল্প নয় খোলাফায়ে রাশেদার রাষ্ট্রব্যবস্থা ছিল টেকসই।

#খ্রীস্টিয় সপ্তম শতক’ই ছিল আলোকিত এক সোনালী সভ্যতা

#আজ থেকে দেড় হাজার বছর পূর্বে আরবে ছিল অন্ধকার যুগ।পৃথিবীর ইতিহাসে সে সময়কাল বর্বর বা আইয়ামে জাহেলিয়া হিসেবে পরিচিত।বলা হয়েছে অজ্ঞতার যুগ বা the days of ignorance or darkness.খ্রীস্টীয় ৬ষ্ঠ শতাব্দীর এ সময় গোটা দুনিয়া ছিল নানা কুসংস্কার,অন্যায়,অবিচার ও অন্ধকারে নিমজ্জিত।অপর দিকে খ্রীস্টিয় সপ্তম শতকে ছিল আলোকিত এক সোনালী সভ্যতা।অবিচার ও দুর্নীতিমুক্ত, সুবিচার ও ন্যায়পরায়ণমুলক এক স্বর্ণালী সভ্যতা।

অজ্ঞতা আর অন্ধকার থেকে মানুষজনকে আলোর পথে ফেরাতে আল্লাহ যুগে যুগে নবী-রাসুল এ দুনিয়ায় প্রেরণ করেছেন।সৃষ্টির সুচনা লগ্নে মহান আল্লাহ হজরত আদম(আঃ)কে এ ভু-খন্ডে প্রেরণ করেন।তিনি লোকজনকে আকাঈদ ও আখলাকের শিক্ষা দিতেন।সে সময় মানুষের কর্মব্যস্ততা কম ছিল।বিধায় মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের বিধি-বিধানের প্রয়োজনীয়তাও তুলনামুলক কম ছিল।এভাবে অনেককাল অতিক্রম করল।পরবর্তীকালে মানুষের জীবনমান বৃদ্ধি,জ্ঞানের অগ্রগতি ও মানুষের কর্মব্যস্ততা অনেক বেড়ে গেল।

এক সময় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পৃথিবীতে হজরত নূহ(আঃ)কে পাঠালেন।তিনি মানুষকে আকাঈদ ও আখলাকের শিক্ষা দেয়ার পাশাপাশি আল্লাহরই নির্দেশনার আলোকে মানুষকে পারস্পরিক সম্পর্কের শিক্ষা দিলেন।আনুগত্যের এই বিধান, এই দ্বীনকে আল্লাহ হজরত ইবরাহীম(আঃ),হজরত মূসা(আঃ) ও হজরত ঈসা(আঃ)কেও দিয়েছিলেন।এই দ্বীন আল্লাহতায়ালা মানবজাতির সবচেয়ে বড় মহান শিক্ষক বিশ্ব ইতিহাসের বিস্ময়কর ব্যাক্তিত্ব শেষ নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) কেও দেন।এবং তাঁকে গোটা বিশ্বমানবতা ও বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরুপ প্রেরণ করেন।

দুনিয়ায় প্রেরিত সকল নবী ও রাসুলদের দ্বীন ছিল এক ও অভিন্ন।সকলেই তাওহীদ প্রতিষ্ঠার কাজ করেছেন।প্রায় সকলেই একই ভাবে আকাইদ ও আখলাকের দাওয়াত দিয়েছেন।বিশ্বাস ও চরিত্রগত বিধানে কোন পার্থক্য ছিল না।কিন্তু শরীয়ত,রাষ্ট্রব্যবস্থা,মুয়ামেয়ালতসহ অন্যান্য সকল দিকও বিভাগ ছিল ভিন্ন ভিন্ন।এজন্য সময়ে সময়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন প্রযুক্তিগত অবস্থা,মানুষের ভাবনা ও জাতিসমুহের সভ্যতা ও সংস্কৃতি ইত্যাদি বিবেচনা করে কর্মগত বিধি-বিধানও নাজিল করেছেন।

মুলত দ্বীন, দ্বীন কায়েমের প্রচেষ্টা, আল্লাহর দিকে আহবান, দ্বীনের জন্য সংগ্রাম,তাওহীদের প্রচার,আল্লাহর আনুগত্য ও দাসত্ব’র দিকে আহবান,শিরক ও তাগুত বর্জন,সমাজে সুবিচার প্রতিষ্ঠা, শরীয়ত,রাষ্ট্রব্যবস্থা,ব্যবহারিক বিষয়াদি ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত বিধানসহ সব কিছুই ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত।আর আল্লাহর এই জমিনে দ্বীন কে প্রতিষ্ঠার একক মাধ্যম হল ইবাদত।আল্লাহর প্রভুত্ব কায়েমে মহান আল্লাহর উপাসনা করাই মুল বিষয়।

খ্রীস্টীয় ৭ম শতকে নবী মুহাম্মদ(সাঃ) প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থাই এর একমাত্র মডেল।সে সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা ছিল সোনার সমাজ।আল্লাহর রাসুলের সাহচর্যে তৈরী হয়েছিল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সোনার মানুষ।আল্লাহর রাসুলের ভাষায় সর্বকালের সেরা ও শ্রেষ্ঠ যুগ তাঁর যুগ অর্থাৎ খ্রীস্টীয় ৭ম শতক।এ ধরনের যুগ এর আগে কখনও আসেনি।দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সভ্যতা নির্মিত হয়েছিল তখন।জ্ঞান-বিজ্ঞান,দর্শন ও সমকালীন প্রযুক্তিতে এমন উন্নত সভ্যতা ইতোপূর্বে ছিল না।বিশ্ববাসী এ ধরনের রাষ্ট্র ও সমাজের সাথে একাধিকবার পরিচিত হতে পারেনি।এমন আলোকিত মানুষ ও সভ্যতাকেও অবলোকন করতে পারেনি।

রাসুল (সাঃ)এর ভবিষ্যত বাণী অনুযায়ী নবুয়ত পরে খেলাফত,এরপর রাজতন্ত্র,এরপর জুলুমতন্ত্র(বর্তমান যুগ),পরবর্তীতে খেলাফতে আলা মিন হাজিহিন নবুয়ত বা নবুয়তের পদ্ধতিতে আল্লাহর প্রতিনিধিত্বমুলক রাষ্ট্র ব্যবস্থা আসবে।খ্রীস্টীয় ৭ম শতকে নবী মুহাম্মদ(সাঃ) পরিচালিত এবং তাঁরই সার্থক অনুসারী খোলাফায়ে রাশেদীনদের যুগের রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও দর্শনই ছিল আলোকিত,উন্নত ও যুগশ্রেষ্ঠ।খেলাফতে রাশেদার যুগ বিশেষ করে আমিরুল মুমেনীন হযরত উমর(রাঃ)এর সময় রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরিপুর্ণতা লাভ করে।আধুনিক রাষ্ট্রের সকল দিকও বিভাগ সেসময়ে পরিব্যাপ্ত হয়।

খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে হযরত মুহাম্মদ (সা:) সর্বপ্রথম আরব দেশে ইসলামের বাণী প্রচার করেন এবং তারই নেতৃত্বে আরবের শতধা বিভক্ত গোত্রসমূহ সুসংবদ্ধ ও সংহত এক জাতিতে পরিণত হয়। জাতিসত্তার নতুন চেতনা ও উদ্দীপনা একযোগে আরবীয়দের উদ্বুদ্ধ ও আত্মপ্রত্যয়ী করে তোলে এবং তারা অপ্রতিরোধ্য এক সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়। অত্যন্ত দ্রুততার সাথে অল্প সময়ের মধ্যেই তারা পৃথিবীর তিনটি মহাদেশে তাদের প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠায় সমর্থ হয়। প্রথমে সিরিয়া, প্যালেস্টাইন, উত্তর আফ্রিকা, পারস্য দেশ তাদের পদানত হয়। অত:পর তারা পশ্চিমে ইউরোপের স্পেন, পূর্বে সিন্ধু অববাহিকা অতিক্রম করে তাদের সম্রাজ্যের পরিধি বিস্তৃতি করে। নবীজি (সা:) এর অনুসারী মুসলমানগণ তার ওফাতের শত বর্ষের মধ্যে এমন একটি বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি হয়ে ওঠেন যে, তা রোমক শাসনের চরম বিকাশ ও সুবর্ণ যুগের সাম্রাজ্য অপেক্ষা আকারে অনেক বড় ও উন্নত ছিল।

মুহাম্মদ (সা:) এর আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি নতুন ধর্মাদর্শ প্রতিষ্ঠা করা এবং তাতে তিনি সফলকাম হয়েছিলেন। সেই সঙ্গে তিনি একটি সম্পূর্ণ নতুন এবং ব্যতিক্রমধর্মী রাজনৈতিক ব্যবস্থাও প্রতিষ্ঠা করেন। তার প্রথম আকাঙ্ক্ষা বা ইচ্ছা ছিল দেশবাসীদের তাওহীদ বা এক আল্লাহ সব কিছুর স্রষ্টা এ শিক্ষা প্রদান করা। কিন্তু পাশাপাশি তিনি সনাতন নগর সরকারের আদর্শ ও পদ্ধতির পরিবর্তন সাধন করেন, গোত্রীয় অভিজাত্যের পাশাপাশি তিনি সনাতন নগর সরকারের আদর্শ ও পদ্ধতির পরিবর্তন সাধন করেন, গোত্রীয় অভিজাত্যের একচেটিয়া জনস্বার্থ সংরক্ষণের কর্তৃত্বের অবসান ঘটান এবং প্রতিষ্ঠা করেন ধর্মীয় রাজনৈতিক সমাজব্যবস্থা। একই সঙ্গে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসাবে তার প্রধান রূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন।

পৃথিবীতে এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগ চলছে।বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির ফলে মানুষ আর মেশিনের মধ্যে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ চলছে।এ যুদ্ধে মানুষকে জয়ী হতে হবে।নতুবা মানব সভ্যতার ধ্বংস অনিবার্য।মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক প্রযুক্তি দিয়ে নয় আদর্শ দিয়ে ঠিকিয়ে রাখতে হবে।নবীর দেখানো আকাঈদ,আখলাক ও কর্মগত বিধানকে মেনে চলতে পারলে বিশ্বায়নের এ চ্যালেন্জ মোকাবেলা করা সম্ভব।ভুলে গেলে চলবে না ,মনে রাখতে হবে খ্রীস্টীয় ৭ম শতকই মানবেতিহাসের শ্রেষ্ঠ অধ্যায়।

জ্ঞান-গরিমা,সভ্যতা-সংস্কৃতি,সমকালীন প্রযুক্তি ও দর্শনে তা ছিল উন্নত,আলোকিত ও সর্বাধুনিক।
ভাবতে অবাক লাগে আজকের যুগের চেয়ে শ্রেষ্ঠ না কি?হ্যাঁ,সব দিক দিয়েই শ্রেষ্ঠ।শুধু তাই নয়,রাষ্ট্র ও সমাজে সাম্য,মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের উপস্থিতি ছিল শতভাগ।নাগরিকদের অধিকার কস্মিনকালেও ভুলুন্ঠিত হয়নি।শাসক ও শাসিতের সম্পর্ক ছিল ভাই ভাই।প্রভু কিংবা ভৃত্য নয়,রাজা কিংবা প্রজা নয়।চমৎকার সমাজ ও সভ্যতা সে সময়ের পৃথিবী উপভোগ করেছে।আইনের শাসন ছিল প্রবলভাবে।

আজকে যারা ইসলামের আলোকে রাষ্ট্র ও সমাজকে ঢেলে সাজাতে চান কিংবা ইসলামকে বিজয়ী আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান দিগ্বিজয়ী বীর আমিরুল মুমিনীন হযরত ওমর(রাঃ)এর শাসনকালকে মডেল হিসেবে গ্রহণ করুন।এ মডেল সর্বাধুনিক।ইহা নবী মুহাম্মদ (সাঃ)প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র ব্যবস্থার অনুকরণে পুর্ণাঙ্গ এক আদর্শ রাষ্ট্রব্যবস্থা।অন্য কোন মডেল আদৌ এ মনুষ্য সমাজের উপযোগী আছে বলে মনে করি না।

গেল শতাব্দীর শেষের দিকে বিশ্ববিদ্যায়গুলো চাকুরী উপযোগী কিছু ফলিত বিভাগ(সমাজ অধ্যয়ন সম্পর্কিত-সমাজকর্ম,সমাজ কল্যাণ ইত্যাদি) এবং আঠারো কিংবা উনিশ শতকের রাষ্ট্র বিজ্ঞানী ও দার্শনিকরা রাষ্ট্র চিন্তা ও দর্শন নিয়ে যা ভাবনা করেছেন তা কোনকালেই ফারুকী খেলাফতের কাঠামোর ধারে কাছেও যেতে পারবে না। আমার বুঝে আসে না, সাম্প্রতিককালের উদ্ভাবিত এ সকল চাকুরি উপযোগী বিষয়ের ফর্মুলা ও বস্তুবাদী ধ্যান-ধারণা প্রসূত মানব রচিত মতবাদকে কেন রুপকল্প বা মানসচিত্র হিসেবে গ্রহণ করছেন ইসলামী দলগুলো?অনুধাবন করা উচিত খোলাফায়ে রাশেদার রাষ্ট্রব্যবস্থা ছিল টেকসই। প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়গয়গুলোতে অনেক অনেক পুরোনো বিষয়গুলো ছাড়া ঐ আমলের ফলিত দিক গুলোকেই প্রাধান্য পাচ্ছে।আধুনিক সমাজকর্ম, সমাজবিজ্ঞান কিংবা এনজিওবিদ্যা নয়। এগুলো দিয়ে আর যাই হোক নবী প্রতিষ্ঠিত সাম্য,মানবিকতা ও সুবিচারমুলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা অলীক কল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়।রাজনীতি তো নয় বটে।

#গোলজার আহমদ হেলাল
সিলেট, 08/02/23

You may also like

Leave a Comment